অচেনা মায়া
পর্ব নম্বর – ২
রহস্যময় ঈশান
সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। বারবার ফোনের স্ক্রিনে তাকাচ্ছিলাম। ঈশানের পাঠানো শেষ মেসেজটা তখনো আমার ফোনে জ্বলজ্বল করছে।
ঈশান: ঘুমিয়ে পড়েছ, মেহেনাজ?
আমি অনেকক্ষণ ভেবে উত্তর দিলাম।
আমি: আপনি কে? আর আমাকে চেনেন কীভাবে?
মেসেজটা পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর এল।
ঈশান: সব প্রশ্নের উত্তর একদিন পেয়ে যাবে।
আমি: একদিন মানে? এখন বলতে সমস্যা কোথায়?
এবার আর কোনো উত্তর এল না।
রাগে ফোনটা পাশে রেখে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। চারপাশে হালকা কুয়াশা। দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। এমন সময় পেছন থেকে আমার কাজিনের ডাক এল।
— এই মেহেনাজ! তোর সঙ্গে দেখা করতে একজন এসেছে।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
— আমার সঙ্গে? কে?
— নাম বলল ঈশান।
নামটা শুনেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
আমি দ্রুত নিচে নেমে এলাম। কিন্তু বসার ঘরে গিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না।
— কোথায় সে?
আমার কাজিন বলল,
— এই তো একটু আগেও ছিল। বলল, তুই এলে যেন তাকে জানাই।
আমি চারদিকে তাকালাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
— আমাকে খুঁজছ?
চমকে পেছনে তাকালাম।
ঈশান!
কালো শার্ট, এলোমেলো চুল আর সেই অদ্ভুত শান্ত চোখ। তাকে দেখে মনে হলো, যেন কিছুই ঘটেনি।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
— আপনি কি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন?
সে মৃদু হেসে বলল,
— তোমাকে ভয় দেখানোর ইচ্ছে থাকলে এত সহজে সামনে আসতাম না।
— তাহলে বারবার এভাবে হঠাৎ উধাও হয়ে যান কেন?
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— সব জায়গায় থাকা যায় না, মেহেনাজ।
তার কথার অর্থ বুঝলাম না।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— আপনি আসলে কে?
ঈশান আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সময় হলে অনেক কিছুই মনে থাকবে তোমার।
কথাটা বলে সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
আমি পেছন থেকে ডাকলাম,
— শুনুন!
সে থেমে গেল।
— আমার নানু আপনাকে চেনেন?
এবার প্রথমবারের মতো ঈশানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তোমার নানুকে এই প্রশ্নটা কোরো না।
কথাটা বলেই সে চলে গেল।
আমি কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
লোকটা এমন কেন?
আর নানুকে প্রশ্ন করতে নিষেধই বা করল কেন?
ঠিক তখনই পেছন থেকে নানুর কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
— মেহেনাজ, কার সঙ্গে কথা বলছিলি?
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
— ঈশানের সঙ্গে।
নানুর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
— কোন ঈশান?
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— ওই যে, কাল যার কথা বলেছিলাম। কালো শার্ট পরা ছেলেটা।
নানু কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন,
— মেহেনাজ, একটা কথা মনে রাখবি। সন্ধ্যার পর একা একা বাড়ির বাইরে যাবি না।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— কেন নানু?
নানু কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন।
কিন্তু আমার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
ঈশানের নাম শুনে নানু এত ভয় পেলেন কেন?
সেদিন রাতে আবার ফোনে একটা মেসেজ এল।
ঈশান: তোমার নানু কি আমার কথা বলেছে?
আমি অবাক হয়ে উত্তর দিলাম।
আমি: আপনি কীভাবে জানলেন?
ঈশান: কারণ আমি জানি, তিনি আমাকে পছন্দ করেন না।
আমি: আপনি আসলে কে, ঈশান?
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ফোনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল—
ঈশান: আমি যদি বলি, আমাকে জানার পর তুমি আর আগের মতো থাকতে পারবে না?
মেসেজটা পড়ে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আমি জানালার দিকে তাকালাম।
বাইরে অন্ধকার। গাছের পাতাগুলো বাতাসে নড়ছে।
আর ঠিক তখনই মনে হলো, কেউ একজন অন্ধকারের আড়াল থেকে আমার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
জানালার বাইরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
হয়তো আমার মনের ভুল।
তবুও কেন জানি মনে হচ্ছিল, কেউ একজন আমাকে আড়াল থেকে লক্ষ্য করছে।
ফোনটা হাতে নিয়ে ঈশানের মেসেজের উত্তর দিতে গেলাম। কিন্তু তার আগেই আরেকটা মেসেজ চলে এল।
ঈশান: এত রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভালো নয়।
আমি চমকে উঠলাম।
আমি: আপনি কি আমাকে দেখছেন?
ঈশান: সবকিছু চোখে দেখতে হয় না, মেহেনাজ।
আমি: এসব রহস্যময় কথা বলা বন্ধ করুন। আপনি কে, সেটা পরিষ্কার করে বলুন।
ঈশান: কাল দেখা হলে বলব।
আমি: কোথায় দেখা হবে?
ঈশান: যেখানে প্রথম দেখা হয়েছিল।
মেসেজটা পড়ে আর কিছু লিখলাম না।
পরদিন সকাল।
নানুর সঙ্গে নাশতা করতে বসেছি। নানু বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চান, কিন্তু বলছেন না।
আমি নিজেই জিজ্ঞেস করলাম,
— নানু, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?
নানু একটু থেমে বললেন,
— তুই কি কাল রাতে কারও সঙ্গে কথা বলছিলি?
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
— তুমি কীভাবে জানলে?
— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। তুই শুধু একটা কথা মনে রাখিস, অপরিচিত কারও ওপর সহজে বিশ্বাস করবি না।
আমি আর কথা বাড়ালাম না।
নাশতা শেষ করে মামার সঙ্গে বাজারে গেলাম। বাজারটা বেশ জমজমাট। চারদিকে মানুষের ভিড়, দোকানিদের ডাকাডাকি।
মামা একটা দোকানে কেনাকাটা করছিলেন। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিলাম।
হঠাৎ চোখ পড়ল রাস্তার ওপাশে।
ঈশান!
সে একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই হাতের ইশারায় ডাকল।
আমি মামাকে বললাম,
— মামা, আমি ওই দোকানটা একটু দেখে আসি।
মামা মাথা নাড়লেন।
আমি রাস্তা পার হয়ে ঈশানের সামনে গেলাম।
— আপনি এখানে কী করছেন?
ঈশান মৃদু হেসে বলল,
— তোমার অপেক্ষা করছি।
— আপনি কি সবসময় আমার অপেক্ষাতেই থাকেন?
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— হয়তো।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
— আপনার সঙ্গে কথা বললেই আমার মাথায় আরও দশটা প্রশ্ন আসে।
ঈশান হেসে ফেলল।
— তাহলে আজ একটা প্রশ্নের উত্তর দিই।
— কোন প্রশ্ন?
— তুমি জানতে চেয়েছিলে, আমি তোমাকে কীভাবে চিনি।
আমি আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকালাম।
ঈশান ধীরে বলল,
— তোমাকে আমি আজ থেকে চিনি না, মেহেনাজ।
কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম।
— তার মানে?
সে কিছু বলার আগেই মামার ডাক শুনতে পেলাম।
— মেহেনাজ! কোথায় গেলি?
আমি পেছনে তাকিয়ে বললাম,
— এই তো মামা!
আবার ঈশানের দিকে তাকাতেই দেখি, সে সেখানে নেই।
চারপাশে তাকালাম। দোকানের সামনে, রাস্তার পাশে—কোথাও নেই।
এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে একজন মানুষ এভাবে কোথায় চলে যেতে পারে?
আমি দ্রুত মামার কাছে ফিরে গেলাম।
মামা জিজ্ঞেস করলেন,
— কার সঙ্গে কথা বলছিলি?
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম,
— একজন পরিচিতের সঙ্গে।
— কে?
— ঈশান।
মামার মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। তিনি আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।
বাড়ি ফিরে দেখি নানু বারান্দায় বসে আছেন।
আমাকে দেখেই বললেন,
— মেহেনাজ, এদিকে আয়।
আমি কাছে যেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— আজও কি ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— তুমি কীভাবে জানলে?
নানু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আমি তোকে আগেই সাবধান করেছিলাম।
— নানু, তুমি ঈশানকে চেনো, তাই না?
তিনি চুপ করে রইলেন।
— তাহলে বলছ না কেন? সবাই ওর নাম শুনে এমন করে কেন?
নানু এবার আমার হাত ধরে বললেন,
— কিছু মানুষকে দূরে রাখাই ভালো, মা।
আমি বললাম,
— কিন্তু ঈশান তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি!
নানু আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমার কথাটা শুনে তিনি আরও ভয় পেয়েছেন।
— সব বিপদ আগে থেকে বোঝা যায় না, মেহেনাজ।
সেদিন রাতে নিজের ঘরে বসে ডায়েরি লিখছিলাম। হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।
ঈশান: আজ তোমার সঙ্গে কথা শেষ করতে পারলাম না।
আমি: আপনি কোথায় চলে গিয়েছিলেন?
ঈশান: সব জায়গায় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি: আপনি কি সত্যিই সাধারণ মানুষ?
মেসেজটা পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
ঈশান: এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখলাম,
আমি: হ্যাঁ। আমি সত্যিটা জানতে চাই।
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ঈশানের একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
ঈশান: তাহলে তোমার নানুর পুরোনো আলমারিটা একবার খুঁজে দেখো। সেখানে এমন কিছু আছে, যা তোমার সব প্রশ্নের শুরু।
মেসেজটা পড়ে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
নানুর পুরোনো আলমারি!
সেই আলমারিতে এমন কী আছে?
আর ঈশানই বা কীভাবে জানে?
আমি ধীরে ধীরে ঘরের দরজা খুলে বাইরে তাকালাম।
নানুর ঘরের দরজাটা বন্ধ।
কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে হালকা আলো বেরিয়ে আসছে।
ভেতর থেকে নানুর কণ্ঠ শোনা গেল—
— এত বছর পর আবার কেন ফিরে এলে, ঈশান?
আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম।
নানু কার সঙ্গে কথা বলছেন?
আর ঈশান কি সত্যিই আবার ফিরে এসেছে?
চলবে...!!