ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিপ্টে সাহেবের শখের বউ

পর্ব 1

লেখক: tesha mony

কিপ্টা সাবের শখের বউ 🤣❤️

পর্ব — ০১ | বড়লোকের কিপটা পোলা!

লেখিকা: teha mony

সকাল সাড়ে আটটা।

গ্রামের নাম শ্যামপুর। তবে এই গ্রাম দেখলে কেউ একে গ্রামের বাইরের কিছু ভাবতে পারে। পাকা রাস্তার দুই পাশে বড় বড় বাড়ি, নামিদামি রেস্টুরেন্ট, শপিং মার্কেট, ব্যাংক, হাসপাতাল—কী নেই এখানে! গ্রামের অনেকেরই ঢাকায় ব্যবসা আছে। কেউ কোটি টাকার মালিক, কেউ আবার বাপ-দাদার জমিজমা দেখাশোনা করেই দিব্যি রাজকীয় জীবন কাটায়।

এই গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়িগুলোর একটির নাম সাদিক ভিলা।

তিনতলা বিশাল বাড়ি, সামনে বাগান, পাশে সুইমিংপুল, গ্যারেজে তিনটা গাড়ি। বাড়ির মালিক সাদিক সাহেবের ব্যবসা আছে ঢাকা শহরে। টাকার অভাব কী জিনিস, সেটা তিনি জীবনে কখনো বুঝতে পারেননি।

কিন্তু এত বড় বাড়ির একটা ছোট্ট সমস্যা আছে।

সমস্যাটার নাম—আয়ান সাদিক!

বাড়ির ছোট ছেলে। বয়স ছাব্বিশ। দেখতে সুদর্শন, লম্বা, স্মার্ট, কথা বলার সময় মুখে এমন একটা ভাব থাকে যেন পুরো গ্রামের জমিজমা তার নামে লেখা।

কিন্তু পোলার কলিজাটা টাকার ব্যাপারে একেবারে নরম।

না, নরম মানে খরচ করতে গেলেই গলে পানি হয়ে যায়!

নিজের নামে গাড়ি আছে, অথচ পেট্রোল বাঁচাতে হেঁটে যায়। আলমারিভর্তি জামাকাপড় আছে, তবু বড় ভাইয়ের শার্ট গায়ে দিয়ে ঘোরে। বাবার কোটি টাকার ব্যবসা আছে, কিন্তু আয়ানের পকেটে পঞ্চাশ টাকা ঢুকলে সে টাকাটাকে এমনভাবে আগলে রাখে, যেন সেটা তার সাত পুরুষের শেষ সম্পত্তি!

আর মুখ?

আল্লাহ মাফ করুক! রাগ উঠলে গ্রামের মানুষ রাস্তা পরিবর্তন করে।

### সকাল সকাল বাড়িতে তুলকালাম!

— আম্মাআআআ!

আয়ানের চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।

রান্নাঘর থেকে তার মা রাহেলা বেগম ছুটে এলেন।

— কী হইছে রে? বাড়িতে আগুন লাগছে নাকি?

আয়ান এক হাতে নিজের মানিব্যাগ, আরেক হাতে বড় ভাইয়ের পারফিউম ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

— আম্মা, এই বাড়িতে চোর ঢুকছে!

মা অবাক।

— কী চুরি করছে?

— আমার মানিব্যাগ থেইকা দুইশো টাকা নাই!

রাহেলা বেগম ছেলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন।

— তোর মানিব্যাগে দুইশো টাকা ছিল?

— হ। কাল রাতে হিসাব কইরা রাখছিলাম। দুইটা একশ টাকার নোট। একটা আমার, আরেকটা আমার ভবিষ্যতের বিপদের দিনের জন্য।

— তোর ভবিষ্যতের বিপদের দিন কবে?

— যেদিন আমারে জোর কইরা বিয়া দেওয়া হইব!

মা কপালে হাত দিলেন।

— আল্লাহ, এই পোলার কপালে কী আছে!

এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল আয়ানের বড় ভাই আদনান সাদিক। পরনে দামি শার্ট, হাতে ঘড়ি, গায়ে পারফিউমের ঘ্রাণ।

আদনান নিচে নেমেই বলল,

— এই সকাল সকাল চিল্লাচ্ছিস কেন?

আয়ান চোখ সরু করে ভাইয়ের দিকে তাকাল।

— তুই আমার দুইশো টাকা নিছস?

আদনান থমকে গেল।

— আমি তোর দুইশো টাকা নিয়ে কী করব?

— তুই বড়লোক, তোর টাকার অভাব নাই। কিন্তু চোরের অভাবও নাই। অনেক বড়লোকই চুরি করে!

— হারামজাদা! তোর টাকা আমি চুরি করব?

— ওই যে, রাগ করতেছস ক্যান? চোরের মন তো পুলিশের ডর!

আদনান এগিয়ে এসে আয়ানের মাথায় একটা টোকা দিল।

— শালা, তোর মানিব্যাগে টাকা ছিল কবে? তুই তো টাকা খরচ করার ভয়ে দোকানে গিয়া দাম জিজ্ঞেস করেও কিছু কিনিস না!

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের শার্টের কলার ঠিক করে দিতে দিতে বলল,

— আরে ভাইজান, রাগ করেন ক্যান? আপনার মতো সম্মানিত মানুষ দুইশো টাকা চুরি করবেন, এইটা আমি বিশ্বাসই করি না।

আদনান চোখ ছোট করল।

— তাহলে?

— কিন্তু সন্দেহ তো করতেই হয়। দুনিয়ার মানুষ বিশ্বাসের যোগ্য না।

— তোরে এক থাপ্পড় দিলে বিশ্বাস ফিরব?

— ঠাপ খাবি কিন্তু!

— কী বললি?

— কই? আমি কইলাম, চা খাবি নাকি? সকাল সকাল মেজাজ খারাপ করিস না, ভাইজান!

আদনান এবার হেসে ফেলল।

— তোর মতো বলদা আমি জীবনে দেখি নাই।

আয়ান বুক ফুলিয়ে বলল,

— কারণ তুই আমার মতো জিনিয়াস না!

কথাটা বলেই সে ভাইয়ের হাতে থাকা পারফিউমটা নিয়ে নিজের গলায় দুইবার স্প্রে করল।

আদনান চিৎকার করে উঠল,

— ওইইই! আমার পারফিউমে হাত দিলি কেন?

আয়ান নির্বিকার।

— আমি দিই নাই। বোতলটা নিজেই আমার দিকে ঝুঁইকা পড়ছে।

— বোতল নিজে ঝুঁকে পড়ছে?

— হ। আপনার পারফিউমেরও আমারে পছন্দ হইছে।

— হারামি! দাম জানিস এইটার?

আয়ান বোতলের গায়ে লেখা দাম দেখে চোখ বড় বড় করল।

— এত টাকা! এইডা পারফিউম নাকি জমির দলিল?

— দামি জিনিস।

— দামি তো বটেই! এই টাকা দিয়া আমি ছয় মাস চা খাইতে পারতাম!

আদনান বোতলটা কেড়ে নিল।

— আর একবার আমার জিনিসে হাত দিলে হাত ভাঙব!

আয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— জাওরা পোলাপান! নিজের ছোট ভাইরে একটু পারফিউমও ব্যবহার করতে দিবি না!

আদনান চলে যেতে যেতে বলল,

— নিজের টাকা দিয়ে কিনে ব্যবহার করিস!

আয়ান পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল,

— এই যে, বড়লোকের বাচ্চা! ছোট ভাইরে টাকা দিতে তোর কলিজা ফাইট্টা যায় কেন?

আদনান পেছনে ফিরে মুচকি হাসল।

— তুই ছোট ভাই না, তুই একটা আর্থিক দুর্যোগ!

আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মায়ের দিকে ফিরে বলল,

— আম্মা, ভাইয়ারে একটা বিয়ে দেও। বউ আসলে ওর টাকা-পয়সা নিয়া ব্যস্ত থাকবে, আমার পিছে লাগতে পারব না।

মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

— আগে তোরে বিয়ে দিই। তোর বউ আইসা তোর কিপটেমি ঠিক করুক।

আয়ান এমনভাবে চমকে উঠল, যেন মা তার সামনে বিয়ের খরচের বিল ধরেছেন।

— আমার বিয়ে? ক্যান? আমি কি অসুস্থ?

— বিয়া করলে অসুস্থ হবি কেন?

— আম্মা, বিয়া মানে একখান মানুষ সারাজীবন আমার পকেটের ওপর নজরদারি করব! আমি এখনো নিজের টাকায় নিজেরে খাওয়াইতে পারি না, আরেকজনরে খাওয়ামু কী দিয়া?

মা হাত তুলে বললেন,

— আল্লাহ! এই পোলার মুখ বন্ধ করো!

আয়ান মাথা নেড়ে বলল,

— বন্ধ করতে গেলেও খরচ আছে আম্মা। তালা কিনতে হইব!

### অন্যদিকে, ঐশীদের বাড়ি

শ্যামপুর বাজারের কাছেই ছোট্ট সুন্দর একটা বাড়ি। বাড়ির সামনে ফুলের টব, বারান্দায় মানিপ্ল্যান্ট, আর দরজার পাশে একটা সাইকেল দাঁড় করানো।

এই বাড়িতেই থাকে সিদরাতুল জান্নাত ঐশী।

ঐশীর বাবা আবদুল করিম একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মা শারমিন বেগম সংসার সামলান। খুব ধনী না হলেও পরিবারে হাসি-আনন্দের অভাব নেই।

আর ঐশী?

মেয়েটার মুখ একবার চলতে শুরু করলে ঘড়ির কাঁটাও লজ্জা পায়!

সকালবেলা নাশতার টেবিলে বসে সে মাকে বলছে,

— আম্মু, আজকে বাজারে যাব। একটা সুন্দর জামা দেখছি। কিনতে হবে।

মা রুটি বানাতে বানাতে বললেন,

— গত সপ্তাহেও তো জামা কিনলি!

— ওইটা গত সপ্তাহের জামা, আম্মু।

— তো কী হইছে?

— এই সপ্তাহে নতুন সপ্তাহ। নতুন সপ্তাহে নতুন জামা না কিনলে সপ্তাহটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়!

বাবা পত্রিকা নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

— বাহ! এই যুক্তি দিয়ে তো তুই প্রতিদিন নতুন জামা কিনতে পারবি!

ঐশী হাসল।

— পারব তো! কিন্তু কিনি না কেন জানেন? আমি অনেক হিসাবি মেয়ে।

মা হেসে বললেন,

— তোর হিসাবের খাতা দেখলে ব্যাংকের ম্যানেজারও চাকরি ছাইড়া দিবে!

ঐশী বাবার প্লেট থেকে একটা রুটি তুলে নিল।

বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন,

— এই যে! নিজের প্লেটে রুটি আছে, আমারটা নিলি কেন?

— আব্বু, আপনার রুটিটা দেখতে বেশি সুন্দর।

— রুটির আবার সৌন্দর্য কী?

— আমার রুচি আছে, আব্বু। আপনি বুঝবেন না।

বাবা মাথা নাড়লেন।

— তোরে বিয়া দেওয়ার আগে ছেলেপক্ষকে সতর্ক করে দিতে হবে।

ঐশী মুখে রুটি পুরে বলল,

— আগে ছেলে খুঁজে বের করেন। তারপর সতর্ক করবেন। আর হ্যাঁ, ছেলে যেন কিপটা না হয়!

মা জিজ্ঞেস করলেন,

— কিপটা ছেলে তোর এত অপছন্দ কেন?

ঐশী গম্ভীর হয়ে বলল,

— কারণ আমি এমন ছেলেকে বিয়ে করতে চাই না, যে আমারে আইসক্রিম কিনে দিয়ে পরে আইসক্রিমের কাঠি ফেরত চাবে!

বাবা হেসে কাশতে লাগলেন।

ঐশী হাত নেড়ে বলল,

— হাসেন, হাসেন! পরে কিন্তু আমার জামাই যদি বলে, ‘বউ, তোমার হাসির শব্দে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ে’, তখন বুঝবেন!

কেউ জানত না, এই কথাটাই অদূর ভবিষ্যতে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যার সঙ্গে মিলে যাবে।

কারণ শ্যামপুরে এমন এক পোলা আছে, যে সত্যিই হাসির হিসাব করতেও পিছপা হবে না!

### বাজারে প্রথম দেখা! ❤️

বেলা এগারোটা।

ঐশী তার বান্ধবী মিমিকে নিয়ে বাজারে এসেছে। দুজনের উদ্দেশ্য—কিছু কেনাকাটা করা, ফুচকা খাওয়া আর একটু ঘোরাঘুরি।

অন্যদিকে আয়ান বাজারে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে।

সে এসেছে ফ্রি চা খেতে!

বাজারের মোড়ে একটা চায়ের দোকান আছে। দোকানদার কাশেম চাচা আয়ানকে দেখেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— আবার আইছস?

আয়ান বেঞ্চে বসে পা তুলে দিল।

— ক্যান চাচা? এই দোকান কি আপনার বাপের?

কাশেম চাচা চোখ পাকালেন।

— আমার বাপের না হইলেও আমারই দোকান! তুই প্রতিদিন আইসা এক কাপ চা খাস, টাকা দেস না। এইবার আগে টাকা, পরে চা!

আয়ান আহত গলায় বলল,

— ছিঃ চাচা! মানুষের ওপর এত অবিশ্বাস! আমি কি আপনার দোকান খাইয়া ফেলছি?

— চা খাইছস!

— চা তো আপনি এমনিই বানাইছেন। আমি শুধু কাপটা ব্যবহার করলাম, টাকা কিসের?

কাশেম চাচা হাতে থাকা চামচটা নামিয়ে রাখলেন।

— তোর মাথায় কি গোবর ভরা?

— না চাচা, মগজ ভরা। গোবর থাকলে আপনার মতো ব্যবসা করতাম!

দোকানে বসে থাকা দুজন লোক হো হো করে হেসে উঠল।

কাশেম চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন,

— যা ভাগ! তোরে চা দিমু না।

আয়ান বুকের ওপর হাত রেখে বলল,

— এইডা অন্যায়! একজন নাগরিকের চা খাওয়ার অধিকার আছে!

— টাকা দিয়া খা!

— টাকার কথা বারবার কইতেছেন কেন? টাকা কি আপনার মামা দিছে?

— তোর বাপও তো টাকা দেয় না!

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

— আমার বাপের নাম নিবেন না! উনি সম্মানিত মানুষ!

কাশেম চাচা ভ্রু তুললেন।

— আর তুই?

— আমি উনার ছোট ছেলে। আমার সম্মান একটু কম, কিন্তু বংশের মান একই!

এই বলে আয়ান পাশের বেঞ্চে বসে পড়ল। তারপর দোকানের সামনে রাখা পানির জগ থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল,

— চাচা, এক কাপ চা দেন। চিনি একটু বেশি দিয়েন।

— টাকা?

— আবার ওই একই প্রশ্ন! চাচা, আপনার স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করা দরকার।

কাশেম চাচা একটা ঝাড়ু হাতে তুলে নিলেন।

— ভাগবি, নাকি ঝাড়ুর বাড়ি খাইবি?

আয়ান লাফ দিয়ে উঠে বলল,

— শ্যাটা! বুড়া বয়সে মানুষ ধর্মকর্ম করে, আর আপনি আমার পেছনে ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ান!

ঠিক সেই মুহূর্তেই দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল ঐশী আর মিমি।

ঐশী প্রথমে আয়ানের কথা শুনল। তারপর তার মুখের দিকে তাকাল।

ছেলেটাকে দেখতে বেশ ভালো। পোশাক-আশাকও সুন্দর। চেহারায় একটা আত্মবিশ্বাসী ভাব আছে।

ঐশী মনে মনে বলল, ছেলেটা দেখতে তো বেশ!

কিন্তু পরের কথাটাই তার সেই ভালো লাগায় প্রথম ধাক্কা দিল।

আয়ান কাশেম চাচার ঝাড়ু দেখে পেছাতে পেছাতে বলছে,

— চাচা, আমারে মারলে আপনার ঝাড়ুর ক্ষতি হইব! আমার গায়ে ধুলাবালি আছে!

মিমি ফিসফিস করে বলল,

— ঐশী, এই পোলা পাগল নাকি?

ঐশী ঠোঁট চেপে হাসল।

— পাগল হইলেও মজার পাগল!

কাশেম চাচা ঝাড়ু নামিয়ে বললেন,

— টাকা দে!

আয়ান এবার পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করল। কয়েনটা আঙুলে ঘুরিয়ে বলল,

— এই নেন। চায়ের দাম পাঁচ টাকা।

— চায়ের দাম দশ টাকা!

আয়ান এমনভাবে তাকাল, যেন চাচা তার সামনে জমির দলিল ছিঁড়ে ফেলেছেন।

— দশ টাকা! চাচা, চায়ের মধ্যে সোনা দেন নাকি?

— দুধ, চিনি, চা-পাতা লাগে!

— পানি লাগে না?

— পানি লাগে!

— ওই যে! পানি তো ফ্রিতে পান। তাইলে দাম দশ টাকা কেমনে হয়?

মিমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হেসে বলল,

— ভাইয়া, আপনি চা খেতে আসছেন, নাকি চাচার ব্যবসা বন্ধ করতে?

আয়ান ঘুরে তাকাল।

আর তাকিয়েই থেমে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। পরনে সুন্দর সালোয়ার-কামিজ, খোলা চুল, চোখেমুখে হাসি। মেয়েটা হাসলে মনে হয় আশপাশের বিরক্তিকর সব শব্দ একটু থেমে যায়।

আয়ানের হাতে ধরা পাঁচ টাকার কয়েনটা মাটিতে পড়ে গেল।

টং!

সে কয়েনটার দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

মিমি ঐশীর কানে কানে বলল,

— এই যে! পোলার টাকা পড়ে গেছে, কিন্তু তুলতেছে না। মনে হয় মাথার নাটবল্টু খুলে গেছে!

ঐশী হেসে বলল,

— টাকা পড়ে থাকলে তুলে দিতাম। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, তুলে দিলে আবার আমাকে পাঁচ টাকার ভাগ চাইবে!

আয়ান কথাটা শুনেও কোনো উত্তর দিল না।

সে শুধু ঐশীর দিকে তাকিয়ে আছে।

মনে মনে বলল,

হায় আল্লাহ! এই মাইয়াটারে যদি আমার বউ বানাইতে পারতাম!

পরক্ষণেই মাথার ভেতর আরেকটা হিসাব শুরু হলো।

বউ হইলে শাড়ি কিনতে হইব। জন্মদিনে উপহার দিতে হইব। রেস্টুরেন্টে খাওয়াইতে হইব। ঈদে জামা, জুতা, চুড়ি—এত খরচ!

আয়ান কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করল।

তারপর মনে মনে নিজেকেই ধমকাল।

ধুর শালা! আগে বিয়া তো হোক! খরচের হিসাব পরে করিস। এমন সুন্দর মাইয়া জীবনে একবারই আসে!

ঐশী এবার সামনে এসে বলল,

— এই যে ভাই, কী হইছে? আমার মুখে কি কিছু লাগছে?

আয়ান মাথা নাড়ল।

— জি না।

— তাইলে এইভাবে তাকায় আছেন কেন?

আয়ান মুখ খুলল।

— আপনারে একটা কথা কই?

— বলেন।

— আপনি কি প্রতিদিন এত সুন্দর থাকেন, নাকি আজকে বিশেষ কোনো অফার আছে?

মিমি মুখ চেপে হাসতে লাগল।

ঐশী ভ্রু তুলে বলল,

— কীসের অফার?

আয়ান একটু সাহস পেয়ে বলল,

— মানে... আপনারে দেখার পর মনে হইতেছে, আল্লাহ আমারে জীবনে প্রথমবার কোনো দামি জিনিস ফ্রিতে দেখাইছে!

কথাটা শুনে ঐশী হেসে ফেলল।

— বাহ! সুন্দর কথা তো বলতে পারেন!

আয়ানের বুকের ভেতর আনন্দে ঢাক বাজতে লাগল।

কিন্তু পরক্ষণেই ঐশী বলল,

— তবে আপনার চেহারা আর কথাবার্তা দেখে মনে হচ্ছে, আপনি নিশ্চয়ই খুব কিপটা!

আয়ানের মুখ থেকে হাসি উধাও।

— কিহ?

— কিপটা। মানে টাকা খরচ করতে কষ্ট হয়, এমন মানুষ।

মিমি পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ল।

— একদম ঠিক ধরছস!

আয়ান প্রতিবাদ করল,

— আরে, কিপটা হমু ক্যান? আমি তো অনেক দানশীল মানুষ!

ঐশী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— সত্যি? কী দান করেন?

আয়ান বুক ফুলিয়ে বলল,

— আমি প্রতিদিন মানুষেরে হাসি দান করি!

ঐশী আবার হেসে ফেলল।

— বাহ! তাহলে চায়ের দামটাও কাশেম চাচাকে দান করে দেন।

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ।

কাশেম চাচা দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন,

— হ, মা! এই কথাটাই তো এতক্ষণ বুঝাইতে পারলাম না!

ঐশী হাসতে হাসতে বলল,

— আচ্ছা, যাই। ভালো থাকবেন।

মেয়েটা চলে যেতে উদ্যত হতেই আয়ান তড়িঘড়ি করে বলল,

— এই যে! আপনার নামটা কইয়া যান!

ঐশী পেছনে ফিরে মুচকি হাসল।

— নাম জানলে কী করবেন?

— মনে রাখমু।

— আর নামের জন্য টাকা লাগলে?

আয়ান এক মুহূর্ত থমকে গেল।

ঐশী হেসে বলল,

— থাক, বুঝে গেছি! আমার নাম সিদরাতুল জান্নাত ঐশী।

তারপর সে মিমির হাত ধরে চলে গেল।

আয়ান পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

মিমি যাওয়ার সময় পেছন ফিরে বলল,

— ভাইয়া, মাটিতে পাঁচ টাকা পড়ে আছে! নিয়ে যান! নইলে আপনার ভবিষ্যতের বউ নিয়ে যাবে!

আয়ান যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল।

সে এক লাফে নিচু হয়ে পাঁচ টাকার কয়েনটা তুলে নিল।

— এই যে! টাকা কি রাস্তায় ফালাইয়া রাখার জিনিস? এইডা কি বৃক্ষের ফল?

ঐশী দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আবার হেসে উঠল।

আর আয়ান?

কয়েনটা পকেটে রেখে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।

— শেষ! আমি শেষ! এই মাইয়ার হাসিতে আমার কলিজা গলে গেছে!

তারপর হঠাৎ মুখ গম্ভীর করে বলল,

— কিন্তু একটা সমস্যা আছে।

কাশেম চাচা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

— আবার কী সমস্যা?

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

— মাইয়াডারে বিয়া করতে হইলে মনে হয় আমারে অনেক টাকা খরচ করতে হইব!

কাশেম চাচা ঝাড়ুটা আবার হাতে নিলেন।

— শালা! আগে আমার চায়ের দশ টাকা দে, তারপর বিয়া করিস!

আয়ান চোখ বড় বড় করে বলল,

— চাচা, প্রেমে পড়ছি আমি, আপনি না! বিলটা আমার ঘাড়ে চাপাইতেছেন ক্যান?

— হারামি! ভাগ এখান থেইকা!

আয়ান দৌড় দিল।

দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করল,

— বলদা চাচা! আপনার দোকানের চা আর কোনো দিন খামু না!

কাশেম চাচা পেছন থেকে চেঁচালেন,

— তোরে খাওয়াইবও না, জাওরা পোলা!

আয়ান রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আবার ঐশী যেদিকে গেছে, সেদিকে তাকাল।

তার মুখে এবার অন্য রকম হাসি।

— সিদরাতুল জান্নাত ঐশী! তুমি জানো না, তুমি কার নজরে পড়ছ!

একটু থেমে সে নিজের পকেটে হাত দিল।

— আমার শখের বউ তুমি-ই হবা!

আবার কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বিড়বিড় করল,

— তবে বিয়ার আগে মাইয়াডার পছন্দ-অপছন্দ জানতে হইব। বেশি দামি জিনিস পছন্দ করে নাকি, সেইটাও জানা জরুরি!

তারপর মাথা চুলকে বলল,

— আল্লাহ, মাইয়াডা যদি বলে বিয়েতে দশ ভরি সোনা লাগব, তাইলে তো আমি বিয়ার আগেই বিধবা হইয়া যামু!

নিজের কথায় নিজেই চমকে উঠে মাথায় চাপড় দিল।

— ধুর! বিয়া করার আগেই বিধবা কেমনে হমু, বলদা!

পাশ দিয়ে যাওয়া এক লোক তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— পাগল নাকি?

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,

— পাগল না, প্রেমিক! তফাত বুঝেন না, ন্যাঙটি ইদুর!

লোকটা অবাক হয়ে চলে গেল।

আর আয়ান সাদিক জীবনে প্রথমবার একটা মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

কিন্তু সে জানে না, ঐশীকে নিজের শখের বউ বানানোর স্বপ্ন দেখতে যত সহজ, সেই স্বপ্ন পূরণ করা তার জন্য ততটাই কঠিন হতে চলেছে! 😂❤️

চলবে… 🌸

প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা, কিপ্টা সাবের শখের বউ গল্পের প্রথম পর্ব তোমাদের কেমন লাগল? আয়ানের কিপটেমি আর ঐশীর সঙ্গে তার প্রথম দেখার ঘটনাটা পড়ে হাসি পেয়েছে তো? 😂

গল্পটা ভালো লাগলে একটা লাইক দিও আর সুন্দর করে কমেন্ট করে জানিও। তোমাদের মন্তব্য পড়েই লেখার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তোমরা গল্পের কোন অংশটা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছ, আর কোন জায়গাটা আরও মজার হলে ভালো লাগত—সেটাও জানাতে ভুলো না। তোমাদের ভালোবাসা আর সুন্দর মন্তব্যই আমাকে পরের পর্ব লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ❤️🌷

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন