ভালোবাসি আপনাকে
পর্ব ২ — নয় বছর পর
সকাল ৭টা।
— তিহা! এই তিহা! কোথায় গেলি?
মায়ের চিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেল। বিরক্ত মুখে বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করলাম।
— কী হয়েছে মা? সকাল সকাল মাইকিং করছ কেন?
— তোর ভাই এসেছে!
কথাটা শুনে এক লাফে বিছানা থেকে উঠলাম।
— কীইইই! ভাইয়া এসেছে?!
হ্যাঁ, আমার মিলিটারি ভাই তিসান শেখ। দীর্ঘ নয় বছর পর দেশে ফিরেছে। ছোটবেলায় ভাইয়াকে যতটা পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি পেয়েছি ফোনের ওপাশে। আর আজ সে সত্যিই বাড়িতে!
দৌড়ে নিচে নামতেই দেখলাম, সোফায় বসে চা খাচ্ছে একজন। কালো শার্ট, পরিপাটি চুল আর মুখভর্তি সেই চেনা হাসি।
— ভাইয়াআআআ!
আমি চিৎকার করে ছুটে গেলাম।
— আরে আস্তে! আমাকে জড়িয়ে ধরবি, নাকি হাসপাতালে পাঠাবি?
— এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? জানো তোমাকে কত মিস করেছি?
— ওহ! আমার বোনটা তো দেখি বড় হয়ে গেছে!
— হ্যাঁ, আর তুমি এখনো আগের মতোই বুড়ো!
— এই মেয়ে! প্রথম দিনেই অপমান?
আমি জিহ্বা বের করে হাসলাম।
বাবা পত্রিকা নামিয়ে বললেন,
— তিসান, দেশে এসেই বোনের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করলি?
— বাবা, আপনার মেয়েকে সামলান। আমার চাকরির চেয়েও কঠিন দায়িত্ব এটা!
সবাই হেসে উঠল।
হঠাৎ ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আচ্ছা, তোর ফোনটা দে।
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম।
— কেন?
— দেখব।
— ফোনে কী দেখবে?
— তোর গোপন রহস্য!
— আমার কোনো গোপন রহস্য নেই।
— তাহলে দিতে সমস্যা কোথায়?
আমি ফোনটা পেছনে লুকিয়ে বললাম,
— আমার ফোন, আমার স্বাধীনতা!
ভাইয়া হাসল।
— বাহ! স্বাধীনতার ভাষণ! দেখি, এই স্বাধীনতা কতক্ষণ থাকে।
সকাল ১০টা।
আমি নিজের ঘরে বসে ফোন চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে একটা মেসেজ এল।
Unknown Number: হ্যালো।
আমি ভাবলাম, আবার কোন বিরক্তিকর মানুষ!
Me: কে?
Unknown Number: আপনার ভাইয়ের বন্ধু।
আমি একটু অবাক হলাম।
Me: কোন ভাই?
Unknown Number: আপনার একটাই ভাই, যতদূর জানি।
আমি চোখ বড় করে তাকালাম।
Me: আপনি কে সেটা বলবেন?
Unknown Number: তাহিদ রহমান।
নামটা দেখেই আমার মাথায় হাত!
এই সেই মানুষ! যার নাম শুনেই গতকাল আমার শান্তিপূর্ণ জীবন শেষ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
Me: ওহ, আপনি!
Tahid: চিনতে পেরেছেন তাহলে।
Me: দুর্ভাগ্যবশত।
Tahid: আপনার কথাবার্তা বেশ সুন্দর।
Me: ধন্যবাদ। তবে আপনার মেসেজের জন্য আমার কোনো পুরস্কার দেওয়ার ইচ্ছা নেই।
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর আবার মেসেজ।
Tahid: কাল কলেজে দেখা হবে। সময়মতো আসবেন।
আমি বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিলাম।
— হায় আল্লাহ! লোকটা কি আমার ব্যক্তিগত টাইমটেবিল বানিয়ে ফেলেছে?
দুপুর ১টা।
খাওয়ার টেবিলে সবাই বসেছে। ভাইয়া তার বিদেশের গল্প বলছে। আমি মন দিয়ে শুনছিলাম।
হঠাৎ ভাইয়া বলল,
— তিহা, তোকে একটা কথা বলার ছিল।
— বলো।
— আমার একজন বন্ধু কয়েকদিন আমাদের বাসায় আসবে।
— আসুক। তাতে আমার কী?
— নাম তাহিদ রহমান।
আমার হাতের চামচটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
— কিহহহ?!
ভাইয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— কী হলো?
— কিছু না। নামটা একটু পরিচিত লাগল।
ভাইয়া হেসে বলল,
— পরিচিত লাগারই কথা। কাল থেকে তোর কলেজে নতুন লেকচারার হিসেবে যোগ দিচ্ছে।
আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহ! এ কোন বিপদে ফেললে!
মা হেসে বললেন,
— তাহিদ ছেলেটা খুব ভালো। তিসানের অনেক দিনের বন্ধু।
আমি মুখ বাঁকিয়ে বললাম,
— হ্যাঁ, খুব ভালো। মেসেজ দিয়েই মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়!
ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী বললি?
— না না! বলছিলাম, খুব ভালো মানুষ!
বিকেল ৫টা।
আমি ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ভাইয়ার গলা শুনলাম।
— কী ভাবছিস?
— ভাবছি, তুমি আবার কবে চলে যাবে।
— এই তো! আমি এলাম আর তুই বিদায় করার চিন্তা শুরু করলি?
— না মানে, শান্তিতে থাকার একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে!
ভাইয়া হেসে আমার মাথায় হাত রাখল।
— পাগলি একটা!
ঠিক তখনই নিচ থেকে মায়ের ডাক এল।
— তিহা! তিসান! নিচে এসো। অতিথি এসেছে!
আমি বললাম,
— আবার কে এল?
ভাইয়া রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
— আমার সেই বন্ধু।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। অবশ্য ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি কাউকে ভয় পাই না!
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুমে চোখ পড়ল।
কালো শার্ট পরা একজন সোফায় বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। মুখে গম্ভীর ভাব।
তাহিদ রহমান!
আমাকে দেখেই সে কাপটা টেবিলে রাখল।
— আসুন, মিস তিহামনি।
আমি দাঁত চেপে হাসলাম।
— আপনি এখানে?
সে শান্ত গলায় বলল,
— না, আমি আপনার কলেজের ক্লাসরুম থেকে হেঁটে এখানে চলে এসেছি।
ভাইয়া হেসে উঠল।
— তোরা আগে থেকেই পরিচিত নাকি?
আমি আর তাহিদ একসঙ্গে বলে উঠলাম,
— না!
তারপর দুজন দুজনের দিকে তাকালাম।
তাহিদ মৃদু হেসে বলল,
— পরিচয়টা নতুন করে করিয়ে দেওয়া যায়।
আমি মনে মনে বললাম,
হে আল্লাহ, আমার কপালে কী আছে!
আর সেদিনই প্রথম বুঝলাম, আমার জীবনে শুধু ভাইয়ার প্রত্যাবর্তন নয়, আরও একজনের আগমন ঘটেছে।
যার সঙ্গে আমার ঝগড়ার হিসাবটা বোধহয় অনেক লম্বা হতে চলেছে!
ঠিক তখনই তাহিদ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তিসান, তোর বোন কিন্তু বেশ ঝগড়াটে!
আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম,
— আর আপনি কিন্তু বেশ বিরক্তিকর!
ভাইয়া হেসে বলল,
— বাহ! তোদের পরিচয় তো বেশ জমে উঠেছে!
আমি মনে মনে বললাম, এই মানুষটা আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে ছাড়বে!
হঠাৎ তাহিদ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— দেখা যাক, কে কাকে বেশি বিরক্ত করতে পারে!
আমি চোখ ছোট করে বললাম,
— চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম, মিস্টার তাহিদ রহমান!
কিন্তু তখনো জানতাম না, এই চ্যালেঞ্জই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠবে!
চলবে...