### অপূর্ণ ছায়া
পর্ব ১৩: সত্যের দরজায়
জাহিদ খান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বললেন,
— মুন! দরজাটা খোল। ভেতরে কার সঙ্গে কথা বলছিস?
মুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষটি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার মুখটা এখনো অন্ধকারে ঢাকা।
— দরজা খুললে সব শেষ হয়ে যাবে, মেহজাবিন। তোমার বাবা তোমাকে যে সত্যটা থেকে এত বছর দূরে রেখেছেন, সেটা জানার অধিকার তোমার আছে।
মুন কাঁপা গলায় বলল,
— আপনি কে? আমার মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?
লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে আবার জাহিদের কণ্ঠ শোনা গেল।
— মুন! শেষবারের মতো বলছি, দরজা খোল!
লোকটি মুনের হাতে একটা পুরোনো খাম দিয়ে বলল,
— এটা তোমার মায়ের শেষ চিঠি। পড়বে, কিন্তু এখনই কাউকে বিশ্বাস করবে না।
মুন খামটা হাতে নিতেই লোকটি পাশের গোপন দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা খুলে গেল। জাহিদ, আদনান আর সমুদ্র ভেতরে ঢুকল।
— এখানে কে ছিল? — জাহিদ প্রশ্ন করলেন।
মুন চুপ করে রইল।
সমুদ্র মুনের হাতে খামটা দেখে বলল,
— এটা কী?
— কিছু না।
— মুন, আমার কাছেও লুকাবি?
মুন চোখ নামিয়ে বলল,
— সবাই তো কিছু না কিছু লুকাচ্ছে। আমি আর কাকে বিশ্বাস করব?
আদনান মেয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— তোর বাবা তোকে কখনো কষ্ট দিতে চায়নি, মা।
মুন এবার সরাসরি বাবার চোখে তাকাল।
— তাহলে সত্যিটা বলো। আমি আসলে কে? আমার জন্মের আগে কী হয়েছিল?
ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আদনান কোনো উত্তর দিলেন না।
সকালের খান বাড়ি
— রোদ ভাইয়া! আমার নাশতার ডিমটা কে খেয়েছে?
আয়ান আদনানের মুখে হাসি চেপে বলল,
— ডিম কি নিজে নিজে উড়ে গেছে?
রোদ বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোর দিকে তাকালেই আমার সন্দেহ হয়।
— সন্দেহ করার জন্য ধন্যবাদ। তবে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করা অপরাধ!
মিম হেসে উঠল। তৃষা পাশে বসে বলল,
— এই বাড়িতে রহস্যের চেয়ে ডিমের রহস্য বেশি!
সমুদ্র চুপচাপ বসে ছিল। মুনকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সে বলল,
— তোর শরীর ঠিক আছে?
— হ্যাঁ।
— রাতে ঘুমিয়েছিস?
— তোমার জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে নাশতা করতে পারি?
সমুদ্র কিছুটা অবাক হলো। মুন সাধারণত এভাবে কথা বলে না।
তৃষা ফিসফিস করে মিমকে বলল,
— আজকে মনে হচ্ছে কারও মেজাজের ওপর রহস্যের ছায়া পড়েছে!
পুরোনো চিঠি
নিজের ঘরে ফিরে মুন দরজা বন্ধ করল। তারপর খামটা খুলে চিঠি বের করল।
চিঠিতে লেখা—
“আমার ছোট্ট মেহজাবিন,
তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছিস।
তোর জন্মের আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে আমাদের পরিবারের সবাই বদলে গিয়েছিল। সেদিন একজনকে বাঁচানোর জন্য আরেকজনকে হারাতে হয়েছিল।
তোর বাবা তোকে ভালোবাসে। কিন্তু সে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার মূল্য আজও আমাদের সবাইকে দিতে হচ্ছে।
আর একটা কথা মনে রাখিস—যাকে সবাই মৃত বলে জানে, সে হয়তো কখনোই মারা যায়নি।
সত্যিটা জানতে চাইলে পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরটা খুঁজে দেখিস।
— তোর মা।”
চিঠিটা পড়ে মুনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
— একজনকে বাঁচানোর জন্য আরেকজনকে হারাতে হয়েছিল!
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
“চিঠিটা পেয়েছ? এবার উত্তর দিকের ঘরে যাও। সেখানে এমন একজনের ছবি পাবে, যাকে তোমার বাবা আজও ভয় পান।”
উত্তর দিকের ঘর
বিকেলে সমুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে মুন পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে গেল।
ঘরটা অনেক দিন ধরে বন্ধ। দরজা খুলতেই ধুলোর গন্ধে দুজনেরই কাশি শুরু হলো।
সমুদ্র বলল,
— তোর রহস্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে একদিন আমার হাঁপানি হয়ে যাবে!
মুন বলল,
— তুমি না এলেও পারতে।
— আর তুই একা একা এখানে এসে বিপদে পড়লে আমি বাড়িতে বসে পায়েস খাব?
মুন হালকা হাসল।
ঘরের ভেতর পুরোনো আলমারি, কয়েকটা বাক্স আর দেয়ালে ঝোলানো ছবি। মুন একটা বাক্স খুলতেই বেশ কিছু পুরোনো ছবি পেল।
একটা ছবিতে আদনান, জাহিদ এবং তাদের দুই স্ত্রীর সঙ্গে আরও একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবির পেছনে লেখা—
“সেই রাতের পাঁচজন সাক্ষী।”
সমুদ্র ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
— এই নারীকে আমি আগে কখনো দেখিনি।
মুন ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিন্তু আমি তাকে চিনি।
— কীভাবে?
— আমার ছোটবেলার একটা ছবিতে এই নারীর মতো কাউকে দেখেছিলাম।
ঠিক তখনই বাক্সের ভেতর একটা ছোট ডায়েরি পাওয়া গেল।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“মেহজাবিনের জন্মের সত্যিটা যদি কখনো প্রকাশ পায়, তাহলে আদনান সব হারাবে।”
মুনের হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সমুদ্র দ্রুত ধরে ফেলল।
— মুন, শান্ত হ। আগে পুরোটা পড়ি।
ডায়েরির পরের পাতাগুলো ছেঁড়া। শুধু শেষ পাতায় একটা নাম লেখা—
রাশেদ।
অন্যদিকে—
জাহিদ খান নিজের ঘরে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে সেই পুরোনো ছবিটা।
আদনান ঘরে ঢুকে বললেন,
— মুন চিঠিটা পেয়েছে?
জাহিদ মাথা নাড়লেন।
— শুধু চিঠি নয়। উত্তর দিকের ঘরেও গেছে।
আদনান চমকে উঠলেন।
— তাহলে ও ডায়েরিটাও পেয়ে গেছে?
— হ্যাঁ। আর ডায়েরিতে রাশেদের নাম আছে।
আদনান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— এবার আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখা যাবে না, ভাই।
জাহিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— সত্যি বলার আগে আমাদের জানতে হবে, সেই রাতে আসলে কাকে বাঁচানো হয়েছিল।
ঠিক তখনই জাহিদের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— জাহিদ সাহেব, আপনারা যতই চেষ্টা করুন, মেহজাবিন সত্যিটা জানবেই।
জাহিদ চিৎকার করে বললেন,
— তুমি কী চাও?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— আমি শুধু চাই, মুন জানুক তার আসল পরিচয়। আর এবার তাকে কেউ থামাতে পারবে না।
কল কেটে গেল।
রাত গভীর হলে মুনের ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
“তোমার জন্মের সত্যিটা জানার আগে তোমাকে জানতে হবে—সেদিন তোমার মায়ের সঙ্গে আর কে নিখোঁজ হয়েছিল।”
মুন অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরির শেষ পাতাটা উল্টাতেই সেখানে ছোট্ট একটি লাইন চোখে পড়ল—
“মেহজাবিন নয়, আসল রহস্য লুকিয়ে আছে সেই শিশুটির পরিচয়ে।”
মুনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
তাহলে এতদিন যে সত্যের পেছনে ছুটছে, সেটাই কি আসল সত্য নয়?
চলবে...!!