কিপ্টে সাহেবের শখের বউ
লেখিকা: tesha mony
পর্ব–৭
কাশেম চাচার দোকানে বসে আয়ান আর ঐশীর খুনসুটি বেশ কিছুক্ষণ চলল। একসময় ঐশী উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
— আচ্ছা, আমি যাই। বাসায় ফিরতে হবে।
আয়ান মুখে বিরক্তির ভাব এনে বলল,
— যা, কে আটকাইছে তোকে?
ঐশী মুচকি হেসে বলল,
— আপনি আটকাবেন নাকি?
— আমি? তোকে আটকাব কেন? তুই আমার কে হোস?
কথাটা বলেই আয়ান মনে মনে একটু থমকাল। মেয়েটা যদি আবার উল্টাপাল্টা কিছু বলে বসে!
ঐশী অবশ্য হাসিমুখেই বলল,
— ঠিকই বলেছেন। আমি আপনার কেউ না। তাই আপনার টাকা বাঁচল!
আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— মানে?
— মানে, আমাকে আটকে রাখলে হয়তো আবার চা খাওয়াতে হতো। তাই না?
কাশেম চাচা এবার হেসে কাশতে লাগলেন।
আয়ান দাঁত চেপে বলল,
— ঐশী, তোর মুখে কি ব্রেক নাই?
— আছে তো। কিন্তু আপনার সামনে এসে কাজ করে না।
— হারামি মেয়ে!
— ধন্যবাদ। আপনিও কম না!
এই বলে ঐশী হেসে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
আয়ান কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
কাশেম চাচা জিজ্ঞেস করলেন,
— কিরে, কোথায় যাস?
— বাড়ি।
— চা খাবি না?
— চা খাওয়ার জন্য কি আমি এখানে আসছি নাকি?
কাশেম চাচা মুচকি হেসে বললেন,
— না রে, তুই তো ঐশীকে দেখার জন্য আসছিস!
আয়ান থমকে গেল।
— চাচা, বুড়া বয়সে ভীমরতি ধরছে নাকি? যা মনে আসে, তাই বলবেন?
— আচ্ছা, আচ্ছা। আর বলব না। তুই যা, তবে যাওয়ার আগে গত সপ্তাহের বাকি দশ টাকা দিয়ে যা।
আয়ানের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
— কোন দশ টাকা?
— চায়ের টাকা।
— চাচা, আপনার স্মৃতিশক্তি এত ভালো কেন? এই বয়সে একটু ভুলে-টুলে যান!
— তোর কাছে টাকা পাব বলে ভুলে গেলে তো আমারই লোকসান!
শেষ পর্যন্ত অনেক তর্কবিতর্কের পর আয়ান দশ টাকা দিয়ে দোকান থেকে বের হলো। বের হওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল,
— এই গ্রামে আমার শান্তি নাই। একজন চায়ের টাকা চায়, আরেকজন আমার মাথা খায়!
কিন্তু গাড়িতে উঠে বসতেই তার মনে পড়ল ঐশীর কথা।
সে নিজেই হেসে ফেলল।
— মেয়েটার মাথা খারাপ। আমারও মনে হয় একটু একটু করে মাথা খারাপ হইতেছে!
বাড়িতে ফিরতেই আয়ানের মা তাকে ডাকলেন।
— আয়ান, এদিকে আয় তো বাবা।
আয়ান মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
— কী হয়েছে, আম্মা?
— তোর বড় ভাইয়ের বউ বলছিল, তুই নাকি আজকাল বাজারে গিয়ে অনেক সময় কাটাস?
আয়ান চমকে উঠল।
— ভাবি আবার কখন বলল?
— এই তো একটু আগে।
— উনার আর কোনো কাজ নাই? সারাদিন আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করেন!
মা হেসে বললেন,
— তুই বাজারে কী করিস, সেটা বল।
— কী আর করব? বাজারে যাই, মানুষের সঙ্গে কথা বলি, তারপর বাড়ি আসি।
— শুধু মানুষের সঙ্গে কথা বলিস? নাকি কোনো মেয়ের সঙ্গেও কথা বলিস?
আয়ান এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল।
— আম্মা! তুমি কি আমার পেছনে লোক লাগাইছ?
— ধুর পাগল! তোর ভাবি তোকে একটা মেয়ের সঙ্গে দেখেছে।
আয়ান মনে মনে ভাবল, এইবার তো শেষ! ভাবি আবার মেয়েটার নাম জানে নাকি?
সে মুখে স্বাভাবিক ভাব এনে বলল,
— তো? মেয়েদের সঙ্গে কথা বললেই বিয়ে করতে হবে নাকি?
মা একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
— বিয়ের কথা কে বলল? আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করলাম।
— আগেই বলে রাখি, আমি এখন বিয়ে-টিয়ে করব না।
— কেন? তোর কি কাউকে পছন্দ হয়েছে?
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— না!
মা হেসে ফেললেন।
— এত জোরে না বলছিস কেন?
— কারণ উত্তরটা সত্যি!
মা আর কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
আয়ান উঠে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
— আম্মা, একটা কথা মনে রেখো। আমার বিয়ের জন্য টাকা জমাইও না। ওই টাকা দিয়ে বরং আমার নামে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিও।
পেছন থেকে মা বললেন,
— তোর বউ এলে আগে তোর এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টটাই বন্ধ করবে!
আয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
— আমার বউ আসবে না! আমি বিয়েই করব না!
তার মা হেসে বললেন,
— আচ্ছা বাবা, তুই বিয়ে করিস না। আগে বড় হ!
আয়ান বিরক্ত হয়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।
— এই বাড়িতে কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না!
বিকেলের দিকে ঐশী তার বান্ধবী মিতুর সঙ্গে বাজারে বের হলো। দুজনের উদ্দেশ্য ছিল কিছু কেনাকাটা করা, যদিও মিতু ভালো করেই জানত ঐশীর কেনাকাটার চেয়ে গল্প করার আগ্রহ বেশি।
একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মিতু বলল,
— ঐশী, ওই যে তোর কিপ্টে সাহেব!
ঐশী তাকিয়ে দেখল, আয়ান রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে একজন দোকানদারের সঙ্গে তর্ক করছে।
— আরে, সত্যিই তো!
মিতু মজা করে বলল,
— চল, একটু দেখে আসি। আজ কত টাকা বাঁচায়!
ঐশী হেসে বলল,
— চল। লোকটার কিপটামি নিয়ে গবেষণা করা দরকার।
দুজন এগিয়ে গেল।
দোকানদার একটা শার্ট হাতে ধরে বলছিলেন,
— আয়ান ভাই, এই শার্টটা নেন। আপনার গায়ে ভালো মানাবে। দাম মাত্র বারোশো টাকা।
আয়ান শার্টটা উল্টেপাল্টে দেখে বলল,
— বারোশো টাকা! এই শার্টে কি সোনার সুতা লাগাইছেন?
— আরে ভাই, ভালো কাপড়ের দাম তো একটু বেশি হবেই।
— ভালো কাপড়? এই কাপড়ের দাম পাঁচশো টাকার বেশি না।
দোকানদার বিরক্ত হয়ে বললেন,
— তাহলে পাঁচশো টাকা দিয়েই বানায়া নেন!
পাশ থেকে ঐশী হেসে উঠল।
আয়ান ঘুরে তাকাতেই তার চোখ পড়ল ঐশীর ওপর।
— তুই এখানে কী করিস?
ঐশী শান্তভাবে বলল,
— বাজারে এসেছি। বাজারে মানুষ আসতে পারে না?
— পারে। কিন্তু তুই আমার পেছনে পেছনে ঘুরছিস কেন?
মিতু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আপনিই কি বাজারের একমাত্র মানুষ নাকি? আপনাকে দেখলেই কি সবাই প্রেমে পড়ে যাবে?
আয়ান মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপা, আপনার সঙ্গে তো আমি কথাই বলি নাই। মাঝখানে ঢুকছেন কেন?
মিতু হেসে বলল,
— কারণ আপনার কথা শুনলে চুপ থাকা যায় না।
ঐশী শার্টটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আচ্ছা, আপনি শার্টটা কিনবেন না?
— কিনব তো। তবে বারোশো টাকা দিয়ে না।
— কত দেবেন?
— চারশো।
দোকানদার এবার প্রায় লাফিয়ে উঠলেন।
— আয়ান ভাই, চারশো টাকায় তো আমার কাপড় কেনার টাকাও উঠবে না!
আয়ান নির্বিকারভাবে বলল,
— তাহলে পাঁচশো দেন। আমারও লাভ, আপনারও লাভ।
ঐশী মুখে হাত দিয়ে হাসতে লাগল।
— আপনি ব্যবসা করলে দোকানদাররা একদিন সবাই পথে বসবে!
আয়ান শার্টটা নামিয়ে রেখে বলল,
— তোদের মতো মানুষ আছে বলেই ব্যবসায়ীদের এত লাভ। টাকা খরচ করতে গেলেই কোনো হিসাব নাই!
ঐশী এবার একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
— আচ্ছা, একটা কথা বলি?
— বল।
— আপনি বিয়ে করলে আপনার বউকে কি শাড়ি কেনার আগে তিন মাসের কিস্তিতে টাকা জমাতে হবে?
মিতু হেসে একেবারে কুঁকড়ে গেল।
আয়ান চোখ বড় করে বলল,
— কেন? শাড়ি কি আমি কিনে দেব নাকি?
ঐশী হেসে বলল,
— না, আপনার বউ নিজেই কিনবে। আপনি শুধু শাড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন!
— আমার বউয়ের এত শখ থাকলে সে নিজের টাকা দিয়ে কিনবে। আমি কি ব্যাংক নাকি?
ঐশী হাসতে হাসতে বলল,
— না, আপনি ব্যাংক না। আপনি তো ব্যাংকের তালা!
এবার আশপাশের দু-একজন ক্রেতাও হেসে ফেললেন।
আয়ান রাগ দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ঐশীর হাসিমাখা মুখ দেখে সেই রাগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না।
সে দোকানদারকে বলল,
— আচ্ছা, শার্টটা প্যাক করেন।
দোকানদার খুশি হয়ে বললেন,
— বারোশো টাকা দেবেন?
— না, ছয়শো।
— ভাই, একটু বাড়ান!
— ছয়শো পঞ্চাশ। এর বেশি এক টাকাও না।
শেষ পর্যন্ত সাতশো টাকায় শার্টটা কিনে আয়ান দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
ঐশী পেছন থেকে বলল,
— বাহ! আজ তো অনেক টাকা খরচ করলেন!
আয়ান গম্ভীর মুখে বলল,
— সব তোর জন্য।
ঐশী থেমে গেল।
মিতুও চোখ বড় করে আয়ানের দিকে তাকাল।
আয়ান বুঝতে পারল, কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। সে দ্রুত সামলে নিয়ে বলল,
— মানে, তুই এসে দোকানদারের সামনে আমার মানসম্মান শেষ করে দিয়েছিস। তাই শার্টটা কিনে পালালাম!
ঐশী ঠোঁট চেপে হাসল।
— বুঝেছি, বুঝেছি। আমার জন্যই সাতশো টাকা খরচ করতে হলো!
— তুই আবার শুরু করিস না!
— আচ্ছা, আর বলব না।
ঐশী চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই আয়ান হঠাৎ বলে উঠল,
— এই ঐশী!
ঐশী ফিরে তাকাল।
— কী?
আয়ান একটু ইতস্তত করে বলল,
— তুই কি কালও বাজারে আসবি?
ঐশী ভ্রু তুলে তাকাল।
— কেন? আবার শার্ট কিনবেন?
— না! এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
ঐশী মুচকি হেসে বলল,
— আসতেও পারি, নাও আসতে পারি।
— মানে?
— মানে, কাল আসব কি না, সেটা এখনো ঠিক করিনি।
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— যা, তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল!
ঐশী হেসে মিতুর হাত ধরে চলে গেল।
আয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখল। তারপর হাতে থাকা শার্টের ব্যাগটার দিকে তাকাল।
সাতশো টাকা!
তারপর মনে পড়ল ঐশীর কথা।
মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
— কাল যদি আসে, তাহলে কথা বলব। তবে কোনো চা-টা খাওয়াব না। একবার চল্লিশ টাকা গেছে, আর না!
একটু থেমে সে নিজেই বিড়বিড় করল,
— তবে মেয়েটা যদি নিজে খাওয়াতে চায়, তাহলে আলাদা কথা!
চলবে…
প্রিয় পাঠক-পাঠিকারা, আমার গল্পটা তোমাদের কেমন লাগছে? আয়ানের কিপটামি আর ঐশীর সঙ্গে তার খুনসুটি ভালো লাগলে একটা লাইক দিও, আর সুন্দর কমেন্ট করে জানিও। তোমাদের মন্তব্য আমাকে গল্প লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। আয়ান কি সত্যিই ঐশীর প্রেমে পড়ছে, নাকি এখনো নিজের টাকার হিসাবেই ব্যস্ত—তোমাদের কী মনে হয়? গল্পের ভালো-মন্দ দুটোই জানাবে কিন্তু! তোমাদের ভালোবাসা নিয়েই গল্পটা এগিয়ে নিতে চাই। 💗