কিপ্টে সাহেবের শখের বউ
লেখিকা: tesha mony
পর্ব–৬
সকালে আয়ান সাদিক ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে মোবাইল হাতে নিল। কোনো মেসেজ এসেছে কি না, সেটা দেখার জন্য নয়। বরং গতকাল চায়ের দোকানে চল্লিশ টাকা খরচ করার পর তার বিকাশে কত টাকা আছে, সেটা দেখার জন্য।
ব্যালেন্স দেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— হায়রে টাকা! মানুষ তোকে কত কষ্টে কামায়, আর তুই এক নিমিষে ফুরায়ে যাস!
পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার বড় ভাই আদনান কথাটা শুনে থেমে গেল।
— কী হয়েছে আবার? সকালে উঠেই টাকার জন্য কান্নাকাটি শুরু করেছিস কেন?
আয়ান গম্ভীর মুখে বলল, — ভাই, মানুষের জীবনে টাকা থাকলে শান্তি থাকে।
— তোর তো টাকা আছে। তোর আবার কিসের অশান্তি?
— টাকা আছে বলেই তো অশান্তি! এই টাকা যদি একবার খরচ হয়ে যায়, তখন কী হবে?
আদনান কিছুক্ষণ ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — তোর বিয়ে হলে তোর বউয়ের জন্যও তো কিছু খরচ করতে হবে।
আয়ান বিছানা থেকে প্রায় লাফ দিয়ে উঠল।
— ভাই, সকাল সকাল বিয়ের নাম নিবি না! আমার সুন্দর সকালটা নষ্ট করিস না।
— কেন? বউয়ের কথা শুনলেই তোর এত ভয় লাগে কেন?
— ভয় না, বাস্তবতা বুঝি! বিয়ে মানে নতুন খরচ। শাড়ি কিনে দে, গয়না কিনে দে, ঘুরতে নিয়ে যা, এটা খাওয়াও, ওটা খাওয়াও। তারপর বউ বলবে, ‘আমার জন্য কী এনেছ?’ আর আমি বলব, ‘তোমার জন্য দোয়া এনেছি!’
আদনান হো হো করে হেসে উঠল।
— তোর মতো স্বামী পেলে মেয়েটা বিয়ের প্রথম দিনেই বাপের বাড়ি চলে যাবে!
— ভালোই তো! যাওয়ার সময় নিজের ভাড়াটা দিয়ে গেলে আমার কোনো আপত্তি নাই।
— শালা, তোর মাথায় আসলে টাকা ছাড়া কিছু আছে?
আয়ান বুক ফুলিয়ে বলল, — আছে তো! বুদ্ধি আছে। আর বুদ্ধিমান মানুষ অযথা টাকা খরচ করে না।
আদনান মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল, — একদিন এই টাকার হিসাব করতে করতেই তোর আসল সর্বনাশ হবে।
আয়ান কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজেকেই বলল, — সর্বনাশ আবার কী! টাকা থাকলে সব ঠিক আছে।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল ঐশীর হাসির কথা।
মেয়েটা হাসলে গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ে। কথা বলার সময় চোখেমুখে এমন ভাব, যেন পৃথিবীর সব কিপ্টে মানুষকে সে একাই শায়েস্তা করবে!
আয়ান ঠোঁট চেপে হাসল।
— মেয়েটা আসলেই মজার। তবে বেশি মজা করতে গিয়ে আমার পকেট খালি করে দিলে খবর আছে!
এদিকে ঐশী তখন নাশতা খেতে বসেছে। তার মা পরোটা আর ডিম ভাজি সামনে দিয়ে বললেন,
— কী রে, কাল বাজারে গিয়েছিলি না?
ঐশী মুখে পরোটা দিয়ে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।
— মিতুর সঙ্গে?
— হ্যাঁ।
— তারপর?
ঐশী একটু হেসে ফেলল।
তার মা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
— কী হয়েছে? এমন করে হাসছিস কেন?
— কিছু না, মা। একটা কিপ্টে মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
— কিপ্টে মানুষ? আবার কী করল?
ঐশী হেসে বলল, — চা খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। পরে চায়ের দাম দেওয়ার সময় এমন মুখ করল, যেন আমি ওর কাছে পুরো বাজার কিনে দিতে বলেছি!
তার মা-ও হেসে ফেললেন।
— তুইও নিশ্চয়ই কম জ্বালাসনি।
— আমি আবার কী করেছি? আমি তো চুপচাপ চা খেয়েছি।
— তোর এই চুপচাপ থাকার নমুনা আমার জানা আছে।
ঐশী প্রতিবাদ করল, — মা! আমি সত্যিই কিছু করিনি। শুধু বলেছি, চায়ে চিনি কম হলে টাকা ফেরত পাওয়া যায় কি না!
তার মা হেসে বললেন, — আহা রে! বেচারা!
ঐশী এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, — বেচারা না, মা। লোকটা বড়লোক। অথচ চল্লিশ টাকা খরচ করে এমন ভাব করল, যেন তার জমিজমা বিক্রি হয়ে গেছে।
— বড়লোক হলেই যে সবাই খরচ করতে ভালোবাসবে, এমন তো নয়।
— তা ঠিক। কিন্তু কেউ যদি নিজের টাকাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ মনে করে, তাহলে তাকে বিয়ে করবে কে?
কথাটা বলেই ঐশী আবার হাসল।
তার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর আর কিছু বললেন না।
দুপুরের দিকে আয়ান তার গাড়ি নিয়ে বাজারে বের হলো। অবশ্য বাজারে যাওয়ার পেছনে তার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল—গাড়ির তেল কমে গেছে, তাই তেল নিতে হবে। আর যেহেতু বাজারের পাশেই কাশেম চাচার দোকান, সেহেতু সেখানে একবার ঢুঁ মারা যেতেই পারে।
চা খাওয়ার জন্য নয়!
একেবারেই নয়!
সে শুধু কাশেম চাচার সঙ্গে দেখা করতে যাবে। চা খেলে আবার চল্লিশ টাকা খরচ হবে!
গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে সে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
কাশেম চাচা তাকে দেখেই বলে উঠলেন, — ও আয়ান! আয়, আয়। আজ কী খাওয়াবি?
আয়ান থমকে দাঁড়াল।
— আমি খাওয়াব কেন? আমি কি হোটেলের মালিক নাকি?
— তা না হলে কাল দুই কাপ চায়ের চল্লিশ টাকা দিয়ে যে এমন মুখ করলি, ভাবলাম আজ হয়তো মন ভালো করতে এসেছিস!
দোকানের বেঞ্চে বসা দুজন লোক হেসে উঠল।
আয়ান চোখ ছোট করে বলল, — চাচা, আপনার দোকানে কি চা বিক্রি হয়, নাকি মানুষের অপমান বিক্রি হয়?
— দুটোই হয়। তবে অপমানের দাম একটু বেশি!
আয়ান বিড়বিড় করে বলল, — শ্যাটা বুড়া!
— কী বললি?
— বললাম, চাচা আপনার বুদ্ধি আছে!
— ও, তাই বল!
আয়ান একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। চা খাবে না, শুধু একটু বসবে। এমন সময় পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
— কাশেম চাচা, এক কাপ চা দেবেন?
আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
ঐশী!
মেয়েটা হাতে একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে দোকানে ঢুকেছে। তাকে দেখেই আয়ানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের হাসিটা সামলে গম্ভীর হয়ে বসে রইল।
ঐশী তাকে দেখে অবাক হলো।
— আরে! আপনি এখানে?
আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, — কেন? এই দোকান কি তোর বাবার?
ঐশী হেসে ফেলল।
— না, আমার বাবার হলে আপনাকে ঢুকতে দিতাম না।
— কেন রে?
— আপনার মতো কিপ্টে মানুষ ঢুকলে দোকানের লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হবে!
কাশেম চাচা পাশ থেকে বললেন, — ঐশী মা, কথাটা কিন্তু ঠিক বলেছিস!
আয়ান দুজনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বলল, — বাহ! তোমরা দুজন মিলে আমার বিরুদ্ধে জোট বাঁধছ?
ঐশী বেঞ্চে বসতে বসতে বলল, — আপনার বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে হবে কেন? আপনি তো নিজেই নিজের বদনাম করার জন্য যথেষ্ট।
আয়ান মনে মনে ভাবল, মেয়েটার মুখটা একবার বন্ধ করতে পারলে শান্তি পেতাম। আবার মুখ বন্ধ থাকলেও ভালো লাগবে না বোধহয়!
ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে নিজেই চমকে উঠল।
— ধুর! কী সব ভাবতেছি!
ঐশী শুনে ফেলল।
— কী ভাবছেন?
— ভাবতেছি, এই দোকানে বসে সময় নষ্ট করছি কেন!
— তাহলে চলে যান।
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
— আমি কি বলেছি চলে যাব? আমি তো এমনিই বললাম!
ঐশী হাসি চেপে বলল, — আচ্ছা, বুঝেছি। আপনি আসলে আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যই বসে আছেন।
— তোর সঙ্গে কথা বলব? তোর এত বড় সাহস!
— সাহস না থাকলে আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলব কীভাবে?
কাশেম চাচা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে হেসে বললেন, — ঐশী মা, তুই চা খা। আর আয়ান, তুই বসে বসে কথা বল। আজ কিন্তু চায়ের দাম বাকিতে দেওয়া যাবে না!
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, — আমি চা খাইতেই আসি নাই!
ঐশী কাপ হাতে নিয়ে তার দিকে তাকাল।
— তাই নাকি? তাহলে আপনার সামনে একটা চায়ের কাপ রাখলে খেয়ে ফেলবেন না তো?
— না!
কাশেম চাচা আর ঐশী একসঙ্গে হেসে উঠল।
আয়ান মুখ গোমড়া করে বসে রইল। কিন্তু ঐশীর হাসির দিকে চোখ পড়তেই তার নিজেরও হাসি পেয়ে গেল।
মেয়েটা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, — আচ্ছা, আপনার নামটা তো জানি না।
আয়ান বুক সোজা করে বলল, — আয়ান সাদিক।
— ওহ! নামটা সুন্দর তো।
আয়ানের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— সত্যি?
ঐশী মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। নাম সুন্দর, কিন্তু কাজকর্ম—
— এই থাম! নামের প্রশংসা করলি, সেটাই যথেষ্ট। বাকি কথা বলার দরকার নাই।
ঐশী আবার হেসে উঠল।
আয়ান মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, মেয়েটাকে আবার চা খাওয়াতে নিয়ে আসবে। তবে এবার চল্লিশ টাকা খরচ করে নয়। কীভাবে কম খরচে দুজনের চা খাওয়া যায়, সেটা নিয়ে তাকে নতুন করে ভাবতে হবে।
কারণ ঐশীর সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগছে।
কিন্তু ভালো লাগলেই তো আর বিয়ে করা যায় না!
বিয়ে করলে যে টাকা ফুরিয়ে যাবে!
আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঐশী কাপ নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, — কী হলো? আবার টাকার কথা মনে পড়েছে?
আয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
— তুই কি আমার মাথার ভেতর থাকিস নাকি?
ঐশী মুচকি হেসে বলল, — না। আপনার মুখ দেখলেই বোঝা যায়, কখন আপনার টাকা নিয়ে চিন্তা শুরু হয়।
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — ঐশী, তুই সব সময় এত কথা বলিস কেন?
ঐশী হাসিমুখে উত্তর দিল, — আর আপনি সব সময় এত হিসাব করেন কেন?
দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আয়ান হঠাৎ হেসে ফেলল।
এই প্রথম সে বুঝতে পারল, কারও সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে টাকা খরচ না হলেও সময়টা বেশ ভালো কাটতে পারে।
তবে এই ভালো লাগার নাম যে প্রেম, সেটা স্বীকার করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই!
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা, আমার গল্পটা তোমাদের কাছে কেমন লাগছে? আয়ান আর ঐশীর খুনসুটি ভালো লাগলে একটা লাইক দিও, আর সুন্দর কমেন্ট করে জানিও। তোমাদের মন্তব্য আমাকে গল্প লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। আয়ানের কিপ্টামি আর ঐশীর দুষ্টুমি কেমন লাগছে, সেটাও জানাবে। তোমাদের ভালোবাসা আর মতামত নিয়েই গল্পটা এগিয়ে নিতে চাই। 💗