লেখিকা: আরফা আইরিশা
### অপূর্ণ ছায়া
### পর্ব ১৫: মিথ্যার আড়ালে সত্য
রাতের অন্ধকারে পুরোনো বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার শেষ কথাগুলো বারবার মুনের কানে বাজছিল।
“মেহজাবিন আমার মেয়ে নয়—এই কথাটা যে বলবে, সে-ই সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।”
কথাটা মনে পড়তেই মুনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সমুদ্রও চুপচাপ। এতক্ষণে দুজনেই বুঝতে পেরেছে, এই রহস্যের সঙ্গে শুধু মুনের জন্মপরিচয় নয়, খান পরিবারের অতীতও জড়িয়ে আছে।
মুন কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—ভাইয়া, তুমি কি মনে করো আব্বু আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে?
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি জানি না, মুন। তবে একটা কথা জানি, এখনই কাউকে কিছু না জানিয়ে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
—কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছে করছে। আমি কে? আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল? আর ওই লোকগুলোই বা কারা?
—সব প্রশ্নের উত্তর একদিন পাবি। কিন্তু তার আগে আমাদের জানতে হবে, কার ওপর বিশ্বাস করা যায়।
মুন ছবিটা শক্ত করে ধরে রাখল। তারপর দুজন বাড়ির দিকে রওনা দিল।
সকালে খান বাড়িতে যথারীতি হইচই শুরু হয়ে গেছে।
রোদ ডাইনিং টেবিলে বসে একের পর এক পরোটা খাচ্ছে। তার পাশে আয়ান বসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। মিম আর তৃষা নিজেদের মধ্যে কী একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে।
রোদ হঠাৎ আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই আয়ান, তোর প্লেটের পরোটাটা খাবি?
আয়ান মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—না।
—তাহলে দে।
—না মানে খাব না, তা তো বলিনি!
রোদ বিরক্ত হয়ে বলল,
—তুই একটা পরোটা নিয়ে এমন করছিস, যেন তোর সম্পত্তি লিখে দিতে বলেছি!
মিম হেসে বলল,
—রোদ ভাইয়া, আপনার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—কী বললি?
তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—দেয়াল অন্তত পাল্টা ঝগড়া করে না!
টেবিলজুড়ে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামল মুন। তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। রাতের ঘুম যেন একেবারেই হয়নি।
মিম তাকে দেখে বলল,
—কী রে মুন? তোর মুখ এমন লাগছে কেন? সারারাত ভূতের সঙ্গে গল্প করেছিস নাকি?
মুন কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়ল।
রোদ বলল,
—ওকে দেখে তো মনে হচ্ছে ভূতই ওর সঙ্গে গল্প করতে এসে ভয় পেয়ে পালিয়েছে!
এবারও সবাই হেসে উঠল। কিন্তু মুন হাসল না।
সমুদ্র ডাইনিং রুমে ঢুকতেই রোদ বলে উঠল,
—ওই যে আমাদের রাতের পাহারাদার হাজির!
সমুদ্র অবাক হয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
—কিছু না। শুধু জানতে চাই, রাতে কোথায় ছিলি?
সমুদ্র স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
—নিজের ঘরে।
রোদ চোখ ছোট করে তাকাল।
—তোর ঘরে ছিলি, নাকি অন্য কারও ঘরের পাহারা দিচ্ছিলি?
সমুদ্র এবার রোদের দিকে এমনভাবে তাকাল যে সে আর কথা বাড়াল না।
মুন চুপচাপ খাবার খেতে লাগল। কিন্তু তার মনে একটাই প্রশ্ন—আব্বু কি সত্যিই সব জানেন?
খাওয়া শেষ করে মুন সোজা আদনান খানের ঘরের দিকে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ভেতরে উঁকি দিল। আদনান তখন কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।
মুনকে দেখে তিনি বললেন,
—কী হয়েছে মা? কিছু বলবি?
মুন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
—আব্বু, তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
—বল।
মুন ব্যাগ থেকে পুরোনো ছবিটা বের করল। ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো আদনানের সামনে ধরল।
আদনানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
তিনি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কয়েক সেকেন্ড পর নিচু স্বরে বললেন,
—এই ছবিটা তুই কোথায় পেলি?
—সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, ছবির পেছনে লেখা কথাটা সত্যি কি না।
আদনান কিছু বললেন না।
মুনের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
—আব্বু, তুমি কি আমাকে সত্যিটা বলবে না?
আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—মুন, তুই আমার মেয়ে। এই পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
—কিন্তু আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল?
আদনান এবার মুনের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব।
—সব কথা জানার সময় এখনো আসেনি।
মুন হতাশ হয়ে বলল,
—সবাই শুধু এই কথাটাই বলে! কেউ বলে না সত্যিটা কী!
—আমি তোকে কষ্ট দিতে চাই না, মা।
—কিন্তু না জানার কষ্টটা কি কম?
কথাটা বলে মুন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদনান ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।
খামের ওপর লেখা— “মেহজাবিনের জন্মের রাত।”
তিনি খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর আবার ড্রয়ারের ভেতর রেখে দিলেন।
অন্যদিকে জাহিদ খান নিজের ঘরে বসে ছিলেন। আদনান হঠাৎ সেখানে এসে দরজা বন্ধ করলেন।
জাহিদ তাকিয়ে বললেন,
—কী হয়েছে?
আদনান নিচু গলায় বললেন,
—মুন ছবিটা পেয়েছে।
জাহিদের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
—কোন ছবিটা?
—যেটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলাম।
জাহিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
—তুই ওকে কী বলেছিস?
—কিছুই না। কিন্তু ওর প্রশ্নগুলো এখন আর থামবে না।
জাহিদ জানালার বাইরে তাকালেন। কিছুক্ষণ পর বললেন,
—রাশেদকে খুঁজে বের করতে হবে।
আদনান অবাক হয়ে বললেন,
—রাশেদকে? এত বছর পর আবার ওর কাছে যাবি?
—আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা নেই। মুন যদি নিজের পরিচয় জানতে পারে, তাহলে শুধু ওর জীবন নয়, আমাদের সবার জীবন বদলে যাবে।
আদনান কিছুটা রেগে বললেন,
—কিন্তু আর কত দিন? একটা মেয়েকে নিজের পরিচয় থেকে দূরে রেখে আমরা কীভাবে শান্তিতে থাকব?
জাহিদ কোনো উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই তাঁর মোবাইলে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর থেকে পাঠানো হয়েছে।
“মেয়েটাকে থামানোর চেষ্টা করবেন না। সত্যি এবার তার কাছে পৌঁছাবেই। আর মনে রাখবেন, জন্মের রাতে যাকে বাঁচিয়েছিলেন, সে এখনো বেঁচে আছে।”
জাহিদের হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
আদনান দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে?
জাহিদ ফোনটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
মেসেজটা পড়ে আদনানের মুখও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—তাহলে সে বেঁচে আছে?
জাহিদ কঠিন গলায় বললেন,
—আমরা এত বছর ধরে যাকে মৃত ভেবেছি, সে যদি সত্যিই ফিরে আসে, তাহলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
বিকেলে মুন ছাদে বসে ছিল। হাতে সেই পুরোনো চিঠি। বাতাসে চুল উড়ছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
সমুদ্র ছাদে এসে পাশে দাঁড়াল।
—এখানে একা বসে আছিস কেন?
মুন চিঠিটা ভাঁজ করতে করতে বলল,
—সবাই আমার কাছ থেকে কিছু না কিছু লুকাচ্ছে।
সমুদ্র পাশে বসে বলল,
—সবাই হয়তো তোকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে চাইছে।
মুন তিক্ত হাসল।
—সত্যিটা জানলে যদি কষ্ট পাই, তাহলে কি মিথ্যার মধ্যে থাকলেই ভালো থাকব?
সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—তোর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি তোকে সাহায্য করব। তবে একটা কথা মনে রাখবি, যা-ই হোক, তুই একা নস।
মুন এবার একটু শান্ত হলো।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
মুন কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
—মেহজাবিন?
মুন চমকে উঠল।
—কে আপনি?
—তোমার মায়ের ব্যাপারে কিছু জানতে চাও?
মুন দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
—আপনি আমার মাকে চিনতেন?
নারীটি কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল,
—শুধু চিনতাম না। তোমার জন্মের রাতে আমি সেখানেই ছিলাম।
মুনের হাত কেঁপে উঠল।
—আপনি কে? কোথায় আছেন?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
—কাল বিকেল পাঁচটায় পুরোনো রেলস্টেশনের পাশে এসো। একা আসবে না। আর তোমার বাবাকে কিছু বলবে না।
কল কেটে গেল।
মুন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সমুদ্র তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কে ফোন করেছিল?
মুন ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে বলল,
—একজন নারী। তিনি নাকি আমার জন্মের রাতের সবকিছু জানেন।
সমুদ্রের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—কাল আমরা সেখানে যাব।
মুন মাথা নাড়ল।
কিন্তু তারা কেউই জানত না, ঠিক সেই সময় খান বাড়ির বাইরে একটি গাড়ি এসে থেমেছে।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটি ফোন বের করে কাউকে বলল,
—মেহজাবিনকে খবর দেওয়া হয়েছে। এবার সে সত্যিটা জানতে পারবে।
ওপাশ থেকে প্রশ্ন এল,
—তাহলে কি সবকিছু প্রকাশ করে দেবে?
লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল,
—না। এবার সত্যিটা প্রকাশ পাবে ঠিকই, কিন্তু তার আগে জানতে হবে—খান পরিবারের মধ্যে আসল অপরাধী কে।
গাড়ির জানালা দিয়ে খান বাড়ির দিকে তাকিয়ে লোকটি মৃদু হাসল।
তারপর বলল,
—কারণ এই পরিবারের সবচেয়ে বড় রহস্যটা এখনো কেউ জানে না।
চলবে...!!