আবিরের আদেশে খান বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের তরজর চলছে।
অতিথিদের জন্য বাহারি রকমের নাস্তার আয়োজন করছে বাড়ির বউরা।
তৃধা বোনের বিয়ের আনন্দে পটের বিবি সেজে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সাথে সঙ্গে জুটিয়েছে আদিবাকে। আহিয়ান ড্রয়িং রুমে বসে রেহানের সাথে টেক্সট করছে।
এতক্ষণে টুকটাক অনেক কিছুই রিহানকে জানিয়েছে।
এদিকে আহিয়া পিটপিট করে চোখ খুলল। প্রথমে তার মাথায় ধরল না সে কোথায় আছে।
এটা তো তার রুম না।
পরবর্তীতে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলো সে মা-বাবার রুম আছে।
পাশে তাকাতেই দেখল তার পাপা ইজি চেয়ারে বসে ফাইল চেক করছে।
মনের ভিতর অপরাধবোধ কাজ করতে এই মেয়েটার চোখ দুটো জলে টলটল হয়ে উঠলো।
আহিয়া চোখের পানি মুছে উঠে বসতে চাইল।
তখনই আবির এসে মেয়েকে আর উঠতে দিল না।
আহিয়া পাপার হাত ধরে কেঁদে উঠলো। সেটা দেখে আবির মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল :এভাবে কান্না কেন করছে মামনি....?
তোমার বাবা যতদিন বেঁচে আছে ততদিন একটু ফুলের আসলে তোমার গায়ে লাগতে দিবে না।
তুমি যাকে নিয়ে সারা জীবন সুখে থাকতে চাও তাকেই বিয়ে কর।
আমি সৈকতের আব্বুর সাথে কথা বলে নিয়েছি। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা না করে রেস্ট করো।
আহিয়া কাতর কন্ঠে বলল : সরি পাপা...
_________+__________
দেখতে দেখতে চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিকাল পাঁচটা বাজে, রিহান ও তোর আব্বু আম্মু প্রবেশ করল খান বাড়িতে।
তারা সাথে করে নিয়ে এসেছে ঝুড়িঝুড়ি ফল মিষ্টি...
রাকিবের কেন জানি আজকে অনেক অস্থির লাগছে।
এই খান বাড়িতে জীবন এসে বহুবার এসেছে।
কিন্তু আজকের মত অনুভূতি কোনদিনও হয়নি। রাকিবকে দেখে সকলেই এগিয়ে আসলো।
রাকিব সকলের সাথে কুশলাদি বিনয় করল।
রেহানুর আম্মুর বয়েজযোষ্ঠীদের সালাম দিল। আহিয়ান রিহান কে একটু সহজ করার জন্য ওর সাথে নিয়ে সোফায় বসলো।
তানভীর রাকিবের সাথে দেখা করে গেল আবিরকে ডাকতে।
আদি ওদের ড্রইং রুমের কোথায় বসালো। ওরা বসতেই আলী আহমেদ খান মোজাম্মেল খান ইকবাল খান। যেহেতু ওরা পূর্ব পরিচিত তাই সকলের একটি টুকটাক আলোচনা করলো।
তখনই সেখানে উপস্থিত হল আবির।
আবির কে দেখে রাকিব কিভাবে কি শুরু করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
কেমন জানি সব অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে।
রিহা আবিরকে একটা সালাম দিয়ে চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
এই প্রথমবার তার ভীষণ লজ্জা লাগছে।
কেন জানি তার মনে হচ্ছে সকলেই তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাকিব কিভাবে কি বলবে বুঝতে না পেরে আবির সামনে আসতে হ্যান্ডসেকের জন্য জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল: কেমন আছিস...?
রাকিবের ইতস্তত বোধ আবির বুঝতে পেরে বলল: হ্যান্ডসেকের দিন শেষ। বিয়াই হতে যাচ্ছিস কোলাকুলি কবরি না।
রাকিব যেন আসমান থেকে পড়ছে। পরবর্তীতে বিষয়টা মনে পড়ে আবির কে জড়িয়ে ধরলো।
খুশিতে আবিরের কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল: thank you bondhu....
আবির নিজেও বন্ধুর সাথে কোলাকুলি করে বলল: মেয়ে দিচ্ছি বলে পুরানো বন্ধুত্ব ভুলে যাস না।
ওদের দুজনকে নিয়ে পরিবারের সকলেই ভীষণ চিন্তিত ছিল। কিন্তু ওদের এভাবে মিলনমেলা দেখে সকলেই ভীষণ খুশি।
ওদের ওই দুই বন্ধুর এই দৃশ্যটা রান্নাঘর থেকে বাড়ির বউরাও দেখতে মিস করল না।
দ্বিতীয় তলার করিডর থেকে আহিয়া ও নিজে নিজের সচক্ষে সবকিছু দেখল।
সে মায়ের রুম থেকে নিজের রুমে যাচ্ছিল। কিন্তু যাওয়ার পরে চোখে পড়ল অপার্থিব দৃশ্য।
তখনই পিছন থেকে কেউ এসে বলল: ভো ভো...
আহিয়া ভয় খতমত খেয়ে পিছনে তাকালো। দেখলে তৃধা দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে।
আহিয়া ত্রিধার মাথায় হালকা চাপড় মেরে বলল : তুই আর বড় হলি না ।
তখনই ওদের পিছনে এসে দাঁড়ালো রাই। অতঃপর আহিয়াকে ডেকে বললো আহিয়া এখনি রুমে চলো।
বড় ভাবি বলেছে তোমাকে ছটফট রেডি করে দিতে।
ওরা দুজনে দেখল কাকিমনির হাতে সোনালী কারু কাজ করা খয়রি রঙের একটা জামদানি শাড়ি।। আর তার উপর কিছু গহনার বক্স।
আহিয়া আমতা আমতা করে বলল: আমি কেন রেডি হবো কাকি মনি...?
রাই দুষ্টুমি করে বলল: ওমা.. তোমার বিয়ের কথা চলছে তুমি রেডি হবে না তো কে হবে...?
মুহূর্তে লজ্জায় আহিয়ার গাল লাল হয়ে গেল।তৃধা আহিয়া কে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল: আপু তাড়াতাড়ি উপরে চলো আমি আজকে তোমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিব...
অতঃপর রাই ও ত্রিধা আহিয়া কে নিয়ে আহিয়া রুমে গেল।
এদিকে মেঘ ও বন্যা। নানারকম নাস্তার আইটেম সাজিয়ে দিচ্ছে অতিথিদেরকে।
আসার পর থেকেই রিয়ার সাথে টুকটাক অনেক কথাই হয়েছে।
রিয়ার কথাবার্তা শুনে ওরা বুঝেছে। আহিয়া কি রিয়ার কতটা পছন্দ।
রিয়ার কোন মেয়ে নেই। আহিয়া কে সেই মেয়ের জায়গা দিতে চায়।
আহিয়া কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার।
সন্ধ্যা বেলায় দুই শাশুড়ি বউ চা খেয়ে খেয়ে সিরিয়াল দেখতে চায়। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে মতো শপিং করতে চায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
মেঘের কেন জানি মনে হলো তার মেয়ের জন্য এমন ভালো শাশুড়ি আর অন্য কোথাও পাবে না।
নাস্তা খেতে খেতে আলী আহমেদ খান মোজাম্মেল খান ইকবাল খান আবির রাকিব ইতিমধ্যে বিয়ের সকল কথায় সেরে ফেলেছে।
ওদের সাথে টুকটাক কথায় তাল মিলিয়েছে তানভীরও আদি।
অবশেষে 15 দিন পর ৯ জানুয়ারি ওদের এনগেজমেন্ট তারিখ ঠিক করা হলো।
আর এংরেজমেন্ট এর ১৫ দিন পর ২৩ শে জানুয়ারি ওদের বিয়ের দিন ঠিক করা হলো।
মেঘ মিষ্টি এলে সকলকে মিষ্টিমুখ করালো।
খান বাড়িতে বহু বছর পর বিয়ে তাই সকলেই ভীষণ খুশি।
তাছাড়া আবিরের একমাত্র রাজকন্যার বিয়ে বলে কথা কোথাও কোন কমতি চায় না আবির।
তাইতো বিয়ের আগে একমাস সময় নিয়েছে।
অগত্য আবিরের কথা বিয়ের ডেট এক মাস পর ফেলা হলো।
আহিয়ান রিহানকে সকলের অগোচরে খোঁচা মেরে বলল: বিয়ের ফুল তো ফুটিয়ে দিলাম ট্রিট কবে দিবি..?
রেহানা সকলের অগোচরে ফিসফিসিয়ে বলল: আগে দুলাভাই ডাক তারপর ট্রিট দিবো...
—আহিয়া আমার ছোট বোন আমি তোকে দুলাভাই ডাকতে যাব কোন আনন্দ...?
বরং তুই আমাকে বড় ভাই ডাকবি। এখন থেকে আমি তোর সমন্দি হই বুঝলি।... সমন্দি....!
তখনই শোনা গেল রিহানের মায়ের কন্ঠ, মালিয়া খানের উদ্দেশ্যে বললেন: আন্টি আমার বৌমাকে কি একটু ডাকা যাবে...
মালিহা খান মৃদু হেসে মেঘ কে বলল: আহিয়া কে নিয়ে আসতে....
—আপু তোমাকে জাস্ট ওয়াও লাগছে...
তৃধা কথায় আহিয়া আজকে লজ্জায় লাল নীল হয়ে যাচ্ছে।
ফর্সা মেয়েটাকে খয়রি রঙের জামদানি শাড়িতে দুর্দান্ত মানিয়েছে।
তার সাথে হালকা গহনা। চোখে কাজল কপালে টিপ ও হালকা খয়রি লিপস্টিক।
তার সাথে মাথায় ঘোমটা দেওয়া একদম বউ বউ লাগছে।
রাই সাজানো শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে পাঁচবার বলেছে মাশাআল্লাহ।
এগুলো শুনে আহিয়া শুধু মিষ্টি হেসেছে।
তৃধা আহিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে ভাবলো: প্রিয় মানুষের সাথে বিয়ে হচ্ছে আপু কতটা খুশি...
যদি অন্য কারো জন্য আজকে সাজতে হতো তাহলে মেয়েটা বুঝি কেঁদে অস্থির হয়ে যেত।
আর তার আহিয়া আপু কেন...? সে নিজেও পারবে না কখনো অন্য কারো জন্য সাজতে।
তার সকল সৌন্দর্য দেখার অধিকার শুধু তার আহিয়ান ভাইয়ের।
সে হাজার বার সাজবে শুধু তার আহিয়ান ভাইয়ের জন্য।
ওর ভাবনার মাঝে রুমে প্রবেশ করল মেঘ... প্রথমে মেঘে দেখে প্রশান্তি ময় হাসলো। তারপর মেয়েকে জাপটে ধরে হুহু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
এখন মায়ের তালে তালে তাল মিলিয়ে আহিয়া।
রাই মাথায় হাত দিয়ে বিছানার কোনে বসে আছে এতক্ষন।
কতক্ষণ ধরে সাজিয়েছে মেয়েটাকে। মুহূর্তে কান্নাকাটি করে চোখের কাজল লেপটে ফেলেছে।
অবশেষে এই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারল না রায় ও তৃধা। মা মেয়েকে ছাড়িয়ে আলাদা করল।
দুজনকে শান্ত করলো এবং আহিয়াকে আবার মুখ ধুয়ে নিয়ে এসে নতুন করে সাজাতে শুরু করল।
সকল মুরুব্বিদের মাঝে বসে আছে রিহান ও আহিয়ান। অবশ্য আহিয়ালি এতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু আজকে রেহানের অবস্থা ভিন্নরকম। তার কেন জানি অস্থির লাগছে।
কারো চোখে চোখ রাখতে পারছে না। তাই বেশিরভাগ সময় নিচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
তখনই আহিয়ান হঠাৎ গালাফাকারি দিল। সেটা দেখে রিহার কিছু বলার জন্য মাথা তুললে নজর গেল সিড়ির দিকে।
চোখে কাজল ও ঠোটে লিপিস্টিক দিয়ে তার কাছে তার আহি আপাকে কে স্বর্গের অপ্সরার মত লাগছে।।
রিহান যেন প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে গেছে। আহিয়া কি এর আগে কখনো এরকম সাথে দেখা সৌভাগ্য হয়নি তার। রিহান কাপা হাতে আহিয়ানের হাত চেপে ধরল।
আহিয়ান মজা করে বলছে :আরে বন্ধু control yourself...
এখানে মুরুব্বিরা আছে জ্ঞান হারাইয়া আমার মান সম্মান খাস না।