### অবশেষে তুমি
পর্ব ১৪: অতীতের মুখোশ
সকাল ৮টা।
খান বাড়ির ডাইনিং রুমে সবাই নাশতা করতে বসেছে। কিন্তু আয়ানের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে আজ কোনো একটা বড় পরিকল্পনা করে এসেছে।
আয়রা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
— কী হয়েছে ভাইয়া? সকাল সকাল এত হাসছ কেন?
আয়ান গম্ভীর মুখে বলল,
— আজ থেকে আমি বদলে যাব।
সামির মুখে পরোটা দিতে দিতে বলল,
— আগে নিজের ঘরটা পরিষ্কার করো, তারপর পৃথিবী বদলাতে এসো!
রোদ হেসে উঠল।
আয়ান সামিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোর মতো মানুষদের জন্যই এই পরিবারে শান্তি নেই।
ইনায়া পাশে বসে সব দেখছিল। হঠাৎ ইহান তার প্লেটে একটা মিষ্টি তুলে দিল।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— এটা কী?
— মিষ্টি।
— সেটা তো আমিও বুঝেছি। কিন্তু আমাকে দিচ্ছ কেন?
— তোমার মুখটা সব সময় এমন তেতো থাকে কেন, একটু মিষ্টি খাও।
ইনায়া চোখ ছোট করে তাকাল।
— আপনার নিজের মুখটা আগে ঠিক করুন।
ইহান মুচকি হাসল।
— আমার মুখ তো তোমাকে দেখলেই ঠিক হয়ে যায়।
কথাটা শুনে ইনায়া চুপ করে গেল। অন্যদিকে আয়রা সব শুনে হাসি চাপতে লাগল।
— বাহ! সকাল সকাল রোমান্স!
ইনায়া তাড়াতাড়ি বলল,
— আয়রা, তুমি নাশতা করো!
ইহানের অফিস
ইহান অফিসে বসে একটা পুরোনো ফাইল দেখছিল। গত কয়েকদিনের রহস্যজনক ঘটনাগুলো তাকে অস্থির করে তুলেছে।
ঠিক তখনই তার সহকারী একটা খাম এনে দিল।
— স্যার, আপনার জন্য একজন দিয়ে গেছেন।
ইহান খাম খুলতেই ভেতরে একটা ছবি পেল।
ছবিতে তার বাবা সাফওয়ান, ফারদিন এবং মাহির চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবির পেছনে লেখা—
“তিনজন মানুষ, একটি গোপন সত্য। কিন্তু চতুর্থ মানুষটি কোথায়?”
ইহান ছবিটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগল।
মাহির চৌধুরী!
এই নামটা সে আগেও শুনেছে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
— হ্যালো?
— ইহান সাহেব, পুরোনো হিসাবের খাতা খুলতে শুরু করেছেন দেখছি।
— আপনি কে?
— পরিচয় জানার আগে নিজের বাবাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি মাহির চৌধুরীকে কেন এত ভয় পান।
— আপনার সঙ্গে আমার দেখা করতে হবে।
ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ এল।
— দেখা হবে। তবে এবার একা আসবেন না। যাকে ভালোবাসেন, তাকেও সঙ্গে আনবেন।
কল কেটে গেল।
ইহান বুঝতে পারল, এবার বিষয়টা শুধু তার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ইনায়ার ঘর
ইনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছিল। এমন সময় আয়রা ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে পড়ল।
— ভাবি!
ইনায়া ঘুরে তাকাল।
— কাকে ভাবি বলছিস?
— ভবিষ্যতের ভাবিকে!
— আয়রা!
আয়রা হেসে বলল,
— আচ্ছা, রাগ করো না। একটা কথা বলব?
— বল।
— তুমি কি ইহান ভাইয়াকে পছন্দ করো?
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই।
আয়রা মুচকি হাসল।
— উত্তর না দিলেও বুঝতে পারি।
ঠিক তখনই ইনায়ার ফোনে একটা মেসেজ এল।
“ইহানকে বিশ্বাস করো না। তার পরিবার তোমার অতীতের সব সত্য জানে।”
ইনায়ার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
আয়রা জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?
ইনায়া ফোনটা লুকিয়ে বলল,
— কিছু না।
কিন্তু তার মনে নতুন করে সন্দেহের জন্ম হলো।
সামির ও নুহা
বিকেলে সামির নুহার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
নুহা তাকে দেখে বলল,
— আজ এত দেরি করলে কেন?
সামির নাটকীয়ভাবে বলল,
— তোমার জন্য একটা বিশেষ উপহার আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।
— কী উপহার?
সামির পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল।
নুহা খুলে দেখল, ভেতরে একটা সুন্দর ছোট্ট ব্রেসলেট।
নুহা মুচকি হেসে বলল,
— সুন্দর তো!
সামির মনে মনে খুশি হয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার ফোনে মেসেজ এল।
“নুহার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিও না। তার পরিবারের সঙ্গেও তোমাদের পরিবারের পুরোনো হিসাব জড়িয়ে আছে।”
সামিরের হাসি থেমে গেল।
সে মেসেজটা দ্রুত বন্ধ করে দিল।
নুহা জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?
— কিছু না। একটা অফিসের মেসেজ।
কিন্তু সামিরের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন—নুহার পরিবার আর তাদের পরিবারের মধ্যে কী সম্পর্ক?
আয়ানের অতীত
সন্ধ্যায় আয়ান পুরোনো স্টোররুমে একটা ফাইল খুঁজছিল। হঠাৎ একটা পুরোনো চিঠি তার হাতে এল।
চিঠির ওপরে লেখা—“আয়রার জন্য।”
সে অবাক হয়ে চিঠিটা খুলল।
“যদি কোনোদিন আয়রা সেই রাতের কথা জানতে পারে, তাহলে তাকে বলবে—তার কোনো দোষ ছিল না। তাকে বাঁচানোর জন্যই আমরা সবাই চুপ ছিলাম।”
আয়ানের বুক ধক করে উঠল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ফারদিনের কণ্ঠ শোনা গেল।
— ওই চিঠি কোথায় পেলে?
আয়ান ঘুরে দাঁড়াল।
— বাবা, আয়রার সঙ্গে কী হয়েছিল?
ফারদিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— কিছু সত্যি আছে, যেগুলো জানলে মানুষ নিজের কাছের মানুষকেও চিনতে পারে না।
— কিন্তু আয়রা তো আমাদেরই মানুষ!
ফারদিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— তাই তো তাকে এতদিন আগলে রেখেছি।
রাত ১০টা — পুরোনো বাড়ি
ইহান গাড়ি নিয়ে পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। তার সঙ্গে ইনায়াও ছিল।
ইনায়া গাড়ি থেকে নেমে বলল,
— তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছ?
ইহান বলল,
— কারণ তোমার অতীত আর আমার পরিবারের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। আর আমি চাই না, তুমি অন্য কারও কাছ থেকে সত্যিটা জানো।
ইনায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— তুমি কি আমাকে সব বলবে?
— সব জানি না। কিন্তু যা জানব, তোমার কাছ থেকে লুকাব না।
দুজন বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই একটা ঘরের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে একটা টেবিলের ওপর পুরোনো ডায়েরি রাখা।
ইনায়া ডায়েরিটা খুলতেই প্রথম পাতায় নিজের নাম দেখতে পেল।
“ইনায়া রহমান—যে মেয়েটিকে হারিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।”
ইনায়ার হাত কেঁপে উঠল।
— ইহান... আমার নাম এখানে কেন?
ইহান উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে একজন বেরিয়ে এল।
লোকটিকে দেখে ইহান থমকে গেল।
— আপনি!
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
— অবশেষে দেখা হলো, ইহান। এবার তোমাদের দুজনকেই সত্যিটা জানতে হবে।
ইনায়া ভয়ে ইহানের হাত শক্ত করে ধরল।
লোকটি টেবিলে আরেকটি ছবি রাখল।
ছবিতে ছোট্ট ইনায়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট ইহান।
আর ছবির পেছনে লেখা—
“এই দুই শিশুকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের নিজেদের পরিবার।”
ইনায়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— তাহলে আমাদের ছোটবেলাও একসঙ্গে কেটেছে?
লোকটি মুচকি হেসে বলল,
— শুধু একসঙ্গে কাটেনি, তোমাদের দুজনের জন্যই সেদিন একটা জীবন বদলে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই ইহানের ফোনে একটা মেসেজ এল।
“সাবধান! লোকটা যা বলছে, তার সবটাই সত্যি নয়। আসল ষড়যন্ত্রকারী তোমাদের খুব কাছেই আছে।”
ইহান মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকাল।
কিন্তু লোকটি ততক্ষণে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।
চলবে...!!