নাম: অচেনা মায়া
লিখিকা: সানজিদা আক্তার মোনালিসা
সেদিন রাতে ঘুমাতে গিয়েও ঈশানের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
"তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার খবর অন্যরাও জেনে গেছে।"
অন্যরা কারা?
তারা কি ঈশানের মতোই?
নাকি তারা আমার কোনো ক্ষতি করতে চায়?
কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, নানু আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
—মেহেনাজ, একটু নিচে আয় মা। তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে।
আমি নিচে নেমে গেলাম।
নানু আমাকে বসতে বলে নিজেও পাশে বসলেন।
—তুই কি ঈশানের সঙ্গে আবার দেখা করেছিস?
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
—হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কীভাবে জানলে?
নানু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি তোকে আগেই বলেছিলাম, ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে।
আমি বললাম,
—নানু, তুমি শুধু দূরে থাকতে বলো। কিন্তু কেন, সেটা বলো না।
নানু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—ঈশানের সঙ্গে তোর পরিবারের একটা পুরোনো সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্কের কারণেই ও আবার ফিরে এসেছে।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
—আমার পরিবারের সঙ্গে ঈশানের সম্পর্ক?
—হ্যাঁ।
—কী সম্পর্ক?
নানু উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে কারও ডাক শোনা গেল।
—আসসালামু আলাইকুম!
নানু উঠে বাইরে গেলেন।
আমি বসে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর নানু একজন বয়স্ক লোককে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। লোকটার হাতে একটা পুরোনো ব্যাগ।
নানু পরিচয় করিয়ে দিলেন,
—মেহেনাজ, উনি তোর নানার পুরোনো বন্ধু।
আমি সালাম দিলাম।
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—তুমিই মেহেনাজ?
আমি মাথা নাড়লাম।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
—তোমার চেহারায় তোমার নানার পরিবারের ছাপ আছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—আপনি আমার নানাকে চিনতেন?
লোকটি মাথা নাড়লেন।
—অনেক ভালো করেই চিনতাম।
তারপর তিনি নানুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ওকে কি সবকিছু জানিয়েছেন?
নানু মাথা নিচু করে বললেন,
—এখনো না।
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আর কতদিন লুকিয়ে রাখবেন? ঈশান ফিরে এসেছে। এবার সত্যিটা ওর জানা দরকার।
ঈশানের নাম শুনেই আমি সোজা হয়ে বসলাম।
—আপনিও ঈশানকে চেনেন?
লোকটি আমার দিকে তাকালেন।
—চিনি। তবে ওর সম্পর্কে যতটা জানি, তার সবটা বলা সহজ নয়।
আমি দ্রুত জিজ্ঞেস করলাম,
—ঈশান কি আগে এখানে এসেছিল?
লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই নানু বললেন,
—আজ আর এসব কথা নয়।
লোকটি ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
ছবিতে নানু দাঁড়িয়ে আছেন একটা পুরোনো বাড়ির সামনে। তাঁর পাশে একজন তরুণ।
তরুণটির মুখটা খুব পরিচিত।
কালো চুল, শান্ত চোখ...
এ যে ঈশান!
আমি ছবিটা হাতে নিয়ে বললাম,
—এটা কীভাবে সম্ভব?
নানু আমার দিকে তাকালেন।
লোকটি ধীরে বললেন,
—ছবিটা অনেক বছরের পুরোনো, মেহেনাজ।
আমার হাত কেঁপে উঠল।
—কিন্তু ঈশান তো এখনো একই রকম দেখতে!
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এল।
ঈশান: ছবিটা দেখেছ?
আমি চারদিকে তাকালাম।
ঈশান কীভাবে জানল আমি ছবিটা দেখছি?
আমি দ্রুত লিখলাম,
আমি: তুমি কি সব জানো?
ঈশান: সব না। তবে তোমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে।
আমি: তুমি কি এখন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?
ঈশান: বিকেলে পুরোনো রাজবাড়ির পাশের বটগাছটার কাছে এসো। তবে একা এসো না।
মেসেজটা পড়ে আমি আরও অবাক হলাম।
একাই যেতে নিষেধ করল কেন?
আমি নানুর দিকে তাকিয়ে বললাম,
—নানু, বিকেলে তোমার সঙ্গে একটা জায়গায় যেতে চাই।
নানু জিজ্ঞেস করলেন,
—কোথায়?
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললাম,
—যেখানে এই ছবিটা তোলা হয়েছিল।
নানু কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
—তাহলে বুঝি সত্যিটা জানার সময় এসে গেছে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
বিকেল হতে না হতেই আমি তৈরি হয়ে নিলাম।
নানু তাঁর পুরোনো একটা শাল গায়ে জড়িয়ে নিলেন। সঙ্গে সেই বয়স্ক লোকটিও যাবেন।
আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—উনার নাম কী, নানু?
নানু বললেন,
—উনার নাম আবদুল কাদের। তোর নানার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন।
আমরা তিনজন বাড়ি থেকে বের হলাম।
পুরোনো রাজবাড়ির পাশের রাস্তাটা খুব একটা বদলায়নি। চারপাশে বড় বড় গাছ, পুরোনো দালান আর নির্জন পথ।
হাঁটতে হাঁটতে কাদের সাহেব একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন।
—এই বাড়িটা চিনতে পারছ, বোন?
নানু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।
—কীভাবে ভুলব? কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে!
আমি অবাক হয়ে বাড়িটার দিকে তাকালাম।
—এই বাড়িতেই কি ছবিটা তোলা হয়েছিল?
কাদের সাহেব বললেন,
—হ্যাঁ। অনেক বছর আগে।
আমি আবার ছবিটা বের করলাম।
ছবির পেছনে ছোট করে একটা তারিখ লেখা ছিল। তারিখটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
ছবিটা তোলা হয়েছে এত বছর আগে, অথচ ঈশানের চেহারায় কোনো পরিবর্তন নেই!
আমি নানুকে জিজ্ঞেস করলাম,
—নানু, ঈশান কি সত্যিই এত বছর আগে এখানে এসেছিল?
নানু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—হ্যাঁ, মা। তখনও ওকে দেখতে ঠিক এমনই ছিল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম,
—তাহলে তুমি এতদিন আমাকে এসব বলোনি কেন?
নানু আমার হাত ধরে বললেন,
—কারণ আমি চাইনি তুই এমন একটা রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়িস, যেটা তোর জীবনকে বদলে দিতে পারে।
কাদের সাহেব এবার কথা বললেন।
—মেহেনাজ, তোর নানার সঙ্গে ঈশানের পরিচয় হয়েছিল অনেক বছর আগে। প্রথমে কেউ জানত না, ঈশান মানুষ নয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—নানা কি জানতেন যে ঈশান একজন জিন?
—হ্যাঁ। পরে সবকিছু জানার পরও তোর নানা ওকে বিশ্বাস করেছিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—কিন্তু কেন?
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—কারণ একসময় ঈশান তোর নানার পরিবারকে একটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল।
আমি আরও অবাক হয়ে গেলাম।
—কী বিপদ?
নানু এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—সেই সময়ের কিছু ঘটনা আমি তোকে বলতে চাই না। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, ঈশান আমাদের পরিবারের শত্রু নয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—তাহলে তুমি ওকে এত ভয় পাও কেন?
নানু উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।
আমরা সবাই একসঙ্গে সেদিকে তাকালাম।
পুরোনো দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
দরজার সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
কালো শার্ট।
পরিচিত সেই চোখ।
ঈশান!
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—তুমি এখানে?
ঈশান মৃদু হাসল।
—তোমাকে বলেছিলাম, বিকেলে দেখা হবে।
কাদের সাহেব ঈশানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—অনেক দিন পর দেখা, ঈশান।
ঈশান মাথা নত করে সালাম দিল।
—কেমন আছেন, কাদের চাচা?
কাদের সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি ভালো আছি। কিন্তু তোমার ফিরে আসার কারণটা এখনো বুঝতে পারছি না।
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মেহেনাজের জন্যই ফিরে এসেছি।
কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
—আমার জন্য?
ঈশান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। তোমার পরিবার সম্পর্কে এমন কিছু আছে, যেটা তোমার জানা দরকার।
আমি বললাম,
—কী আছে আমার পরিবারে?
ঈশান উত্তর দেওয়ার আগে নানু বললেন,
—আজ আর নয়। অনেক হয়েছে।
ঈশান শান্ত গলায় বলল,
—আপনি যতই লুকিয়ে রাখুন, সত্যিটা একদিন সামনে আসবেই।
তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—মেহেনাজ, তোমার নানার কাছে একটা জিনিস ছিল। সেটা এখনো এই বাড়ির কোথাও লুকানো আছে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—কী জিনিস?
ঈশান বলল,
—একটা পুরোনো চিঠি।
—চিঠিতে কী লেখা আছে?
ঈশান কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—সেটা পড়লেই তুমি বুঝতে পারবে, তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়টা কাকতালীয় নয়।
আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটা পুরোনো ঘড়ির শব্দ ভেসে এল।
টং... টং... টং...
কাদের সাহেব চমকে উঠলেন।
—এই ঘড়িটা তো বহু বছর ধরে বন্ধ!
ঈশান ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
—সময় এসে গেছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—কিসের সময়?
ঈশান আমার দিকে তাকাল।
—সত্যিটা জানার সময়, মেহেনাজ।
চলবে... !!