অবশেষে তুমি
পর্ব ১১: পুরোনো বাড়ির গোপন দরজা
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকাল থেকেই খান বাড়িতে অদ্ভুত একটা চাপা উত্তেজনা। ইহান আর ইনায়া গতকাল রাতে যে পুরোনো বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা কাউকে জানায়নি। কিন্তু ইনায়ার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে একদিকে ভয় পাচ্ছে, অন্যদিকে ইহানের সঙ্গে থাকার সুযোগটাও ছাড়তে চাইছে না।
ডাইনিং টেবিলে বসে সামির একবার ইনায়ার দিকে, আরেকবার ইহানের দিকে তাকাল।
— আচ্ছা, তোমরা দুজন কি গোপনে কোনো মিশনে যাচ্ছ?
ইনায়া চমকে উঠে বলল, — কীসব বলছিস?
সামির গম্ভীর মুখে বলল, — না মানে, দুজনের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আজকেই বিয়ে করে পালিয়ে যাবে!
— সামির! — ইনায়া ধমকে উঠল।
রোদ হেসে বলল, — বিয়ে করলে আমাদের জানিয়ে করিস। খাওয়াদাওয়ার একটা ব্যাপার আছে না!
আয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, — তোদের জীবনে সিরিয়াস বিষয় বলে কিছু নেই?
সামির সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, — আছে তো! আমার জীবনের সবচেয়ে সিরিয়াস বিষয় হলো নুহা আমাকে রিপ্লাই দিতে এত দেরি করে কেন!
সবাই হেসে উঠল। কিন্তু ইহানের মুখে হাসি নেই। সে বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছে।
ইনায়া সেটা লক্ষ করে নিচু গলায় বলল, — আবার মেসেজ এসেছে?
ইহান ফোনটা উল্টে রেখে বলল, — না।
— মিথ্যা বলছ কেন?
ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — কারণ সত্যিটা বললে তুমি চিন্তা করবে।
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— তুমি কি মনে করো, তোমার চিন্তায় আমি নেই? তুমি বিপদে পড়লে আমি চিন্তা করব না?
ইহান এবার তার চোখের দিকে তাকাল। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
— চলো। আমাদের বের হতে হবে।
ইনায়া আর কোনো কথা বলল না। শুধু মনে মনে ঠিক করল, আজ ইহানের কাছ থেকে কোনো সত্যি লুকাতে দেবে না।
পুরোনো বাড়িটা শহরের একেবারে নিরিবিলি প্রান্তে। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ থাকে না। চারপাশে বড় বড় গাছ, দেয়ালে শ্যাওলা আর লোহার গেটের গায়ে মরিচার দাগ।
গাড়ি থেকে নেমে ইনায়া বাড়িটার দিকে তাকাল।
— এই বাড়িতে কেউ থাকে?
ইহান বলল, — জানি না।
— বাহ! কী চমৎকার! যেখানে কেউ থাকে কি না জানো না, সেখানেই আমাকে নিয়ে এসেছ!
ইহান একটু হেসে বলল, — তুমি তো নিজেই আসতে চেয়েছ।
— তোমাকে একা বিপদে পড়তে দেব না বলে এসেছি। ভূতের সঙ্গে পরিচিত হতে আসিনি!
ইহান হেসে ফেলল।
— ভূত দেখলে আমার পেছনে লুকাবে না কিন্তু।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল, — তুমি সামনে থাকলে লুকাব কেন? তোমাকেই আগে ঠেলে দেব!
— বাহ! ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
ইনায়া কথাটা শুনে থমকে গেল। ইহানও বুঝতে পারল, মুখ ফসকে কথাটা একটু বেশিই বেরিয়ে গেছে।
দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
ইনায়া চোখ সরিয়ে বলল, — চলো, ভেতরে যাই।
ইহান মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কতবার যে সে ইনায়াকে নিজের মনের কথা বলতে চেয়েছে! কিন্তু প্রতিবারই কোনো অজানা ভয় তাকে আটকে দিয়েছে।
আর এখন তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক অতীত, যার সম্পর্কে তারা কেউই পুরোপুরি কিছু জানে না।
বাড়ির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল। ঘরের আসবাবপত্র সাদা কাপড়ে ঢাকা। দেয়ালে কয়েকটা পুরোনো ছবি ঝুলছে।
ইনায়া একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
— ইহান, এদিকে আসো!
ইহান এগিয়ে এসে ছবিটার দিকে তাকাল। ছবিতে তার বাবা সাফওয়ান খান, আয়ানের বাবা ফারদিন খান এবং আরেকজন অচেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবির পেছনে লেখা—
“যে রাতে সবকিছু বদলে গিয়েছিল।”
ইহানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— এই ছবিতে বাবা এখানে কী করছেন?
ইনায়া বলল, — হয়তো এই বাড়ির সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক আছে।
— সম্পর্ক থাকলে আমাদের এত বছর কিছু জানানো হয়নি কেন?
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ হলো।
দুজনেই চমকে সেদিকে তাকাল।
ইনায়া ফিসফিস করে বলল, — কেউ আছে?
কোনো উত্তর এল না।
ইহান ইনায়াকে নিজের পেছনে রেখে ধীরে ধীরে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা ঠেলে খুলতেই দেখা গেল, জানালাটা খোলা। বাতাসে পর্দা নড়ছে।
কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা কাগজ।
ইহান কাগজটা তুলে পড়ল।
“তোমরা দুজন এখানে আসবে, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু তোমাদের জানা উচিত—এই বাড়ির সত্যি জানলে তোমাদের পরিবার আর আগের মতো থাকবে না।”
ইনায়া কাগজটা হাতে নিয়ে বলল, — কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।
ইহান চারপাশে তাকিয়ে বলল, — শুধু অনুসরণ নয়। কেউ চায় আমরা সত্যিটা জানি, আবার কেউ চায় আমরা সত্যিটা জানার আগেই থেমে যাই।
— তাহলে আমরা কী করব?
ইহান তার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, — সত্যিটা খুঁজব। একসঙ্গে।
ইনায়া মৃদু স্বরে বলল, — তুমি আবার আমাকে মাঝপথে ছেড়ে চলে যাবে না তো?
প্রশ্নটা শুনে ইহান থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি কখনো ভাবিনি, ইনায়া। কিন্তু কিছু সত্যি আছে, যেগুলো জানার পর মানুষ নিজের কাছের মানুষকেও চিনতে পারে না।
ইনায়ার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।
— তাহলে আগে থেকেই আমাকে দূরে সরিয়ে রাখছ কেন? সত্যিটা জানার অধিকার কি শুধু তোমার?
ইহান উত্তর দিতে পারল না।
বাড়ির ওপরতলায় একটা ছোট ঘর ছিল। ঘরটার দরজায় তালা ঝুলছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ইহান একটা পুরোনো চাবি পেল, যা দরজার তালায় ঠিকমতো মিলে গেল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল, ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর পুরোনো ডায়েরি, কয়েকটা চিঠি আর একটা ছোট বাক্স রাখা।
ইনায়া বাক্সটা খুলল।
ভেতরে ছিল একটা রুপার চেইন আর ছোট্ট একটা কাগজ।
কাগজে লেখা—
“যদি কখনো ইনায়া আর ইহান একসঙ্গে এই ঘরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে অতীত আবার ফিরে এসেছে।”
ইনায়ার হাত কেঁপে উঠল।
— আমাদের নাম এখানে কেন?
ইহান ডায়েরিটা খুলে পাতা উল্টাতে লাগল। বেশির ভাগ লেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু শেষের পাতায় কয়েকটা লাইন স্পষ্ট দেখা গেল।
“ফারদিন সব জানে। সাফওয়ানও জানে। কিন্তু তারা কেউ মুখ খুলবে না। কারণ সেই রাতের সত্যি প্রকাশ পেলে শুধু একটি পরিবার নয়, দুটি পরিবারের জীবন বদলে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—যে মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য সবাই এত কিছু করেছিল, সে নিজেই জানে না তার জীবনের সঙ্গে কী ঘটেছিল।”
ইনায়া ধীরে ধীরে বলল, — এখানে কি আমার কথা বলা হয়েছে?
ইহান তার দিকে তাকাল। তার চোখে উদ্বেগ।
— আমি জানি না।
— কিন্তু তোমার বাবা আর আমার বাবা দুজনের নামই আছে। আমাদের কাছ থেকে কী লুকানো হয়েছে, ইহান?
ইহান ডায়েরিটা বন্ধ করল।
— সেটা জানতেই হবে।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
ইহান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
— ডায়েরিটা পেয়েছ?
ইহান চমকে উঠল।
— আপনি কে?
— সেটা জানার সময় এখনো হয়নি। তবে একটা কথা মনে রেখো, ইহান—ইনায়াকে সবকিছু থেকে রক্ষা করতে গিয়ে এমন কিছু কোরো না, যাতে একদিন সে তোমাকেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে।
ইহান রাগে বলল, — আপনি আমাদের পরিবার সম্পর্কে কী জানেন?
লোকটি হালকা হেসে বলল,
— তোমার বাবা যেটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছেন, সেটা জানতে চাইলে আজ রাতেই ফারদিন খানের পুরোনো অফিসে যাও। তবে সাবধান, সেখানে যা পাবে, তা তোমার ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে তোমার বিশ্বাস বদলে দিতে পারে।
কল কেটে গেল।
ইনায়া সব শুনেছে। সে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
ইহান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না।
আর তার এই নীরবতাই ইনায়ার মনে নতুন সন্দেহের জন্ম দিল।
এদিকে খান বাড়িতে আয়ান নিজের ঘরে পুরোনো কাগজপত্র খুঁজছিল। আয়রাকে নিয়ে পাওয়া চিঠিটার কথা সে কাউকে বলেনি। কিন্তু আজ একটা পুরোনো ফাইলের ভেতর সে আরেকটা ছবি খুঁজে পেল।
ছবিতে ছোট্ট আয়রা দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা মহিলার পাশে। পেছনে লেখা—
“যেদিন ও সত্যিটা জানবে, সেদিন আর কাউকে বিশ্বাস করবে না।”
আয়ান ছবিটা শক্ত করে ধরে রইল।
— আয়রা, তোমার জীবনে এমন কী ঘটেছিল, যেটা তুমি নিজেও জানো না?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
আয়রা ভেতরে ঢুকে বলল, — ভাইয়া, কী করছ?
আয়ান দ্রুত ছবিটা লুকিয়ে ফেলল।
— কিছু না।
আয়রা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, — তুমি আবার মিথ্যা বলছ। তোমার চোখ দেখলেই বোঝা যায়।
আয়ান মৃদু হাসল।
— তোর চোখ এত ভালো হলে নিজের মনের কথাটাও বুঝতে পারিস না কেন?
আয়রা থমকে গেল।
— কী বলতে চাও?
আয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু তাদের জীবনে নিজের জায়গা দাবি করা যায় না।
আয়রার মুখটা মুহূর্তে বদলে গেল। সে বুঝতে পারল, আয়ান এখনো অতীতের কিছু অনুভূতি বয়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু সে কিছু বলল না।
কারণ তার নিজের মনেও তো ইহানকে নিয়ে এমন এক অনুভূতি রয়েছে, যার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
রাত নামতেই ইহান আর ইনায়া বাড়ি ফিরে এল। দুজনের কেউই খুব একটা কথা বলছিল না।
ইনায়া নিজের ঘরে চলে যাওয়ার আগে থেমে বলল,
— ইহান, একটা কথা মনে রেখো। সত্যি যত কঠিনই হোক, আমি সেটা শুনতে প্রস্তুত। কিন্তু তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্কই থাকবে না।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
ইহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। ফোনে আবার একটা মেসেজ এল।
“আজ রাত ১২টা। ফারদিন খানের পুরোনো অফিস। একা আসবে। সঙ্গে কাউকে আনলে ইনায়া এমন সত্যি জানবে, যা সে কোনোদিন জানতে চায়নি।”
ইহান মেসেজটা পড়ে চোখ বন্ধ করল।
একদিকে ইনায়ার বিশ্বাস, অন্যদিকে পরিবারের লুকানো অতীত।
সে কি ইনায়াকে সঙ্গে নেবে, নাকি একাই যাবে?
রাত ১১টা ৫৫ মিনিট।
পুরোনো অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ইহান বুঝতে পারল, কেউ একজন ভেতরে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ বলল,
— এসেছ, ইহান? এবার তোমাকে সেই সত্যিটা বলব, যেটা তোমার বাবা সারাজীবন লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন।
ইহান ঘরে ঢুকতেই লোকটা আলোয় সামনে এল।
লোকটিকে দেখে ইহানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— আপনি!
লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল,
— হ্যাঁ, আমি। আর তুমি যদি ইনায়াকে সত্যিই ভালোবেসে থাকো, তাহলে আজ রাতের পর ওর কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
চলবে...!!