অবশেষে তুমি
পর্ব ১:
লেখক: আরফা আইরিশা
সকাল আটটা। খানবাড়ির বিশাল বাড়িটা সকাল থেকেই সরগরম। বাড়ির একেক কোণে একেক রকম কাণ্ড চলছে। কেউ নাশতা নিয়ে ব্যস্ত, কেউ ফোন নিয়ে, আবার কেউ অন্যের পেছনে লাগার পরিকল্পনা করছে।
ডাইনিং টেবিলে বসে আয়ান খান ফোন দেখছিল। তার পাশে ইনায়া চুপচাপ নাশতা করছিল। অন্যদিকে ইহান খান ফোনে চোখ রেখে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে তার ফোন ছাড়া আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নেই।
আয়রা খান সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল, “এই বাড়িতে কি কেউ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে না?”
সামির খান সোফায় বসে আপেল খেতে খেতে উত্তর দিল, “পারে তো! তুই চাইলে আজ থেকেই চেষ্টা করতে পারিস।”
আয়রা চোখ ছোট করে তাকাল। “তুই কি সকালে সকালে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাস?”
“আমি তো শান্তিতে আপেল খাচ্ছি। ঝগড়া করার জন্য তুই নিজেই এগিয়ে এসেছিস।”
“তোর আপেলটা মাথায় ভেঙে মারব!”
সামির আপেলটা বুকের কাছে নিয়ে বলল, “আমার খাবারের ওপর নজর দিস না। এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি!”
কথাটা শুনে ইনায়া হেসে ফেলল।
ইহান ফোন থেকে চোখ তুলে বলল, “সকালে একটু শান্তি পাওয়া যাবে না?”
আয়রা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তুমি সামিরকে কিছু বলছ না কেন? সব দোষ কি আমার?”
ইহান নির্বিকারভাবে বলল, “কারণ তুই চুপ থাকলে ও নিজে থেকেই চুপ হয়ে যাবে।”
সামির হেসে উঠল। “শুনলি, আয়রা? ভাইয়াও জানে, তুই কতটা শান্তিপ্রিয়!”
আয়রা রাগে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ইহানের সামনে সে বেশি রাগ দেখাতে চায় না। কারণ, ইহানকে দেখলেই তার ভেতরটা কেমন যেন হয়ে যায়।
এই অনুভূতিটা সে কাউকে বোঝাতে পারে না। এমনকি নিজেকেও না।
অথচ ইহানের চোখে সে শুধুই পরিবারের একজন সদস্য।
অন্তত আয়রা তাই মনে করে।
ইনায়া খান চুপচাপ ইহানের দিকে তাকাল। ছেলেটা যখন ফোনে মনোযোগ দেয়, তখন তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে। এই ছোট্ট বিষয়টাও ইনায়ার চোখ এড়ায় না।
ইনায়া জানে, সে ইহানকে পছন্দ করে। অনেক দিন ধরেই করে। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেনি।
ইহানের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তার কেমন অস্বস্তি হয়। অথচ দূর থেকে ইহানকে দেখলে তার মনটা ভালো হয়ে যায়।
ইহানও ইনায়াকে পছন্দ করে। কিন্তু সেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। ইনায়া যদি তাকে ভুল বোঝে? যদি তাদের সম্পর্কটা বদলে যায়? এই ভয়েই সে চুপ থাকে।
একই বাড়িতে থেকেও দুজনের মধ্যে কত কথা জমে আছে, অথচ কেউ কাউকে কিছু বলতে পারে না।
হঠাৎ ইনায়ার হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।
ইহান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে? সাবধানে থাকতে পারিস না?”
ইনায়া লজ্জা পেয়ে বলল, “ভুল করে পড়ে গেছে।”
ইহান চামচটা তুলে দিয়ে বলল, “আচ্ছা, খেয়ে নে।”
ছোট্ট কথাটুকু শুনেই ইনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আর ইহান মনে মনে ভাবল, মেয়েটা এত সহজে খুশি হয়ে যায় কেন?
আয়ান নাশতা শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
“ইনায়া, তুই আজ কোথাও যাবি?”
ইনায়া চমকে তাকাল। “কেন?”
“এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
“না, কেন?”
আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, “একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে এত প্রশ্ন করতে হয়?”
ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল, “তুমি আগে ঠিক করে কথা বলতে শেখো।”
আয়ান হেসে চলে গেল।
ইনায়া আবার ইহানের দিকে তাকাল। কিন্তু এবার ইহানও তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
চোখাচোখি হতেই ইনায়া তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল।
ইহানের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল।
মেয়েটার নীরবতার আড়ালে কত কথা লুকিয়ে আছে, তা ইহান জানে না। অথবা জানলেও বুঝতে চায় না।
দুপুরের দিকে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল আয়রা। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
ইহানকে নিয়ে তার ভাবনার শেষ নেই।
কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝতে পারে না—ইহান কেন তাকে কখনো আলাদাভাবে দেখে না?
সে কি এতটাই সাধারণ? নাকি ইহানের মনে অন্য কেউ আছে?
প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরতেই আয়রা বিরক্ত হয়ে গেল।
“ধুর! আমি কেন এত ভাবছি?”
পেছন থেকে সামিরের কণ্ঠ ভেসে এল, “কারণ তোর মাথায় সমস্যা আছে।”
আয়রা ঘুরে তাকাল। “তুই আবার এখানে কেন?”
“ছাদটা কি তোর বাবার?”
“আমার বাবা এই বাড়ির মালিক না হলেও তোকে এখানে আসার অনুমতি দিতে হবে না।”
সামির হেসে বলল, “বাহ! আজ তো কথায় আগুন ঝরছে!”
আয়রা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
সামির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“না।”
“তুই কি ইহান ভাইকে পছন্দ করিস?”
আয়রা মুহূর্তেই থমকে গেল।
“কীসব বলছিস তুই?”
“যা শুনলি, সেটাই।”
“একদম বাজে কথা বলবি না!”
সামির ভ্রু তুলে বলল, “আমি তো শুধু প্রশ্ন করেছি। উত্তর দিতে এত ভয় কিসের?”
আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ, পছন্দ করি।”
সামিরের মুখের হাসি আরও বড় হলো।
“ওহ! তাহলে ঘটনা অনেক দূর এগিয়েছে!”
“একটা কথাও কাউকে বলবি না।”
“বলব না। কিন্তু আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।”
আয়রা সন্দেহের চোখে তাকাল। “কী কাজ?”
সামির এবার একটু গম্ভীর হলো।
“আমার একজনকে ভালো লাগে। সে তোর বন্ধু। আমি চাই, তুই আমাকে ওর কাছে যেতে সাহায্য করবি।”
আয়রা অবাক হয়ে বলল, “তুই আমার কাছে সাহায্য চাইছিস?”
“হ্যাঁ। আর তুই যদি আমার সাহায্য চাস, তাহলে আমাকেও সাহায্য করতে হবে।”
আয়রা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
“কী?”
“তুই আমাকে ইহানকে নিজের মনের কথা বোঝাতে সাহায্য করবি। আর আমি তোকে তোর পছন্দের মানুষটার কাছে যেতে সাহায্য করব।”
সামির হাত বাড়িয়ে দিল।
“চুক্তি?”
আয়রা তার হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“চুক্তি।”
দুজনের হাত মেলানো হলো।
তারা জানত না, এই ছোট্ট চুক্তি তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
একদিকে আয়রার না বলা ভালোবাসা, অন্যদিকে সামিরের লুকানো অনুভূতি। আর তাদের মাঝখানে রয়েছে এমন কিছু মানুষ, যাদের হৃদয়ে জমে আছে আরও অনেক না বলা কথা।
কেউ কাউকে নিজের মনের কথা বলতে পারছে না। কিন্তু এই নীরবতা আর কত দিন?
চলবে...