নিষিদ্ধ অনুভূতি
পঞ্চম পর্ব: বাবার গোপন অধ্যায়
লেখিকা: জান্নাত জাহান
শেষ মেসেজটা পাওয়ার পর থেকে আরহান চৌধুরীর মাথায় একটি কথাই ঘুরছিলো -
এত বছর ধরে যে অতীতকে সে ভুলে থাকতে চেয়েছে, সেই অতীতই যেন আবার তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, মেহরিনের ফোনে আসা সতর্কবার্তাটাও তাকে ভাবিয়ে তুলেছে।
“তোমার বাবাকে নিয়ে বেশি প্রশ্ন কোরো না, মেহরিন। সব সত্য তোমার জন্য নিরাপদ নয়।”
একই রহস্যের মধ্যে দুজন জড়িয়ে পড়েছে। অথচ কেউই জানে না, অন্যজন ঠিক কতটা সত্য জানে।
পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই আরহান তার বাবাকে ফোন করল।
— বাবা, তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— কী কথা?
— কামাল ইসলামকে তুমি কত বছর ধরে চেনো?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর তার বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
— কারণ তাঁর নাম আবার আমার জীবনে ফিরে এসেছে। আর এবার আমি সত্যটা জানতে চাই।
— আরহান, অতীতের সব দরজা খুলতে নেই।
আরহান জানালার বাইরে তাকাল।
— দরজা বন্ধ রাখলেই কি অতীত হারিয়ে যায়, বাবা?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। কিছুক্ষণ পর ফোন কেটে গেল।
আরহান বুঝতে পারল, তার বাবা উত্তর জানেন। কিন্তু সেই উত্তর দিতে চান না।
সে নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিল, এবার আর থামবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে আরহান যথারীতি ক্লাস নিতে শুরু করল।
মেহরিন সামনের দিকের একটি আসনে বসে নোট লিখছিল। সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো তাকে অস্থির করে তুলেছিল।
ক্লাসের মাঝখানে আরহান একটি প্রশ্ন করল। কয়েকজন উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সঠিক উত্তর দিতে পারল না।
মেহরিন হাত তুলে উত্তর দিল।
আরহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— সঠিক উত্তর। ভালো।
কথাটা ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু মেহরিন লক্ষ করল, আজ আরহানের কণ্ঠে আগের মতো কঠোরতা নেই।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই বেরিয়ে গেল। মেহরিন নিজের বইগুলো গুছিয়ে দরজার দিকে এগোতেই আরহান বলল,
— মিস ইসলাম, এক মিনিট সময় হবে?
মেহরিন থেমে গেল।
— জি, স্যার?
আরহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— গত কয়েক দিনে তোমাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। কোনো সমস্যা হয়েছে?
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল। সে ভাবেনি, আরহান তার পরিবর্তন লক্ষ করেছে।
— না, স্যার। তেমন কিছু না।
— নিশ্চিত?
মেহরিন মৃদু হাসল।
— সব প্রশ্নের উত্তর তো আর সব সময় দেওয়া যায় না, স্যার।
কথাটা শুনে আরহান থমকে গেল। মনে হলো, মেয়েটি অজান্তেই তার নিজের মনের কথাটা বলে ফেলেছে।
— ঠিক বলেছ।
মেহরিন চলে যাওয়ার জন্য ঘুরল।
ঠিক তখন আরহান বলল,
— আর একটা কথা, মেহরিন।
সে ফিরে তাকাল।
— কোনো অচেনা মানুষ যদি তোমাকে তোমার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলে, আগে যাচাই করবে। সবাই সত্যি বলছে বলে দাবি করলেই তাদের বিশ্বাস করতে নেই।
মেহরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— আপনি কি জানেন, কেউ আমাকে মেসেজ পাঠাচ্ছে?
আরহান এবার সত্যিই অবাক হলো।
— কী ধরনের মেসেজ?
মেহরিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
— আমার বাবাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছে কেউ।
আরহানের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
— মেসেজগুলো আমাকে দেখাতে পারবে?
মেহরিন ফোন বের করল। কিন্তু মেসেজ দেখানোর আগেই থেমে গেল।
— আপনি কি সত্যিই আমাকে সাহায্য করতে চান, স্যার? নাকি আপনিও কিছু লুকাচ্ছেন?
প্রশ্নটা আরহানকে চুপ করিয়ে দিল।
মেহরিন আর অপেক্ষা করল না। সে চলে গেল।
আরহান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, সত্য লুকিয়ে রাখতে গিয়ে সে হয়তো এমন একজনের বিশ্বাস হারাচ্ছে, যার বিশ্বাস তার কাছে অপ্রত্যাশিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় আরহান বাড়ি ফিরে সরাসরি তার বাবার স্টাডি রুমে গেল।
ঘরটিতে পুরোনো বই, কয়েকটি কাঠের আলমারি আর বাবার বহু বছরের সংগ্রহ রাখা ছিল।
ছোটবেলায় এই ঘরে ঢোকা তার জন্য নিষেধ ছিল। বাবার সেই নিষেধের কারণ সে কখনো জানতে পারেনি।
আজ ঘরটা ভালো করে দেখতে গিয়ে তার চোখ পড়ল টেবিলের নিচের একটি ছোট ড্রয়ারে। ড্রয়ারটিতে তালা লাগানো।
আরহান বাবার পুরোনো কাগজপত্রের বাক্স খুলল। সেখানে কিছু নথি, পুরোনো চাবি আর একটি চামড়ার খাম পেল।
খামের ভেতরে একটি চাবি ছিল।
চাবিটি ড্রয়ারের তালায় লাগতেই সেটি খুলে গেল।
ভেতরে রাখা ছিল একটি পুরোনো ডায়েরি, একটি সিল করা খাম এবং কয়েকটি হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ।
ডায়েরির প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখা—
“কিছু সিদ্ধান্ত মানুষ নিজের ইচ্ছায় নেয় না। পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে।”
আরহান পাতা উল্টাতে লাগল।
একটি পাতায় এসে তার হাত থেমে গেল।
সেখানে লেখা—
“কামালকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমাকে সারাজীবন বহন করতে হবে। কিন্তু একদিন এই প্রতিশ্রুতিই দুই পরিবারের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে।”
আরহানের বুকের ভেতর চাপা উত্তেজনা তৈরি হলো।
দুই পরিবার? কোন প্রতিশ্রুতি? আর মেহরিনের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?
সে সিল করা খামটি হাতে নিল। খামের ওপরে লেখা ছিল—
“সময় না আসা পর্যন্ত খোলা যাবে না।”
আরহান খামটি খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
দরজায় তার বাবা।
বাবার দৃষ্টি সরাসরি খামটির ওপর গিয়ে পড়ল।
— তুমি এই ঘরে কী করছ, আরহান?
আরহান এবার আর পিছিয়ে গেল না।
— সত্য খুঁজছি, বাবা।
তার বাবা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন।
— সব সত্য জানার পরও মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে না।
আরহান খামটি টেবিলে রাখল।
— সত্য না জেনে যে অশান্তিতে আছি, তার চেয়ে বেশি অশান্তি আর কী হবে?
তার বাবা দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু খামটি খুলতে দিলেন না।
— এখনো সময় হয়নি।
এই একই কথা শুনতে শুনতে আরহান ক্লান্ত।
সে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— তাহলে আমাকে অন্তত বলো, মেহরিনের পরিবারকে ঘিরে কী ঘটেছিল?
বাবার মুখের রং বদলে গেল।
সেই প্রতিক্রিয়াই আরহানকে বুঝিয়ে দিল, সে ঠিক জায়গায় হাত দিয়েছে।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে মেহরিন একা বসে ছিল।
তার সামনে বই খোলা, কিন্তু পড়ায় মন বসছিল না।
হঠাৎ টেবিলের পাশে একটি বই এসে রাখা হলো।
মেহরিন মুখ তুলে দেখল, আরহান দাঁড়িয়ে আছে।
— এই বইটা তোমার কাজে লাগতে পারে। গত ক্লাসে যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, তার বিস্তারিত এখানে আছে।
মেহরিন বইটি নিল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
আরহান চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই মেহরিন ডাকল,
— স্যার?
— বলো।
— আপনি কি আমার বাবার সঙ্গে কোনোদিন খারাপ কিছু করেছিলেন?
প্রশ্নটা শুনে আরহান স্থির হয়ে গেল।
তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
— আমি তোমার বাবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কখনো কোনো খারাপ আচরণ করিনি। কিন্তু আমাদের পরিবারের অতীতে কী ঘটেছে, তার সবটা এখনো আমি জানি না।
মেহরিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আরহানের কথায় পুরো সত্য ছিল কি না, সে নিশ্চিত হতে পারল না। কিন্তু এই প্রথম আরহান নিজের অজানা থাকার কথাটা স্বীকার করল।
— তাহলে আপনিও উত্তর খুঁজছেন?
— হ্যাঁ।
— আমিও।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
সেই দৃষ্টিতে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। ছিল না অকারণ ঘনিষ্ঠতাও।
ছিল শুধু একটি অদ্ভুত উপলব্ধি—তারা দুজনেই এমন একটি রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরু তাদের জন্মেরও আগে।
আরহান মৃদু স্বরে বলল,
— সাবধানে থেকো, মেহরিন।
মেহরিন এবার চোখ সরিয়ে নিল।
— আপনিও, স্যার।
আরহান চলে যাওয়ার পর মেহরিন বইটি খুলল।
প্রথম পাতার ভেতরে একটি ছোট কাগজ রাখা ছিল।
কাগজটিতে লেখা—
“যদি সত্য জানতে চাও, তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো ১৭ই নভেম্বরের রাতের কথা।”
মেহরিনের হাত থেমে গেল।
১৭ই নভেম্বর।
তার জন্মের আগের কোনো তারিখ? নাকি এমন একটি রাত, যার কথা তার বাবা কখনো বলেননি?
সে কাগজটি ব্যাগে রেখে দিল।
এবার তাকে বাবার সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
সেই রাতেই আরহান আবার অচেনা নম্বর থেকে একটি মেসেজ পেল।
“আপনি সঠিক পথে এগোচ্ছেন, স্যার। কিন্তু সাবধান—আপনার বাবা শুধু একটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন না। তিনি এমন একজনকে রক্ষা করছেন, যার পরিচয় জানলে আপনি নিজেই সবকিছু বদলে দিতে চাইবেন।”
আরহান দ্রুত উত্তর দিল,
“কে সেই মানুষ?”
মেসেজটি দেখা হলো। কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি মেসেজ এল—
“আগামীকাল ১৭ই নভেম্বরের পুরোনো নথি খুঁজুন। তারিখটি মনে রাখবেন।”
আরহান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
একই তারিখ মেহরিনের কাছেও পৌঁছে গেছে কি না, সে জানে না।
অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে মেহরিন বাবার পুরোনো অ্যালবাম খুলে দেখছিল।
একটি ছবির পেছনে তার চোখ আটকে গেল।
ছবিটি বহু বছরের পুরোনো। সেখানে তার বাবা, আরহানের বাবা এবং আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু তৃতীয় মানুষটির মুখ ছবির ওপর কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ছবির পেছনে লেখা—
“১৭ই নভেম্বর। যে রাতে সবকিছু বদলে গিয়েছিল।”
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে বাবার গলা শোনা গেল—
— না! ওই নামটা আর কখনো উচ্চারণ করবে না!
মেহরিন স্থির হয়ে গেল।
সে এত দিন ভেবেছিল, তার বাবা শুধু অতীতের কোনো ঘটনা লুকিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, অতীতের সেই মানুষটি হয়তো এখনো তাদের জীবনের খুব কাছেই আছেন।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
ছবির মুখটি কার, আর ১৭ই নভেম্বরের রাতে আসলে কী ঘটেছিল?রাত তখন অনেক গভীর।
আরহানের হাতে বাবার পুরোনো ডায়েরিটা খোলা। পাতার এক কোণে আঁকা অসম্পূর্ণ বৃত্ত আর তার পাশে লেখা দুটি অক্ষর—“ক. ই.”
কামাল ইসলাম?
নাকি অন্য কেউ?
প্রশ্নটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছিল। কিন্তু উত্তর পাওয়ার মতো কোনো সূত্র তার কাছে নেই।
আরহান ডায়েরিটা বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে ইস্তাম্বুলের রাত নীরব। অথচ তার মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা এখনো নিঃশব্দে তাদের জীবনকে অনুসরণ করছে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
“আরহান, এখনো ঘুমাওনি?”
বাইরে তার মা নওরীন চৌধুরীর কণ্ঠ।
“না, মা। একটু কাজ ছিল।”
নওরীন ঘরে ঢুকে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। ছেলেকে তিনি ছোটবেলা থেকেই চেনেন। আরহান যখন কোনো বিষয় নিয়ে ভেতরে ভেতরে অস্থির থাকে, তখন তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে যায়।
“কয়েক দিন ধরে তোমাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সমস্যা হয়েছে?”
আরহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মা, তুমি কি কামাল ইসলাম নামের কাউকে চেনো?”
নামটা শুনে নওরীনের মুখের অভিব্যক্তি এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল।
“কেন হঠাৎ এই নাম?”
“এমনিই জানতে চাইলাম।”
নওরীন ছেলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “সব পুরোনো পরিচয়ের কথা মনে রাখা ভালো নয়, আরহান।”
“কিন্তু কেন?”
“কিছু প্রশ্নের উত্তর সময়ের আগে খুঁজতে গেলে কষ্ট বাড়ে। তুমি এখন নিজের কাজের দিকে মন দাও।”
কথাটা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আরহান এবার নিশ্চিত হলো—কামাল ইসলাম নামটা তার পরিবারের কাছে অপরিচিত নয়। কিন্তু সবাই যেন একইভাবে সত্যিটাকে আড়াল করে যাচ্ছে।
***
পরদিন সকাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়িয়ে আরহান ফোনে একটি পুরোনো নোট দেখছিল। এমন সময় পেছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত রাখল।
“কী ব্যাপার, অধ্যাপক সাহেব! সকাল সকাল এমন মুখ করে আছ কেন? ছাত্রছাত্রীরা এখনো ক্লাসেই আসেনি, এর মধ্যেই কাউকে ফেল করিয়ে দিলে নাকি?”
আরহান বিরক্ত চোখে তাকাল।
“রায়ান, তোমার কি কোনো কাজ নেই?”
হেসে উঠল রায়ান মালিক।
রায়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আরহানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আরহানের গম্ভীর স্বভাবের সঙ্গে তার হাসিখুশি স্বভাবের একেবারেই মিল নেই। তবু দুজনের বন্ধুত্ব বহু দিনের। আরহান যখন অন্য কারও সঙ্গে নিজের কথা ভাগ করে নিতে চায় না, তখনও রায়ান তার নীরবতার কারণ বোঝার চেষ্টা করে।
“কাজ আছে। কিন্তু বন্ধুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তার জীবনে কোনো বড় রহস্য ঢুকে পড়েছে। তাই ভাবলাম, একটু খোঁজ নিই।”
আরহান ফোনটা পকেটে রেখে বলল, “সবকিছু নিয়ে মজা করতে হবে না।”
রায়ানের হাসি একটু কমে গেল।
“আচ্ছা, মজা করছি না। সত্যি বল, কী হয়েছে?”
আরহান কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তুমি কি কখনো এমন কোনো ঘটনার কথা শুনেছ, যেটা নিয়ে একটা পরিবার বছরের পর বছর চুপ করে থাকে?”
রায়ান উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামল।
“শুনেছি। কিন্তু তোমার মতো মানুষ হঠাৎ এমন প্রশ্ন করছে কেন?”
“আমাদের পরিবারের পুরোনো কিছু কাগজপত্র পেয়েছি। সেখানে এমন একটা তারিখ আছে, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।”
“কোন তারিখ?”
আরহান তার দিকে তাকাল।
“১৭ নভেম্বর।”
তারিখটা শুনে রায়ান ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তারপর বলল, “নামটা কোথাও শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। তবে কোথায়, মনে করতে পারছি না।”
আরহানের চোখে নতুন প্রশ্ন জেগে উঠল।
“তুমি নিশ্চিত?”
“না। ভুলও হতে পারে। তবে আমার বাবা পুরোনো পারিবারিক কাগজপত্র নিয়ে মাঝে মাঝে কথা বলেন। বাসায় গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি।”
আরহান এবার প্রথমবারের মতো একটু আশার আলো দেখল।
“ঠিক আছে। তবে কাউকে এখনই সব বলো না।”
রায়ান মাথা নাড়ল।
“বুঝেছি। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—একা একা সবকিছু সামলাতে যেয়ো না।”
***
ক্লাস শুরুর কিছুক্ষণ আগে মেহরিন ও সায়রা করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
সায়রা খেয়াল করল, মেহরিন আজও অন্যমনস্ক।
“তুই কি গত রাতেও ওই চিঠির কথা ভেবেছিস?”
মেহরিন ধীরে মাথা নাড়ল।
“শুধু চিঠি নয়, সায়রা। বাবার আচরণ, আরহানের পরিবারের নীরবতা—সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা। অথচ সুতোটা কোথা থেকে শুরু হয়েছে, বুঝতে পারছি না।”
“তুই কি আরহানের সঙ্গে কথা বলেছিস?”
“হ্যাঁ। আমরা ঠিক করেছি, নতুন কিছু জানতে পারলে একে অন্যকে জানাব।”
সায়রা একটু ইতস্তত করে বলল, “তাহলে সাবধানে থাকিস। যে মানুষ তোকে বারবার সতর্ক করছে, সে হয়তো তোকে ভয় দেখাতে চাইছে। আবার এমনও হতে পারে, সে সত্যিই চায় না তুই বিপদে পড়িস।”
মেহরিন কোনো উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।
অপরিচিত নম্বর থেকে পাঠানো হয়েছে।
“সব পুরোনো কাগজে সত্য লেখা থাকে না। কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই কাগজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।”
মেহরিন বার্তাটা কয়েকবার পড়ল।
তারপর আরেকটি বার্তা এল।
“তোমার বাবা যে চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছেন, সেটার শেষ লাইনটা কি তুমি পড়েছ?”
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে তো বাবার হাতে সেই খাম দেখেছে। কিন্তু চিঠির শেষ লাইন সে পড়েনি।
সায়রা তার মুখের পরিবর্তন দেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
মেহরিন ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
বার্তাগুলো পড়ে সায়রার মুখও গম্ভীর হয়ে গেল।
“এবার আর সন্দেহ নেই, কেউ তোদের বাড়ির ভেতরের খবর জানে।”
মেহরিন ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু সে কীভাবে জানল, বাবা চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছেন?”
***
সেদিন সন্ধ্যায় ইসলাম পরিবারের বাড়িতে।
কামাল ইসলাম বসার ঘরে বসে কিছু পুরোনো কাগজ গুছিয়ে রাখছিলেন। এমন সময় দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তিনি থমকে গেলেন।
“তুমি?”
দরজার ওপাশের নারীটি শান্ত কণ্ঠে বললেন, “অনেক দিন পর এলাম, কামাল ভাই। ভেবেছিলাম, এবার আর দেরি করা ঠিক হবে না।”
কামাল দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে তাঁকে ভেতরে আসতে বললেন।
নারীটি ঘরে ঢুকে বসার আগেই বললেন, “মেহরিন কি সব জানতে শুরু করেছে?”
কামালের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“কে তোমাকে বলেছে?”
“কেউ বলেনি। আপনার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি।”
কামাল নিচু স্বরে বললেন, “আমি চাই না ও এখন এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়ুক।”
নারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনি যত দিন সত্যিটা লুকিয়ে রাখবেন, তত দিন অন্য কেউ নিজের মতো করে সেই গল্প লিখবে।”
কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি শুধু একটা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।”
“কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কি এখনো রক্ষা করার মতো আছে?”
প্রশ্নটা শুনে কামাল নীরব হয়ে গেলেন।
নারীটি উঠে দাঁড়ালেন।
“আমার মনে হয়, ১৭ নভেম্বরের ঘটনাটা আবার সামনে আসছে। এবার হয়তো কেউ আর একে থামাতে পারবে না।”
কামাল তাঁকে থামিয়ে বললেন, “মেহরিনের সামনে এখনই কিছু বলবেন না।”
নারীটি দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।
“আমি কিছু বলব না। কিন্তু অন্যরা কত দিন চুপ থাকবে, তার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”
তিনি চলে যাওয়ার পর কামাল অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আলমারি খুলে সেই ছোট খামটি বের করলেন, যার গায়ে লেখা—“১৭ নভেম্বর”।
খামটা হাতে নিয়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আর কত দিন?”
***
রাত।
নিজের ঘরে বসে মেহরিন আবার অপরিচিত নম্বর থেকে আসা বার্তাগুলো দেখছিল। সে জানত, বাবাকে প্রশ্ন করলে হয়তো আবারও একই উত্তর পাবে—এখনো সময় হয়নি।
কিন্তু এবার সে আর শুধু অপেক্ষা করতে চায় না।
সে ফোন হাতে নিয়ে আরহানকে একটি বার্তা পাঠাল।
“আজ আবার কেউ আমাকে ১৭ নভেম্বর নিয়ে বার্তা দিয়েছে। সে জানে, আমার বাবা একটি চিঠি লুকিয়ে রেখেছেন।”
কিছুক্ষণ পর আরহানের উত্তর এল।
“আমার মায়ের কাছেও আজ কামাল ইসলামের নাম শুনে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখেছি। মনে হচ্ছে, আমাদের দুই পরিবারেই কেউ কিছু জানে।”
মেহরিন লিখল, “তাহলে কি আমরা ভুল পথে খুঁজছি?”
আরহানের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
“জানি না। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারছি—যে সত্যটা আমরা খুঁজছি, সেটা শুধু আমাদের দুজনের নয়। আরও অনেক মানুষ এর সঙ্গে জড়িত।”
মেহরিন ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার মনে হলো, অচেনা মানুষগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসছে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের কাছেই যেন গল্পের আলাদা একটি অংশ রয়েছে।
আর সব অংশ একসঙ্গে না হওয়া পর্যন্ত সত্যিটা অধরাই থাকবে।
অন্যদিকে, শহরের আরেক প্রান্তে সেই অচেনা নম্বরের মালিক নিজের ফোনের পর্দায় মেহরিনের পাঠানো বার্তার উত্তর দেখছিল।
তারপর সে ফোনটা বন্ধ করে একটি পুরোনো ছবির দিকে তাকাল।
ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
দুজনের মুখ স্পষ্ট।
তৃতীয়জনের মুখের ওপর কালো কালি।
ছবির পেছনে লেখা—
“১৭ নভেম্বর—শেষ সিদ্ধান্ত নয়, শুরু।”
লোকটি ছবিটা উল্টে রাখল।
তারপর ধীরে বলল, “এবার আর কাউকে থামিয়ে রাখা যাবে না।”
চলবে…
পর্ব 3
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান