ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবশেষে তুমি..

পর্ব 2

লেখক: আইরিশা / Irisha

### অবশেষে তুমি

লেখক: আরফা আইরিশা

### পর্ব : ২

সকাল ৮টা।

“ইনায়া আপু! ওঠো! সকাল হয়ে গেছে!”

আয়রা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই।

সে আবার বলল, “আপু, উঠবে? নাকি আজকে বিছানার সঙ্গে বিয়ে করে ফেলবে?”

বিছানার ওপর থেকে ইনায়ার গলার আওয়াজ এল, “আর এক মিনিট!”

আয়রা বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

“তোমার ওই এক মিনিটে তো পৃথিবীতে দুইবার সূর্য উঠে যায়!”

ইনায়া বালিশ দিয়ে মুখ ঢেকে বলল, “তুমি যাও তো! আমাকে শান্তিতে মরতে দাও—মানে ঘুমাতে দাও!”

“কী বললে? দাঁড়াও, ইহান ভাইয়াকে ডেকে আনছি!”

ইহানের নাম শুনতেই ইনায়া ধড়মড় করে উঠে বসল।

“খবরদার! ওনাকে ডাকবে না!”

আয়রা দুহাত কোমরে রেখে মুচকি হাসল।

“ওহ! নাম শুনেই ঘুম উধাও? ব্যাপারটা তো বেশ সন্দেহজনক!”

“আয়রা!”

“আচ্ছা, আচ্ছা! বুঝেছি। আমি কিছুই বুঝিনি!”

বলেই আয়রা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ইনায়া বালিশটা বুকে চেপে ধরল। ইহানের নাম শুনলেই কেন তার বুকের ভেতর এমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সে নিজেও জানে না।

ছেলেটাকে সে পছন্দ করে। অনেক দিন ধরেই করে।

কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস কখনো হয়নি।

আর ইহান?

সেও কি ইনায়াকে পছন্দ করে?

এই প্রশ্নের উত্তর জানার সাহসটুকুও ইনায়ার নেই।

### খান বাড়ির সকাল

ডাইনিং টেবিলে সবাই একে একে বসছে।

ফারদিন খান খবরের কাগজ পড়ছেন। সাফওয়ান খান ফোনে অফিসের কাজ দেখছেন। তাহসিন খান চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সবার কথাবার্তা শুনছেন।

আয়ান খান টেবিলে বসে ফোন দেখছিল। পাশে বসা সামির তার প্লেট থেকে একটা পরোটা তুলে নিতেই আয়ান তার হাত চেপে ধরল।

“এই! নিজের খাবার খা!”

সামির নিরীহ মুখ করে বলল, “ভাই, তোমার খাবারের মধ্যে ভালোবাসা বেশি।”

আয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল, “আর একবার হাত বাড়ালে ভালোবাসার বদলে থাপ্পড় পাবি।”

রায়ান না থাকলেও খান বাড়িতে হাসির অভাব নেই।

আয়রা এসে চেয়ারে বসে বলল, “আজকে ইনায়া আপুকে বিছানা থেকে তুলতে আমার জীবন শেষ!”

ইনায়া ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল।

“তোমাকে কে বলেছিল আমাকে তুলতে?”

“তোমার আম্মু!”

“আম্মু কোথায়?”

“রান্নাঘরে। যাও, অভিযোগ করো!”

ইনায়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় ইহান ঘরে ঢুকল।

সাদা শার্ট, কালো ঘড়ি, আর মুখে সেই পরিচিত শান্ত ভাব।

ইনায়া একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল।

ইহান তার পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “সুপ্রভাত।”

ইনায়া আস্তে করে বলল, “সুপ্রভাত।”

আয়রা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

“বাহ! আজ তো দুজনের মধ্যে বেশ ভদ্রতা!”

ইনায়া পা দিয়ে আয়রার পায়ে চাপ দিল।

আয়রা ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল, “আহ! কী করছ?”

“মশা কামড়েছে।”

“টেবিলের নিচে মশা?”

ইহান হেসে ফেলল।

“তোরা দুজন সকালবেলায় ঝগড়া শুরু করেছিস কেন?”

আয়রা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি তো কিছুই করিনি। ইনায়া আপু শুধু—”

“আয়রা!”

ইনায়া এমনভাবে তাকাল যে আয়রা আর কথা বলার সাহস পেল না।

কিন্তু ইহান লক্ষ করল, ইনায়া তার দিকে তাকাতে গেলেই চোখ নামিয়ে ফেলছে।

সে মনে মনে ভাবল, মেয়েটার আজ কী হয়েছে?

### কলেজের পথে

নাশতা শেষে ইনায়া আর আয়রা বেরিয়ে পড়ল।

গাড়িতে বসে আয়রা বলল, “আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“না।”

“কিন্তু আমি তো প্রশ্নই করিনি!”

“তবুও উত্তর না।”

আয়রা মুখ বাঁকিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, “ইহান ভাইয়াকে ভালোবাসো?”

ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।

“কীসব বলছ!”

“আচ্ছা, ভালোবাসো না?”

“না!”

“তাহলে উনি সামনে এলেই তোমার মুখ লাল হয়ে যায় কেন?”

“গরম লাগে!”

আয়রা জানালা খুলে দিল।

“এই নাও, বাতাস খাও।”

ইনায়া এবার বুঝল, তার বোনের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।

সে চুপ করে রইল।

আয়রা এবার একটু নরম স্বরে বলল, “আপু, মজা করছি ঠিকই। কিন্তু তুমি যদি সত্যিই ওনাকে পছন্দ করো, তাহলে সারাজীবন নিজের মনের কথা লুকিয়ে রেখো না।”

ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “যদি উনি আমাকে সেভাবে না ভাবেন?”

আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তাহলে অন্তত তুমি জানবে, তুমি নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করোনি।”

ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।

কিছু অনুভূতি এত গভীর হয় যে, সেগুলো হারানোর ভয়েই মানুষ মুখ খুলতে পারে না।

### অন্যদিকে, ইহান

অফিসে যাওয়ার আগে ইহান নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল।

তার ফোনে ইনায়ার একটা ছবি ছিল। পারিবারিক অনুষ্ঠানে তোলা ছবিটা সে অনেক দিন ধরে রেখে দিয়েছে।

ছবিটায় ইনায়া হাসছে।

ইহান নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই সামির ঘরে ঢুকে পড়ল।

“ভাই, কার ছবি দেখে হাসছ?”

ইহান তাড়াতাড়ি ফোনটা বন্ধ করে বলল, “কোনো ছবি না।”

সামির চোখ ছোট করল।

“ওহ! বুঝেছি। নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ মানুষ!”

“সামির, তোর কাজ কী?”

“আমার কাজ হলো পরিবারের মানুষের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখা।”

“তাহলে গিয়ে নিজের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখ।”

সামির হেসে বলল, “ভাই, একটা কথা বলি? কাউকে ভালো লাগলে বলে দিতে হয়। বেশি দেরি করলে অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে।”

ইহান গম্ভীর হয়ে গেল।

“সবকিছু এত সহজ নয়।”

সামির এবার আর হাসল না।

“সহজ না হলেও অসম্ভব তো নয়।”

কথাটা বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ইহান ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ইনায়াকে সে পছন্দ করে। কিন্তু পরিবারের সম্পর্ক, নিজের অনুভূতি আর ইনায়ার মনের কথা না জানার ভয়—সব মিলিয়ে সে নিজেকে আটকে রেখেছে।

সে জানে না, ইনায়াও ঠিক একই ভয়ে দিন কাটাচ্ছে।

### বিকেলের খুনসুটি

বিকেলে সবাই বসার ঘরে আড্ডা দিচ্ছিল।

আয়ান অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসতেই আয়রা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“ভাইয়া, একটা উপকার করবে?”

আয়ান ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল, “কী?”

“আমাকে একটা নতুন ফোন কিনে দাও।”

“না।”

“কেন?”

“কারণ তোর আগের ফোনটা এখনো ভালো আছে।”

আয়রা মুখ ফুলিয়ে বলল, “তুমি একদম কিপটে!”

আয়ান এবার ফোন নামিয়ে বলল, “কী বললি?”

আয়রা দৌড়ে ইহানের পেছনে লুকিয়ে পড়ল।

“ইহান ভাইয়া, বাঁচাও!”

ইহান হেসে বলল, “আমি কেন তোকে বাঁচাব?”

“কারণ তুমি আমার প্রিয় ভাই!”

সামির পাশ থেকে বলে উঠল, “মাত্র পাঁচ মিনিট আগে তো আমি তোর প্রিয় ভাই ছিলাম!”

“তুমি পুরোনো হয়ে গেছ!”

সবাই হেসে উঠল।

এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই ইনায়া চুপচাপ বসে ছিল।

ইহান সেটা লক্ষ করল।

কিছুক্ষণ পর সে ইনায়ার পাশে এসে বসল।

“কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“সারাদিন ধরে চুপচাপ আছ।”

“এমনিই।”

ইহান একটু থেমে বলল, “আমার সঙ্গে কিছু হয়েছে?”

ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

“না তো!”

“তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?”

প্রশ্নটা শুনে ইনায়ার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

সে কি বুঝে ফেলেছে?

ইনায়া তাড়াতাড়ি বলল, “তুমি বেশি ভাবছ!”

ইহান মৃদু হেসে বলল, “হতে পারে।”

তারপর সে উঠে চলে গেল।

ইনায়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইহান একবার পেছনে ফিরে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো।

কেউ কিছু বলল না।

তবু সেই নীরবতার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা দুজনের কেউই মুখে প্রকাশ করতে পারল না।

### রাতের ছাদে

রাতের খাবারের পর আয়রা ছাদে এসে দেখল, সামির রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

তার মুখে অদ্ভুত একটা হাসি।

আয়রা কাছে গিয়ে বলল, “কার সঙ্গে কথা বলছ?”

সামির চমকে ফোনটা পেছনে সরিয়ে নিল।

“কেউ না!”

আয়রা হেসে বলল, “তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে, কেউ একজন তোমার খুব প্রিয়।”

সামির চুপ করে রইল।

আয়রা এবার তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আচ্ছা, নাম বলো। কে সে?”

সামির কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, “তোর বান্ধবী নুহা।”

আয়রা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

“নুহা? আমার নুহা?”

সামির মাথা নাড়ল।

আয়রা এবার হেসে ফেলল।

“বাহ! তাহলে একটা চুক্তি করা যাক।”

“কী চুক্তি?”

আয়রা গম্ভীর মুখ করে বলল, “তুমি যদি ইনায়া আপুর ব্যাপারে ইহান ভাইয়ের মনের কথা জানতে সাহায্য করো, তাহলে আমি নুহার সঙ্গে তোমার ব্যাপারটা এগিয়ে নিতে সাহায্য করব।”

সামির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মানে, তুই চাইছিস আমি ইহান ভাইকে জিজ্ঞেস করি, উনি ইনায়া আপুকে পছন্দ করেন কি না?”

“একদম!”

“আর আমি যদি জানতে পারি, উনি ইনায়া আপুকে পছন্দ করেন না?”

আয়রার হাসি মিলিয়ে গেল।

“তাহলে অন্তত সত্যিটা জানা যাবে।”

সামির মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে। তবে একটা শর্ত আছে।”

“কী?”

“নুহার কাছে আমার নামে কোনো বাজে কথা বলবি না!”

আয়রা হেসে বলল, “সেটা তো পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে!”

“আয়রা!”

দুজনের হাসিতে ছাদটা মুখর হয়ে উঠল।

তারা জানত না, তাদের এই ছোট্ট পরিকল্পনা একদিন পরিবারের অনেক গোপন অনুভূতি সামনে নিয়ে আসবে।

সেই রাতে ইনায়া নিজের ডায়েরিতে লিখল—

কিছু মানুষ খুব কাছে থেকেও কত দূরে থাকে! ইহান আমার পাশে থাকে, আমার সঙ্গে কথা বলে, আমার খোঁজ নেয়। তবু তাকে নিজের মনের কথাটা বলতে পারি না।

যদি একদিন সে আমার জীবন থেকে দূরে চলে যায়?

অন্যদিকে, ইহানও নিজের ঘরে বসে ফোনের স্ক্রিনে ইনায়ার নামের দিকে তাকিয়ে ছিল।

কতবার যে সে একটা মেসেজ লিখে আবার মুছে দিয়েছে, তার হিসাব নেই।

শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল—

“ঘুমিয়ে পড়েছ?”

ইনায়ার ফোনে মেসেজটা পৌঁছাতেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

সে উত্তর দিল—

“না। তুমি?”

ইহান লিখল—

“আমিও না।”

দুটি ছোট্ট মেসেজ।

কিন্তু দুজনের মুখেই তখন অজান্তে হাসি।

তারা কেউই জানত না, এই না-বলা ভালোবাসা একদিন তাদের কোথায় নিয়ে যাবে।

তবে একটা কথা সত্যি—

কখনো কখনো ভালোবাসা স্বীকার করার আগেই, একজন মানুষের ছোট্ট একটা মেসেজ পুরো রাতটাকে সুন্দর করে দিতে পারে।

চলবে…!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন