অপূর্ণ ছায়া
পর্ব ৯: ফিরে আসা মৃত মানুষ
লেখিকা: আরফা আইরিশা
জাহিদ খানের ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছেন তিনি। এত বছর ধরে যে মানুষটাকে মৃত বলে বিশ্বাস করেছেন, সে আজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে!
জাহিদের ঠোঁট কাঁপছে।
— তু... তুমি?
লোকটা মৃদু হাসল।
— হ্যাঁ, জাহিদ। আমি। যাকে তুমি মৃত ভেবে এত বছর নিশ্চিন্তে কাটিয়েছ!
জাহিদ এক পা পিছিয়ে গেলেন।
— এটা কীভাবে সম্ভব? তোমার তো...
— মৃত্যু হয়েছে? কথাটা শেষ করো। আমার মৃত্যুর খবরটা তো তুমিই বিশ্বাস করতে চেয়েছিলে!
— চুপ করো!
জাহিদের গর্জনে ঘরের জানালার কাচ কেঁপে উঠল।
লোকটা নির্বিকার।
— এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো শুধু আমার পাওনা চাইতে এসেছি।
— তুমি কী চাও?
লোকটা টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল। ছবিতে জাহিদ, তাঁর স্ত্রী এবং আরও একজন নারী ছিলেন।
— যা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা ফেরত চাই।
জাহিদ তাড়াতাড়ি ছবিটা উল্টে দিলেন।
— সেই ঘটনা অনেক আগের। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
— তোমার কাছে শেষ হয়েছে। আমার কাছে নয়।
লোকটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে থেমে বলল,
— তোমার মেয়ে সত্যির খুব কাছে পৌঁছে গেছে। ওকে থামাও। নাহলে এমন সত্যি জানবে, যা জানার পর তোমার মুখের দিকে তাকাতেও ঘৃণা করবে।
জাহিদ চোখ বন্ধ করলেন।
— মুনের কোনো দোষ নেই।
— দোষ কার, সেটা ঠিক করার অধিকার তোমার নেই, জাহিদ খান!
কথাটা বলেই লোকটা চলে গেল।
জাহিদ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
এত বছর ধরে লুকিয়ে রাখা অতীত আবার ফিরে এসেছে। আর এবার সেই অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাঁর মেয়ে।
তিনি কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে আদনানকে কল করলেন।
— আদনান, সে ফিরে এসেছে!
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আদনানের আতঙ্কিত কণ্ঠ শোনা গেল—
— কী বলছ ভাই? তুমি নিশ্চিত?
— নিজের চোখে দেখেছি।
— তাহলে আমাদের হাতে আর সময় নেই। মেয়েগুলোকে সবকিছু থেকে দূরে রাখতে হবে।
জাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— এবার আর ওদের দূরে রাখা যাবে না, আদনান। মুন সব জেনে গেছে।
পুরোনো পথের শেষে
অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর মুন আর সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে।
মুনের হাতে সেই পুরোনো চিঠি। তার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে।
— সমুদ্র, আমার জন্মের আগের রাতের সঙ্গে আমার জীবনের সম্পর্ক কী?
সমুদ্র কোনো উত্তর দিতে পারল না।
— তুমি আবার চুপ করে আছ কেন? সবাই কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে?
— মুন, আগে এখান থেকে বের হই। তারপর সবকিছু নিয়ে ভাবব।
— তুমি কি জানো, আমার মা কী লুকিয়ে রেখেছিলেন?
সমুদ্র তার দিকে তাকাল।
— সত্যি বলছি, সবটা জানি না। তবে একটা কথা জানি—তোর মা তোকে খুব ভালোবাসতেন।
মুনের চোখ ভিজে উঠল।
— তাহলে তিনি আমাকে সত্যিটা বলে গেলেন না কেন?
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— হয়তো তোকে বাঁচানোর জন্য।
মুন তিক্তভাবে হেসে উঠল।
— সবাই আমাকে বাঁচানোর অজুহাতে আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকিয়ে রাখছে। অথচ কেউ একবারও ভাবছে না, এই অজানা সত্যি আমাকে প্রতিদিন কতটা কষ্ট দিচ্ছে!
সমুদ্রের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
সে মুনের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে সাবধানে ভাঁজ করল।
— আমি কথা দিচ্ছি, যতক্ষণ না সত্যিটা জানতে পারছি, ততক্ষণ তোকে একা ছাড়ব না।
মুন তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। অথচ সমুদ্রের কাছে সে শুধু তার ছোট্ট কাজিন, পরিবারের একজন সদস্য।
মুন চোখ সরিয়ে নিল।
— কথা দিও না, সমুদ্র। সব কথা রাখা যায় না।
সমুদ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা আলো জ্বলে উঠল।
দুজনেই চমকে তাকাল।
কেউ একজন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
সমুদ্র দ্রুত মুনকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল।
— কে ওখানে?
কোনো উত্তর এল না।
লোকটা আরও কাছে এগিয়ে এল। তার মুখ স্পষ্ট হতেই মুনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— বাবা!
আদনান খান তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু তাঁর মুখে স্বস্তির কোনো চিহ্ন নেই। বরং চোখেমুখে ভয় আর রাগ স্পষ্ট।
— তোমরা এখানে কী করছ?
মুন এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— বাবা, তুমি আমাকে বলো, রাশেদ কে? আমার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? আর আমার জন্মের আগের রাতে কী ঘটেছিল?
আদনান খান স্থির হয়ে গেলেন।
— তুই এই নাম কোথায় শুনেছিস?
মুন চিঠিটা এগিয়ে দিল।
— এখানে!
আদনান চিঠিটা পড়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।
কয়েক মুহূর্ত পর তিনি মুনের হাত ধরে বললেন,
— আমার সঙ্গে চল। এখনই!
— না, বাবা! আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও!
আদনান এবার মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।
— মুন, তুই যা জানতে চাইছিস, সেটা জানার জন্য এখনো প্রস্তুত নোস।
মুনের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— আমার নিজের জীবন সম্পর্কে জানার জন্যও কি আমাকে প্রস্তুত হতে হবে?
আদনান কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সমুদ্র পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
যাওয়ার আগে আদনান একবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সমুদ্র, এই ব্যাপারে আর এগোবে না। এটা শুধু মুনের অতীত নয়। এটা আমাদের পুরো পরিবারের ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
সমুদ্র শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— তাহলে এত বছর ধরে আপনারা সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন কেন, চাচা?
আদনান থমকে গেলেন।
সমুদ্রের চোখে এবার স্পষ্ট সন্দেহ।
— আর সত্যিটা যদি এতটাই ভয়ংকর হয়, তাহলে সেটা জানার অধিকার আমাদের আছে।
খানবাড়ির বসার ঘর
মিম আর তৃষা সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছিল। রোদ হাতে একটা আপেল নিয়ে ঘরে ঢুকতেই মিম তার দিকে তাকাল।
— ভাই, একটা কথা বলি?
রোদ আপেলে কামড় দিয়ে বলল,
— বল। তবে টাকা চাইলে হবে না।
মিম চোখ ঘুরিয়ে বলল,
— তোমার জীবনে টাকা ছাড়া আর কোনো কথা নেই?
— আছে। খাবার।
তৃষা হেসে ফেলল।
— তোমাকে বিয়ে করলে তোমার বউকে প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
রোদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমার বউ হলে সে-ও আমার সঙ্গে বসে খাবে। সমস্যা কোথায়?
মিম মুখ বাঁকাল।
— আহা! বউ পাওয়ার আগেই কত পরিকল্পনা!
তিনজনের হাসাহাসির মাঝেই দরজা খুলে গেল।
আদনান খান মুনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। পেছনে সমুদ্র।
মুনের চোখ লাল। সমুদ্রও অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ।
মিম দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
— মুন! কী হয়েছে তোর?
মুন কিছু বলার আগেই আদনান বললেন,
— ওর একটু শরীর খারাপ। সবাই যার যার ঘরে যাও।
রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— বাবা, শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ডাকব। কিন্তু সবাইকে ঘরে পাঠাচ্ছ কেন?
— রাইয়ান, আমি যা বলেছি, তাই করো।
রোদের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে।
জাহিদ খানও ঘরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ এক মুহূর্তের জন্য সমুদ্রের সঙ্গে মিলল।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা সমুদ্রের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল।
আয়ানও সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।
— কী হয়েছে? সবাই এমন করছে কেন?
কেউ উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই খানবাড়ির প্রধান দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
সবাই থেমে গেল।
একজন কর্মচারী দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে চমকে উঠল।
লোকটি ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।
তার চোখ প্রথমে জাহিদের দিকে, তারপর আদনানের দিকে গেল।
— সবাইকে একসঙ্গে দেখে ভালো লাগছে।
জাহিদ গর্জে উঠলেন,
— তুমি এখানে কেন এসেছ?
লোকটা মৃদু হাসল।
— নিজের বাড়িতে আসতে কি অনুমতি লাগে?
আদনান খান ফিসফিস করে বললেন,
— রাশেদ...
নামটা শুনে ঘরের সবাই অবাক হয়ে গেল।
সমুদ্রের মনে পড়ল, এই সেই নাম—যে নাম তার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মুন ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
— আপনি কি আমার মাকে চিনতেন?
রাশেদের চোখ মুনের মুখে স্থির হলো।
কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর সে বলল,
— শুধু চিনতাম না, মুন। তোমার মা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন।
জাহিদ চিৎকার করে উঠলেন,
— চুপ করো! ওর সামনে আর একটা কথাও বলবে না!
রাশেদ এবার জাহিদের দিকে তাকিয়ে হাসল।
— এত ভয় কেন, জাহিদ? মেয়েটা তো শুধু তার মায়ের সম্পর্কে জানতে চাইছে।
মুনের গলা কেঁপে উঠল।
— আমার মায়ের কী হয়েছিল? সবাই কেন তাঁর কথা লুকিয়ে রাখছে?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তোমার মা মারা যাওয়ার আগের রাতে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।
— কী কথা?
রাশেদ ধীরে ধীরে মুনের কাছে এগিয়ে এল।
— তিনি বলেছিলেন, যদি তাঁর কিছু হয়, তাহলে যেন আমি তোমাকে সত্যিটা জানাই।
জাহিদ সামনে এগিয়ে এসে বললেন,
— রাশেদ, আমি শেষবারের মতো বলছি—চলে যাও!
রাশেদ থামল।
তারপর এমন একটা কথা বলল, যা শুনে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
— তোমরা এত বছর ধরে মুনকে আদনানের মেয়ে বলে বড় করেছ। কিন্তু ওর জন্মের সত্যিটা কি আদনান নিজেও জানে?
মুনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আদনান খান যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
সমুদ্র অবিশ্বাসের চোখে তার চাচার দিকে তাকাল।
আর জাহিদ খান মাথা নিচু করে ফেললেন।
মুন কাঁপা গলায় বলল,
— বাবা... উনি কী বলছেন?
আদনান কোনো উত্তর দিলেন না।
মুন এবার এক পা পিছিয়ে গেল।
— বাবা, তুমি কিছু বলছ না কেন?
ঠিক তখন রাশেদ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
ছবিতে মুনের মা মেহজাবিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক।
ছবির পেছনে লেখা—
“মুনের জন্মের সত্যি—যেদিন সবাই জানতে পারবে, সেদিন খানবাড়ির সব সম্পর্ক বদলে যাবে।”
মুন ছবিটা হাতে তুলে নিল।
তারপর ধীরে ধীরে আদনানের দিকে তাকাল।
— বাবা, আমি কি সত্যিই তোমার মেয়ে নই?
আদনান খান চোখ বন্ধ করলেন।
কিন্তু তাঁর নীরবতাই যেন মুনের বুকের ভেতর সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে বিঁধল।
চলবে...!!