### অপূর্ণ ছায়া
লেখক: আরফা আইরিশা
### পর্ব 2
সকালের খানবাড়ি বরাবরের মতোই সরগরম। কেউ নাশতা নিয়ে ব্যস্ত, কেউ ফোন হাতে বসে আছে, আবার কেউ অন্যের পেছনে লেগে আছে।
— এই রোদ! আমার ফোনটা ফেরত দে বলছি!
আয়ানের চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
রোদ সোফায় বসে ফোনটা মাথার ওপর তুলে বলল,
— আগে বল, আমার নতুন হেয়ারস্টাইল কেমন হয়েছে?
আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোর মাথায় চুল আছে নাকি হেয়ারস্টাইল করবি?
পাশে বসে থাকা মিম হেসে গড়িয়ে পড়ল। তৃষাও হাসি আটকাতে পারল না।
সমুদ্র সোফার এক কোণে বসে ফোন দেখছিল। চারপাশে এত চেঁচামেচি হলেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে মুন চুপচাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। ছেলেটা যখন মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখত, তখন তার মুখে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য ফুটে উঠত। মুনের খুব ইচ্ছে করছিল, একবার সমুদ্র তার দিকে তাকাক।
ঠিক তখনই সমুদ্র মাথা তুলে তাকাল।
মুন তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।
— মুন!
তৃষার ডাকে সে চমকে উঠল।
— কী হয়েছে?
— কী হয়েছে মানে? কতক্ষণ ধরে সমুদ্র ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছিস?
মুনের মুখ লাল হয়ে গেল।
— আমি আবার কখন তাকালাম?
মিম দুষ্টুমি করে বলল,
— আমরা তো কিছু বলিনি! তুই নিজেই স্বীকার করে ফেললি।
— তোরা দুজন একদম অসহ্য!
মুন সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু তার অজান্তেই সিঁড়ির অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সবকিছু লক্ষ করছিল।
তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক হিসাব।
মুনের চোখে সমুদ্রের জন্য যে অনুভূতি, সেটা বুঝতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি।
আর সেই অনুভূতিটাই তার কাছে একটা সুযোগ।
কারণ, সমুদ্রকে সে নিজের জীবনে চায়। যেকোনো মূল্যে।
### দুপুরের খুনসুটি
দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে।
রোদ খাবার মুখে তুলেই বলল,
— বড়ো চাচি থাকলে আজকে আমার জন্য আলাদা একটা পদ রান্না হতো।
জাহিদ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোর জন্য আলাদা পদ না, আলাদা একটা বুদ্ধি দরকার।
সবাই হেসে উঠল।
আদনান খান মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোমরা আবার হাসছ কেন? তোমাদের তিনজনের মধ্যে একজনও কি রান্না শিখেছ?
মিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আব্বু, রান্না শেখার কী দরকার? বাড়িতে তো রাঁধুনি আছেই!
— বাহ! তাহলে বিয়ের পর?
তৃষা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— বিয়ের পরও রাঁধুনি থাকবে।
মুন চুপচাপ ভাত মাখছিল। সমুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী ব্যাপার, আজ এত চুপচাপ কেন?
মুনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সমুদ্র নিজে থেকে তার সঙ্গে কথা বলছে!
সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
— কিছু হয়নি।
— পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে নাকি?
— না তো!
— তাহলে এমন মুখ করে আছিস কেন? কেউ তোর চকলেট খেয়ে ফেলেছে?
রোদ হেসে বলল,
— ভাইয়া, চকলেট খেলে মুন এমন মুখ করে না। ওর চকলেট খেলে পুরো বাড়িতে তদন্ত শুরু হয়!
মুন একটা রুটির টুকরো রোদের দিকে ছুড়ে মারল।
— চুপ কর!
সমুদ্র হেসে উঠল।
মুনও হাসল, কিন্তু তার হাসির আড়ালে একটা ছোট্ট কষ্ট লুকিয়ে রইল।
সমুদ্রের কাছে সে এখনো শুধু পরিবারের ছোট্ট মুন। তার মনের কথাগুলো যে কত গভীরে জমে আছে, তা সমুদ্র জানে না।
আর এই অজানাই একদিন তাদের জীবনে ঝড় ডেকে আনবে।
### বিকেলের গোপন সাক্ষাৎ
বিকেলে খানবাড়ির পেছনের বাগানে একা দাঁড়িয়ে ছিল সেই রহস্যময় মেয়েটি। তার হাতে ফোন। স্ক্রিনে সমুদ্রের একটি ছবি খোলা।
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটি বার্তা এল।
“তুমি কি নিশ্চিত, মেয়েটাই তোমার পথে বাধা?”
মেয়েটি ঠান্ডা চোখে উত্তর দিল,
“সমুদ্রের জীবনে মুন যতদিন থাকবে, আমার কোনো জায়গা হবে না।”
ওপাশ থেকে আবার বার্তা এল,
“তাহলে কী করতে চাও?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল,
“ওকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলতে হবে, যাতে সমুদ্র নিজেই ওর থেকে দূরে সরে যায়।”
কয়েক সেকেন্ড পর আরও একটি বার্তা পাঠাল সে।
“আর যদি তাতেও কাজ না হয়, তাহলে মুনকে এই বাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য সরিয়ে দিতে হবে।”
বার্তা পাঠিয়ে সে চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
কিন্তু সে জানত না, বাগানের প্রবেশপথের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার কথার কিছু অংশ শুনে ফেলেছে।
লোকটি কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেল।
তার মুখে কোনো বিস্ময় ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, সে আগে থেকেই এমন কিছু ঘটার অপেক্ষায় ছিল।
### রাতের অন্ধকারে
রাত প্রায় এগারোটা।
মুন নিজের ঘরে বসে ডায়েরি লিখছিল।
“আজ সমুদ্র আমার সঙ্গে কথা বলেছে। খুব সাধারণ একটা কথা, তবু আমার কাছে দিনটা সুন্দর হয়ে গেল। জানি, ও আমাকে কখনো সেভাবে দেখবে না। তবু ওর একটু হাসি দেখলে আমার সব মন খারাপ কোথায় যেন হারিয়ে যায়।”
ডায়েরি বন্ধ করে জানালার কাছে গেল সে।
বাইরে অন্ধকার। দূরে গাছের পাতাগুলো বাতাসে নড়ছে।
হঠাৎ ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা এল।
“সমুদ্রকে ভালোবাসিস?”
মুনের বুক ধক করে উঠল।
সে উত্তর দিল না।
দ্বিতীয় বার্তা এল—
“যাকে তুই নিজের পৃথিবী ভাবিস, সে-ই একদিন তোর সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হবে।”
মুনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
— কে আপনি?
বার্তাটি পাঠানোর পর সে অপেক্ষা করল। কিন্তু আর কোনো উত্তর এল না।
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটি ছবি এল।
ছবিতে সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে একটি রেস্তোরাঁর সামনে। তার পাশে এক অচেনা মেয়ে।
ছবির নিচে লেখা—
“ওর কাছাকাছি যেতে চাইলে আগে জেনে নে, ওর জীবনে তুই ছাড়া আর কে আছে।”
মুনের চোখে পানি জমে উঠল। সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ছবিটা কি সত্যি? সমুদ্র কি সত্যিই অন্য কাউকে পছন্দ করে?
সে জানত না।
শুধু জানত, নিজের মনের কথাগুলো কাউকে বলতে পারবে না।
অন্যদিকে, খানবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সমুদ্র ফোনে কথা বলছিল।
— হ্যাঁ, ছবিটা আমি দেখেছি। কিন্তু মুনকে এসব কে পাঠাচ্ছে, সেটা জানতে হবে।
ওপাশ থেকে কী বলা হলো, শোনা গেল না।
সমুদ্রের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— শোনো, আমার পরিবারের কাউকে নিয়ে কেউ খেলতে চাইলে আমি চুপ করে থাকব না।
ফোন কেটে সে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর নিচে মুনের ঘরের জানালার দিকে চোখ পড়তেই সে থমকে গেল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মুন কাঁদছে।
সমুদ্র বুঝতে পারল না কেন তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
সে শুধু জানত, মুনের চোখের পানি তার ভালো লাগছে না।
কিন্তু এই কান্নার পেছনে যে আরও ভয়ংকর একটি ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে, তা সে এখনো জানে না।
কেউ একজন সমুদ্রকে পাওয়ার জন্য মুনকে সরিয়ে দিতে চাইছে।
আর সেই পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
চলবে...!!