অপূর্ণ ছায়া
পর্ব ৫
লেখিকা: আরফা আইরিশা
রাত তখন প্রায় বারোটা।
খানবাড়ির চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও মেহজাবিন খান মুনের চোখে ঘুম নেই। বারবার তার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অচেনা নম্বরের মেসেজটি মনে পড়ছে।
“যাকে তুমি ভালোবাসো, সে কি সত্যিই তোমার পরিবারের মানুষদের সম্পর্কে সবকিছু জানে?”
মুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল।
সমুদ্রকে সে ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসে। কিন্তু সমুদ্রের কাছে সে শুধুই ছোট্ট মুন—তার চাচাতো বোন। সমুদ্রের বিয়ের কথা উঠলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে যায়।
কিন্তু আজকের মেসেজটা শুধু তার ভালোবাসা নিয়ে নয়। এর মধ্যে অন্য কিছু আছে। এমন কিছু, যা তাদের পরিবারের সঙ্গে জড়িত।
মুন জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরাল।
বাড়ির গেটের বাইরে দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
মুন চোখ কুঁচকে তাকাল। এত রাতে গাড়িটা সেখানে কেন?
সে ভালো করে দেখার আগেই গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর গাড়িটা ধীরে ধীরে চলে গেল।
মুনের বুকের ভেতর অজানা ভয় জমতে লাগল।
সকালে খানবাড়িতে যথারীতি হৈচৈ শুরু হলো।
রাইয়ান খান রোদ ডাইনিং টেবিলে বসে একের পর এক পরোটা খাচ্ছে। তার পাশে আয়ান খান আদনান বসে ফোন দেখছে। আরহাম খান সমুদ্র খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চুপচাপ চা খাচ্ছে।
মেহরিন খান মিম তৃষাকে বলল, — দেখেছিস? রোদ ভাইয়ের খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে কাল থেকে বাড়িতে দুর্ভিক্ষ চলছে।
রোদ মুখভর্তি খাবার নিয়েই বলল, — আমি বড় হচ্ছি। আমার খাবার দরকার।
তৃষা হেসে বলল, — তুমি বড় হচ্ছ না, তোমার পেট বড় হচ্ছে।
রোদ পানি খেতে গিয়ে কাশতে শুরু করল।
আয়ান হেসে বলল, — তৃষা, সাবধানে কথা বল। ওর আত্মসম্মান আছে।
রোদ গম্ভীর মুখে বলল, — ধন্যবাদ, আয়ান। অন্তত তুমি আমাকে বোঝো।
আয়ান যোগ করল, — আত্মসম্মান আছে, কিন্তু বুদ্ধি আছে কি না সন্দেহ।
এবার পুরো টেবিল হেসে উঠল।
সমুদ্রও মুচকি হাসল। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে মুন নিচে নামল।
সমুদ্র তাকে দেখে বলল, — কী হয়েছে, মুন? তোমাকে এত ক্লান্ত লাগছে কেন?
মুন থমকে গেল।
সমুদ্রের সামান্য খেয়ালও তার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইল না।
— রাতে ঘুম হয়নি।
— কেন?
— এমনিই।
সমুদ্র কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — বেশি রাত জাগবে না। শরীর খারাপ করবে।
মুন মাথা নাড়ল।
পাশ থেকে রোদ ফিসফিস করে আয়ানকে বলল, — ভাই, সমুদ্র ভাইয়ের বিয়ে হলে মুনের কী হবে?
আয়ান কনুই দিয়ে রোদের পেটে গুঁতো মেরে বলল, — চুপ কর। সব জায়গায় নিজের নাক গলাতে হবে?
মুন কথাটা শুনে ফেলেছিল। সে নীরবে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল।
তার মনে হলো, এই বাড়িতে সবাই তার হাসি দেখে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা কেউ দেখে না।
নাশতার পর সমুদ্র অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় মুন তাকে ডাকল।
— ভাইয়া, একটু কথা ছিল।
সমুদ্র ঘুরে তাকাল।
— বলো।
মুন কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, — আমাদের পরিবারের পুরোনো কোনো ঘটনা কি তোমার মনে আছে?
সমুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল, — হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?
— না, এমনি জানতে ইচ্ছে করল।
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, — ছোটবেলার অনেক ঘটনা মনে নেই। তবে বাবাদের কাছে শুনলে হয়তো জানতে পারবে।
মুন সাহস করে আবার জিজ্ঞেস করল, — আমাদের দুই মায়ের দুর্ঘটনার ব্যাপারে তুমি কতটুকু জানো?
এবার সমুদ্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কেন? হঠাৎ এসব জানতে চাইছ কেন?
মুন উত্তর দেওয়ার আগেই সমুদ্রের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের দিকে তাকিয়ে সে বলল, — আমাকে এখন যেতে হবে। পরে কথা বলব।
সমুদ্র চলে গেল।
মুন দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তার প্রশ্নটা সমুদ্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
কিন্তু কেন?
তাদের মায়েদের দুর্ঘটনার কথা উঠলেই সবাই কেন চুপ হয়ে যায়?
দুপুরে মুন নিজের ঘরে বসে পুরোনো অ্যালবাম দেখছিল। মায়ের ছবিগুলো দেখলে তার বুকটা ভারী হয়ে আসে। ছোটবেলায় মাকে হারানোর স্মৃতি তার খুব অস্পষ্ট, তবু মায়ের মুখটা দেখলে মনে হয়, কোথাও যেন কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
অ্যালবামের শেষের দিকে একটা পুরোনো ছবি পেয়ে সে থেমে গেল।
ছবিতে দুই চাচি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের পেছনে বাড়ির বাগান। কিন্তু ছবির এক কোণে আরও একজন মানুষের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
মুন ছবিটা কাছে টেনে নিল।
লোকটার মুখ পরিষ্কার নয়। যেন ইচ্ছা করেই ছবিটা থেকে মুখটা আড়াল করা হয়েছে।
ছবির পেছনে তারিখ লেখা—দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগে।
মুনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজায় মিম এসে দাঁড়াল।
— মুন, কী দেখছিস এত মন দিয়ে?
মুন দ্রুত ছবিটা অ্যালবামের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলল।
— কিছু না। পুরোনো ছবি দেখছিলাম।
মিম তার পাশে বসে বলল, — তুই কয়েক দিন ধরে কেমন যেন হয়ে গেছিস। কিছু হয়েছে?
মুন মাথা নাড়ল।
— না।
মিম তার হাত ধরে বলল, — আমাকে বল। আমি তোর বোন। তোর কষ্ট হলে আমারও খারাপ লাগে।
মুনের চোখ ভিজে উঠল। সে সবকিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না।
কারণ সে নিজেই জানে না, কাকে বিশ্বাস করা যায়।
সন্ধ্যায় জাহিদ খান ও আদনান খান বসার ঘরে কথা বলছিলেন। সমুদ্র অফিস থেকে ফিরে দরজার কাছেই থেমে গেল। ভেতর থেকে বাবাদের গম্ভীর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিল।
আদনান খান বললেন, — এত বছর পর আবার এসব সামনে আসছে কেন?
জাহিদ খান নিচু গলায় বললেন, — আমি ভেবেছিলাম, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
— কিন্তু যদি কেউ সত্যিটা জেনে যায়?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর জাহিদ খান বললেন, — সত্যিটা জানার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সময়টা এখনো আসেনি।
সমুদ্রের কপালে ভাঁজ পড়ল।
কোন সত্যি?
কী এমন ঘটনা ঘটেছিল, যা এত বছর পরও তাঁদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে?
সে আরও কিছু শোনার আগেই আদনান খান দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, — বাইরে কে?
সমুদ্র আর দাঁড়িয়ে থাকল না। দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
কিন্তু বাবাদের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরতে লাগল।
রাত দশটার দিকে মুনের ফোনে আবার অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“পুরোনো অ্যালবামের ছবিটা দেখেছ?”
মুনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে লিখল, “আপনি কে? আমার সম্পর্কে এত কিছু জানেন কীভাবে?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
“যে মানুষটাকে তুমি ছবির কোণে দেখেছ, তার পরিচয় জানলে তোমার পরিবারের অনেক ধারণা বদলে যাবে।”
মুন তাড়াতাড়ি অ্যালবামটা খুলে ছবিটা বের করল।
ছবির কোণে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, লোকটা যেন ক্যামেরার দিকে নয়, সরাসরি দুই চাচির দিকে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
মুন চমকে ছবিটা লুকিয়ে ফেলল।
— কে?
ওপাশ থেকে সমুদ্রের কণ্ঠ ভেসে এল।
— আমি। দরজা খোলো, মুন। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
মুন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু দরজা খোলার আগেই সমুদ্র আবার বলল,
— আর একটা কথা… আজ বাবাদের ঘরে আমি এমন কিছু শুনেছি, যা তোমাকে জানানো দরকার।
মুনের বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে দরজার ছিটকিনি খুলল।
সমুদ্রের মুখ গম্ভীর। তার হাতে একটা পুরোনো কাগজ।
— মুন, আমাদের মায়েদের দুর্ঘটনাটা কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?
মুন নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চলবে…!!