তোমাতেই পূর্ণতা
পর্ব ৫: তোমার চোখে অন্য গল্প
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকালে চৌধুরী ভিলায় এমন একটা ঘটনা ঘটল, যা দেখে বাড়ির সবাই একসঙ্গে হাসতে বাধ্য হলো।
আরহান চৌধুরী নাশতার টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। আরিশা এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
— ভাইয়া, আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
আরহান কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— টাকা লাগবে?
আরিশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল। তুমি কি আমাকে শুধু টাকার জন্যই চেনো?
— না। তুই আমার বোন বলেও চিনি। তাই জানি, গুরুত্বপূর্ণ কথার শেষে টাকা থাকবেই।
পাশে বসে থাকা নওরীন চৌধুরী হেসে ফেললেন।
— আরহান, মেয়েটাকে একটু শান্তিতে কথা বলতে দাও।
আরিশা মায়ের পাশে বসে বলল,
— মা, তোমার ছেলে আমাকে একটুও ভালোবাসে না।
আরহান এবার খবরের কাগজ নামাল।
— ভালোবাসি বলেই তো এখনো বাড়িতে থাকতে দিয়েছি।
— মা! শুনেছ? আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে!
নওরীন মাথা নেড়ে বললেন,
— তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়।
আরিশা বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল,
— শুনেছ ভাইয়া? মায়ের মাথাব্যথার কারণ তুমি!
আরহান শান্তভাবে চায়ের কাপ তুলে বলল,
— আর তোর জন্মের পর থেকে আমার মাথাব্যথার কারণ তুই।
আরিশা মুখে হাত দিয়ে নাটকীয়ভাবে বলল,
— এই বাড়িতে আমার কোনো সম্মান নেই!
ঠিক তখনই আরহানের ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— হ্যাঁ, বলুন।
ওপাশ থেকে কিছু শোনার পর সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— ঠিক আছে। আমি অফিসে গিয়ে দেখছি।
ফোন রেখে সে উঠে দাঁড়াল।
আরিশা ভ্রু তুলে বলল,
— কী হয়েছে? আবার কোনো শত্রু তোমার ব্যবসা দখল করতে এসেছে?
আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোর মতো একটা শত্রু ঘরে থাকতেই বাইরের শত্রুর দরকার হয় না।
কথাটা বলে সে বেরিয়ে গেল।
আরিশা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মা, একদিন ভাইয়াকে এমন শিক্ষা দেব, সারা জীবন মনে রাখবে।
নওরীন হেসে বললেন,
— আগে নিজের পড়াশোনাটা মনে রাখ, তারপর ভাইকে শিক্ষা দিস।
আরিশা মুখ ভার করে নাশতা খেতে লাগল।
অফিসে নতুন বিপদ
মেহের রহমান অফিসে ঢুকেই বুঝতে পারল, পরিবেশটা আজ অন্য রকম।
কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। কেউ একজন তাকে দেখে কথা থামিয়ে দিল।
মেহের নিজের ডেস্কে বসে রাফিকে ফোন করল।
— রাফি, অফিসে কী হয়েছে জানিস?
— তোর অফিসে? কী হয়েছে?
— সবাই এমনভাবে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি গোপনে কোম্পানির মালিক হয়ে গেছি।
রাফি হেসে বলল,
— হয়ে গেলে আমাকে ম্যানেজার বানাবি?
— তোকে নিরাপত্তারক্ষীও বানাব না।
— বন্ধুত্বের এই মূল্য!
মেহের হেসে ফোন রেখে দিল।
ঠিক তখনই আরহানের সহকারী এসে বলল,
— মিস রহমান, স্যার আপনাকে কেবিনে ডাকছেন।
মেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সকালটা ভালোই যাচ্ছিল। এখন নিশ্চয়ই ঝামেলা শুরু হবে।
কেবিনে ঢুকতেই আরহান একটা ফাইল তার দিকে এগিয়ে দিল।
— এই কাগজগুলো ভালো করে দেখুন।
মেহের ফাইল খুলে কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ল। তারপর অবাক হয়ে বলল,
— এখানে তো কিছু হিসাবের অসংগতি আছে।
— ঠিক তাই। গত কয়েক মাসের হিসাব মিলছে না।
মেহের এবার সিরিয়াস হয়ে ফাইলটা দেখতে শুরু করল।
— আপনি কি মনে করছেন, কেউ ইচ্ছা করে এসব করেছে?
আরহান চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
— আমি কিছু মনে করতে চাই না। প্রমাণ দেখতে চাই।
মেহের মাথা নাড়ল।
— তাহলে আমাকে সব কাগজ দিন। আমি হিসাবগুলো মিলিয়ে দেখব।
আরহান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— পারবেন?
মেহের ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমাকে দেখে কি আপনার মনে হয়, আমি শুধু সাজগোজ করতে অফিসে আসি?
— না। মাঝে মাঝে মনে হয়, কথা বলার জন্য আসেন।
— মিস্টার চৌধুরী!
আরহান মুচকি হাসল।
— ঠিক আছে। কাজ শুরু করুন।
মেহের ফাইল নিয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে গেল। কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—আরহান কি সত্যিই শুধু ব্যবসার সমস্যায় চিন্তিত, নাকি এর পেছনে আরও কিছু আছে?
পুরোনো ঘরের রহস্য
সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে আরহান সোজা নিজের বাবার পুরোনো স্টাডিরুমে গেল।
ঘরটা বহুদিন ধরে বন্ধ ছিল। সেখানে পুরোনো বই, কাঠের আলমারি আর কিছু নথিপত্র রাখা আছে।
আরহান আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে চাবি দিয়ে তালা খুলল। ভেতরে পুরোনো ফাইলের স্তূপ।
সে নির্দিষ্ট একটা ফাইল খুঁজছিল। অবশেষে নিচের তাকে একটা বাদামি খাম পেল।
খামটা খুলতেই কয়েকটি পুরোনো ছবি বেরিয়ে এল।
একটা ছবি হাতে নিয়ে আরহান থমকে গেল।
ছবিতে ছোট্ট একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে আরেকজন নারী, যার মুখটা ছবিতে স্পষ্ট নয়।
আরহান ছবিটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
— এটা এখানে কীভাবে এল?
তার মনে পুরোনো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগল। ছোটবেলায় সে এই মেয়েটিকে কোথাও দেখেছিল। কিন্তু কোথায়, তা মনে করতে পারল না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ হলো।
আরহান দ্রুত ছবিটা খামে ঢুকিয়ে ফেলল।
— কে?
দরজা খুলে আরিশা ভেতরে ঢুকল।
— আমি। তুমি এখানে কী করছ?
— কাজ আছে।
আরিশা ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— এই ঘরে কাজ? এখানে তো ভূত থাকলেও অবাক হব না!
আরহান বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুই সবকিছু নিয়ে মজা করিস কেন?
আরিশা এবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।
— কারণ তুমি সব সময় এত গম্ভীর থাকো যে, তোমাকে দেখে মনে হয় পৃথিবীর সব দুঃখ তোমার একার।
আরহান কিছু বলল না।
আরিশা একটু নরম গলায় বলল,
— ভাইয়া, কোনো সমস্যা হয়েছে?
— না।
— তুমি মিথ্যা বললে তোমার ডান ভ্রুটা একটু কুঁচকে যায়।
আরহান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
আরিশা হেসে বলল,
— ছোটবেলা থেকে তোমাকে দেখে আসছি। আমাকে এত সহজে বোকা বানাতে পারবে না।
আরহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— সময় হলে সব বলব।
আরিশা মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। কিন্তু একা একা সব সমস্যা সমাধান করতে যেও না।
কথাটা বলে সে বেরিয়ে গেল।
আরহান আবার খামটা বের করল। ছবির পেছনে ছোট্ট করে লেখা একটা নাম দেখতে পেল।
“মেহের।”
নামটা পড়ে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
মেহের রহমানের সঙ্গে কি এই ছবির কোনো সম্পর্ক আছে?
মেহেরের অজানা অনুভূতি
রাতে মেহের নিজের ঘরে বসে অফিসের ফাইলগুলো দেখছিল। হিসাবের কয়েকটি পাতায় একই ধরনের ভুল পাওয়া গেছে। কেউ ইচ্ছা করে টাকা সরিয়ে থাকলে বিষয়টা বেশ গুরুতর।
হঠাৎ তার ফোনে আরহানের মেসেজ এল।
আরহান: ফাইলগুলো দেখেছেন?
মেহের: জি। কিছু সমস্যা পেয়েছি।
আরহান: কাল সকালে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মেহের ফোনটা নামিয়ে রাখল। কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোন হাতে নিল।
সে লিখল,
মেহের: একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
উত্তর আসতে বেশি সময় লাগল না।
আরহান: বলুন।
মেহের কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
মেহের: আপনি কি সব সময় এত রহস্যময় থাকেন?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
আরহান: আর আপনি কি সব সময় এত প্রশ্ন করেন?
মেহের হেসে ফেলল।
মেহের: আপনার উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা খুবই খারাপ।
আরহান: আপনার প্রশ্ন করার ক্ষমতা অসাধারণ।
মেহের ফোনটা বুকে চেপে ধরে হাসল। তারপর নিজেই অবাক হয়ে গেল।
সে কেন আরহানের মেসেজের জন্য অপেক্ষা করছে?
কেন লোকটার সঙ্গে কথা বললে তার মন ভালো হয়ে যায়?
মেহের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বোঝাল,
— না, না! এই লোককে পছন্দ করা অসম্ভব। ওর সঙ্গে কথা বললেই আমার মাথা গরম হয়ে যায়।
কিন্তু তার ঠোঁটের হাসিটা কিছুতেই মিলিয়ে গেল না।
শেষ দৃশ্য
রাত গভীর হলে আরহান আবার পুরোনো খামটা খুলল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় পরিবারের একটি দুর্ঘটনার পর সবাই তাকে কিছু বিষয় ভুলে যেতে বলেছিল। তখন সে খুব ছোট ছিল। বড়রা কখনো বিস্তারিত কিছু বলেনি।
আজ এত বছর পর সেই পুরোনো ছবিটা আবার সামনে এসেছে।
আরহান ফোন তুলে একজনকে কল করল।
— হ্যালো, আমি একটা পুরোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— আপনি কি ছবিটা পেয়েছেন?
আরহান চমকে উঠল।
— আপনি জানলেন কীভাবে?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ওপাশের মানুষটি বলল,
— কারণ ছবিটা আপনার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল না।
আরহানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
— আপনি কে?
কিন্তু কল কেটে গেল।
আরহান আবার ছবিটার দিকে তাকাল। এবার ছবির পেছনে লেখা নামটার নিচে আরেকটি বাক্য দেখতে পেল, যা আগে তার চোখে পড়েনি।
“সত্যিটা জানলে সবকিছু বদলে যাবে।”
আরহান বুঝতে পারল, তার পরিবারের অতীতের সঙ্গে মেহেরের কোনো অজানা সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু সেই সম্পর্ক কী?
আর কেন এত বছর পর কেউ তাকে সত্যিটা জানতে বাধা দিচ্ছে?
চলবে...!!