ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবশেষে তুমি..

পর্ব 15

লেখক: আইরিশা / Irisha

লেখিকা: আরফা আইরিশা

### অবশেষে তুমি

### পর্ব ১৫: বিশ্বাসের আড়ালে বিশ্বাসঘাতকতা

পুরোনো বাড়ির সেই ঘরটায় তখনও নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ইনায়ার হাতে ধরা ডায়েরির পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছে। পাশে দাঁড়িয়ে ইহান বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

—ইনায়া, আমাদের এখান থেকে যাওয়া উচিত।

ইনায়া ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,

—না, ইহান। এতদূর এসে আবার ফিরে যাব না। লোকটা বলল, আমাদের খুব কাছের কেউ এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। কে সে?

ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—সেটাই তো জানতে হবে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করবে না।

ইনায়া মুচকি হেসে বলল,

—তাহলে তোমাকেও না?

ইহান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—আমাকে একটু বেশি বিশ্বাস করতে পারো।

—কেন? তোমার ওপর বিশেষ কোনো অফার চলছে?

—হ্যাঁ। আজীবন বিশ্বাসের অফার। মেয়াদ শেষ হবে না।

ইনায়া হাসি চেপে বলল,

—বাহ! কথার দোকান খুললে ভালোই চলবে।

ইহান কিছু বলার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। দুজনেই চমকে উঠল।

—কেউ এসেছে! —ফিসফিস করে বলল ইনায়া।

ইহান দ্রুত ডায়েরিটা নিজের ব্যাগে রেখে দরজার কাছে গেল। বাইরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। তবে মেঝেতে একটা খাম পড়ে আছে।

খামটা খুলতেই একটি ছবি বেরিয়ে এল।

ছবিতে ফারদিন, সাফওয়ান এবং মাহিরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ। ছবির পেছনে লেখা—

“যাকে খুঁজছ, সে তোমাদের বাড়িতেই আছে।”

ইহানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সকালে খান বাড়িতে যথারীতি মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে।

ডাইনিং টেবিলে বসে সামির একের পর এক পরোটা খাচ্ছে। আয়রা তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুই কি আজকে সকাল থেকে না খেয়ে আছিস?

সামির মুখভর্তি খাবার নিয়ে বলল,

—হ্যাঁ। তোমাদের বাসায় খাবারের অভাব আছে নাকি?

আয়ান চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,

—খাবারের অভাব নেই, কিন্তু তোর ক্ষুধার কোনো সীমা নেই।

সামির গম্ভীর মুখে বলল,

—ভাইয়া, মানুষের ক্ষুধা নিয়ে মজা করা ঠিক না।

ইহান পাশে বসে হেসে ফেলল।

—তোর ক্ষুধা দেখে মনে হচ্ছে, রান্নাঘরটা তোর নামে লিখে দিতে হবে।

সামির সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—লিখে দিলে কিন্তু না করব না।

ইনায়া পানি খেতে গিয়ে হাসতে শুরু করল।

আয়রা বলল,

—এই বাড়িতে একটা মানুষও স্বাভাবিক নেই!

সামির ভ্রু নাচিয়ে বলল,

—তুমি আছো তো। তোমাকে দেখে আমরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি।

—সামির!

—আচ্ছা, আর বলব না। নুহাকে বলব।

নুহার নাম শুনে সামিরের মুখের হাসি একটু অন্যরকম হয়ে গেল।

আয়রা সেটা লক্ষ করে বলল,

—ওহ! নাম শুনেই মুখে আলো জ্বলে উঠল কেন?

সামির তাড়াতাড়ি পানি খেতে শুরু করল।

আয়ান হেসে বলল,

—পানি খা, পানি। লজ্জা পেলে গলা শুকিয়ে যায়।

সবার হাসির মধ্যেই ইহানের ফোনে একটি মেসেজ এল।

“ছবির মানুষটিকে চিনতে পেরেছ? এবার নিজের বাবাকে জিজ্ঞেস করো, তিনি কেন সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন।”

ইহান ফোনটা উল্টে রাখল।

কিন্তু ইনায়ার চোখ এড়াল না।

দুপুরে ইহান বাবার ঘরে গেল।

সাফওয়ান তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।

—বাবা, তোমার সঙ্গে কথা আছে।

—বলো।

ইহান ছবিটা টেবিলের ওপর রাখল।

ছবিটা দেখেই সাফওয়ানের মুখের ভাব বদলে গেল।

—এটা কোথায় পেলে?

—সেটা বড় কথা নয়। ছবির এই মানুষটা কে?

সাফওয়ান কিছুক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

—পুরোনো বিষয় নিয়ে আর মাথা ঘামিও না।

—প্রতিবার একই কথা বলো! আমাদের পরিবারে কী ঘটেছিল, সেটা জানার অধিকার কি আমাদের নেই?

সাফওয়ান গম্ভীর হয়ে বললেন,

—কিছু সত্যি জানলে মানুষ শুধু অতীত হারায় না, বর্তমানও হারিয়ে ফেলে।

ইহান এবার শান্ত গলায় বলল,

—আর মিথ্যা বিশ্বাস করে বেঁচে থাকলে?

সাফওয়ান কোনো উত্তর দিলেন না।

ইহান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে বাবার কণ্ঠ শুনল,

—ইহান!

সে ফিরে তাকাল।

—ইনায়াকে এই বিষয় থেকে দূরে রাখো।

ইহানের চোখ সরু হয়ে এল।

—কেন? ইনায়ার সঙ্গে কী হয়েছে?

সাফওয়ান মাথা নিচু করে বললেন,

—আমি এখন কিছু বলতে পারব না।

অন্যদিকে আয়ান নিজের ঘরে পুরোনো কাগজপত্র খুঁজছিল। হঠাৎ একটি ছোট্ট বাক্সের ভেতর থেকে চিঠি বেরিয়ে এল।

চিঠির ওপরে লেখা—

“আয়রার জন্য।”

আয়ান চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।

“যেদিন সত্যিটা প্রকাশ পাবে, সেদিন হয়তো সবাই বুঝবে, আয়রার কোনো দোষ ছিল না। তাকে আড়াল করার জন্য যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার মূল্য অনেককে দিতে হয়েছে। কিন্তু এখনো সময় আছে। তাকে সত্যিটা জানাতে হবে।”

আয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

ঠিক তখনই দরজায় ফারদিন এসে দাঁড়ালেন।

—চিঠিটা কোথায় পেলে?

আয়ান চমকে উঠে বলল,

—বাক্সের মধ্যে। বাবা, আয়রার কী হয়েছিল ছোটবেলায়?

ফারদিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না।

—কিন্তু আয়রার নাম কেন?

ফারদিন চিঠিটা নিয়ে ভাঁজ করে রাখলেন।

—তোমার বোনের জীবন নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিও না। সময় হলে সব জানবে।

আয়ান এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—আমি আর অন্ধকারে থাকতে চাই না, বাবা।

ফারদিন ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ।

সন্ধ্যায় ইনায়া ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। ইহান এসে পাশে দাঁড়াল।

—কী ভাবছ?

—ভাবছি, আমাদের পরিবারে এত রহস্য কেন!

ইহান মৃদু হেসে বলল,

—তুমি চাইলে রহস্য সমাধানের জন্য একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলতে পারো।

—আর তুমি?

—আমি তোমার সহকারী হব।

—বেতন কত চাইবে?

—প্রতিদিন এক কাপ চা আর তোমার সঙ্গে একটু সময়।

ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে হাসল।

—তোমার চাহিদা খুব বেশি না।

—তোমার ক্ষেত্রে একটু বেশি হলেও সমস্যা নেই।

কথাটা শুনে ইনায়া চুপ হয়ে গেল।

ইহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—একটা কথা বলব?

—বলো।

—যা-ই হোক, আমার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ো না।

ইনায়া মৃদু স্বরে বলল,

—তুমিও না।

দুজনের চোখাচোখি হলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ইহানের ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

কল ধরতেই ওপাশ থেকে একটি ভারী কণ্ঠ ভেসে এল।

—তোমার বাবাকে বিশ্বাস করো না, ইহান।

—আপনি কে?

—যার জন্য তোমার পরিবার এত বছর ধরে মিথ্যা বলে আসছে।

—সোজাসুজি কথা বলুন!

লোকটি হেসে বলল,

—আগামীকাল পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে এসো। একা। সঙ্গে ইনায়াকে আনলে তার অতীতের এমন একটা সত্য জানবে, যা সে সহ্য করতে পারবে না।

কল কেটে গেল।

ইনায়া উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—কে ফোন করেছিল?

ইহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—অফিসের একটা জরুরি বিষয়।

ইনায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—তুমি আবার কিছু লুকাচ্ছ, তাই না?

ইহান উত্তর দিতে পারল না।

রাত গভীর।

খান বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু বাড়ির পেছনের ছোট্ট ঘরে দুজন মানুষের কথোপকথন চলছে।

একজন বলল,

—ইহানকে খবর দেওয়া হয়েছে?

অন্যজন উত্তর দিল,

—হ্যাঁ। সে আসবে।

—আর ইনায়া?

—তাকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

প্রথম ব্যক্তি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

—মনে রেখো, এবার কোনো ভুল করা যাবে না। এত বছরের গোপন সত্য প্রকাশ পেলে শুধু একটি পরিবার নয়, অনেকের জীবন বদলে যাবে।

টেবিলের ওপর রাখা ছবিটা তুলে নিল সে।

ছবিতে ফারদিন, সাফওয়ান, মাহির এবং সেই অচেনা মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির পেছনে লেখা ছিল—

“যে সত্যি সবাইকে আলাদা করেছিল, সেই সত্যিই আবার সবাইকে এক করবে।”

লোকটি ছবিটা নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে বলল,

—খেলা এবার শেষের দিকে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।

“ইনায়া সব জানতে শুরু করেছে। এবার তাকে থামানো কঠিন হবে।”

লোকটি মুচকি হেসে উত্তর দিল—

“তাহলে এবার ইহানকে দিয়েই ইনায়াকে সত্যি থেকে দূরে সরাতে হবে।”

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 15 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন