### অপূর্ণ ছায়া
লেখক: আরফা আইরিশা
### পর্ব 1
খানবাড়ি। বিশাল এক যৌথ পরিবার, যেখানে সকাল শুরু হয় একেকজনের একেক রকম কাণ্ডকারখানা দিয়ে। কেউ ঘুম থেকে উঠতেই চায় না, কেউ আবার সকালবেলা থেকেই অন্যের মাথা খাওয়ার কাজে ব্যস্ত।
এই বাড়িতে থাকেন দুই ভাই—জাহিদ খান ও আদনান খান। দুজনের স্ত্রীই এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সেই ঘটনার পর থেকে ছয় ভাইবোনকে দুই ভাই নিজেদের ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে বড় করে তুলেছেন।
জাহিদ খানের তিন ছেলে—আরহাম খান সমুদ্র, রাইয়ান খান রোদ ও আয়ান খান আদনান।
আর আদনান খানের তিন মেয়ে—মেহরিন খান মিম, মেহের খান তৃষা ও মেহজাবিন খান মুন।
ছয়জনের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া, কারও সঙ্গে খুনসুটি, আবার কারও সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব। তবে এই হাসি-আনন্দের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু অনুভূতি, যা মুখে প্রকাশ করার সাহস সবার হয় না।
বিশেষ করে মুনের।
মুনের জীবনে সমুদ্র শুধু তার চাচাতো ভাই নয়। সমুদ্র তার মনের সেই মানুষ, যার দিকে তাকালে তার চারপাশের সবকিছু যেন থেমে যায়।
কিন্তু সমস্যা একটাই—সমুদ্রের চোখে মুন শুধুই তার ছোট্ট চাচাতো বোন।
### সকালবেলা, খানবাড়ি
— রোদ ভাইয়া! আমার ফোনটা কোথায় রেখেছিস?
সকালের নীরবতা ভেঙে চিৎকার করে উঠল আয়ান।
সোফায় বসে ফোন টিপতে টিপতে রোদ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— তোর ফোন আমি নেব কেন? তোর ফোনের ওপর আমার এত মায়া পড়েছে নাকি?
— তাহলে আমার ফোন তোর বালিশের নিচে গেল কীভাবে?
রোদ এবার ফোন থেকে মুখ তুলে তাকাল।
— ওহ, সেটা তোর ফোন ছিল? আমি তো ভাবলাম আমার হারানো ফোনটা ফিরে এসেছে।
— তোর মাথা! নিজের ফোন চিনিস না, আবার আমার ফোন নিয়ে নাটক করছিস!
পাশ থেকে মিম আর তৃষা দুজনেই হেসে উঠল।
তৃষা হাসতে হাসতে বলল,
— তোরা দুজন সকালে উঠেই ঝগড়া শুরু করিস কীভাবে? তোদের কি ঘুমের মধ্যেও ঝগড়ার প্র্যাকটিস চলে?
মিম মাথা নেড়ে বলল,
— আমার তো মনে হয়, একদিন এদের দুজনকে আলাদা ঘরে আটকে রাখা উচিত।
— তোদের দুজনকেও সঙ্গে আটকে রাখব! আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল।
— বাহ! আমাদের দাওয়াতও দিয়ে দিলি! মিম হেসে উত্তর দিল।
বাড়ির সবার কাছে এই দৃশ্য খুবই পরিচিত। রোদ আর আয়ানের ঝগড়া না হলে যেন খানবাড়ির সকালটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কিন্তু এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেও একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির পাশে।
মুন।
তার চোখ ছিল সোফায় বসে থাকা সমুদ্রের দিকে।
সমুদ্র নিজের ফোনে ব্যস্ত। পরনে সাধারণ একটা টি-শার্ট, মুখে একরাশ বিরক্তি। রোদ আর আয়ানের চিৎকারে তার ফোনে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ সমুদ্র মাথা তুলে বলল,
— তোরা কি একটু চুপ করতে পারবি? সকাল সকাল মাথাটা খারাপ করে দিলি!
রোদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাই, তুই বিয়ে করে আলাদা হয়ে যা। শান্তিতে থাকতে পারবি।
সমুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— তোর বিয়ে আগে দেওয়া উচিত। সারাদিন শুধু চিৎকার করিস।
— আমার বিয়ে নিয়ে এত চিন্তা কেন? নিজেরটা নিয়ে ভাব!
আয়ান আবার বলে উঠল,
— আগে রোদের বিয়ে হোক। তারপর ভাইয়ার। তারপর আমার। আমি ছোট, আমার অনেক সময় আছে।
সমুদ্র ফোনটা নামিয়ে আয়ানের দিকে তাকাল।
— তোর বিয়ে নিয়ে কেউ ভাবছেও না। এত লাফাস কেন?
আবারও সবাই হেসে উঠল।
মুনও ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে তুলল। সমুদ্রের এমন ছোট ছোট কথাও তার কাছে অদ্ভুত ভালো লাগার।
কেউ জানে না, সে কতবার দূর থেকে সমুদ্রকে দেখেছে। কতবার মনে মনে তার সঙ্গে কথা বলেছে। কতবার নিজের অনুভূতিগুলোকে বুঝিয়েছে, এই ভালোবাসার কথা কাউকে বলা যাবে না।
কারণ সমুদ্র যদি তার অনুভূতি বুঝে ফেলে? যদি তার সঙ্গে আগের মতো কথা বলা বন্ধ করে দেয়?
এই ভয়েই মুন নিজের ভালোবাসাকে মনের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে।
### দুপুরের দিকে
খাওয়ার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। জাহিদ খান খবরের কাগজ পড়ছেন, আর আদনান খান সবার খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নিচ্ছেন।
— মুন, তুই এত চুপচাপ কেন? আদনান খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
মুন মাথা তুলে বলল,
— কই, কিছু না তো, বাবা।
— কিছু না হলে এভাবে খাবার নাড়াচাড়া করছিস কেন? ঠিকমতো খা।
— হুম, খাচ্ছি।
কথাটা বলেই মুন চোখ নামিয়ে নিল।
তার ঠিক সামনেই বসে ছিল সমুদ্র। সে একবার মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?
মুন যেন হঠাৎ প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
— নাহ! আমি ঠিক আছি।
— তাহলে খাচ্ছিস না কেন?
— খাচ্ছি তো!
সমুদ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবার নিজের খাবারে মন দিল।
কিন্তু মুনের কাছে ওই সামান্য প্রশ্নটাই অনেক কিছু। সমুদ্র তার খেয়াল করেছে—এই ভাবনাটুকুতে তার মন ভালো হয়ে গেল।
অথচ সমুদ্রের কাছে ব্যাপারটা ছিল খুবই সাধারণ। পরিবারের একজন সদস্য ঠিকমতো খাচ্ছে না দেখে সে শুধু জানতে চেয়েছে।
দুজনের একই মুহূর্ত, অথচ অনুভূতি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা।
মুনের ভালোবাসা ছিল গভীর, নীরব আর একতরফা।
আর সমুদ্রের কাছে সে ছিল শুধুই মুন—তার আদরের ছোট্ট চাচাতো বোন।
### বিকেলবেলা
বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল মুন। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে কী যেন ভাবছিল।
এমন সময় পেছন থেকে তৃষার কণ্ঠ ভেসে এল,
— কী রে, এখানে একা একা কী করছিস?
মুন চমকে পেছনে তাকাল।
— কিছু না। এমনি দাঁড়িয়ে আছি।
তৃষা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
— তোর কিছু একটা হয়েছে। কয়েক দিন ধরে দেখছি, তুই কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেছিস।
মুন হেসে বলল,
— তোর মাথায় সব সময় আজেবাজে চিন্তা আসে।
— তাই নাকি? তাহলে বল, সমুদ্র ভাইয়া সামনে এলে তুই এত চুপ হয়ে যাস কেন?
মুনের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— কী বলছিস এসব?
তৃষা এবার একটু গম্ভীর হলো।
— মুন, আমি তোর বোন। তোর চোখের ভাষা আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না।
মুন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
— কাউকে বলিস না, প্লিজ।
তৃষা তার হাতটা ধরে বলল,
— তুই কি সত্যিই সমুদ্র ভাইয়াকে পছন্দ করিস?
মুন চোখ নামিয়ে নিল।
তার নীরবতাই যেন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল।
তৃষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— কিন্তু মুন, সমুদ্র ভাইয়া তোকে কীভাবে দেখে, সেটা তুই জানিস।
— জানি।
— তাহলে?
মুনের চোখে জমে থাকা অনুভূতিগুলো যেন কথায় প্রকাশ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।
— আমি জানি, সে আমাকে ওভাবে দেখে না। আমি এটাও জানি, হয়তো কোনো দিনও দেখবে না। তবুও তাকে ভালোবাসতে আমার ইচ্ছা করে। তাকে দেখলে আমার ভালো লাগে। সে আমার সঙ্গে একটু কথা বললেও আমার সারাদিন ভালো কেটে যায়।
কথাগুলো বলতে বলতে মুনের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
— আমি তো তার কাছে কিছু চাইনি, তৃষা। শুধু নিজের মনের মধ্যে তাকে একটু জায়গা দিয়েছি।
তৃষা আর কিছু বলল না। শুধু বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
দূরে আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। চারপাশে সন্ধ্যার আলো ছড়িয়ে পড়ছে।
মুন আবারও আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
যাকে এতটা ভালোবাসি, সে কি কোনো দিনও আমার ভালোবাসা বুঝবে?
নাকি তার চোখে আমি সারাজীবন শুধু একজন চাচাতো বোন হয়েই থেকে যাব?
সে জানে না, তার এই নীরব ভালোবাসার গল্প কোন দিকে যাবে। জানে না, ভবিষ্যৎ তার জন্য কী অপেক্ষা করে রেখেছে।
শুধু এটুকু জানে, সমুদ্রকে ভালোবাসার অনুভূতিটা সে চাইলেও সহজে মুছে ফেলতে পারবে না।
কারণ কিছু ভালোবাসা মুখে বলা হয় না।
কিছু ভালোবাসা শুধু মনের আড়ালেই থেকে যায়।
চলবে...!!