ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবশেষে তুমি..

পর্ব 13

লেখক: আইরিশা / Irisha

### অবশেষে তুমি

### পর্ব ১৩: বিশ্বাসের শেষ পরীক্ষা

লেখিকা: আরফা আইরিশা

রাত ১০টা ৩০ মিনিট।

পুরোনো বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে ইহান এখনো সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট ইনায়ার পাশে দাঁড়ানো অচেনা মানুষটি কে, সেটা জানার জন্য তার মন অস্থির হয়ে উঠেছে।

লোকটি চেয়ারে বসে বলল,

— ছবিটা দেখে চিনতে পারছ?

ইহান মাথা নাড়ল।

— না। কিন্তু ইনায়ার সঙ্গে এই মানুষটার সম্পর্ক কী?

— সম্পর্কটা অনেক পুরোনো। তোমার বাবা আর ফারদিন খান যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন, তার সঙ্গে এই মানুষটার নাম জড়িয়ে আছে।

ইহান বিরক্ত হয়ে বলল,

— আপনি বারবার আমার বাবার কথা বলছেন। সরাসরি বলুন, কী হয়েছে?

লোকটি একটা ফাইল এগিয়ে দিল।

— এটা পড়ো। তাহলেই বুঝতে পারবে, কেন তোমার আর ইনায়ার একসঙ্গে থাকা কিছু মানুষের পছন্দ নয়।

ইহান ফাইলটা খুলতেই কয়েকটি পুরোনো নথি চোখে পড়ল। সেখানে সাফওয়ান খান ও ফারদিন খানের স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু শেষ পাতায় এমন একটা নাম লেখা, যেটা দেখে ইহান থমকে গেল।

মেহের রহমান।

ইহান অবাক হয়ে বলল,

— মেহেরের নাম এখানে কেন?

লোকটি বলল,

— এই পরিবারের গল্পে শুধু ইনায়া নয়, মেহেরের অতীতও জড়িয়ে আছে। তোমাদের সবাইকে আলাদা রাখার পেছনে একটা পরিকল্পনা ছিল।

ইহান ফাইলটা বন্ধ করে বলল,

— আমি কাউকে আলাদা রাখার পরিকল্পনা মানি না। সত্যিটা জানতে চাই।

লোকটি মৃদু হাসল।

— তাহলে তোমার বাবার কাছে যাও। তবে সাবধান, তিনি হয়তো তোমাকে সেই উত্তর দেবেন না, যেটা তুমি শুনতে চাও।

### খান বাড়ি

সকালে সামির নাশতার টেবিলে বসে নুহার সঙ্গে মেসেজ করছিল।

রোদ তার ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী ব্যাপার? নাশতার টেবিলেও প্রেম?

সামির ফোনটা বুকে চেপে বলল,

— ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো নিষেধ।

আয়ান হেসে বলল,

— ব্যক্তিগত ব্যাপারটা এত জোরে হাসছিস কেন? আমরা তো পাশের ঘর থেকেও শুনতে পাচ্ছি!

সামির মুখ গম্ভীর করে বলল,

— তোমাদের জীবনে প্রেম নেই বলে আমার জীবনেও থাকবে না?

রোদ বলল,

— আমাদের জীবনে প্রেম আছে। শুধু তোর মতো প্রতিদিন রিপোর্ট দিতে হয় না।

ঠিক তখনই আয়রা এসে বসলো।

— কী নিয়ে এত হাসাহাসি?

সামির সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— আমার প্রেম নিয়ে ওদের হিংসা হচ্ছে।

আয়রা হেসে বলল,

— নুহা আপু কি অবশেষে তোকে উত্তর দিয়েছে?

সামিরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

— হ্যাঁ!

রোদ হাততালি দিয়ে বলল,

— বাহ! ইতিহাসে নাম লেখানোর মতো ঘটনা!

সবাই হেসে উঠল।

কিন্তু আয়ান চুপচাপ আয়রার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে সেই পুরোনো ছবির কথা ঘুরছিল।

আয়রা সেটা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে ভাইয়া? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?

আয়ান হাসার চেষ্টা করল।

— কিছু না। তুই ভালো আছিস তো?

— হ্যাঁ। হঠাৎ এই প্রশ্ন?

— এমনি।

আয়রা কিছু না বলে খাবারে মন দিল।

আয়ান বুঝতে পারল, সত্যিটা জানার আগেই তাকে আয়রাকে রক্ষা করার একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

### ইনায়ার ঘর

ইনায়া জানালার পাশে বসে ছিল। ইহানের সঙ্গে গত রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।

ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।

ইহান: আজ দেখা করতে পারবে? জরুরি কথা আছে।

ইনায়া কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল।

ইনায়া: পারব। কিন্তু এবার কোনো কথা লুকাবে না।

কিছুক্ষণ পর ইহানের উত্তর এল।

ইহান: চেষ্টা করব।

ইনায়া বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল।

— চেষ্টা করবে! যেন সত্যি বলাটা পরীক্ষার প্রশ্ন!

ঠিক তখন আরিশা ঘরে ঢুকল।

— আপু, কার ওপর রাগ করছ?

— কারও ওপর না।

আরিশা ইনায়ার পাশে বসে বলল,

— ইহান ভাইয়ার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?

ইনায়া অবাক হয়ে তাকাল।

— তুমি কীভাবে বুঝলে?

আরিশা হেসে বলল,

— তোমার মুখে যখন হাসি থাকে না, তখন বুঝতে হবে ইহান ভাইয়ার কোনো দোষ আছে।

ইনায়া হালকা হেসে ফেলল।

আরিশা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

— আপু, একটা কথা বলি? কাউকে ভালোবাসলে তার ভুলগুলো বুঝতে হয়। কিন্তু নিজের কষ্টগুলোও চেপে রাখা উচিত না।

ইনায়া আরিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

— এত বড় কথা শিখলি কোথায়?

— রাফি ভাইয়ার কাছ থেকে!

ইনায়া হেসে বলল,

— তাহলে বুঝলাম, কথাটা তোর নিজের না।

আরিশা মুখ বাঁকাল।

— থাক, তোমাকে কিছু বলাই ভুল!

### পুরোনো ক্যাফে

বিকেলে ইহান আর ইনায়া দেখা করল সেই ক্যাফেতে, যেখানে তারা একবার একসঙ্গে সময় কাটিয়েছিল।

ইনায়া বসেই বলল,

— এবার বলো।

ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ছবিটা বের করল।

— এই মানুষটাকে চেনো?

ইনায়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

— না। কে উনি?

— জানি না। কিন্তু তোমার ছোটবেলার একটা ছবিতে উনাকে দেখেছি।

ইনায়া অবাক হয়ে বলল,

— আমার ছোটবেলার ছবি তোমার কাছে এল কীভাবে?

ইহান সব খুলে বলল—পুরোনো বাড়ি, ফাইল, অচেনা লোক এবং পরিবারের গোপন চুক্তির কথা।

সব শুনে ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— তুমি কি মনে করো, আমার বাবা এসব জানেন?

— আমার মনে হয়, শুধু তোমার বাবা নন, আমার বাবাও জানেন।

ইনায়ার চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

— তাহলে আমাদের কাছ থেকে সবাই এত কিছু লুকিয়েছে কেন?

ইহান তার হাতের কাছে হাত রাখল।

— আমি জানি না। কিন্তু সত্যিটা বের করব।

ইনায়া হাতটা সরিয়ে নিল না। বরং ধীরে বলল,

— ইহান, একটা কথা বলো। সত্যিটা জানার পর যদি আমাদের পরিবার আমাদের একসঙ্গে থাকতে না দেয়?

ইহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমি তোমার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেব না। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয়ে সত্যিটা থেকে পালাবও না।

ইনায়া মৃদু স্বরে বলল,

— আমিও পালাতে চাই না।

ঠিক তখনই ইহানের ফোনে একটা ছবি এল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তাদের দুজনকে ক্যাফের বাইরে থেকে কেউ গোপনে ছবি তুলেছে।

নিচে লেখা—

“একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করো। তোমাদের অতীত তোমাদের আলাদা করবেই।”

ইনায়া ছবিটা দেখে ভয় পেয়ে গেল।

ইহান ফোনটা নামিয়ে বলল,

— এবার আর চুপ করে থাকব না।

### সাফওয়ান খানের ঘর

রাতে ইহান বাবার ঘরে ঢুকল।

সাফওয়ান খান তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।

— বাবা, তোমার সঙ্গে কথা আছে।

— বল।

ইহান ছবিটা টেবিলে রাখল।

— এই মানুষটা কে?

সাফওয়ান ছবিটা দেখে চমকে উঠলেন।

— এটা কোথায় পেয়েছ?

— উত্তর দাও, বাবা।

সাফওয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

— ইহান, এই বিষয়টা নিয়ে আর এগোবে না।

— কেন? ইনায়ার সঙ্গে এই লোকটার কী সম্পর্ক?

সাফওয়ান এবার কঠিন গলায় বললেন,

— ইনায়ার নাম এই ব্যাপারে আনবি না।

ইহান অবাক হয়ে বলল,

— কেন? ওর নাম তো এই ছবিতে আছে!

সাফওয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— তুই যা ভাবছিস, ব্যাপারটা তেমন নয়।

— তাহলে কেমন?

সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— একদিন সব বলব।

ইহান তিক্ত হেসে বলল,

— তোমাদের সবার কাছে সত্যিটা বলার জন্য শুধু একটা দিনই থাকে। কিন্তু সেই দিনটা কখনো আসে না।

সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সাফওয়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর নিজের ফোন হাতে নিয়ে একটা নম্বরে কল করলেন।

— ও আবার সত্যিটা খুঁজছে। এবার আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

— তাহলে ইনায়াকে সব জানিয়ে দিন।

সাফওয়ান আতঙ্কিত গলায় বললেন,

— না! ও এখনো জানে না, ওর জীবনে কী ঘটেছিল।

### রাতের শেষ মেসেজ

ইনায়া ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ ফোনে অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।

“তোমার বাবা তোমাকে একটা কথা বলেননি। ছোটবেলায় তুমি হারিয়ে যাওনি, তোমাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।”

ইনায়ার হাত কেঁপে উঠল।

সে সঙ্গে সঙ্গে ইহানকে ফোন করল।

— ইহান, আমার একটা কথা জানতে হবে।

— কী হয়েছে?

— তুমি কি জানো, ছোটবেলায় আমি একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম?

ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— কে বলেছে তোমাকে?

— অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। বলেছে, আমাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি, লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

ইহান স্তব্ধ হয়ে গেল।

— ইনায়া, তুমি এখন কোথাও যাবে না। আমি আসছি।

কল কেটে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরই ইহানের ফোনে আরেকটা মেসেজ এল।

“ইনায়াকে সব জানতে দাও। কিন্তু মনে রেখো, ও যদি সত্যিটা জানতে পারে, তোমার নিজের পরিবারই তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।”

ইহান জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে রাস্তার পাশে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়ির ভেতর থেকে কেউ একজন ফোনে কথা বলছে।

— হ্যাঁ, ওরা দুজন আবার একসঙ্গে হয়েছে। এবার আলাদা করার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিছুক্ষণ থেমে লোকটি বলল,

— আর একটা কথা। মেহের রহমানের ব্যাপারটাও নজরে রাখবে। ও যেন মাহিরের কাছে পৌঁছাতে না পারে।

ফোনের ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল,

— তাহলে পরের পদক্ষেপ কী?

লোকটি ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,

— এবার ওদের নিজেদের পরিবারের বিরুদ্ধেই দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।

চলবে...!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন