ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপূর্ণ ছায়া

পর্ব 10

লেখক: আইরিশা / Irisha

অপূর্ণ ছায়া

পর্ব ১০: রক্তের সম্পর্ক, নাকি মিথ্যার দেয়াল?

লেখিকা: আরফা আইরিশা

মুনের হাতে ধরা ছবিটা কাঁপছে।

ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো যেন তার পুরো পৃথিবীটা ওলটপালট করে দিয়েছে।

“মুনের জন্মের সত্যি—যেদিন সবাই জানতে পারবে, সেদিন খানবাড়ির সব সম্পর্ক বদলে যাবে।”

মুন ধীরে ধীরে বাবার দিকে তাকাল।

— বাবা, আমি একটা প্রশ্ন করেছি। তুমি উত্তর দিচ্ছ না কেন?

আদনান খান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।

জাহিদ খান বারবার রাশেদের দিকে তাকাচ্ছেন। তাঁর মুখে রাগ, ভয় আর অপরাধবোধ—সবকিছু একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।

রাশেদ সোফায় বসে এমনভাবে চা খাচ্ছে, যেন এই বাড়িতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনাই ঘটেনি।

মুন এবার কাঁপা গলায় বলল,

— বাবা, আমি কি সত্যিই তোমার মেয়ে নই?

আদনান চোখ বন্ধ করলেন।

— মুন, তুই আমার মেয়ে। এই কথাটা নিয়ে কখনো সন্দেহ করবি না।

— তাহলে উনি এমন কথা বললেন কেন?

আদনান চুপ।

মুনের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

— ছোটবেলা থেকে তুমি আমাকে শিখিয়েছ, সত্যি কথা বলতে হয়। অথচ আজ যখন আমি নিজের জীবনের সত্যিটা জানতে চাইছি, তখন তুমি নিজেই আমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ!

কথাটা শুনে আদনানের মুখটা ভেঙে পড়ল।

তিনি মেয়ের কাছে এগিয়ে গেলেন।

— মা, আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি।

মুন পিছিয়ে গেল।

— তাহলে সত্যিটা বলো!

রাশেদ চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল,

— আদনান, আর কত দিন মেয়েটাকে অন্ধকারে রাখবে? সত্যিটা তো একদিন প্রকাশ পাবেই।

জাহিদ এবার রেগে উঠে দাঁড়ালেন।

— রাশেদ! তুমি এই বাড়িতে এসে আমাদের পরিবারের মধ্যে আগুন লাগাতে পারবে না!

রাশেদ ঠান্ডা গলায় বলল,

— আগুন আমি লাগাইনি, জাহিদ। আগুন তো তোমরা নিজেরাই লাগিয়েছিলে। আমি শুধু সেই আগুনের ছাই সরিয়ে সত্যিটা দেখাতে এসেছি।

— বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে!

রাশেদ উঠে দাঁড়াল।

— চলে যাব। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই।

সে মুনের দিকে তাকাল।

— তোমার মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন যদি তুমি নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করো, তাহলে যেন চিঠিটা তোমার হাতে তুলে দিই।

মুন এক পা এগিয়ে এল।

— চিঠিটা কোথায়?

রাশেদ পকেট থেকে একটা খাম বের করল।

কিন্তু খামটা মুনের হাতে দেওয়ার আগেই জাহিদ তার হাত ধরে ফেললেন।

— না!

সবাই চমকে উঠল।

জাহিদের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— ওই চিঠি মুন পড়তে পারবে না!

মুন অবিশ্বাসের চোখে বড় চাচার দিকে তাকাল।

— কেন? আমার মায়ের চিঠি পড়ার অধিকার কি আমার নেই?

জাহিদ কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।

রাশেদ মৃদু হাসল।

— দেখলে, মুন? তোমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস কারও নেই।

সে খামটা আবার পকেটে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বের হওয়ার আগে থেমে বলল,

— কাল রাত বারোটায় পুরোনো বটগাছটার কাছে এসো। একা। তোমার মায়ের শেষ চিঠিটা তখন তোমাকে দেব।

জাহিদ চিৎকার করে উঠলেন,

— মুন কোথাও যাবে না!

রাশেদ পেছনে না তাকিয়েই বলল,

— সেটা মুন নিজেই ঠিক করবে।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

আর মুনের মনে তখন একটাই সিদ্ধান্ত—

সে সত্যিটা জানবেই।

যত কষ্টই হোক, যত সম্পর্কই ভেঙে যাক।

ভাইবোনদের সন্দেহ

রাশেদ চলে যাওয়ার পর খানবাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

রোদ, আয়ান, মিম আর তৃষা কেউই বুঝতে পারছে না, হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটল যে বড়রা সবাই এত অস্থির হয়ে গেলেন।

রোদ ধীরে আয়ানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,

— ভাই, ব্যাপারটা কী? ওই লোকটা কে?

আয়ান নিচু গলায় বলল,

— জানি না।

রোদ চোখ ছোট করে তাকাল।

— তুমি মিথ্যা বলছ।

— কীভাবে বুঝলি?

— কারণ তুমি যখন মিথ্যা বলো, তখন ভ্রু কুঁচকে ফেলো।

আয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

— তোর কাজ নেই?

— আছে। কিন্তু পরিবারের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা আমার শখ।

পাশ থেকে মিম বলে উঠল,

— তোমার শখ যদি একটু কম হতো, তাহলে পৃথিবীটা শান্তিতে থাকত।

রোদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমার মতো মানুষ থাকলে গোয়েন্দাদের কাজই থাকত না।

তৃষা হেসে ফেলল।

কিন্তু মুন হাসল না।

সে চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

মিম সেটা লক্ষ করে তার পেছনে গেল।

ঘরে ঢুকে দেখল, মুন বিছানায় বসে ছবিটা হাতে নিয়ে আছে।

মিম পাশে বসে নরম গলায় বলল,

— মুন, কী হয়েছে? আমাকে বলবি না?

মুন ছবিটা বোনের হাতে দিল।

মিম ছবির পেছনের লেখাটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

— এটা কী?

— জানি না, আপু। কেউ আমাকে কিছু বলছে না।

মিম বোনের হাত ধরে বলল,

— তুই ভয় পাস না। যা-ই হোক, আমরা সবাই তোর পাশে আছি।

মুন চোখ মুছল।

— যদি সত্যিটা জানার পর আমাদের সম্পর্কই বদলে যায়?

মিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মুনকে জড়িয়ে ধরে বলল,

— সত্যি জানলে সম্পর্ক বদলাতে পারে, কিন্তু তোর প্রতি আমার ভালোবাসা বদলাবে না।

মুন বোনের কাঁধে মাথা রাখল।

কিন্তু তার মনের ভয়টা কিছুতেই কমল না।

কারণ সে জানে, এই রহস্যের সঙ্গে শুধু তার অতীত নয়—সমুদ্রের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে।

সমুদ্রের ঘরে

সমুদ্র নিজের ঘরে বসে পুরোনো ডায়েরিটা খুলে রেখেছে।

লাইব্রেরি থেকে পাওয়া ডায়েরিটা সে লুকিয়ে এনেছিল। এতক্ষণ পরিবারের সামনে কিছু বলতে পারেনি।

এবার সে ডায়েরির বাকি পাতাগুলো পড়তে শুরু করল।

একটি পাতায় লেখা—

“আজ জাহিদ আর আদনানের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বললাম। তারা মনে করছে, সবকিছু গোপন রাখলেই বিপদ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি কখনো চিরকাল লুকিয়ে থাকে না।

মেহজাবিন বলেছে, যদি তার কিছু হয়, তাহলে মুনকে যেন কখনো একা না ছাড়া হয়। কারণ মেয়েটার জীবন এমন এক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যার কথা সে নিজেও জানে না।”

সমুদ্রের বুক ধক করে উঠল।

পরের পাতাটা ছেঁড়া।

তার পরের পাতায় শুধু কয়েকটি শব্দ—

“রাশেদ ফিরে এলে প্রথমেই সে মুনকে খুঁজবে।”

সমুদ্র ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

কেন রাশেদ মুনকে খুঁজছে?

মুনের জন্মের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

আর কেন তার বাবা ও চাচা এই মানুষটাকে নিয়ে এত ভয় পাচ্ছেন?

ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।

সমুদ্র ডায়েরিটা বালিশের নিচে লুকিয়ে বলল,

— কে?

দরজা খুলে মুন ভেতরে ঢুকল।

সমুদ্র তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে কেঁদেছে।

— কী হয়েছে?

মুন কোনো কথা না বলে সমুদ্রের সামনে ছবিটা রাখল।

সমুদ্র ছবিটা হাতে নিল।

— এটা কোথায় পেলি?

— রাশেদ দিয়েছে। ও বলেছে, আমার জন্মের সত্যি এই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সমুদ্র ছবিটার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকাল।

তারপর হঠাৎ ছবির এক কোণে একটা চিহ্ন দেখতে পেল।

ছোট্ট একটা অর্ধচন্দ্রের পাশে লেখা— “কে.এফ.”

সমুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,

— কে.এফ. মানে কী?

মুন মাথা নাড়ল।

— জানি না।

সমুদ্র ছবিটা আবার ঘুরিয়ে দেখল।

— মুন, তুই কি নিশ্চিত, রাশেদ সত্যি বলছে?

মুনের চোখে রাগ ফুটে উঠল।

— তাহলে সবাই কেন আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকাচ্ছে? বাবা কেন কিছু বলছে না? বড় চাচা কেন চিঠিটা পড়তে দিল না?

সমুদ্র চুপ করে রইল।

মুন ধীরে বলল,

— কাল রাতে আমি রাশেদের সঙ্গে দেখা করতে যাব।

সমুদ্র সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— তুই একা কোথাও যাবি না।

— কিন্তু—

— কোনো কিন্তু নয়। লোকটা কে, কী চায়, কিছুই জানি না। তুই একা গেলে বিপদ হতে পারে।

মুন বিরক্ত হয়ে বলল,

— তাহলে তুমি আমার সঙ্গে যাবে?

সমুদ্র একটু থেমে উত্তর দিল,

— হ্যাঁ। তবে আমরা আগে সবকিছু ভালোভাবে বুঝে নেব।

মুনের মুখে সামান্য স্বস্তি ফুটে উঠল।

সমুদ্র তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আর একটা কথা। তুই যত বড় রহস্যেই জড়িয়ে পড়িস না কেন, নিজেকে একা ভাববি না।

মুনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এই কথাটুকুর জন্যই সে হয়তো বারবার সমুদ্রের কাছে ফিরে আসে।

কিন্তু সমুদ্রের চোখে তখনও সে শুধু তার পরিবারের একজন সদস্য।

রাতের খাবারের টেবিলে

রাত আটটা।

সবাই ডাইনিং টেবিলে বসেছে।

কিন্তু আজ কারও মুখে স্বাভাবিক হাসি নেই।

রোদ কয়েকবার পরিবেশটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।

শেষ পর্যন্ত সে বলল,

— আচ্ছা, একটা কথা বলি? আমাদের বাড়িতে যদি এত রহস্য থাকে, তাহলে একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুললে কেমন হয়?

তৃষা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমাকে প্রথমেই গ্রেপ্তার করা হবে।

— কেন?

— কারণ তুমি সবকিছুতে নাক গলাও!

রোদ প্রতিবাদ করল,

— আমি নাক গলাই না, সত্যের সন্ধান করি!

মিম হেসে ফেলল।

কিন্তু জাহিদ খান টেবিলে চামচ নামিয়ে রাখতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।

তিনি মুনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— কাল রাতে তুই কোথাও যাবি না।

মুন শান্ত গলায় বলল,

— কেন, বাবা?

— কারণ আমি বলেছি।

— কিন্তু আমি বড় হয়েছি। নিজের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার আছে।

আদনান এবার কঠোর গলায় বললেন,

— মুন, বড়দের কথা শোন।

মুন বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

— বাবা, আমি তোমাদের অসম্মান করতে চাই না। কিন্তু তোমরা যদি আমার মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে সত্যি কিছু জেনে থাকো, তাহলে সেটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার অধিকার তোমাদের নেই।

টেবিলের চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

সমুদ্র মুনের দিকে তাকাল।

আয়ান ধীরে মাথা তুলল।

রোদ আর মিমও আর কোনো কথা বলল না।

জাহিদ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— তুই বুঝতে পারছিস না, মুন। কিছু সত্যি জানলে মানুষ আর আগের মতো থাকতে পারে না।

মুনের চোখ ভিজে উঠল।

— তাহলে আমাকে অন্ধকারে রেখে কী লাভ? আমি তো ইতিমধ্যেই আগের মতো নেই!

কথাটা বলে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।

আদনান খান অসহায় চোখে মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সমুদ্রও উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু জাহিদ তাকে থামালেন।

— সমুদ্র, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।

সমুদ্র থেমে গেল।

জাহিদ ধীরে বললেন,

— মুনকে কাল রাতে রাশেদের সঙ্গে দেখা করতে দিবি না।

সমুদ্র সরাসরি উত্তর দিল,

— চাচা, মুনকে আটকানোর চেয়ে সত্যিটা বলে দেওয়া কি ভালো নয়?

জাহিদ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর নিচু গলায় বললেন,

— তুই জানিস না, কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে যায় না।

সমুদ্রের মনে হলো, এই কথার ভেতরেও একটা লুকানো স্বীকারোক্তি আছে।

হয়তো তার চাচারা নিজেরাও জানেন না, এই পরিবারের মধ্যে কে বন্ধু আর কে শত্রু।

মধ্যরাতের আগে

রাত এগারোটা পঞ্চাশ।

মুন নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

বাইরে চাঁদের আলোয় বাগানটা অদ্ভুত লাগছে। দূরে পুরোনো বটগাছটা দেখা যাচ্ছে।

তার ফোনে একটা বার্তা এল।

“আমি জানি, তুমি আসবে। এবার তোমাকে তোমার মায়ের শেষ চিঠিটা দেব। কিন্তু মনে রেখো, চিঠিটা পড়ার পর তুমি যাকে বাবা বলে ডাকো, তাকে নতুন করে চিনতে হবে।”

মুনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দ্রুত ফোনটা বন্ধ করল।

ঠিক তখন দরজায় মৃদু শব্দ হলো।

সমুদ্র ভেতরে ঢুকল।

— তৈরি?

মুন অবাক হয়ে তাকাল।

— তুমি জানলে কীভাবে?

সমুদ্র মুচকি হাসল।

— তোর মুখ দেখেই বুঝেছি। তুই এখনই বের হওয়ার পরিকল্পনা করছিস।

মুন একটু হেসে বলল,

— তুমি সব বুঝে যাও কীভাবে?

সমুদ্র কাঁধ ঝাঁকাল।

— কারণ তুই রহস্য লুকাতে পারিস না।

মুন মুখ বাঁকাল।

— আমি সব লুকাতে পারি!

— হ্যাঁ, অবশ্যই। বিশেষ করে যখন তুই রাগ করিস, তখন তোর মুখ দেখেই পুরো গ্রামের মানুষ বুঝে যায়।

মুন বিরক্ত হয়ে বালিশ ছুড়ে মারল।

সমুদ্র হেসে বালিশটা ধরে ফেলল।

কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— চল। তবে যা-ই ঘটুক, আমার কথা শুনবি।

মুন মাথা নাড়ল।

দুজন নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তারা জানত না, বাড়ির অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে জাহিদ খান তাদের চলে যেতে দেখছেন।

জাহিদের চোখে ভয়।

তিনি ফোন বের করে একটা নম্বরে কল করলেন।

— ওরা বের হয়েছে।

ওপাশ থেকে রাশেদের কণ্ঠ শোনা গেল।

— আমি জানতাম, মুন আসবে।

জাহিদ কাঁপা গলায় বললেন,

— রাশেদ, দয়া করে। মেয়েটার কোনো ক্ষতি কোরো না।

রাশেদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

— ক্ষতি আমি করব না, জাহিদ। কিন্তু সত্যিটা ওর কাছ থেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না।

কল কেটে গেল।

জাহিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

— ঈশ্বর, এবার যেন সবকিছু শেষ হয়ে যায়।

পুরোনো বটগাছের নিচে

রাত বারোটা।

মুন আর সমুদ্র বটগাছটার কাছে পৌঁছাতেই দেখতে পেল, একজন লোক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

রাশেদ।

তার হাতে একটি পুরোনো খাম।

মুন সামনে এগিয়ে গেল।

— আমার মায়ের চিঠি দিন।

রাশেদ খামটা তার হাতে দিল।

— পড়ো।

মুন কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

“আমার মুন,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব সত্যিটা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

তুই আমার মেয়ে। আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

কিন্তু তোর জন্মের আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে আমাদের পরিবারের সব সম্পর্ক বদলে গিয়েছিল।

আমি চাইনি তুই সেই ঘটনার শাস্তি পাস।

তোর বাবা তোকে ভালোবাসে। কিন্তু তোর বাবারও কিছু ভুল আছে। আর সেই ভুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে তুই হয়তো নিজের পরিবারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সদস্য বলে জানিস।

তাকে প্রশ্ন করিস—সেই রাতে সে কোথায় ছিল?

আর মনে রাখিস, মুন—রক্তের সম্পর্ক সব সময় সত্যি বলে না। কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের মানুষটাই সবচেয়ে বড় সত্যি লুকিয়ে রাখে।”

চিঠিটা পড়ে মুনের চোখ ভিজে গেল।

— সেই রাতে কী হয়েছিল? কে আমার জন্মের সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে?

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— তোমার জন্মের আগে তোমার মায়ের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার সাক্ষী ছিল তোমার বাবা, জাহিদ আর আরও একজন মানুষ।

সমুদ্র দ্রুত প্রশ্ন করল,

— সেই মানুষটা কে?

রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই পেছন থেকে শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ শোনা গেল।

তিনজন একসঙ্গে ঘুরে তাকাল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

তার মুখটা দেখে মুনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

— বাবা!

আদনান খান দাঁড়িয়ে আছেন।

কিন্তু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় মানুষটিকে দেখে সমুদ্রও স্তব্ধ হয়ে গেল।

লোকটিকে সে আগে দেখেছে।

পুরোনো ছবিতে।

তার মায়ের পাশে।

আর সেই লোকটিকে এত বছর ধরে মৃত বলে বিশ্বাস করা হয়েছিল।

লোকটা ধীরে মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— অবশেষে তোমার সঙ্গে দেখা হলো, মুন।

রাশেদ এক পা পিছিয়ে গেল।

আদনান খানের মুখ ফ্যাকাশে।

সমুদ্র অবিশ্বাসের চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— আপনি... এত বছর পর?

লোকটা মৃদু হাসল।

— হ্যাঁ, সমুদ্র। আমি ফিরে এসেছি।

তারপর সে মুনের দিকে তাকিয়ে এমন একটা কথা বলল, যা শুনে মুনের হাত থেকে চিঠিটা মাটিতে পড়ে গেল।

— মুন, তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্যিটা জানতে চাইলে প্রথমে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো, সেই রাতে তিনি কাকে বাঁচিয়েছিলেন—তোমার মাকে, নাকি অন্য কাউকে?

চলবে...!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন