সন্ধ্যার আকাশ 🌆
প্রথম অধ্যায়
সকাল সকাল গোসল সেরে আয়নার সামনে বসে আছে সন্ধ্যা। আজ তাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। বাড়ির সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ ঘর গোছাচ্ছে, কেউ আবার রান্নাঘরে খাবার তৈরিতে ব্যস্ত।
অথচ যার বিয়ে, সেই মেয়েরই যেন কোনো মাথাব্যথা নেই!
সন্ধ্যা আয়নায় নিজের মুখটা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
— উফ্! এই বিয়ে নিয়ে সবার এত মাতামাতি কেন, বুঝি না! 🙄
সন্ধ্যার পড়াশোনায় একদমই মন বসে না। বই খুলে বসলেই তার কাছে পৃথিবীর সবকিছু বিরক্তিকর মনে হয়। তাই বিয়ের কথা শুনে সে মনে মনে ভাবছে, বিয়ে হয়ে গেলে অন্তত পড়াশোনার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে!
কিন্তু বিয়ে করার জন্য তার বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তার কাছে বিয়েটা যেন পড়াশোনা থেকে বাঁচার একটা সহজ উপায়!
হঠাৎ বাইরে থেকে মায়ের ডাক ভেসে এল—
— সন্ধ্যা! তাড়াতাড়ি আয় মা, ওরা এসে পড়েছে!
— আসছি, মা!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সন্ধ্যা।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখল, পাত্রপক্ষের সবাই বসে আছেন। তার মা হাসিমুখে তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন।
সন্ধ্যাকে দেখে ছেলের মা মুচকি হেসে বললেন,
— এসো মা, এখানে বসো।
সন্ধ্যা চুপচাপ গিয়ে মায়ের পাশে বসল। তার একদমই ভালো লাগছে না এসব। মনে মনে শুধু ভাবছে, কখন যে এই নাটক শেষ হবে!
কিছুক্ষণ পর ছেলের মা বললেন,
— আমাদের ছেলের যদি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে, তাহলে করতে পারে।
কথাটা শুনে সন্ধ্যা মনে মনে বলল,
‘আবার প্রশ্ন! স্কুলের পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই জীবনের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল!’
নিজের ভাবনায় নিজেই একটু হেসে ফেলল সে। কিন্তু পরক্ষণেই মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসি থামিয়ে দিল।
এবার ছেলেটি সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— আপনার কি এই বিয়েতে মত আছে?
প্রশ্নটা শুনে সন্ধ্যা একটু থমকে গেল।
এমন প্রশ্ন সে আশা করেনি। কী উত্তর দেবে, বুঝে উঠতে পারল না।
ঘরের সবাই তখন তার উত্তরের অপেক্ষায়।
সন্ধ্যা কি সত্যিই এই বিয়েতে রাজি হবে? নাকি তার জীবনের গল্প অন্য কোনো দিকে মোড় নেবে?
সন্ধ্যার আকাশ 🌆
দ্বিতীয় অধ্যায়: এক অদ্ভুত প্রশ্ন
ঘরের সবাই সন্ধ্যার উত্তরের অপেক্ষায় আছে।
ছেলেটার প্রশ্ন শুনে সন্ধ্যা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মুখ তুলে বলল,
— সত্যি কথা বলব, নাকি আপনাদের খুশি করার মতো উত্তর দেব?
সন্ধ্যার কথা শুনে ঘরের সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটা অবশ্য মুচকি হাসল।
— সত্যি কথাটাই শুনতে চাই।
সন্ধ্যা মনে মনে বলল, ‘বাহ্! বিয়ে করতে এসেও সত্যি কথা শোনার শখ!’
তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— আসলে বিয়ে নিয়ে আমার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। পড়াশোনাও ভালো লাগে না। তাই ভাবলাম, বিয়ে হয়ে গেলে হয়তো পড়াশোনা থেকে মুক্তি পাব।
কথাটা শুনে সন্ধ্যার মা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকালেন।
— সন্ধ্যা! এসব কী বলছিস?
সন্ধ্যা সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, ‘সত্যি কথা বলতে বলল, এখন আবার সত্যি কথা শুনে রাগ!’
ছেলেটা হেসে বলল,
— তাহলে আপনি শুধু পড়াশোনা থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করতে চাইছেন?
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক তা-ও না। বিয়ে করতে খুব একটা ইচ্ছা নেই। তবে পড়াশোনা করতে যে একদম ভালো লাগে না, সেটা সত্যি!
ছেলেটা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— একটা কথা বলি? বিয়ে কিন্তু পড়াশোনা থেকে পালানোর উপায় নয়। আর বিয়ের পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়।
কথাটা শুনে সন্ধ্যা একটু থমকে গেল।
সে ভেবেছিল, ছেলেটা হয়তো তার কথা শুনে রেগে যাবে। কিন্তু ছেলেটার কথায় রাগের চেয়ে বোঝানোর সুরই বেশি ছিল।
এদিকে সন্ধ্যার মা তাড়াতাড়ি বললেন,
— আরে, মেয়েটা একটু ছেলেমানুষ। আস্তে আস্তে সব বুঝে যাবে।
ছেলেটার মা হেসে বললেন,
— সমস্যা নেই। মেয়েটা অন্তত নিজের মনের কথা বলতে পারে।
সন্ধ্যা এবার মনে মনে বলল, ‘হায় আল্লাহ! নিজের মনের কথা বলে ফেলেছি, এখন আবার কী হয়!’
কিছুক্ষণ পর পাত্রপক্ষ বিদায় নিলেন।
সবাই চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যার মা তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
— সন্ধ্যা, তুই কি একবারও ভেবে দেখেছিস, তোর কথায় ওরা কী মনে করতে পারে?
সন্ধ্যা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মা, তুমি তো আমাকে সত্যি কথা বলতে শিখিয়েছ। তাহলে আজ সত্যি কথা বলায় দোষ কোথায়?
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
সন্ধ্যা ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
ছেলেটা কি সত্যিই তার এই অদ্ভুত কথাগুলো মেনে নেবে?
নাকি এই বিয়ের গল্প এখানেই শেষ?
সন্ধ্যার আকাশ 🌆
তৃতীয় অধ্যায়: নতুন এক সকাল
সকাল ১০টা।
নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে সন্ধ্যা। গতকালের বিয়ের কথা তার মাথা থেকে প্রায় বেরিয়েই গেছে। বিয়ে হবে কি হবে না, তা নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে সন্ধ্যা বিরক্ত মুখে কলটা ধরল।
— হ্যালো! কী হয়েছে?
ওপাশ থেকে তার বান্ধবী মাইশা বলে উঠল,
— এই মেয়ে! তুই এখনো বাসায়? তাড়াতাড়ি তৈরি হ! আজ আমাদের বাসায় আসবি।
— কেন? তোদের বাসায় গিয়ে আমি কী করব?
— আহা! এলেই বুঝবি। এত প্রশ্ন করিস কেন?
সন্ধ্যা আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দিল।
কিছুক্ষণ পর তৈরি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
---
অন্যদিকে—
একটা ঘরের জানালার পাশে বসে গিটার বাজাচ্ছে আকাশ। হালকা নীল শার্ট, এলোমেলো চুল আর মুখে সবসময়ের সেই মিষ্টি হাসি।
গিটারের সুরে ডুবে আছে সে।
হঠাৎ পেছন থেকে তার বন্ধু রাফি এসে বলল,
— এই যে মিস্টার আকাশ! সারাদিন গিটার বাজালেই কি জীবন চলবে?
আকাশ গিটার থামিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— কেন? গিটার বাজালে তোর সমস্যা কী?
— আমার সমস্যা নেই। কিন্তু তোর বিয়ে হলে তোর বউয়ের সমস্যা হবে!
কথাটা শুনে আকাশ হেসে উঠল।
— আগে তো বিয়ে হোক! তারপর বউয়ের সমস্যা নিয়ে ভাবব।
রাফি মাথা নেড়ে বলল,
— তোর মতো ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হবে, এমন মেয়ে পাওয়াই তো কঠিন!
আকাশ গিটারটা পাশে রেখে বন্ধুর দিকে তাকাল।
— দুনিয়ায় মেয়ের অভাব নেই, বুঝলি? কিন্তু আমার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে, এমন কাউকে পাওয়াই আসল ব্যাপার!
— ওহ! তা হলে তোর জন্য একটা বিশেষ মেয়ে খুঁজতে হবে!
— খুঁজিস। তবে বেশি ভালো মেয়ে খুঁজিস না, আমার সঙ্গে পাগলামি করতে পারবে এমন মেয়ে চাই!
দুজনেই হেসে উঠল।
---
বিকেলবেলা।
সন্ধ্যা তার বান্ধবীর বাসায় পৌঁছে কলিংবেল চাপল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে মাইশা চিৎকার করে বলল,
— অবশেষে মহারানির আগমন হলো!
সন্ধ্যা চোখ ঘুরিয়ে বলল,
— আর একটা কথা বললে কিন্তু চলে যাব!
— আচ্ছা বাবা, আয় ভেতরে!
সন্ধ্যা ঘরে ঢুকে সোফায় বসতে যাবে, ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে একটা ছেলের কণ্ঠ ভেসে এল—
— রাফি, আমার গিটারটা কোথায় রেখেছিস?
কণ্ঠটা শুনে সন্ধ্যা থমকে গেল।
মাইশা হেসে বলল,
— ও হ্যাঁ, তোকে তো বলাই হয়নি! আমার এক বন্ধু এসেছে। ওর নাম আকাশ।
ঠিক তখনই ছেলেটা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
হাতে গিটার, মুখে হালকা হাসি।
আকাশের চোখ পড়ল সন্ধ্যার দিকে। আর সন্ধ্যা তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর মাইশা বলল,
— আকাশ, এ আমার বান্ধবী সন্ধ্যা।
আকাশ মুচকি হেসে বলল,
— হাই, আমি আকাশ।
সন্ধ্যা হালকা মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যালো।
আকাশ আবার জিজ্ঞেস করল,
— আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?
সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আপনাকে দেখেই কথা বলার ইচ্ছা চলে গেছে!
কথাটা শুনে মাইশা আর রাফি দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু আকাশ?
সে কিছুক্ষণ সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে বলল,
— বাহ্! প্রথম দেখাতেই এমন ব্যবহার! আপনার সঙ্গে পরিচয়টা বেশ মজার হতে যাচ্ছে দেখছি।
সন্ধ্যা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
সে তখনো জানত না, এই গিটার হাতে ছেলেটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে কঠিন গল্পের অংশ হয়ে উঠবে।
আর আকাশও জানত না, তার জীবনের গল্পে আজ থেকে এক নতুন নাম যোগ হতে চলেছে—
সন্ধ্যা।