অবশ্যই! এবার আবার দিলাম। 🙂
লেখিকা: আরফা আইরিশা
### অবশেষে তুমি
### পর্ব ১৬: অচেনা অনুভূতির টান
সকালের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। খান বাড়ির সবাই ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠলেও ইনায়ার ঘুম ভাঙেনি। সারারাত ডায়েরির পাতাগুলো পড়ে সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি।
ডায়েরিতে পাওয়া সেই ছবিটা এখনো তার মাথায় ঘুরছে। ফারদিন খান, সাফওয়ান খান, মাহির চৌধুরী এবং অচেনা একজন মানুষ। ছবির পেছনে লেখা ছিল, ‘যাকে খুঁজছ, সে তোমাদের বাড়িতেই আছে।’
কিন্তু কে সেই মানুষ?
ইনায়া বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—সবাই এত রহস্য করে কেন? একটা পরিবারে থাকতে হলে কি গোয়েন্দা হওয়া বাধ্যতামূলক?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
—ম্যাডাম গোয়েন্দা, ঘুম ভাঙলে নিচে আসুন। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ইনায়া বুঝতে পারল, এটা আয়ানের কণ্ঠ।
দরজা খুলতেই আয়ান বলল,
—কী ব্যাপার? আজকাল দরজা খুলতেও এত সময় লাগে কেন?
—তোমার মতো সারাক্ষণ মানুষের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকি না আমি।
—বাহ! সকাল সকাল ঝগড়ার মুড!
—তুমি চলে গেলেই মুড ভালো হয়ে যাবে।
আয়ান মুচকি হেসে বলল,
—ঠিক আছে, যাচ্ছি। তবে নিচে গিয়ে ইহানের সঙ্গে দেখা হলে একটু হাসিমুখে কথা বলিস। বেচারা কয়েক দিন ধরে তোর রাগের শিকার হচ্ছে।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তোমার এত দরদ কেন?
আয়ান হেসে চলে গেল।
ইনায়া দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেল। ইহানের নাম শুনতেই তার মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত।
সামির এক হাতে রুটির টুকরো আর অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে বসে আছে। আয়রা তার পাশে বসে কিছু একটা বলছে।
—সামির, তুই আমার কথা শুনছিস?
—হ্যাঁ, শুনছি।
—আমি কী বললাম?
সামির একটু থেমে বলল,
—তুমি বলেছ, পৃথিবী গোল।
আয়রা চোখ বড় করে বলল,
—আমি বলেছি নুহাকে কখন ফোন দিবি!
সামির লজ্জা পেয়ে গেল।
পাশ থেকে ইহান হেসে বলল,
—ভাইয়ের অবস্থা দেখ। নুহার নাম শুনলেই পৃথিবী গোল থেকে চ্যাপ্টা হয়ে যায়!
সামির বিরক্ত হয়ে বলল,
—তোর নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা কর।
আয়রা এবার ইহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইহান ভাইয়া, আপনার জীবন নিয়ে চিন্তা করার মতো কেউ আছে নাকি?
ইহান কিছু বলার আগেই ইনায়া এসে চেয়ারে বসল।
—কেন? ওনার জীবন নিয়ে চিন্তা করার জন্য কি আবেদন করতে হবে?
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
ইহান ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—তুমি আবেদন করলে ভেবে দেখতে পারি।
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—আমার এত সময় নেই।
আয়ান পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
—সময় নেই, কিন্তু উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না!
ইনায়া কনুই দিয়ে আয়ানকে হালকা ধাক্কা দিল।
নাশতা শেষ করে ইহান ইনায়াকে ছাদে ডাকল।
ইনায়া প্রথমে যেতে চাইছিল না। কিন্তু ডায়েরির ব্যাপারে কিছু কথা বলার আছে ভেবে শেষ পর্যন্ত গেল।
ছাদে গিয়ে দেখল, ইহান রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
—কী হয়েছে? এখানে ডাকলে কেন?
ইহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে।
—বলুন।
—গত রাতে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।
ইনায়া চমকে উঠল।
—কী বলেছে?
ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আজ রাতে আমাকে পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে যেতে বলেছে।
—আপনি যাবেন?
—যেতে হবে। মনে হচ্ছে, ওখানেই কিছু উত্তর পাওয়া যাবে।
ইনায়া দ্রুত বলল,
—তাহলে আমিও যাব।
—না, তুমি যাবে না।
—কেন?
—কারণ ওরা তোমাকে নিয়েই আমাকে ভয় দেখিয়েছে।
ইনায়ার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—আমাকে নিয়ে ভয় দেখিয়েছে মানে?
ইহান বুঝতে পারল, সে ভুল করে বেশি বলে ফেলেছে।
—কিছু না। তুমি এসবের মধ্যে জড়িও না।
ইনায়া রেগে বলল,
—আমি কি এতটাই ছোট যে আমার হয়ে সব সিদ্ধান্ত আপনিই নেবেন?
ইহান শান্ত গলায় বলল,
—তোমাকে বিপদে ফেলতে চাই না।
ইনায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—আপনি কি জানেন, আপনার এই কথাগুলো শুনলে আমার কতটা খারাপ লাগে?
ইহান অবাক হয়ে তাকাল।
—কেন?
ইনায়া উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
ইহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, ইনায়াকে দূরে রাখা যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়।
অন্যদিকে আয়ান নিজের ঘরে বসে পুরোনো চিঠিটা আবার পড়ছিল।
চিঠিতে আয়রার নাম লেখা। কিন্তু চিঠির কথাগুলো পড়ে তার মনে হচ্ছে, আয়রা অতীতে এমন কিছু ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, যার জন্য সে কোনোভাবেই দায়ী ছিল না।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
—ভেতরে আসতে পারি?
আয়ান চিঠিটা দ্রুত ড্রয়ারে রেখে বলল,
—আয়রা? আয়, কী হয়েছে?
আয়রা ঘরে ঢুকে বলল,
—তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
আয়ান একটু অবাক হলো।
—হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?
—কয়েক দিন ধরে তোমাকে কেমন যেন লাগছে। কিছু একটা হয়েছে, তাই না?
আয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোর অতীত নিয়ে কিছু কথা জানতে পেরেছি।
আয়রার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—কী জানতে পেরেছ?
—এখনো সবটা জানি না। তবে একটা কথা বুঝেছি, তুই কোনো ভুল করিসনি।
আয়রা নিচের দিকে তাকাল।
—সব ভুলের জন্য মানুষকে দায়ী করা যায় না, আয়ান ভাইয়া। কখনো কখনো পরিস্থিতি মানুষকে এমন জায়গায় দাঁড় করায়, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।
আয়ান বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
—তোর কিছু হলে আমি চুপ করে থাকব না।
আয়রা মৃদু হাসল।
—তুমি সব সময় এমন কেন?
—কেমন?
—নিজের কথা না ভেবে সবার কথা ভাবো।
আয়ান হেসে বলল,
—এটা আমার জন্মগত সমস্যা।
আয়রা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যার দিকে সামির নুহাকে ফোন করল।
—হ্যালো, নুহা?
ওপাশ থেকে নুহার কণ্ঠ ভেসে এল,
—হ্যাঁ, বলো।
—তুমি কি আজ একটু সময় পাবে?
—কেন?
সামির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তোমার সঙ্গে কথা ছিল।
নুহা হেসে বলল,
—তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? কথা বলবে, বলো।
সামিরও হেসে ফেলল।
—আসলে তোমার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আমার সব কথা ভুলে যাই।
ওপাশে নুহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—তাহলে আগে কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করো। পরে কথা হবে।
কল কেটে যেতেই সামির ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।
ঠিক তখনই আয়রা দরজায় এসে দাঁড়াল।
—কী ব্যাপার? ফোনের সঙ্গে প্রেম করছিস?
সামির তাড়াতাড়ি ফোনটা নামিয়ে বলল,
—তুই আবার কখন এলি?
—যখন থেকে তুই ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসছিস!
সামির বালিশ তুলে আয়রার দিকে ছুড়ে মারল।
রাত বাড়তে লাগল।
ইহান নিজের ঘরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার মনে একদিকে অজানা মানুষের পরিচয় জানার কৌতূহল, অন্যদিকে ইনায়াকে নিয়ে চিন্তা।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
“সময় হয়ে গেছে। উত্তর দিকের ঘরে একা আসবে। কাউকে সঙ্গে আনলে ইনায়ার অতীতের এমন সত্য প্রকাশ করব, যা সে কোনো দিন সহ্য করতে পারবে না।”
ইহান মেসেজটা পড়ে ফোন শক্ত করে ধরল।
সে জানে, এই মানুষগুলো শুধু তাকে নয়, ইনায়াকেও তাদের পরিকল্পনার মধ্যে টেনে আনছে।
অন্যদিকে ইনায়া নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির পাতায়। সেখানে আগে খেয়াল না করা একটি ছোট্ট লেখা চোখে পড়ল।
লেখাটিতে লেখা—
“ইহানকে বিশ্বাস করো, কিন্তু তার আশপাশের সবাইকে নয়।”
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
সে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—ইহানকে বিশ্বাস করব, কিন্তু ওর আশপাশের সবাইকে নয়? তাহলে কি ওর নিজের পরিবারেও কেউ জড়িত?
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।
ইনায়া জানালার কাছে গিয়ে তাকাল।
ইহান বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ওড়নাটা নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
কারণ এবার সে আর ইহানকে একা কোনো বিপদের মুখে যেতে দেবে না।
কিন্তু খান বাড়ির আরেকটি ঘরে বসে থাকা একজন মানুষ তাদের দুজনের বেরিয়ে যাওয়া দেখছিল।
তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সে ফোন বের করে বলল,
—দুজনেই বের হয়েছে। এবার পরিকল্পনার পরের ধাপ শুরু করো।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
—তাহলে কি সত্যিটা জানিয়ে দেব?
লোকটি ধীরে বলল,
—এখনো না। আগে ওদের দুজনের বিশ্বাসটা ভাঙতে হবে।
চলবে...!!