### অবশেষে তুমি
### পর্ব ৫: অচেনা বিপদ
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকালের নাশতার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। কিন্তু আজ টেবিলে খাবারের চেয়ে কথার পরিমাণই বেশি।
আয়ান ফোনে চোখ রেখে নাশতা করছে। ইহান চুপচাপ চা খাচ্ছে। সামির একদিকে বসে রুটিতে জ্যাম লাগাচ্ছে, আর অন্যদিকে আয়রাকে বিরক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
আয়রা বিরক্ত মুখে বলল, — সামির, আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
সামির নিরীহ মুখ করে বলল, — আপু, তোমার মুখে কিছু লেগে আছে।
আয়রা তাড়াতাড়ি মুখ মুছল। — কোথায়?
— বিরক্তি!
সামিরের কথা শুনে ইনায়া হেসে ফেলল। আয়রা রাগী চোখে তাকাতেই সামির নিজের প্লেটের দিকে মনোযোগ দিল।
ইহান মৃদু হেসে বলল, — তোদের দুজনের ঝগড়া কি কখনো শেষ হবে?
আয়রা বলল, — ওকে একদিন বাসা থেকে বের করে দিলে শেষ হবে।
সামির সঙ্গে সঙ্গে বলল, — আমাকে বের করলে নুহাকে কে ভাববে?
কথাটা শুনে সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
আয়ান ভ্রু তুলে বলল, — নুহা কে?
সামির পানি খেতে গিয়ে প্রায় কাশতে শুরু করল।
আয়রা তাড়াতাড়ি বলল, — নুহা আমার বান্ধবী। সামিরের মাথায় একটু সমস্যা হয়েছে।
সামির ফিসফিস করে বলল, — আপু, নিজের কাজ নিজে নষ্ট করো না।
আয়রা চোখ রাঙাল।
নাশতার পর ইনায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। ইহান পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে গেল।
— কার সঙ্গে কথা বলছ?
ইনায়া ফোনটা নামিয়ে বলল, — বান্ধবীর সঙ্গে।
— এত হাসছ কেন?
— হাসতেও কি এখন অনুমতি নিতে হবে?
ইহান মুচকি হেসে বলল, — না, তবে তোমাকে হাসতে দেখলে ভালো লাগে।
ইনায়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল, — আপনি আজকাল বেশি কথা বলছেন।
— তোমার সঙ্গে কথা বললে এমনিই হয়ে যায়।
ইনায়ার গাল লাল হয়ে উঠল। সে দ্রুত ভেতরে চলে গেল।
ইহান নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
দুপুরে আয়রা ও সামির একসঙ্গে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আয়রার উদ্দেশ্য ছিল নুহার সঙ্গে দেখা করা, আর সামিরের উদ্দেশ্য ছিল নুহার সামনে একটু ভালো সাজা।
গাড়িতে উঠে আয়রা বলল, — একটা কথা মনে রাখবি, নুহার সামনে কোনো অদ্ভুত আচরণ করবি না।
সামির গম্ভীর মুখে বলল, — আমি কি কখনো অদ্ভুত আচরণ করি?
— তুই জন্ম থেকেই অদ্ভুত।
— ধন্যবাদ। এত সুন্দর প্রশংসা করার জন্য।
আয়রা মাথায় হাত দিল।
অন্যদিকে, আয়ান অফিসের একটি জরুরি ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে একটি মেসেজ এল।
“আপনার পরিবারের ব্যাপারে কিছু কথা আছে। আজই দেখা করা দরকার।”
আয়ান মেসেজটি পড়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। নম্বরটি পরিচিত নয়। সে কল করল, কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ধরল না।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ এল—
“বিষয়টা আপনার ছোট ভাইয়ের নিরাপত্তা নিয়েও হতে পারে।”
এবার আয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
বিকেলের দিকে ইহান অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকল।
— ইহান!
সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, একজন অপরিচিত লোক তার দিকে এগিয়ে আসছে।
— আপনি কি ইহান আহমেদ?
— জি। কিন্তু আপনি কে?
লোকটি চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, — আপনার পরিবারের একজনের সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। আপনি কি একটু সময় দিতে পারবেন?
ইহান সতর্ক হয়ে বলল, — কী কথা?
লোকটি পকেট থেকে একটি খাম বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— এটা আগে দেখুন।
ইহান খামটি হাতে নিতেই লোকটি দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
খামের ভেতরে ছিল একটি ছবি। ছবিতে তাদের পরিবারের বাড়ির সামনের অংশ দেখা যাচ্ছে। ছবির পেছনে লেখা—
“সবাইকে বিশ্বাস করবেন না।”
ইহান কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে ইহান সরাসরি আয়ানের ঘরে গেল।
— ভাইয়া, তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে হবে।
আয়ান ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল। — কী হয়েছে?
ইহান ছবিটি তার হাতে দিল। ছবিটি দেখেই আয়ানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— এটা তুমি কোথায় পেয়েছ?
— অফিসের সামনে একজন লোক দিয়ে গেছে।
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের ফোনের মেসেজগুলোও ইহানকে দেখাল।
দুজনেই বুঝতে পারল, ব্যাপারটা সাধারণ কিছু নয়।
ঠিক তখনই দরজায় সামির এসে দাঁড়াল।
— কী হয়েছে? দুজনের মুখ এমন কেন? মনে হচ্ছে কেউ আমার নামে বিয়ের কার্ড ছাপিয়েছে!
কেউ হাসল না।
সামিরের মুখের হাসিও মিলিয়ে গেল।
— আচ্ছা, সত্যিই কী হয়েছে?
আয়ান ফোনটা রেখে বলল, — আপাতত কাউকে কিছু বলবি না। আর একা কোথাও যাবি না।
ইহান মাথা নাড়ল।
রাতের খাবারের সময় সবাই একসঙ্গে বসেছিল। কিন্তু আয়ান ও ইহানের মন পড়ে ছিল বিকেলের ঘটনায়।
ইনায়া বিষয়টি খেয়াল করল।
— ভাইয়া, তোমাদের কী হয়েছে? দুজনকেই কেমন চিন্তিত লাগছে।
আয়ান স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল, — অফিসের একটু কাজের চাপ।
ইনায়া আর কিছু বলল না। তবে তার মনে সন্দেহ থেকেই গেল।
রাত গভীর হলে আয়ান আবার অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ পেল।
“ছবিটা পেয়েছেন তো? এবার বুঝতে পারবেন, আপনাদের পরিবারের অতীত এখনো শেষ হয়নি।”
আয়ান দ্রুত রিপ্লাই দিল—
“আপনি কে? কী চান?”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
কিছুক্ষণ পর ইহানের ফোনেও একটি মেসেজ এল।
“যাকে আপনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন, বিপদটা হয়তো তার কাছ থেকেই আসবে।”
ইহান ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
একই সময়ে বাড়ির বাইরে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ির ভেতর থেকে কেউ খানবাড়ির দিকে তাকিয়ে ফোনে বলল,
— ওরা সন্দেহ করতে শুরু করেছে। এবার পরের পদক্ষেপ নিতে হবে।
ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— সাবধানে। এখনই যেন কেউ সত্যিটা জানতে না পারে।
আয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—কে তাদের পরিবারকে লক্ষ্য করছে?
ইহানও বুঝতে পারছিল, সামনে বড় কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে।
কিন্তু বিপদটা ঠিক কোথা থেকে আসবে, তা কেউ জানে না।
হঠাৎ আয়ানের ফোনে আবারও একটি মেসেজ এল।
মেসেজে লেখা—“খেলা তো সবে শুরু হয়েছে!”
আয়ান বুঝল, তাদের জীবনে এবার ঝড় আসতে চলেছে।
চলবে...!!