ফন্ট সাইজ:
থিম:
সন্ধ্যার আকাশ

পর্ব 4

লেখক: শেখ তাহানা

সন্ধ্যার আকাশ 🌆

দশম পর্ব: অচেনা এক অনুভূতি

সেদিন বিকেলে সন্ধ্যা নিজের উপন্যাস লিখছিল। হঠাৎ মাইশার একটা ফোন এল।

— কিরে, কী করিস?

— গল্প লিখছি। কেন?

— আকাশের সঙ্গে দেখা করতে যাবি? ও নাকি আজ আমাদের সঙ্গে দেখা করবে।

আকাশের নাম শুনেই সন্ধ্যার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে বলল,

— আমি যাব কেন? তোরা যা।

মাইশা হেসে বলল,

— আচ্ছা, বুঝেছি! তোর যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। ঠিক আছে, আমি আকাশকে বলে দিচ্ছি তুই যাবি না।

— আরে দাঁড়া! আমি কখন বললাম যাব না? একটু সময় দে, আসছি!

ফোনের ওপাশ থেকে মাইশার হাসি শোনা গেল।

বিকেলে তারা দেখা করল একটা ছোট্ট ক্যাফেতে। আকাশ আগে থেকেই সেখানে বসে ছিল। কিন্তু আজ তার সঙ্গে আরেকটা মেয়েও ছিল।

মেয়েটাকে দেখে সন্ধ্যা একটু থমকে গেল।

আকাশ হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দিল,

— ও হলো নীলা। আমার স্কুলের বন্ধু। অনেক দিন পর দেখা হলো।

নীলা মিষ্টি হেসে বলল,

— আকাশের মুখে তোমাদের কথা অনেক শুনেছি।

সন্ধ্যা হালকা হেসে উত্তর দিল,

— তাই নাকি? আমাদের কথা বলার এত সময় পায় কখন?

আকাশ ভ্রু উঁচু করে বলল,

— কেন? আমার কি কথা বলার সময় থাকতে নেই?

— আছে তো! তুমি তো আবার ভীষণ ব্যস্ত মানুষ!

মাইশা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। কিন্তু সন্ধ্যা নিজেই বুঝতে পারছিল না, তার কথাগুলো আজ এমন খোঁচা দিয়ে বের হচ্ছে কেন।

কিছুক্ষণ পর নীলা আকাশের গিটার নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। আকাশও উৎসাহ নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করছিল। দুজনের হাসাহাসি দেখে সন্ধ্যা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

মাইশা আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে তোর?

— কিছু না।

— তাহলে এমন মুখ করে বসে আছিস কেন?

— আমার মুখ কেমন?

— মনে হচ্ছে কেউ তোর প্রিয় আইসক্রিমটা খেয়ে ফেলেছে!

সন্ধ্যা হেসে ফেলল।

— তুই না একদম অসহ্য!

কিন্তু তার হাসির আড়ালেও একটা অদ্ভুত অস্বস্তি রয়ে গেল।

ফেরার সময় আকাশ সন্ধ্যাকে জিজ্ঞেস করল,

— কী ব্যাপার, আজ এত চুপচাপ কেন?

— আমি আবার কবে কথা বলি না?

— কথা তো বলিস। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার সঙ্গে ঝগড়া করার মুডেও নেই।

সন্ধ্যা মুখ ঘুরিয়ে বলল,

— তোমাকে নিয়ে ভাবার এত সময় আমার নেই।

আকাশ হেসে বলল,

— কে বলেছে আমাকে নিয়ে ভাবতে? আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করলাম!

সন্ধ্যা আর কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাতে নিজের ডায়েরি খুলে বসে সে। অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে চুপ করে থাকার পর লিখল—

“আজ আকাশের পাশে অন্য কাউকে দেখে আমার এত খারাপ লাগল কেন? আকাশ তো আমার কেউ নয়। তার জীবনে কে আসবে, কার সঙ্গে সে হাসবে—সেটা নিয়ে আমার ভাবারই বা কী আছে?

তাহলে মনের ভেতর এমন অচেনা একটা অভিমান জমল কেন?

আমি কি তবে ধীরে ধীরে এমন একটা গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ছি, যার শেষটা আমি নিজেও জানি না?”

সন্ধ্যা ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

ঠিক তখনই আকাশের মেসেজ এল—

আকাশ: আজ কী হয়েছে তোমার? আমার ওপর রাগ করেছ?

সন্ধ্যা অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল—

সন্ধ্যা: তোমার ওপর রাগ করার আমি কে?

কয়েক সেকেন্ড পর আকাশের উত্তর এল—

আকাশ: সেটা তো আমিও জানি না। তবে তোমার রাগ ভাঙাতে ইচ্ছে করে।

মেসেজটা পড়ে সন্ধ্যার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

আর সেই হাসির মাঝেই তার মনে হলো—কিছু অনুভূতির নাম দিতে খুব ভয় লাগে। কারণ নাম দিয়ে ফেললেই হয়তো মানুষটাকে হারানোর ভয়টাও সত্যি হয়ে যায়।

সন্ধ্যার আকাশ 🌆

একাদশ পর্ব: অভিমানের আড়ালে

সকালে ঘুম থেকে উঠেই সন্ধ্যা ফোনটা হাতে নিল। আকাশের কোনো নতুন মেসেজ নেই।

অথচ গত রাতে সে-ই বলেছিল, সন্ধ্যার রাগ ভাঙাতে তার ইচ্ছে করে!

সন্ধ্যা মনে মনে বলল,

— বাহ! রাগ ভাঙানোর ইচ্ছে তো খুব, কিন্তু একটা মেসেজ দেওয়ার সময় নেই!

কথাটা বলেই নিজে নিজে হেসে ফেলল সে। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে গেল।

— ধুর! আমি কেন ওর মেসেজের অপেক্ষা করছি?

ফোনটা পাশে রেখে সে নিজের উপন্যাস লিখতে বসল। কিন্তু আজ কোনো লাইনই ঠিকমতো মাথায় আসছিল না। বারবার মনে পড়ছিল আকাশ আর নীলার একসঙ্গে হাসার দৃশ্যটা।

ঠিক তখনই মাইশার ফোন এল।

— কী রে, আজ আকাশের সঙ্গে কথা হয়নি?

সন্ধ্যা বিরক্ত হয়ে বলল,

— তোদের কি আর কোনো কথা নেই? সারাক্ষণ আকাশ, আকাশ!

— ওহ! নামটা শুনেই তো দেখি মেজাজ গরম হয়ে গেল!

— মাইশা, তুই ফোন রাখবি?

মাইশা হেসে বলল,

— আচ্ছা বাবা, রাখছি। তবে একটা কথা মনে রাখিস, নিজের মনের কথা নিজের কাছেও বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না।

সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল।

বিকেলে আকাশ নিজেই মেসেজ দিল।

আকাশ: কী খবর, লেখিকা সাহেবা?

সন্ধ্যা: ভালো।

আকাশ: শুধু ভালো? আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে না আজ?

সন্ধ্যা: ঝগড়া করার মতো সময় নেই।

আকাশ: আচ্ছা, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।

সন্ধ্যা: কী?

আকাশ: তুমি কি আমার ওপর সত্যিই রাগ করেছ?

সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল,

সন্ধ্যা: তোমার ওপর রাগ করার কোনো কারণ নেই।

আকাশ উত্তর দিল,

আকাশ: কারণ না থাকলে মানুষ এত অভিমান করে কেন?

মেসেজটা পড়ে সন্ধ্যার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে উত্তর লিখেও মুছে দিল। শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল,

সন্ধ্যা: সব প্রশ্নের উত্তর হয় না, আকাশ।

সেদিন সন্ধ্যায় মাইশার বাড়িতে আবার দেখা হলো তাদের।

নীলা সেখানে ছিল না। আকাশকে একা দেখে সন্ধ্যা স্বস্তি পেলেও নিজের এই স্বস্তির কারণটা সে মানতে চাইল না।

আকাশ তার পাশে এসে বসল।

— তোমার উপন্যাস কতদূর এগোল?

— বেশ কিছুটা।

— নায়কটা কেমন?

— বিরক্তিকর।

আকাশ হেসে বলল,

— আমার মতো?

সন্ধ্যা একটু থমকে গেল।

— তোমার মতো বিরক্তিকর মানুষ পৃথিবীতে একজনই আছে।

— তা হলে নায়কটা নিশ্চয়ই খুব ভাগ্যবান!

— কেন?

— কারণ লেখিকা তাকে এত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে!

সন্ধ্যা হাসি চেপে বলল,

— বেশি কথা বলো না।

আকাশ হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— আচ্ছা, সন্ধ্যা, তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছ?

সন্ধ্যা তার দিকে তাকাল। এত সহজ একটা প্রশ্নের উত্তরও আজ তার কাছে ভীষণ কঠিন মনে হলো।

— না তো।

— তাহলে আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলছ না কেন?

সন্ধ্যা চোখ নামিয়ে বলল,

— সবকিছু কি আগের মতো থাকে, আকাশ?

আকাশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— জানি না। তবে কিছু মানুষকে আমি আগের মতোই কাছে রাখতে চাই।

কথাটা শুনে সন্ধ্যার বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন একটু নরম হয়ে এল।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

রাতে নিজের ডায়েরি খুলে সন্ধ্যা লিখল—

“আজ আকাশ বলল, কিছু মানুষকে সে আগের মতোই কাছে রাখতে চায়।

কিন্তু আমি কি সত্যিই তার কাছে সেই মানুষদের একজন? নাকি কথাটা সে সবাইকেই বলে?

আমি জানি না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি, আকাশের কাছে আমার গুরুত্ব কতটা—সেই উত্তরটা জানার জন্যই বোধহয় আমার এত অপেক্ষা।”

ডায়েরি বন্ধ করার ঠিক আগে সন্ধ্যার ফোনে আরেকটা মেসেজ এল।

আকাশের পাঠানো একটা ছবি।

ছবিতে একটি ছোট্ট কাগজের ওপর লেখা—

“কিছু মানুষকে হারানোর ভয় তখনই হয়, যখন তারা আমাদের জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠে।”

ছবিটার নিচে আকাশ লিখেছে—

“তোমার উপন্যাসের জন্য লাইনটা কেমন হবে, লেখিকা সাহেবা?”

সন্ধ্যা মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে করে হাসল।

কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—

আকাশ কি শুধু তার উপন্যাসের কথা বলছে, নাকি অন্য কিছু বোঝাতে চাইছে?

সন্ধ্যার আকাশ 🌆

দ্বাদশ পর্ব: তুমি কি শুধু বন্ধু?

সকালে ঘুম থেকে উঠেই সন্ধ্যা আকাশের পাঠানো মেসেজটা আবার পড়ল।

“কিছু মানুষকে হারানোর ভয় তখনই হয়, যখন তারা আমাদের জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠে।”

কথাটা কি শুধু উপন্যাসের জন্য ছিল? নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে?

সন্ধ্যা নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না।

ঠিক তখনই আকাশের ফোন এল।

— হ্যালো, লেখিকা সাহেবা! কী করছ?

— তোমার মেসেজের মানে বোঝার চেষ্টা করছি।

ওপাশ থেকে আকাশ হেসে উঠল।

— এত কঠিন কিছু লিখেছি নাকি?

— তুমি সব সময় এমন গোলমেলে কথা বলো কেন?

— কারণ তোমাকে একটু ভাবাতে ভালো লাগে।

— বাহ! অন্য কোনো কাজ নেই তোমার?

— আছে তো। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বলার কাজটা একটু বেশি ভালো লাগে।

কথাটা শুনে সন্ধ্যা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

আকাশ আবার বলল,

— কী হলো? কথা হারিয়ে ফেলেছ?

— না। তোমার মতো বকবক করা শিখিনি তো!

— শিখে নাও। সামনে অনেক সময় পাবে।

সন্ধ্যা হেসে ফেলল। ফোন রাখার পরও তার মুখের হাসিটা সহজে মিলিয়ে গেল না।

বিকেলে আকাশ মাইশার বাড়িতে এল। হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট।

সন্ধ্যাকে দেখেই বলল,

— তোমার জন্য এনেছি।

সন্ধ্যা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— আমার জন্য? কেন?

— খুলে দেখো।

প্যাকেটের ভেতরে একটা সুন্দর নোটবুক আর নীল রঙের কলম।

সন্ধ্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

— এগুলো কেন?

আকাশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

— তুমি তো উপন্যাস লিখছ। ভাবলাম, তোমার লেখার জন্য একটা নোটবুক দরকার হবে।

সন্ধ্যা নোটবুকটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।

— তোমার মনে ছিল?

— তোমার বলা কথা ভুলে যাওয়ার অভ্যাস আমার নেই।

কথাটা শুনে সন্ধ্যার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

এত ছোট্ট একটা ব্যাপার—অথচ কেউ তার কথাটা মনে রেখেছে, তার স্বপ্নটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যাপারটা তার কাছে অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগল।

সে আস্তে করে বলল,

— ধন্যবাদ, আকাশ।

আকাশ মুচকি হেসে বলল,

— একটা শর্ত আছে।

— আবার কী শর্ত?

— তোমার উপন্যাস শেষ হলে প্রথম কপিটা আমাকে পড়তে দিতে হবে।

— যদি তোমাকে নায়ক বানাই?

আকাশ একটু ঝুঁকে বলল,

— তাহলে তো প্রথম কপি পাওয়ার অধিকার আমার আরও বেশি!

সন্ধ্যা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।

— কে বলেছে তোমাকে নায়ক বানাব?

— তোমার চোখ বলেছে!

— অসহ্য!

সন্ধ্যা মুখ ঘুরিয়ে হাসি লুকানোর চেষ্টা করল। আকাশও হাসতে লাগল।

কিন্তু বাড়ি ফিরে নোটবুকটা খুলতেই সন্ধ্যার মুখটা শান্ত হয়ে এল।

প্রথম পাতায় সে লিখল—

“কেউ যখন আমার ছোট্ট একটা স্বপ্নকেও নিজের মতো করে গুরুত্ব দেয়, তখন তাকে শুধু বন্ধু বলে ভাবা কি সত্যিই এত সহজ?”

কিছুক্ষণ পর সে আরও একটা লাইন লিখল—

“আকাশ, তুমি জানো না—তোমার দেওয়া এই নোটবুকের প্রথম পাতায় আজ তোমাকেই লিখে ফেললাম।”

সন্ধ্যা কলমটা বন্ধ করে নোটবুকটা বুকের কাছে ধরে রাখল।

তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করল,

“আমি কি সত্যিই আকাশকে ভালোবেসে ফেলছি?”

প্রশ্নটার উত্তর সে জানত না।

কিন্তু এই প্রথমবার উত্তরটা জানতে তার ভীষণ ইচ্ছে হলো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন