লেখিকা: আরফা আইরিশা
### অপূর্ণ ছায়া
### পর্ব ১৪: পরিচয়ের আড়ালে অচেনা সত্য
পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরটায় দাঁড়িয়ে আছে মুন আর সমুদ্র। ঘরের ভেতর ধুলোমাখা আসবাবপত্র, পুরোনো ছবি আর অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা।
মুনের হাতে ধরা সেই ছবিটা। ছবিতে চারজন মানুষ—জাহিদ খান, মুনের মা, একজন অচেনা নারী এবং আরেকজন পুরুষ।
সমুদ্র ছবিটা ভালো করে দেখে বলল,
—মুন, এই ছবির মানুষগুলোকে তুমি চিনতে পারছ?
মুন মাথা নাড়ল।
—বাবাকে চিনতে পারছি। মাকেও চিনতে পারছি। কিন্তু বাকি দুজনকে কখনো দেখিনি।
—তাহলে তোর মায়ের ডায়েরিতে তাদের নাম কেন আছে, সেটা জানতে হবে।
মুন ছবির পেছনটা উল্টে দেখল। সেখানে কাঁপা হাতে লেখা—
“যেদিন মেহজাবিন নিজের জন্মের সত্যিটা জানবে, সেদিন অনেক সম্পর্কের মুখোশ খুলে যাবে।”
মুনের হাত কেঁপে উঠল।
—সমুদ্র, আমার জন্মের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী?
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, কেউ ইচ্ছা করেই তোকে সত্যিটা জানতে দিতে চাইছে না।
মুন ছবিটা ব্যাগে রেখে বলল,
—আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করব।
সমুদ্র তার দিকে তাকাল।
—প্রস্তুত থাকিস। উত্তরটা হয়তো তোর পছন্দ হবে না।
মুন মৃদু হেসে বলল,
—সত্যি যত কঠিনই হোক, এবার আর পালাব না।
সকালে খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রোদ আর আয়ানের মধ্যে ঝগড়া চলছে।
রোদ বলল,
—আয়ান, তোর প্লেট থেকে ডিমটা আমি নেব।
আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—নিজের প্লেটে খাবার নেই?
—আছে। কিন্তু তোরটা বেশি সুস্বাদু মনে হচ্ছে।
আয়ান ডিমটা নিজের প্লেটের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
—আমার প্লেটের খাবারের প্রতি তোর এত ভালোবাসা কেন?
মিম হেসে বলল,
—কারণ রোদের নিজের খাবারের প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই।
তৃষা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
—ওর বিশ্বাস শুধু অন্যের প্লেটের ওপর!
সবাই হেসে উঠল।
রোদ বিরক্ত হয়ে বলল,
—এই বাড়িতে আমার কোনো সম্মান নেই।
মুন চুপচাপ বসে ছিল। তার মন অন্য কোথাও।
সমুদ্র পাশের চেয়ারে বসে বলল,
—কী হয়েছে? সকাল থেকে এত চুপ কেন?
মুন উত্তর দিল না।
সমুদ্র আবার বলল,
—নাশতা কর। গোয়েন্দাগিরি করতে হলে শক্তি লাগবে।
মুন চোখ তুলে তাকাল।
—তুমি কি সব সময় আমাকে বিরক্ত করার জন্যই জন্মেছ?
সমুদ্র হেসে বলল,
—হ্যাঁ, এটা আমার জন্মগত প্রতিভা।
মুনও হালকা হাসল। কিন্তু তার মনে তখনও সেই ছবির কথাগুলো ঘুরছে।
নাশতার পর মুন সোজা আদনান খানের ঘরে গেল।
আদনান তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।
—বাবা, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
আদনান মাথা তুলে তাকালেন।
—বলো মা।
মুন ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে টেবিলে রাখল।
ছবিটা দেখেই আদনানের মুখের রং বদলে গেল।
—এটা কোথায় পেয়েছিস?
—পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে। বাবা, এই মানুষগুলো কারা?
আদনান ছবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
—পুরোনো ছবি। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
মুন এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—আমার জন্মের সত্যিটা কী, বাবা?
আদনান চমকে উঠলেন।
—কী বলছিস তুই?
—আমি জানতে চাই, আমার জন্মের সঙ্গে এই ছবির সম্পর্ক কী! মায়ের ডায়েরিতে আমার নাম কেন লেখা? সবাই আমার কাছ থেকে কী লুকাচ্ছে?
আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—মুন, তুই আমার মেয়ে। এই সত্যিটা কখনো বদলাবে না।
—আমি শুধু এই উত্তরটা চাইনি, বাবা।
আদনান মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—সব কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
মুনের চোখ ভিজে উঠল।
—তাহলে আমাকেও কি সবাই মিথ্যার মধ্যে বাঁচতে বলবে?
কথাটা বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদনান ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
—আর কতদিন লুকিয়ে রাখব তোকে, মেহজাবিন?
অন্যদিকে জাহিদ খান নিজের ঘরে বসে ছিলেন। সামনে বসে আছেন আদনান।
জাহিদ নিচু স্বরে বললেন,
—মুন ছবিটা পেয়ে গেছে?
আদনান মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। আজ আমাকে সরাসরি তার জন্মের কথা জিজ্ঞেস করেছে।
জাহিদ চিন্তিত হয়ে বললেন,
—এভাবে আর কতদিন চলবে?
—আমি জানি না, ভাই। কিন্তু সত্যিটা জানলে মুন শুধু আমাকে নয়, হয়তো পুরো পরিবারকেই প্রশ্ন করবে।
জাহিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—রাশেদ ফিরে এসেছে। এবার আর কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আদনান নিচু গলায় বললেন,
—রাশেদ শুধু সত্যি প্রকাশ করতে চায় না। তার পেছনে আরও কেউ আছে।
ঠিক তখনই জাহিদের ফোনে একটি মেসেজ এল।
“মেয়েটিকে আর আটকে রাখতে পারবেন না। তার পরিচয়ের সত্যি এবার প্রকাশ হবেই।”
জাহিদ ফোনটা শক্ত করে ধরে রইলেন।
বিকেলে মুন নিজের ঘরে বসে মায়ের পুরোনো ডায়েরি পড়ছিল।
হঠাৎ ডায়েরির শেষের দিকে ভাঁজ করা একটি কাগজ পেল।
কাগজে লেখা—
“মেহজাবিন, যদি কোনোদিন তুই নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করিস, তাহলে উত্তর খুঁজবি সেই রাতের মধ্যে। যেদিন তোর জন্ম হয়েছিল, সেদিন শুধু একজন শিশুর জন্ম হয়নি, জন্ম হয়েছিল এক ভয়ংকর গোপন সত্যের। তোর বাবা তোকে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসার আড়ালেও কিছু অপরাধ লুকিয়ে থাকে।”
মুনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে পরিচিত সেই কণ্ঠ।
—চিঠিটা পেয়েছ, মেহজাবিন?
মুন চমকে উঠল।
—আপনি কে? আমার নাম জানেন কীভাবে?
লোকটি হালকা হেসে বলল,
—তোমার নাম শুধু আমি জানি না। তোমার জন্মের দিন কী ঘটেছিল, সেটাও জানি।
—তাহলে সব বলুন!
—সব জানতে চাইলে আজ রাত বারোটায় পুরোনো বটগাছের কাছে এসো।
—আমি একা আসব না।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তাহলে তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো, তোমার জন্মের রাতে তিনি কাকে বাঁচিয়েছিলেন।
কল কেটে গেল।
মুনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
রাত সাড়ে এগারোটা।
মুন চুপচাপ নিজের ঘর থেকে বের হলো। কিন্তু দরজার বাইরে সমুদ্র দাঁড়িয়ে ছিল।
—কোথায় যাচ্ছিস?
মুন থমকে গেল।
—তুমি এখানে?
—প্রশ্নটা আমার করার কথা। এত রাতে কোথায় যাচ্ছিস?
মুন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—পুরোনো বটগাছের কাছে। একজন আমার জন্মের সত্যি জানে বলে দাবি করেছে।
সমুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
—আর তুই একা যেতে চেয়েছিলি?
—আমি চাইনি তুমি আবার বিপদে পড়ো।
সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—বিপদের ভয়ে সত্যি খোঁজা বন্ধ করা যায় না। চল, একসঙ্গে যাই।
দুজনেই বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
পুরোনো বটগাছের নিচে পৌঁছাতেই দেখা গেল, একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ অন্ধকারে ঢাকা।
লোকটি মুনকে দেখে বলল,
—অবশেষে এলে, মেহজাবিন।
মুন এগিয়ে গেল।
—আপনি আমার জন্মের কথা জানেন?
লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।
—এখানে তোমার মায়ের লেখা শেষ চিঠি আছে। কিন্তু পড়ার আগে একটা কথা জানতে হবে।
—কী কথা?
লোকটি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার বাবা যাকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্মের রাতেই এই পরিবারের একজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল।
মুন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
—কিন্তু কে?
লোকটি খামটা মুনের হাতে দিয়ে বলল,
—যে মানুষটাকে তোমরা মৃত ভেবেছ, সে-ই তোমার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় সাক্ষী।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সমুদ্র ঘুরে তাকাতেই অন্ধকার থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
—মুন, চিঠিটা পড়ার আগে নিজের বাবাকে আরেকবার ভাবতে বলো। কারণ তোমার জন্মের সত্যিটা শুধু আদনান জানে না, জাহিদও জানে!
মুন ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হাতে ছিল তার মায়ের আরেকটি ছবি।
ছবির পেছনে লেখা—
“মেহজাবিন আমার মেয়ে নয়—এই কথাটা যে বলবে, সে-ই সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।”
মুনের হাত থেকে খামটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
চলবে....!!