তোমাতেই পূর্ণতা
পর্ব ৪: একটা ডিনার, হাজারটা ঝামেলা
লেখিকা: আরফা আইরিশা
সকাল থেকেই চৌধুরী ভিলায় অদ্ভুত এক পরিস্থিতি চলছে। আরহান চৌধুরী বসার ঘরে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে, আর তার ছোট বোন আরিশা সোফায় বসে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন ভাইয়ের বিরুদ্ধে বড় কোনো ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করছে।
আরহান বিরক্ত হয়ে বলল, — কী হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
আরিশা মিষ্টি হেসে বলল, — ভাইয়া, একটা কথা বলব?
— না।
— আরে, কথাটা তো শোনো!
— তোর মুখ দেখে বুঝতে পারছি, কথাটা আমার পকেটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আরিশা বুকের ওপর হাত রেখে বলল, — তুমি আমাকে এত ভুল বোঝো কীভাবে? আমি কি কখনো তোমার কাছে টাকা চেয়েছি?
আরহান ল্যাপটপ বন্ধ করে তার দিকে তাকাল।
— গতকাল?
— ওটা ছিল জরুরি প্রয়োজন।
— তার আগের দিন?
— সেটাও জরুরি।
— তার আগের সপ্তাহে?
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, — ভাইয়া, অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে ভবিষ্যৎ সুন্দর হয় না।
আরহান মাথায় হাত দিল।
— আল্লাহ আমাকে একটা বোন দিয়েছেন, নাকি আজীবন চলার মতো একটা ঋণ?
আরিশা হেসে বলল, — টাকা দাও, দোয়া করব।
— বের হ আমার ঘর থেকে!
— টাকা না দিলে দোয়া বন্ধ!
আরিশা দৌড়ে পালিয়ে গেল। আরহান বিরক্ত মুখে আবার ল্যাপটপ খুলল। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
অন্যদিকে, মেহের রহমান নিজের ঘরে বসে ফোনে রাফির সঙ্গে কথা বলছিল।
— রাফি, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ওপাশ থেকে রাফি আগ্রহী গলায় বলল, — কী সিদ্ধান্ত? বিয়ে করবি?
মেহের চোখ বড় করে বলল, — তোর মাথায় কি সব সময় বিয়ের চিন্তা ঘোরে?
— না। মাঝে মাঝে খাবারের চিন্তাও করি। বল, কী হয়েছে?
— আমি আরহান চৌধুরীকে সহ্য করব না।
রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, — বাহ! কী অসাধারণ সিদ্ধান্ত! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তুই প্রতিদিন তার অফিসে যাস, তার সঙ্গে কথা বলিস, আর রাতে বাসায় ফিরে তার কথাই বলিস।
মেহের বিরক্ত হয়ে বলল, — আমি তার কথা বলি কারণ লোকটা আমাকে বিরক্ত করে!
— বুঝলাম। যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করে, তার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।
— রাফি!
— আচ্ছা, আচ্ছা! রাগ করিস না। তবে একটা কথা বলি?
— কী?
— তোর আর আরহানের ঝগড়া দেখে মনে হয়, তোদের বিয়ে হলে বিয়ের মঞ্চেও ঝগড়া হবে।
মেহের ফোন কেটে দিল।
রাফি ফোনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, — প্রেমের রোগী! শুধু নিজের রোগটা বুঝতে পারছে না।
দুপুরে অফিসে ঢুকেই মেহের বুঝতে পারল, আজ কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
কারণ আরহান তার কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহের মনে মনে বলল, হে আল্লাহ, আজ আবার কী বিপদ!
আরহান তাকে দেখে বলল, — মিস রহমান, আমার কেবিনে আসুন।
মেহের ভ্রু কুঁচকে বলল, — কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?
— আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অপরাধ করার পরিকল্পনা করছেন।
— আপনার কেবিনে ঢুকলেই কি মানুষের অপরাধী মনে হয়?
— আপনার ক্ষেত্রে একটু বেশি।
মেহের দাঁত চেপে হাসল।
— একদিন আপনাকে এমন শিক্ষা দেব, সারাজীবন মনে রাখবেন।
আরহান শান্তভাবে বলল, — আগে নিজের কাজগুলো মনে রাখুন। গতকালের রিপোর্টে তিনটা ভুল ছিল।
মেহেরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— তিনটা?!
— জি। চাইলে চারটাও খুঁজে দিতে পারি।
— না, ধন্যবাদ! তিনটাই যথেষ্ট!
আরহান কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসে বলল, — আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে একটা ডিনারে যেতে হবে।
মেহের অবাক হয়ে তাকাল।
— কী?!
— কান আছে তো? ডিনারে যেতে হবে।
— আপনার সঙ্গে?
— না, আমার ছায়ার সঙ্গে। অবশ্য ছায়া আপনার চেয়ে বেশি ভদ্র।
মেহের চোখ সরু করে বলল, — আপনি কি আমাকে অপমান করার জন্যই বেতন দেন?
— না। কাজ করার জন্য দিই। অপমানটা বিনামূল্যে।
মেহের মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এই লোককে একদিন না একদিন শিক্ষা দিতেই হবে।
কিন্তু মুখে বলল, — ঠিক আছে। যাব। তবে একটা শর্ত আছে।
— কী?
— খাবারের বিল আপনাকেই দিতে হবে।
আরহান কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — আপনাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই ভুল ছিল।
মেহের বিজয়ীর হাসি দিল।
— সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু ভেবে নেবেন, স্যার।
সন্ধ্যায় মেহের তৈরি হয়ে নিচে নামতেই তার মা অবাক হয়ে তাকালেন।
— কিরে, আজ এত সাজগোজ কেন?
মেহের চুল ঠিক করতে করতে বলল, — অফিসের একটা ডিনার আছে।
মা মুচকি হেসে বললেন, — অফিসের ডিনার, নাকি বিশেষ কারও সঙ্গে দেখা?
— মা!
— আচ্ছা, আচ্ছা! নামটা বললেই তো হয়।
মেহের বিরক্ত হয়ে বলল, — আরহান চৌধুরী!
মায়ের হাসি আরও চওড়া হলো।
— ওহ! তাহলে তো ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয়।
— মা, লোকটা একটা আস্ত বিপদ!
— বিপদ যদি এত সুন্দর করে তৈরি হয়ে আসে, তাহলে মানুষ একটু থেমে তাকাতেই পারে।
মেহের কিছু না বলে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।
গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই আরহান ঘড়ির দিকে তাকাল।
— আপনি দশ মিনিট দেরি করেছেন।
মেহের গাড়িতে উঠে বলল, — আর আপনি দশ মিনিট ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন। তার মানে আমি গুরুত্বপূর্ণ।
আরহান গাড়ি চালু করে বলল, — না, আমার ড্রাইভার ছুটিতে। তাই বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করছি।
মেহের মুখ বাঁকিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
— আপনার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
— তাহলে দেয়ালকে বিয়ে করে ফেলুন।
মেহের হেসে ফেলল। আরহানও অজান্তে হেসে উঠল।
দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
রেস্তোরাঁয় পৌঁছে মেহের মেনু হাতে নিয়ে বলল, — এত দামি জায়গায় নিয়ে এসেছেন কেন? আপনার কি টাকার গাছ আছে?
আরহান বলল, — আছে। তবে গাছটা আপনার নাগালের বাইরে।
— চিন্তা করবেন না। গাছের ঠিকানা পেলে আমি পৌঁছে যাব।
আরহান হেসে মাথা নাড়ল।
খাবার আসার পর মেহের একমনে খেতে লাগল। আরহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, — আপনি সব সময় এত কথা বলেন কীভাবে?
মেহের মুখ তুলে বলল, — আর আপনি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন কীভাবে?
— অভ্যাস।
— আমারও অভ্যাস। কথা না বললে আমার শরীর খারাপ হয়।
আরহান মৃদু হেসে বলল, — সেটা তো বুঝতেই পারছি।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর আরহান একটি ফাইল বের করল।
মেহের অবাক হয়ে বলল, — ডিনারে এসেও কাজ?
— ব্যবসা কখনো ছুটি নেয় না।
— আর মানুষ?
আরহান তার দিকে তাকাল।
— মানুষও মাঝে মাঝে ভুলে যায়, সে শুধু কাজ করার জন্য বেঁচে নেই।
মেহের এবার আর কোনো মজার কথা বলল না। লোকটার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ করিয়ে দিল।
সে প্রথমবার ভাবল, আরহান কি সব সময় এমন গম্ভীর থাকার আড়ালে নিজের কোনো কষ্ট লুকিয়ে রাখে?
রাতের শেষে বাড়ি ফেরার সময় আরহানের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে কেউ বলল, — স্যার, পুরোনো ফাইলটা পাওয়া গেছে।
আরহানের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
— কোথায়?
— আপনার বাবার পুরোনো স্টাডিরুমে। কিন্তু ফাইলের ভেতরে এমন কিছু আছে, যা আপনাকে নিজে এসে দেখতে হবে।
আরহান গাড়ি থামিয়ে বলল, — কেউ যেন ফাইলটা স্পর্শ না করে।
ফোন কেটে সে চুপ করে রইল।
মেহের তার পরিবর্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, — কী হয়েছে?
আরহান স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, — কিছু না।
মেহের ভ্রু কুঁচকে বলল, — আপনার এই ‘কিছু না’ কথাটার আড়ালে যে অনেক কিছু থাকে, সেটা আমি বুঝতে পারি।
আরহান তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড পর বলল, — সবকিছু জানার চেষ্টা করবেন না, মেহের।
মেহেরের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কেন? আমার জানার অধিকার নেই?
আরহান কোনো উত্তর দিল না।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু এবার দুজনের কেউই কথা বলল না।
মেহের জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল, আরহানের জীবনে এমন কী রহস্য লুকিয়ে আছে, যা সে কাউকে জানতে দিতে চায় না?
আরহান মনে মনে শুধু একটি কথাই ভাবছিল—
যদি অতীতের সত্যিটা মেহের জেনে যায়, তাহলে কি সে তাকে আগের মতো বিশ্বাস করবে?
চলবে...!!