ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপূর্ণ ছায়া

পর্ব 8

লেখক: আইরিশা / Irisha

অপূর্ণ ছায়া

পর্ব ৮: বন্ধ দরজার ওপাশে

লেখিকা: আরফা আইরিশা

পুরোনো লাইব্রেরির ভেতরটা নিস্তব্ধ। চারদিকে ধুলোমাখা বই, ভাঙা টেবিল আর দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ছবিগুলো যেন বহু বছরের কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রেখেছে।

মুন ভয়ে সমুদ্রের হাত শক্ত করে ধরে আছে।

— ভাইয়া, আমরা এখান থেকে বের হব কীভাবে?

সমুদ্র দরজার হাতল ঘুরিয়ে আবার চেষ্টা করল। কিন্তু দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হয়েছে।

— ভয় পাস না। কোনো একটা উপায় বের করব।

— তুমি নিজেই তো বের হতে পারছ না!

— এই পরিস্থিতিতেও তোর মুখ চলছে?

মুন বিরক্ত হয়ে তাকাল।

— আমি ভয়ে কথা বলছি, আর তুমি আমাকে বকছ!

সমুদ্র কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। মুনের চোখে পানি জমেছে। সে ধীরে মুনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল,

— আচ্ছা, সরি। কাঁদিস না। আমি থাকতে তোকে কিছু হতে দেব না।

মুন মুখ নামিয়ে ফেলল।

এই কথাটা সমুদ্র খুব সহজেই বলে ফেলেছে। কিন্তু মুনের কাছে কথাটা ভীষণ মূল্যবান। কারণ সে জানে, সমুদ্র তাকে ভালোবাসে না—অন্তত সে যেভাবে ভালোবাসে, সেভাবে নয়।

হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা পুরোনো রেকর্ডারটা আবার চালু হয়ে গেল।

একজন নারীর কণ্ঠ ভেসে এল।

“যদি আমার মেয়ের কাছে এই কথাগুলো পৌঁছায়, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর বেঁচে নেই। মুন, মা… কখনো কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করিস না। এমনকি নিজের পরিবারের মানুষকেও না।”

মুনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

— এটা… এটা আমার মায়ের কণ্ঠ!

সমুদ্র রেকর্ডারের কাছে এগিয়ে গেল। রেকর্ডিংয়ে এবার শোনা গেল—

“রাশেদ জানে সেদিন কী ঘটেছিল। কিন্তু সে একা দোষী নয়। আমাদের ভুলের শাস্তি আমাদের সন্তানদের পেতে হবে, এটা আমি কখনো চাইনি।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

আবার সেই কণ্ঠ—

“যদি কখনো জানতে পারিস, রাশেদ আসলে কে, তাহলে তোর বাবাকে প্রশ্ন করিস। জিজ্ঞেস করিস, কেন তিনি এত বছর ধরে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন।”

রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।

মুন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

— সমুদ্র, রাশেদ কে?

সমুদ্র কোনো উত্তর দিল না।

— তুমি কিছু জানো, তাই না?

— না।

— মিথ্যা বলছ!

মুনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— প্রথমে পুরোনো ছবি, তারপর চিঠি, এখন মায়ের কণ্ঠে বাবার নাম! আর তুমি বলছ কিছু জানো না?

সমুদ্র চোখ নামিয়ে ফেলল।

সত্যিটা হলো, রাশেদ নামটা সে আগেও শুনেছে। কয়েক দিন আগে বাবার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে সে জাহিদ খানের মুখে এই নাম শুনেছিল। তখন তার বাবা ফোনে বলেছিলেন, “রাশেদ ফিরে এলে সব শেষ হয়ে যাবে।”

কিন্তু সমুদ্র মুনকে কথাটা বলতে পারল না।

কারণ তার মনে হচ্ছিল, এই নামের সঙ্গে এমন কিছু জড়িয়ে আছে, যা জানলে তাদের পুরো পরিবার ভেঙে পড়তে পারে।

খানবাড়ি

এদিকে খানবাড়ির সকালের পরিবেশ একেবারেই অন্য রকম।

রোদ সোফায় বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

— ভাই, একটা কথা বলব?

আয়ান খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল,

— টাকা লাগবে?

— ধুর! তোমার কাছে টাকা চাওয়ার মতো দুর্ভাগ্য আমার হয়নি।

— তাহলে বল।

রোদ গলা পরিষ্কার করে বলল,

— আমাদের বাড়িতে একটা গোয়েন্দা দল খোলা উচিত।

আয়ান এবার কাগজ নামাল।

— কেন?

— কারণ এই বাড়িতে সবাই কিছু না কিছু লুকাচ্ছে। আর আমি সত্যিটা বের করব।

পাশ থেকে মিম বলে উঠল,

— আগে নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখা বিরিয়ানির প্যাকেটটা খুঁজে বের করো। গতকাল কে খেয়েছে, সেটা এখনো আমরা জানি না।

তৃষা হেসে ফেলল।

রোদ প্রতিবাদ করল,

— ওইটা ছিল আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি!

— ফ্রিজে রাখা খাবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় কখন থেকে? মিম প্রশ্ন করল।

আয়ান চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,

— তোদের ঝগড়া শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে, এই বাড়ির আসল রহস্য বিরিয়ানির প্যাকেট।

সবাই হেসে উঠলেও জাহিদ খান হাসলেন না।

তিনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন।

আদনান খানও অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ।

মেহরিন মিম বিষয়টা লক্ষ করল।

— বাবা, কী হয়েছে? তোমাকে সকাল থেকে চিন্তিত লাগছে।

আদনান চমকে তাকালেন।

— কিছু হয়নি, মা।

— তাহলে তুমি আর বড়ো চাচা বারবার ফোন দেখছ কেন?

জাহিদ খান এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— বড়দের কিছু কাজ থাকে, যেগুলো নিয়ে তোমাদের চিন্তা করতে হবে না।

মিম আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।

কারণ এই একই কথা সে আগেও শুনেছে।

আর প্রতিবারই তার পরে নতুন কোনো রহস্য সামনে এসেছে।

পুরোনো লাইব্রেরি

সমুদ্র একটা পুরোনো টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখছিল। ভেতরে কিছু কাগজ, একটি মরচে ধরা চাবি এবং ভাঁজ করা একটি মানচিত্র পাওয়া গেল।

মুন এগিয়ে এল।

— এটা কী?

সমুদ্র কাগজটা মেলে ধরল। মানচিত্রে খানবাড়ির পেছনের বাগান থেকে শুরু করে বাড়ির পুরোনো অংশ পর্যন্ত কয়েকটি পথ আঁকা। এক পাশে লাল কালিতে লেখা—

“যেখানে ছায়া সবচেয়ে ঘন, সত্যি লুকিয়ে আছে সেখানেই।”

মুন অবাক হয়ে বলল,

— এটা কি আমাদের বাড়ির মানচিত্র?

— মনে হচ্ছে। কিন্তু এই পুরোনো অংশটা তো আমি কখনো দেখিনি।

মানচিত্রের এক কোণে ছোট্ট একটি চিহ্ন ছিল। দেখতে অনেকটা দরজার মতো।

মুন হঠাৎ বলল,

— দাঁড়াও! আমাদের বাড়ির পেছনে যে পরিত্যক্ত ঘরটা আছে, সেটার দরজায়ও এমন চিহ্ন দেখেছি।

সমুদ্র তার দিকে তাকাল।

— তুই আগে বলিসনি কেন?

— কারণ আমি জানতাম না এটা গুরুত্বপূর্ণ!

ঠিক তখন দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

দুজনেই চুপ হয়ে গেল।

কেউ একজন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল—

— মানচিত্রটা পেয়ে গেছ, তাই না?

সমুদ্র দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

— আপনি কে? আমাদের এখানে আটকে রেখেছেন কেন?

বাইরের লোকটি মৃদু হেসে বলল,

— তোমরা দুজন অনেক বেশি প্রশ্ন করছ।

মুন সাহস সঞ্চয় করে বলল,

— আমার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর লোকটি বলল,

— তোমার মা মারা যাওয়ার আগে এমন একটি সত্য জেনে গিয়েছিলেন, যা জানার অধিকার তোমাদের পরিবারের কারও ছিল না।

মুনের চোখ ভিজে উঠল।

— তাহলে কি আমার মায়ের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না?

বাইরের লোকটি এবার নিচু কণ্ঠে বলল,

— উত্তরটা তোমার বাড়িতেই আছে, মুন। কিন্তু উত্তর খুঁজতে গিয়ে যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, তাকেই হয়তো হারিয়ে ফেলবে।

সমুদ্র দরজায় ধাক্কা দিল।

— ধাঁধা বন্ধ করুন! দরজা খুলুন!

কিন্তু লোকটি চলে যেতে শুরু করেছে।

সমুদ্র দ্রুত চারদিকে তাকাল। ঘরের পেছনের দেয়ালে কাঠের একটি তাক ছিল। তাকটা একটু সরাতেই নিচে ছোট্ট একটি ফাঁক দেখা গেল।

— মুন, এদিকে আয়!

দুজন মিলে তাকটা সরাল। পেছনে সরু একটি পথ। পথটা অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।

মুন ভয়ে বলল,

— ওই পথে যাব?

সমুদ্র মাথা নাড়ল।

— এখানে বসে থাকলে লোকটা আবার ফিরে আসতে পারে। চল, সাবধানে যাব।

দুজন পথের ভেতর ঢুকে পড়ল।

কিছু দূর এগোতেই মুনের পা কিছুর সঙ্গে আটকে গেল। নিচে তাকিয়ে সে দেখল, একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।

বাক্সের ওপর লেখা—

“মেহজাবিন খানের জন্য।”

মুনের হাত কেঁপে উঠল।

— সমুদ্র… এটা আমার মায়ের নাম!

বাক্স খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল একটি চিঠি, একটি পুরোনো আংটি এবং ছোট্ট একটি ছবি।

ছবিতে দুই নারী, একজন পুরুষ এবং একটি ছোট্ট মেয়ে।

মুন ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

ছোট্ট মেয়েটি দেখতে অবিকল তার মতো।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখটি দেখে সমুদ্রের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তারিখটি ছিল সেই দুর্ঘটনার ঠিক এক দিন আগে।

আর ছবির পুরুষটি—

জাহিদ খান।

মুন অবিশ্বাসের চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

— বাবা এখানে কেন?

সমুদ্র চিঠিটা খুলল। প্রথম কয়েকটি লাইন পড়েই তার চোখ বড় হয়ে গেল।

চিঠিতে লেখা—

“জাহিদ, তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝব আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। মুনকে সত্যিটা জানিও না। সে যদি জানতে পারে, তার জন্মের আগের সেই রাতের সঙ্গে তার নিজের জীবনের সম্পর্ক আছে, তাহলে সে কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।”

মুনের নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল।

— আমার জন্মের আগের রাত? আমার জীবনের সঙ্গে কী সম্পর্ক?

সমুদ্র চিঠির পরের অংশ পড়তে গেল। কিন্তু কাগজের বাকি অংশ ছেঁড়া।

ঠিক তখনই দূর থেকে একটি দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

তারপর কারও কণ্ঠ—

— ওরা বাক্সটা পেয়ে গেছে!

আরেকটি কণ্ঠ উত্তর দিল,

— তাহলে আর সময় নেই। মুন সত্যিটা জানার আগেই ওকে থামাতে হবে।

মুন আর সমুদ্র একে অপরের দিকে তাকাল।

তারা বুঝতে পারল, এই রহস্য শুধু তাদের মায়েদের মৃত্যু নিয়ে নয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুনের জন্ম, তার বাবা এবং এমন একটি অতীত—যা কেউ কোনোভাবেই প্রকাশ হতে দিতে চায় না।

কিন্তু তারা জানত না, ঠিক সেই মুহূর্তে খানবাড়ির ভেতরেও আরেকটি ঘটনা ঘটতে চলেছে।

জাহিদ খানের ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল—

“আপনার মেয়ে সত্যির খুব কাছে পৌঁছে গেছে। এবার কি তাকে সব বলবেন, নাকি দ্বিতীয়বারও একই ভুল করবেন?”

জাহিদ খান বার্তাটি পড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

— না… এটা হতে পারে না। সে তো এত বছর আগে মারা গেছে!

ঠিক তখনই তার ঘরের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে জাহিদ খানের হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে গেল।

লোকটি মৃদু হেসে বলল,

— অনেক বছর পর দেখা হলো, জাহিদ।

“এবার হিসাবটা শেষ করার সময় এসেছে।”

চলবে....!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন