অপূর্ণ ছায়া
পর্ব ৬
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সমুদ্রের প্রশ্নটা শুনে মুনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— আমাদের মায়েদের দুর্ঘটনাটা কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?
সমুদ্রের হাতে থাকা পুরোনো কাগজটার দিকে মুন তাকিয়ে রইল। এত বছর ধরে যে প্রশ্নটা কেউ করেনি, আজ সেই প্রশ্নটাই সমুদ্রের মুখে শুনতে হচ্ছে।
মুন ধীরে ধীরে বলল, — তুমি এমন কথা বলছ কেন, ভাইয়া?
সমুদ্র কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— এটা বাবার ঘরের পুরোনো একটা ফাইলের মধ্যে পেয়েছি। এখানে লেখা আছে, দুর্ঘটনার আগের দিন কেউ একজন বাবাকে ফোন করেছিল। কিন্তু ফোনের কথাগুলো লেখা নেই। শুধু একটা লাইন আছে—‘ওরা যদি সত্যিটা জেনে যায়, তাহলে সব শেষ।’
মুনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— তার মানে কেউ আগে থেকেই জানত কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে?
— আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু বাবাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছেন।
মুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — ভাইয়া, আমিও একটা জিনিস পেয়েছি।
সে আলমারির ভেতর থেকে পুরোনো অ্যালবামটা বের করল। অ্যালবাম খুলে সেই ছবিটা সমুদ্রকে দেখাল, যেখানে দুই চাচির পেছনে অচেনা একজন মানুষের ছায়া দেখা যাচ্ছিল।
সমুদ্র ছবিটা হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগে দেখল।
— এই ছবিটা কোথায় পেয়েছ?
— অ্যালবামের শেষ পাতায়। ছবির পেছনে তারিখ লেখা আছে। দুর্ঘটনার কয়েক দিন আগের।
সমুদ্র ছবিটা উল্টে দেখল। পেছনে ছোট্ট করে একটা বাক্য লেখা—
‘শেষ পর্যন্ত সত্যি লুকিয়ে রাখা যায় না।’
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর সমুদ্র বলল, — মুন, এই ব্যাপারে এখনই কাউকে কিছু বলবে না। আগে আমাদের জানতে হবে, আসলে কী ঘটেছিল।
মুন মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার মনে তখন অন্য একটা চিন্তা ঘুরছিল। অচেনা নম্বরের সেই মানুষটা কীভাবে জানল যে সে পুরোনো অ্যালবাম দেখেছে?
কেউ কি তাদের ওপর নজর রাখছে?
খানবাড়ির সকালের অশান্তি
পরদিন সকালে খানবাড়ির পরিবেশ একেবারে অন্য রকম।
রোদ ডাইনিং টেবিলে বসে তৃষার প্লেট থেকে পরোটা তুলে নিচ্ছিল।
তৃষা হাত চাপড়ে বলল, — এই! আমার প্লেট থেকে নিচ্ছ কেন?
রোদ নির্লজ্জের মতো উত্তর দিল, — তোর পরোটাটা দেখতে ভালো লাগছিল।
— তোমার প্লেটেও তো পরোটা আছে!
— ওটা আমার। তোরটা বেশি সুন্দর।
তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল, — তোমার বুদ্ধিটাও যদি পরোটার মতো হতো, তাহলে ভালো হতো।
আয়ান হেসে ফেলল।
— তৃষা, ছেড়ে দে। ওকে যুক্তি দিয়ে হারানো সম্ভব না।
রোদ গর্ব করে বলল, — শুনেছিস? আমি যুক্তির বাইরে!
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল, — না, তুই যুক্তিহীন।
পুরো টেবিল হাসিতে ভরে উঠল।
শুধু মুন হাসল না। সে অন্যমনস্কভাবে খাবার নাড়াচাড়া করছিল।
সমুদ্র বিষয়টা খেয়াল করল।
— মুন, কী হয়েছে? শরীর খারাপ?
মুন দ্রুত মাথা নাড়ল।
— না, কিছু হয়নি।
রোদ এবার মজা করে বলল, — মুনের বিয়ের কথা ভাবতে হবে। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে!
মুনের হাত থেমে গেল।
সমুদ্র গম্ভীর হয়ে বলল, — সব কথায় বিয়ের প্রসঙ্গ আনতে হবে?
রোদ অবাক হয়ে তাকাল।
— আরে ভাই, মজা করছিলাম!
সমুদ্র আর কিছু না বলে উঠে চলে গেল।
মুন তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সমুদ্র কেন হঠাৎ রেগে গেল, সে বুঝতে পারল না।
কিন্তু তার মনে ক্ষীণ একটা আশা জাগল—সমুদ্র কি তার কষ্টটা বুঝতে পারছে?
বাবাদের গোপন আলোচনা
দুপুরে জাহিদ খান নিজের ঘরে বসে পুরোনো কাগজপত্র দেখছিলেন। এমন সময় আদনান খান ঘরে ঢুকলেন।
— ভাই, আমাদের আর দেরি করা উচিত নয়।
জাহিদ খান কাগজগুলো গুছিয়ে বললেন, — আমি জানি। কিন্তু এত বছর পর সবকিছু সামনে আনলে ছেলেমেয়েগুলোর ওপর প্রভাব পড়বে।
আদনান খান নিচু গলায় বললেন, — সত্যিটা লুকিয়ে রাখার কারণেই তো আজ এই অবস্থা। কেউ আবার আমাদের পরিবারের দিকে নজর দিচ্ছে।
জাহিদ খান জানালার বাইরে তাকালেন।
— তুমি কি নিশ্চিত, সেই মানুষটা ফিরে এসেছে?
— গত রাতে আবার ফোন এসেছিল।
জাহিদ খান চমকে উঠলেন।
— কী বলেছে?
আদনান খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, — বলেছে, এবার সে শুধু সত্যিটা প্রকাশ করবে না। আমাদের কাছ থেকে তার পাওনাটাও বুঝে নেবে।
জাহিদ খান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
— এত বছর পরও সে আমাদের ক্ষমা করেনি।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো।
দুজনেই চুপ করে গেলেন।
— কে ওখানে?
কোনো উত্তর এল না।
জাহিদ খান দ্রুত দরজা খুললেন। করিডোর ফাঁকা। তবে মেঝেতে পড়ে আছে একটা ছোট্ট কাগজ।
তিনি কাগজটা তুলে খুললেন।
তাতে লেখা—
‘আপনারা যতই লুকান, ছয়জনের জীবনেই সত্যিটা একদিন ফিরে আসবে।’
জাহিদ খানের হাত কেঁপে উঠল।
মুনের কাছে নতুন বার্তা
বিকেলে মুন একা ছাদে বসে ছিল। হাতে সেই পুরোনো ছবিটা। সে ছবির অচেনা মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
‘ছবির মানুষটাকে চিনতে পেরেছ?’
মুন দ্রুত লিখল, ‘আপনি কে? আমার পরিবারের পেছনে কেন লেগেছেন?’
উত্তর এল—
‘তোমার পরিবারের পেছনে আমি লাগিনি। তোমার পরিবারই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।’
মুনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে আবার লিখল, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
‘তোমার দুই মায়ের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে চাও?’
মুনের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোটবেলার অস্পষ্ট স্মৃতি—বাড়ির মানুষের কান্না, সবার মুখে শোক, আর তারপর থেকে মায়েদের কথা উঠলেই বড়দের নীরব হয়ে যাওয়া।
সে কাঁপা হাতে লিখল, ‘হ্যাঁ। সব জানতে চাই।’
উত্তর এল—
‘তাহলে আজ রাত বারোটায় বাড়ির পুরোনো বাগানে এসো। কাউকে সঙ্গে আনবে না।’
মুনের মনে ভয় ঢুকে গেল।
এটা কি সত্যি জানার সুযোগ, নাকি তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা?
সমুদ্রের সন্দেহ
সন্ধ্যায় সমুদ্র নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ মুন এসে দরজার সামনে দাঁড়াল।
— ভাইয়া, তুমি কি একটু সময় দিতে পারবে?
সমুদ্র ফোনটা নামিয়ে বলল, — বলো।
মুন তার দিকে তাকিয়ে বলল, — তুমি যদি জানতে পারো, আমাদের পরিবারের কেউ একটা বড় সত্যি লুকিয়ে রেখেছে, তুমি কী করবে?
সমুদ্র কিছুক্ষণ ভেবে বলল, — সত্যিটা জানার চেষ্টা করব। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষ দেব না।
মুন মাথা নাড়ল।
সে সবকিছু বলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু অচেনা মানুষটার নির্দেশ মনে পড়তেই থেমে গেল।
সমুদ্র তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, — মুন, তুমি কি কিছু লুকাচ্ছ?
মুন জোর করে হাসল।
— না তো!
সমুদ্র বিশ্বাস করল না। তবু আর চাপ দিল না।
— ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে। একা একা কিছু করতে যেও না।
মুনের বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে করে, তাকেই আজ সত্যিটা বলতে পারছে না।
রাত বারোটার অপেক্ষা
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।
মুন নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছে বলে মনে হলেও তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের মধ্যে কেউ যেন তাকে দেখছে।
পুরোনো বাগানের দিকে এগিয়ে যেতেই শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ হলো।
মুন থেমে গেল।
— কে?
কোনো উত্তর নেই।
সে ফোনের আলো জ্বালিয়ে চারপাশে তাকাল। বাগানের এক কোণে একটা পুরোনো বেঞ্চ। তার ওপর সাদা খাম রাখা।
মুন ধীরে ধীরে এগিয়ে খামটা হাতে নিল।
ভেতরে ছিল একটা ছবি।
ছবিতে তার দুই চাচি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের পাশে সেই অচেনা মানুষটি। এবার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ছবির পেছনে লেখা—
‘তোমার মায়েরা দুর্ঘটনার দিন একা ছিলেন না।’
মুনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
— ছবিটা পেয়েছ, মুন?
মুন ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু তার পরের কথাটা শুনে মুনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
— তোমার পরিবার তোমাকে যে গল্প শুনিয়েছে, তার সবটাই সত্যি নয়।
মুন কাঁপা গলায় বলল, — আপনি কে?
লোকটা এক পা এগিয়ে এল।
— আমাকে চিনতে পারবে না। কিন্তু তোমার বাবা আমাকে খুব ভালো করেই চেনেন।
ঠিক তখনই বাগানের অন্য দিক থেকে সমুদ্রের কণ্ঠ শোনা গেল—
— মুন!
মুন চমকে তাকাল।
সমুদ্র সেখানে কীভাবে এল?
আর অন্ধকারে দাঁড়ানো মানুষটা কি সত্যিই তাদের পরিবারের অতীতের সঙ্গে জড়িত?
চলবে…!!