hell university: রক্তের খেলা
✍️ লেখিকা: সামিয়া সুলতানা লিজা
পর্ব ৩
ঘণ্টার শব্দটা থামার পরও পুরো গোলকধাঁধা কাঁপছিল।
দেয়ালের ফাটল দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু বের হতে লাগল।
সামিয়া এখনো হাতে সেই কালো গোলকটা ধরে আছে।
গোলকটা ধুকপুক করছে—একদম জীবন্ত কিছুর মতো।
নীরা ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল।
সে চোখ খুলেই পিছিয়ে গেল।
“ওটা… ওটা কী?”
সামিয়া নিচের দিকে তাকাল।
“জানি না।”
কিন্তু সত্যি কথা হলো—
গোলকটা হাতে নেওয়ার পর থেকে তার মাথার ভেতর অদ্ভুত সব শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ফিসফিসানি।
অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে।
“wake up…”
“find us…”
“blood…”
সামিয়া চোখ বন্ধ করল।
এক মুহূর্তের জন্য তার মাথা ব্যথা করে উঠল।
আয়ান সেটা লক্ষ্য করল।
“তুমি ঠিক আছো?”
“আমি ঠিক আছি,” সামিয়া ঠান্ডা গলায় বলল।
ঠিক তখনই—
গোলকটা হঠাৎ লাল আলো ছড়াতে শুরু করল।
পুরো করিডোর কেঁপে উঠল।
তারপর—
সামনের দেয়ালে ধীরে ধীরে একটা দরজা তৈরি হলো।
আগে সেখানে কিছুই ছিল না।
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
“এটা আগে ছিল?”
আয়ান মাথা নাড়ল।
“না…”
দরজার উপর একটা প্রতীক জ্বলছে।
একটা চোখ।
আর তার নিচে লেখা—
“THE INNER FLOOR”
আয়ানের মুখ এবার সিরিয়াস হয়ে গেল।
“অসম্ভব…”
সামিয়া তাকাল,
“কি?”
আয়ান ধীরে বলল,
“এই ফ্লোর শুধু বিশেষদের জন্য।”
“বিশেষ মানে?”
আয়ান উত্তর দেওয়ার আগে—
লাউডস্পিকার আবার চালু হলো।
কিন্তু এবার আগের কণ্ঠ না।
এই কণ্ঠটা অনেক গভীর… ভয়ংকর।
“core has chosen its owner.”
“welcome… successor.”
নীরা ভয়ে পিছিয়ে গেল।
“successor মানে কী?”
কেউ উত্তর দিল না।
কারণ ঠিক তখনই—
দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে শুধু অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর অসংখ্য লাল চোখ জ্বলছে।
সামিয়ার হাতে থাকা গোলকটা আরও দ্রুত স্পন্দন করতে লাগল।
তার বুকের ভেতরেও অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
যেন…
এই জায়গাটা তাকে ডাকছে।
আয়ান ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি ভেতরে গেলে সবকিছু বদলে যাবে।”
সামিয়া শান্ত গলায় বলল,
“আমার জীবন আগেই বদলে গেছে।”
তারপর সে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল।
নীরা চিৎকার করে বলল,
“সামিয়া, wait!”
কিন্তু সামিয়া থামল না।
দরজার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই—
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা হাত বের হলো।
কালো… লম্বা… অস্বাভাবিক।
নীরা ভয় পেয়ে চিৎকার করল।
কিন্তু সামিয়া একটুও পিছালো না।
বরং সে হাতটা ধরে ফেলল।
এক মুহূর্তে—
পুরো জায়গাটা আলোয় ভরে গেল।
সামিয়ার চোখ পুরো লাল হয়ে উঠল।
তার মাথার ভেতর একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“finally… তুমি ফিরে এসেছো।”
সামিয়া হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“ফিরে… এসেছি?”
তার চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য কিছু ছবি ভেসে উঠল—
আগুন।
রক্ত।
একটা সিংহাসন।
আর—
ছোটবেলার সামিয়া…
এই একই ইউনিভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার শ্বাস আটকে গেল।
“এটা… কীভাবে সম্ভব…”
আয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।
সে খুব আস্তে বলল—
“…তুমি আগে এখানে এসেছিলে।”
সামিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখের সামনে এখনো সেই দৃশ্যগুলো ঘুরছে—
আগুনে জ্বলতে থাকা করিডোর…
রক্তে ভেজা মেঝে…
আর ছোট্ট একটা মেয়ে…
সে নিজেই।
“না…” সামিয়া আস্তে মাথা নাড়ল।
“আমি কখনো এখানে আসিনি…”
কিন্তু তার কণ্ঠে এবার আগের মতো আত্মবিশ্বাস নেই।
আয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“তুমি কিছু মনে করতে পারছো?”
সামিয়া চোখ বন্ধ করল।
মাথার ভেতর যেন কেউ জোরে জোরে দরজায় আঘাত করছে।
হঠাৎ—
আরও একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
একজন মহিলা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলছে—
“কখনো ফিরে আসবে না… promise me…”
তারপর—
অন্ধকার।
সামিয়া চোখ খুলে ফেলল।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।
“কে ছিল সে…” সে ফিসফিস করল।
ঠিক তখনই—
দরজার ভেতরের লাল চোখগুলো একসাথে জ্বলে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে কয়েকটা অবয়ব বের হয়ে এলো।
মানুষের মতো… কিন্তু পুরোপুরি মানুষ না।
তাদের চোখ কালো, শরীর ধোঁয়ার মতো।
নীরা পিছিয়ে গেল।
“ওরা আমাদের দিকে আসছে!”
একটা অবয়ব হঠাৎ সামিয়ার সামনে এসে থামল।
তারপর মাথা নিচু করল।
যেন…
সম্মান দেখাচ্ছে।
আয়ানের চোখ সরু হয়ে গেল।
“অসম্ভব…”
আরও কয়েকটা অবয়ব একইভাবে মাথা নিচু করল।
একসাথে তারা ফিসফিস করে বলল—
“welcome back…”
নীরার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“ওরা… তোমাকে চিনে?”
সামিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ তার নিজেরও ভয় লাগতে শুরু করেছে।
প্রথমবার।
ঠিক তখনই—
পুরো ইউনিভার্সিটিতে হঠাৎ সাইরেন বাজতে শুরু করল।
লাল আলো জ্বলে উঠল চারদিকে।
লাউডস্পিকারে তাড়াহুড়ো করা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“WARNING.”
“INNER SEAL BROKEN.”
“ALL FACULTY TO LEVEL ZERO.”
আয়ানের মুখ এক মুহূর্তে বদলে গেল।
“seal… ভেঙে গেছে?”
হঠাৎ—
মাটিটা প্রচণ্ড কেঁপে উঠল।
দূরের দেয়াল ভেঙে ধসে পড়তে লাগল।
আর অন্ধকারের গভীর থেকে একটা ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল।
নীরা কান চেপে বসে পড়ল।
সামিয়ার হাতে থাকা কালো গোলকটা এবার আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল।
তার ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বের হলো—
“run.”
পরের সেকেন্ডেই—
অন্ধকারের ভেতর থেকে বিশাল কিছু একটা নড়ল।
দুইটা জ্বলন্ত লাল চোখ খুলে গেল।
এত বড়… যে পুরো করিডোর ঢেকে যাচ্ছে।
নীরা কাঁপা গলায় বলল—
“ওটা… মানুষ না…”
আয়ান খুব আস্তে বলল—
“…guardian.”
সামিয়া তাকিয়ে রইল।
অদ্ভুতভাবে—
তার ভয় লাগছে না।
বরং—
মনে হচ্ছে সে এই প্রাণীটাকে আগে দেখেছে।
guardian ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
তারপর পুরো ইউনিভার্সিটি কাঁপিয়ে একটা শব্দ বের হলো—
“MY… QUEEN.”
পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
guardian-এর বিশাল শরীর অন্ধকারের ভেতরে নড়ছে, আর তার জ্বলন্ত লাল চোখ স্থির সামিয়ার উপর।
“My… Queen.”
শব্দটা যেন দেয়াল কাঁপিয়ে বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
নীরা আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।
“কুইন মানে কী?! সামিয়া, এটা তোমাকে কেন এমন বলছে?!”
সামিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ তার নিজের বুকের ভেতরও অদ্ভুত কিছু অনুভূত হচ্ছে।
যেন…
এই শব্দটা তার কাছে অপরিচিত না।
আয়ান ধীরে বলল,
“…এটা খারাপ।”
সামিয়া তার দিকে তাকাল।
“কি খারাপ?”
আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“hell university-তে একটা পুরোনো কিংবদন্তি আছে।”
guardian আবার মাথা নিচু করল।
আয়ান নিচু গলায় বলতে লাগল—
“অনেক বছর আগে এখানে একজন ছিল…
যে পুরো university control করত।”
“সবাই তাকে ভয় পেত।”
“তার শক্তি এত বেশি ছিল যে faculty-রাও তাকে থামাতে পারেনি।”
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
“তারপর?”
আয়ানের চোখ এবার সামিয়ার দিকে।
“এক রাতে সে হঠাৎ disappear হয়ে যায়।”
“তারপর university-র একটা অংশ seal করে দেওয়া হয়।”
“Inner Floor.”
সামিয়ার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে।
তার মাথার ভেতর আবার সেই কণ্ঠগুলো—
“remember…”
“wake up…”
হঠাৎ—
তার চোখের সামনে আবার একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটা ছোট মেয়ে অন্ধকার সিংহাসনে বসে আছে।
চারপাশে আগুন।
আর সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
ছোট মেয়েটা ধীরে মাথা তুলল।
সে সামিয়া।
সামিয়া হঠাৎ পিছিয়ে গেল।
“না…”
তার মাথা ধরে বসে পড়ল।
আয়ান এগিয়ে এলো,
“সামিয়া!”
ঠিক তখনই—
guardian সামনে এক পা এগোল।
পুরো মেঝে কেঁপে উঠল।
নীরা চিৎকার করল।
কিন্তু guardian তাদের আক্রমণ করল না।
বরং সামিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“WE WAITED… FOR YOUR RETURN.”
সামিয়ার হাতে থাকা কালো গোলকটা হঠাৎ ভেঙে গেল।
ভেতর থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়ে তার হাত ঘিরে ফেলল।
তার শরীরে লাল চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করল।
আয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।
“…mark of the ruler.”
সামিয়া কাঁপা গলায় বলল,
“আমি… কে?”
ঠিক তখনই—
পুরো ইউনিভার্সিটির আলো একসাথে নিভে গেল।
এক সেকেন্ডের সম্পূর্ণ অন্ধকার।
তারপর—
একটা ধীর তালি দেওয়ার শব্দ।
টক… টক… টক…
অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ হাঁটতে হাঁটতে সামনে এলো।
কালো স্যুট।
সাদা গ্লাভস।
মুখে শান্ত হাসি।
কিন্তু তার চোখ ভয়ংকর ঠান্ডা।
লোকটা থেমে সামিয়ার দিকে তাকাল।
তারপর হালকা ঝুঁকে বলল—
“welcome back, princess.”
আয়ানের মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।
“Director…” সে ফিসফিস করল।
লোকটা মুচকি হাসল।
“অনেক বছর পর অবশেষে খেলা আবার শুরু হলো।”