hell university: রক্তের খেলা
✍️ লেখিকা: সামিয়া সুলতানা লিজা
পর্ব ২
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে এবার যে আলোটা বের হলো, সেটা আগের মতো ঠান্ডা না—বরং অদ্ভুত লালচে।
সামিয়া এক পা এগিয়ে ভেতরে ঢুকল।
পেছনে দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
ঠাস!
সে ঘুরে তাকাল না।
এখন তার চোখ সামনে।
একটা বিশাল হলরুম… কিন্তু আগেরটার মতো না।
মেঝেতে লাল দাগ—পুরনো, শুকনো।
দেয়ালে অদ্ভুত সব চিহ্ন, যেন কেউ বারবার কিছু লিখে আবার মুছে ফেলেছে।
হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন স্টুডেন্ট।
তাদের চোখে ভয় স্পষ্ট।
সামিয়া ধীরে ধীরে কাছে গেল।
ঠিক তখনই—উপরে একটা স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
সেই অচেনা কণ্ঠ আবার ভেসে এলো—
“Second Trial.”
“এবার তোমাদের টিমে ভাগ করা হবে।”
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠতে লাগল।
সামিয়া তাকিয়ে রইল।
TEAM A
— সামিয়া
— আয়ান রহমান
— নীরা
সামিয়ার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
“আয়ান…”
সে নামটা আস্তে করে বলল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ—
“আমাকে খুঁজছো?”
সামিয়া ঘুরে দাঁড়ালো।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটা—যাকে সে আগেই দেখেছিল।
কালো কোট, ঠান্ডা চোখ…
আর সেই একই রহস্যময় হাসি।
আয়ান রহমান।
“তুমি…” সামিয়ার চোখ সরু হয়ে এলো।
আয়ান একটু হেসে বলল,
“মনে হচ্ছে আমরা একই টিমে।”
“কাকতালীয়?” সামিয়া জিজ্ঞেস করল।
আয়ান মাথা কাত করল,
“এই জায়গায় কাকতালীয় বলে কিছু নেই।”
ঠিক তখনই আরেকটা মেয়ে এগিয়ে এলো।
চোখে ভয়, কিন্তু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
“আমি… নীরা,” সে বলল।
সামিয়া শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিল।
হঠাৎ মেঝে কেঁপে উঠলো।
সবাই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
স্ক্রিনে আবার লেখা ভেসে উঠল—
“RULE 02: ONLY ONE TEAM WILL SURVIVE”
পুরো হলরুমে এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো।
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
“মানে… আমাদের… একে অপরকে মারতে হবে?”
আয়ান হালকা হাসল,
“অথবা অন্য টিমগুলোকে।”
সামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ এবার আয়ানের দিকে।
“তুমি কি বিশ্বাসযোগ্য?” সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল।
আয়ান একদম কাছে এসে থামল।
দুজনের চোখ এক লাইনে।
“তুমি কি কাউকে বিশ্বাস করো?”
সামিয়া এক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—
“না।”
আয়ানের ঠোঁটে হাসি ফুটল।
“তাহলে আমরা ভালোই ম্যাচ।”
ঠিক তখনই—
হলের চারপাশের দেয়াল ভেঙে খুলে যেতে লাগল।
বাইরে দেখা গেল এক ভয়ংকর গোলকধাঁধা।
অন্ধকার, সরু পথ, আর প্রতিটা কর্নারে অজানা কিছু লুকিয়ে আছে।
লাউডস্পিকার আবার বেজে উঠল—
“Second Trial begins now.”
“Find the core… or die lost.”
নীরা ভয়ে সামিয়ার হাত ধরে ফেলল।
সামিয়া হাত ছাড়িয়ে নিল।
“নিজেকে বাঁচাতে শিখো,” সে ঠান্ডা গলায় বলল।
তারপর সামনে এগিয়ে গেল।
আয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“তুমি সামনে, আমি পেছনে,” সে বলল।
সামিয়া একবার তাকাল,
“আমাকে কভার করবে?”
আয়ান মুচকি হাসল,
“অথবা তোমাকে পর্যবেক্ষণ করব।”
সামিয়ার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“চেষ্টা করে দেখো।”
তিনজন একসাথে গোলকধাঁধার ভেতরে ঢুকে গেল।
আর পিছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
এবার আর ফেরার পথ নেই।গোলকধাঁধার ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের আলো আরও কমে গেল।
পথগুলো সরু… দেয়ালগুলো অদ্ভুত ঠান্ডা…
আর কোথাও কোথাও ফিসফিস শব্দ শোনা যাচ্ছে।
নীরা ধীরে বলল,
“এই জায়গাটা… ভালো লাগছে না…”
সামিয়া থামল না।
তার চোখ সামনে, পা steady।
আয়ান পেছন থেকে বলল,
“ভয় পাচ্ছো?”
নীরা কিছু বলল না।
সামিয়া হালকা গলায় বলল,
“ভয় থাকলে বাঁচার chance থাকে… কিন্তু panic করলে শেষ।”
তারা একটা মোড়ে এসে থামল।
তিনটা রাস্তা।
একটা বামদিকে, একটা ডানদিকে, আর একটা সোজা।
আয়ান দেয়ালে হাত রাখল।
“এই দেয়ালগুলো নড়ছে,” সে বলল।
ঠিক তখনই—
ডান দিকের পথটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
নীরা চমকে উঠল,
“আমরা তো ওদিকেই যাচ্ছিলাম!”
সামিয়া শান্তভাবে বলল,
“মানে পথ নিজেই আমাদের নির্বাচন করছে।”
হঠাৎ—
সোজা পথ থেকে কারও দৌড়ানোর শব্দ আসতে লাগল।
কেউ ছুটে আসছে।
একটা ছেলে—রক্তাক্ত, হাঁপাচ্ছে।
“পেছনে… ওটা আসছে…” সে কাঁপা গলায় বলল।
“কি আসছে?” নীরা জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা উত্তর দেওয়ার আগেই—
অন্ধকারের ভেতর থেকে কিছু একটা নড়ল।
ধীরে… ভারী… ভয়ংকর।
দেয়ালের ছায়া যেন আলাদা হয়ে গেল।
তারপর—
একটা বিশাল কালো ছায়া মাটিতে গড়িয়ে সামনে এলো।
চোখ নেই… মুখ নেই… কিন্তু একটা উপস্থিতি আছে।
যেন পুরো অন্ধকারটাই জীবিত।
নীরা চিৎকার করে উঠল,
“ওটা কী!”
ছেলেটা দৌড়ে পালাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
ছায়াটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
এক সেকেন্ড।
তারপর কিছুই নেই।
সে উধাও।
শুধু মাটিতে একটা দাগ।
নীরা কাঁপতে লাগল।
“আমরা… আমরা শেষ…”
সামিয়া এক পা এগিয়ে গেল।
তার চোখ আবার লাল হয়ে উঠছে।
আয়ান চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
“তুমি কি এটাকে থামাতে পারবে?” সে ধীরে বলল।
সামিয়া কোনো উত্তর দিল না।
ছায়াটা এবার তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
চারপাশের আলো নিভে যেতে লাগল।
শুধু তার উপস্থিতি…
সামিয়া হাতটা সামান্য তুলল।
হাওয়াটা কেঁপে উঠল।
ছায়াটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
আয়ানের চোখে ঝিলিক।
“so… এটা তোমার আসল শক্তি…”
সামিয়া ফিসফিস করে বলল,
“আমি এখনো জানি না এটা কী…”
ছায়াটা হঠাৎ আরও বড় হয়ে উঠল।
এবার পুরো করিডোর ঢেকে ফেলছে।
নীরা কাঁদতে শুরু করল,
“আমরা বাঁচবো না…”
সামিয়া হঠাৎ চোখ বন্ধ করল।
একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল।
তারপর—
চোখ খুলল।
এবার তার চোখ পুরো লাল।
চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
দেয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করল।
ছায়াটা পেছনে সরে গেল।
প্রথমবার—
ওটা ভয় পেল।
সামিয়া ধীরে বলল—
“পেছনে যাও।”
একটা অদৃশ্য চাপ ছায়াটাকে ধাক্কা দিল।
ওটা গর্জে উঠল… তারপর অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে গেল।
সবকিছু আবার শান্ত।
নীরা মাটিতে বসে পড়ল।
“এটা… এটা কী ছিল…”
সামিয়া কিছু বলল না।
তার চোখ আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
আয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“তুমি dangerous,” সে বলল।
সামিয়া তাকাল না।
“তুমিও,” সে শান্তভাবে বলল।
ঠিক তখনই—
দেয়ালে একটা চিহ্ন জ্বলে উঠল।
একটা লাল তীর চিহ্ন।
আয়ান বলল,
“core-এর দিকে নির্দেশ করছে।”
সামিয়া সামনে হাঁটা শুরু করল।
“চল।”
তিনজন আবার এগিয়ে গেল।
কিন্তু এবার—
গোলকধাঁধা শুধু পথ না…
তাদের ভয়, শক্তি আর গোপন রহস্যগুলোও পরীক্ষা করছে।লাল তীর চিহ্নটা ধীরে ধীরে জ্বলতে জ্বলতে সামনে পথ দেখাচ্ছিল।
তিনজন সেই দিকেই এগিয়ে চলল।
গোলকধাঁধা এখন আগের চেয়েও চুপচাপ।
কোনো শব্দ নেই…
কোনো নড়াচড়া নেই…
এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর।
নীরা আস্তে বলল,
“এখন কেন এত শান্ত?”
আয়ান চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“কারণ কিছু একটা অপেক্ষা করছে।”
সামিয়া কিছু বলল না।
তার চোখ এখন আরও সতর্ক।
হঠাৎ—
তারা একটা খোলা জায়গায় এসে পৌঁছালো।
মাঝখানে একটা গোলাকার প্ল্যাটফর্ম।
প্ল্যাটফর্মের উপর একটা কালো বাক্স।
আর তার চারপাশে মাটিতে আঁকা অদ্ভুত চিহ্ন।
সামিয়া ধীরে বলল,
“এটাই কি core?”
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
“হতে পারে… কিন্তু এত সহজ হবে না।”
নীরা ভয় পেয়েও এগিয়ে গেল,
“আমরা কি এটা খুলবো?”
ঠিক তখনই—
লাউডস্পিকার আবার বেজে উঠল—
“Core found.”
“Final rule: Only one will claim it.”
এক মুহূর্তে তিনজন থেমে গেল।
নীরার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“মানে… আমাদের মধ্যে একজন?”
আয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ এবার সামিয়ার দিকে।
সামিয়াও তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে।
দুজনের মাঝখানে অদৃশ্য একটা চাপ তৈরি হলো।
নীরা পিছিয়ে গেল,
“আমি… আমি লড়তে পারব না…”
হঠাৎ—
মাটির চিহ্নগুলো জ্বলে উঠলো।
একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো—
তিনজনকে আলাদা করে ফেলল।
এখন তারা একে অপরের কাছে যেতে পারছে না।
আয়ান হালকা হাসল,
“interesting setup…”
সামিয়া চোখ সরু করে বলল,
“এটা আমাদের দিয়ে fight করানোর জন্য।”
ঠিক তখনই—
বাক্সটা নিজে থেকেই খুলতে শুরু করল।
ভেতর থেকে লাল আলো বের হলো।
আর সেই আলোর ভেতর—
তাদের নিজেদের ভয় দেখা যেতে লাগল।
নীরা চিৎকার করে উঠল,
“না! না! এটা না!”
সে মাটিতে বসে পড়ল।
তার সামনে যেন তার worst nightmare দাঁড়িয়ে গেছে।
আয়ানও এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তার চোখে প্রথমবার একটা চাপ দেখা গেল।
কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
“illusion…” সে ফিসফিস করল।
সামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তার সামনে কী দেখা যাচ্ছে—
তা কেউ জানে না।
কিন্তু—
তার চোখ আবার লাল হয়ে উঠছে না।
বরং…
পুরোপুরি শান্ত।
সে ধীরে ধীরে বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল।
অদৃশ্য দেয়াল তাকে থামাতে পারল না।
আয়ান বিস্ময়ে বলল,
“…তুমি কীভাবে পারছো?”
সামিয়া কোনো উত্তর দিল না।
সে বাক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
তার হাত ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
এক মুহূর্ত—
সবকিছু থেমে গেল।
তারপর—
আলো নিভে গেল।
অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে গেল।
নীরা অচেতন হয়ে পড়ে গেল।
আয়ান স্থির দাঁড়িয়ে।
আর সামিয়া…
তার হাতে এখন একটা ছোট, কালো গোলক।
যেটা ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ধুকপুক করছে—
যেন একটা হৃদয়।
লাউডস্পিকার শেষবারের মতো বেজে উঠল—
“Second Trial completed.”
“Winner: Samia.”
পুরো গোলকধাঁধা কেঁপে উঠল।
দেয়ালগুলো ভেঙে যেতে শুরু করল।
বের হওয়ার পথ খুলে গেল।
আয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
তার চোখে এবার কৌতূহল না—
গভীর কিছু।
“তুমি শুধু খেলোয়াড় না…” সে বলল।
সামিয়া তার দিকে তাকাল।
“তাহলে?”
আয়ান একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি এই গেমের নিয়ম বদলাতে পারো।”
সামিয়ার ঠোঁটে ধীরে একটা শীতল হাসি ফুটে উঠল।
তার হাতে থাকা কালো গোলকটা আরও জোরে ধুকপুক করতে লাগল…
আর ঠিক তখনই—
দূরে আবার সেই ঘণ্টার শব্দ বাজলো।
কিন্তু এবার—
এটা নতুন ট্রায়ালের শুরু না…
বরং—
কিছু বড় কিছুর আগমনের সংকেত।
চলবে..