🖤 নিষিদ্ধ অনুভূতি
পর্ব :২
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পরও মেহরিনের মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির ছিল।
নতুন প্রফেসর আরহান চৌধুরীর আচরণ সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। বিশেষ করে তার বাবার নাম শোনার পর আরহানের চোখের সেই বিস্ময়টা বারবার মনে পড়ছিল।
আচ্ছা, স্যার কি সত্যিই আব্বুকে চেনেন?
মেহরিন ব্যাগটা রেখে নিজের ঘরে ঢুকল। কিছুক্ষণ পর তার মা দরজার কাছে এসে বললেন,
— মেহরিন, কী হয়েছে মা? আজ তোকে একটু চিন্তিত লাগছে।
মেহরিন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আম্মু, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একজন প্রফেসর এসেছেন। আজ তিনি হঠাৎ আমাকে আব্বুর নাম জিজ্ঞেস করলেন।
মায়ের মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল।
— তোর আব্বুর নাম?
— হ্যাঁ, আম্মু। নামটা শুনে উনি কেমন যেন চুপ হয়ে গেলেন। মনে হলো, নামটা আগে থেকেই জানেন।
মা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললেন,
— হয়তো কোথাও পরিচয় আছে। এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করিস না। হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আমি খাবার দিচ্ছি।
মেহরিন আর কিছু বলল না। কিন্তু সে খেয়াল করল, তার মা কথাটা বলার পর দ্রুত ঘর থেকে চলে গেলেন।
মায়ের আচরণেও কি কিছু অস্বাভাবিক ছিল?
নাকি সবটাই তার ভুল ধারণা?
---
রাতের খাবারের পর মেহরিন তার বাবার ঘরে গেল। কামাল ইসলাম তখন একটি পুরোনো আলমারি গোছাচ্ছিলেন।
— আব্বু, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বল, মা।
— তুমি কি আরহান চৌধুরী নামে কাউকে চেনো?
নামটা শুনে কামাল ইসলামের হাত থেমে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে তাকালেন।
— কেন? এই নাম কোথায় শুনেছিস?
— উনি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রফেসর। আজ আমার নাম আর তোমার নাম শুনে কেমন যেন করছিলেন।
কামাল ইসলাম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— তুই পড়াশোনায় মন দে, মেহরিন। সব মানুষের ব্যাপারে জানার দরকার হয় না।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
— কিন্তু আব্বু, আমি তো শুধু জানতে চেয়েছি তুমি তাঁকে চেনো কি না!
কামাল ইসলাম আর উত্তর দিলেন না। তিনি আলমারির দরজা বন্ধ করে অন্যদিকে চলে গেলেন।
মেহরিনের মনে এবার সন্দেহ আরও গভীর হলো।
আরহান চৌধুরীর নাম শুনে আব্বুও এমন করলেন কেন?
---
রাত বাড়ল।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর কামাল ইসলাম নিজের ঘরে ফিরে এলেন। তিনি অনেকক্ষণ আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ভেতরের একটি পুরোনো বাক্স বের করলেন।
বাক্সের মধ্যে ছিল কিছু চিঠি, কয়েকটি কাগজ এবং একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটা হাতে নিয়ে তাঁর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
ছবিতে কয়েক বছর আগের কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ছবির এক পাশে তরুণ আরহান চৌধুরী।
কামাল ইসলামের চোখ আটকে গেল ছবির পেছনে লেখা একটি তারিখে।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
— এত বছর পর আবার সবকিছু সামনে আসছে কেন?
তিনি ছবিটা বাক্সে রেখে দিলেন। কিন্তু বাক্সের নিচে থাকা একটি চিঠি তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল।
চিঠির খামের ওপর লেখা ছিল—
“কামাল সাহেবের জন্য। বিষয়টি আরহানকে জানানো যাবে না।”
---
পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে—
মেহরিন ক্লাসে ঢুকে নিজের আসনে বসল। কিছুক্ষণ পর আরহান চৌধুরী এলেন।
প্রতিদিনের মতোই তাঁর পোশাক পরিপাটি, মুখ গম্ভীর। তিনি ক্লাস শুরু করলেন, যেন আগের দিনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
কিন্তু একবার চোখ তুলে মেহরিনের দিকে তাকাতেই তাঁর মনে পড়ে গেল পুরোনো ছবিটা।
ছবিতে থাকা মানুষগুলো।
কামাল ইসলাম।
আর সেই ঘটনা, যার কথা তিনি এত বছর কাউকে বলেননি।
ক্লাস শেষে মেহরিন বেরিয়ে গেলে আরহান নিজের ফোন বের করলেন। অচেনা নম্বরটিতে নতুন একটি মেসেজ এসেছে।
“পুরোনো ছবিটা এখনো কামাল সাহেবের কাছে আছে। আপনি সত্য জানতে চাইলে তাঁর বাড়িতে খোঁজ নিন।”
আরহানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
এবার তিনি আর অপেক্ষা করবেন না।
কিন্তু ঠিক তখনই ফোনে আরেকটি মেসেজ এল—
“সাবধান, স্যার। সত্য খুঁজতে গিয়ে মেহরিনের বিশ্বাস হারাবেন না।”
আরহান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মেহরিনের বিশ্বাস?
তার সঙ্গে মেহরিনের এমন কী সম্পর্ক, যা এখনো আরহান নিজেও জানে না?
তিনি জানতেন, এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে হলে তাঁকে অতীতের মুখোমুখি হতেই হবে।
আর সেই অতীতের দরজা খুলতে গেলে প্রথমেই সামনে আসবে কামাল ইসলাম।
রাতের নীরবতায় আরহানের ফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল অজানা নম্বর থেকে আসা সেই মেসেজ—
“পুরোনো ছবিটা এখনো কামাল সাহেবের কাছে আছে। আপনি সত্য জানতে চাইলে তাঁর বাড়িতে খোঁজ নিন।”
আরহান মেসেজটা বারবার পড়ল। এবার শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। তাকে জানতে হবে, কামাল ইসলাম আর তার পরিবারের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল।
পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই সে নিজের গাড়ির চালককে একটি ঠিকানা দিল।
“এই ঠিকানায় যেতে হবে।”
চালক ঠিকানাটা দেখে একবার আরহানের দিকে তাকালেও কোনো প্রশ্ন করল না।
কামাল ইসলামের বাড়িতে
সকাল তখন প্রায় দশটা।
গাড়ি থামতেই আরহান দেখল, বাড়িটা বেশ পুরোনো হলেও যত্নে রাখা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে কয়েক মুহূর্ত বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটার সঙ্গে তার অতীতের কোনো অজানা সম্পর্ক রয়েছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই একজন গৃহকর্মী বেরিয়ে এলেন।
“কাকে চাই?”“কামাল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমার নাম আরহান চৌধুরী।”
নামটা শুনে গৃহকর্মী কিছুটা থমকে গেলেন।
“আপনি একটু অপেক্ষা করুন।”
কিছুক্ষণ পর কামাল ইসলাম নিজেই দরজার কাছে এলেন। আরহানকে সামনে দেখে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“তুমি এখানে কেন এসেছ?”
আরহান শান্ত গলায় বলল, “আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
“যা বলার, ফোনেই বলতে পারতে।”
“কিছু কথা ফোনে বলা যায় না, কামাল সাহেব। বিশেষ করে যখন সেই কথাগুলোর সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক থাকে।”
কামালের চোখে মুহূর্তের জন্য উদ্বেগ ফুটে উঠল।
তিনি চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “ভেতরে এসো।”
যে প্রশ্নের উত্তর নেই
বসার ঘরে মুখোমুখি বসেছিল দুজন।
কামাল ইসলাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, “তোমার বাবা জানেন তুমি এখানে এসেছ?”
“জানেন না। আর আমি এখানে এসেছি, সেটাও তিনি হয়তো পছন্দ করবেন না।”
“তাহলে ফিরে যাও।”
আরহান অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
“আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন, নাকি এমন কিছু লুকাচ্ছেন যা আমি জেনে ফেলতে পারি?”
কামালের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“সবকিছু জানার অধিকার সবার থাকে না।”
“কিন্তু সত্যটা যদি আমার পরিবারের সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”
কামাল কিছুক্ষণ আরহানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“তোমাকে একটা কথা বলি, আরহান। অতীতের দরজা একবার খুললে, তার ভেতর থেকে শুধু উত্তর বেরিয়ে আসে না। এমন কিছু সত্যও বেরিয়ে আসে, যেগুলো মানুষ সারাজীবন লুকিয়ে রাখতে চায়।”
“আমি সেই সত্য জানতেই এসেছি।”
কামাল আর কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি পাশের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
আরহান বসে রইল। তার মনে হলো, কামাল তাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আচরণে এমন কিছু আছে যা সাধারণ অস্বীকারের চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
পুরোনো ফাইল
কামাল পাশের ঘরে গিয়ে আলমারির সামনে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর তিনি একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন। ফাইলটা খুলে ভেতরের কাগজগুলো দেখতেই তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
একটি কাগজের ওপর লেখা ছিল দুটি পরিবারের নাম।
চৌধুরী পরিবার।
ইসলাম পরিবার।
নাম দুটির নিচে কিছু পুরোনো তারিখ আর হাতে লেখা কয়েকটি বাক্য ছিল। কিন্তু ফাইলের শেষ পাতাটি ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।
কামাল চোখ বন্ধ করলেন।
এত বছর ধরে তিনি যে অতীতকে আড়াল করে রেখেছেন, সেই অতীত আবার ফিরে আসছে।
আর এবার তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরহান—যে কিছুই জানে না, অথচ যার জানার অধিকার সবচেয়ে বেশি হতে পারে।
তিনি ফাইলটি আবার বন্ধ করে দিলেন।
“এখনই নয়,” মনে মনে বললেন তিনি। “এখনই সত্যটা বলা যাবে না।”
মেহরিনের অজানা প্রশ্ন
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেহরিন ক্লাসে বসে বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেও মনোযোগ দিতে পারছিল না।
সায়রা পাশে বসে ফিসফিস করে বলল, “কী হয়েছে তোর? আজ এত চুপচাপ কেন?”
মেহরিন বই বন্ধ করল।
“জানিস, আরহান স্যার আবার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।”
“তোর বাবাকে উনি চেনেন নাকি?”
“আমি জানি না। কিন্তু বাবার নাম শুনলেই সবাই এমন আচরণ করে, যেন নামটার পেছনে কোনো বড় রহস্য আছে।”
সায়রা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তুই তোর মাকে জিজ্ঞেস করেছিস?”
“করেছি। কিন্তু কেউই আমাকে কিছু বলতে চায় না।”
মেহরিন জানালার বাইরে তাকাল। তার মনে হচ্ছিল, তার নিজের জীবন সম্পর্কে এমন কিছু লুকানো আছে, যা সবাই জানে—শুধু সে জানে না।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“তোমার বাবাকে নিয়ে বেশি প্রশ্ন কোরো না, মেহরিন। সব সত্য তোমার জন্য নিরাপদ নয়।”
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
প্রেরকের নাম নেই। নম্বরটাও তার পরিচিত নয়।
সে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজটির স্ক্রিনশট নিল। তারপর চারপাশে তাকাল। ক্লাসের সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত।
কেউ কি তাকে লক্ষ্য করছে?
নাকি কেউ দূরে বসে তার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর রাখছে?
শেষ দৃশ্য
কামাল ইসলামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরহান গাড়িতে উঠল। সে কোনো পুরোনো ছবি বা চিঠি হাতে পায়নি, কিন্তু কামালের আচরণ তাকে নিশ্চিত করেছে—এই রহস্যের উত্তর সত্যিই তাঁর কাছে আছে।
হঠাৎ ফোনে আরেকটি মেসেজ এল।
“কামাল সাহেবের বাড়িতে গিয়েছিলেন, স্যার? তাহলে বুঝতেই পারছেন, সত্যটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা এখনো চলছে।”
আরহান দ্রুত উত্তর দিল—
“আপনি যা জানেন, সরাসরি বলুন।”
উত্তর এল—
“সরাসরি বলার সময় এখনো আসেনি। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—আপনার বাবা এই গল্পের বাইরের কেউ নন।”
আরহানের আঙুল ফোনের পর্দায় স্থির হয়ে গেল।
তার বাবা?
এতক্ষণ সে ভেবেছিল, রহস্যটা শুধু কামাল ইসলামকে ঘিরে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার নিজের পরিবারও সেই রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে।
আর অন্যদিকে, মেহরিনও অজানা নম্বর থেকে হুমকির মতো একটি বার্তা পেয়েছে।
দুজনের অজান্তেই কেউ তাদের জীবনকে একই রহস্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু সেই অচেনা মানুষটি কে? আর কেন সে মেহরিন ও আরহান—দুজনকেই সত্য থেকে দূরে রাখতে চাইছে?
চলবে…