ফন্ট সাইজ:
থিম:
অচেনা মায়া

পর্ব 6

লেখক: সানজিদা আক্তার মোনালিসা

🌙 অচেনা মায়া 🌙

ঈশানের কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—সত্যিটা জানার সময়, মেহেনাজ।
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।
হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল—চারপাশের সবকিছু যেন থেমে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে বললাম—
—কোন সত্য?
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে সেই পরিচিত বিষণ্ণতা।
তারপর সে বলল—
—যে সত্যটা তোমার নানু এতদিন তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন।
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
—নানু?
ঈশান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কিন্তু নানু তোমাকে চেনেন কীভাবে?
ঈশান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল—
—কারণ আমাদের দেখা এই প্রথম নয়।
আমি যেন ঠিকমতো শুনতে পেলাম না।
—মানে?
ঈশান ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে একটু দূরে সরে গেল।
—তোমার জন্মের অনেক আগেই আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম।
আমার চোখ বড় হয়ে গেল।
—কীভাবে সম্ভব?
ঈশান কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
—তুমি আমাকে মানুষ হিসেবে দেখো, মেহেনাজ। কিন্তু আমি সবসময় মানুষের মতো সময়ের মধ্যে বাঁধা নই।
কথাটা শুনে আমার শরীর শিউরে উঠল।
হঠাৎ আমার মনে পড়ল—
নানুর সেই কথা।
“ও আমাদের মতো নয়।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম—
—তুমি আসলে কে, ঈশান?
প্রথমবারের মতো ঈশানের মুখের হাসিটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—তুমি কি সত্যিটা শুনতে প্রস্তুত?
আমি চুপ করে রইলাম।
ভয় লাগছিল।
কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল জানার ইচ্ছা।
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
—হ্যাঁ।
ঈশান আমার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল—
—আমি মানুষ নই, মেহেনাজ।
আমার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল।
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
—তাহলে... তুমি কী?
ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে কোথাও হঠাৎ অদ্ভুত একটা শব্দ হলো।
ঈশানের মুখের ভাব সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল—
—আজ নয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কেন?
ঈশান দ্রুত আমার দিকে তাকাল।
—কারণ কেউ আমাদের দেখছে।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
—কে?
ঈশান কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু বলল—
—এখন বাড়ি যাও।
—না! তুমি আমাকে এখানে ডেকে এনে আবার সব না বলে চলে যেতে পারো না।
ঈশান এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে রক্ষা করতেই সবকিছু বলছি না।
আমি থমকে গেলাম।
—আমাকে রক্ষা?
ঈশান ধীরে বলল—
—তুমি যতটা ভাবছ, ব্যাপারটা তার থেকেও অনেক বড়।
কথাটা বলেই সে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে গেল।
আমি চিৎকার করে বললাম—
—ঈশান! দাঁড়াও!
সে থেমে গেল।
শেষবারের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—সত্যিটা জানার পর হয়তো তুমি আর আগের মতো আমাকে দেখতে পারবে না, মেহেনাজ।
তারপর—
এক মুহূর্তের জন্য বাতাসটা প্রচণ্ড জোরে বয়ে গেল।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
আবার চোখ খুলতেই দেখি—
ঈশান আর সেখানে নেই।
আমি একা দাঁড়িয়ে আছি।
চারপাশে শুধু রাতের নীরবতা।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
ঈশান আসলে কে?
আর আমার নানু—
কী এমন সত্য লুকিয়ে রেখেছেন এতদিন?
সেদিন প্রথমবার আমার মনে হলো—
আমার জীবনে আসা ঈশান শুধু একজন রহস্যময় মানুষ নয়।
তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে—
আমার পরিবারের এমন এক অতীত, যার কথা আমি কখনো জানতামই না।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━
সেদিন রাতে আমি আর ঘুমাতে পারিনি।
বারবার ঈশানের কথাগুলো মনে পড়ছিল।
“আমি মানুষ নই, মেহেনাজ।”
“তোমার পরিবার আমাকে অনেক আগে থেকেই চেনে।”
“কেউ আমাদের দেখছে।”
এই কথাগুলো যেন আমার মাথার ভেতর ঘুরছিল।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো—
বাগানের সেই পুরোনো গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
আমি ভালো করে তাকালাম।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
তাহলে কি আমি ভুল দেখলাম?
পরদিন সকালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—
আজ নানুর কাছ থেকে সবকিছু জানব।
আমি নানুকে রান্নাঘরে পেলাম।
তিনি চুপচাপ কাজ করছিলেন।
আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
—নানু, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
নানু আমার দিকে তাকালেন।
—কী হয়েছে মা?
আমি সরাসরি বললাম—
—ঈশান কে?
নানুর হাত থেমে গেল।
কিছুক্ষণ তিনি কোনো কথা বললেন না।
আমি আবার বললাম—
—তুমি তাকে আগে থেকেই চেনো, তাই না?
নানু ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
তাঁর চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ।
—তুই ওর সঙ্গে আবার দেখা করেছিস?
আমি মাথা নাড়লাম।
—হ্যাঁ।
নানু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি জানতাম, একদিন না একদিন ও আবার ফিরে আসবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—আবার?
নানু আমার দিকে তাকালেন।
—হ্যাঁ, মেহেনাজ। ঈশান আগে একবার এই বাড়িতে এসেছিল।
—কবে?
নানু ধীরে বললেন—
—অনেক বছর আগে।
আমি বললাম—
—কিন্তু সে তো এখনো দেখতে একই রকম!
নানু চোখ নামিয়ে ফেললেন।
—সবাই মানুষের মতো সময়ের সঙ্গে বদলায় না।
আমার শরীর শিউরে উঠল।
আমি ধীরে বললাম—
—তাহলে ঈশান সত্যিই...
নানু আমাকে থামিয়ে দিলেন।
—নামটা উচ্চারণ করিস না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
—কেন?
নানু চারপাশে তাকালেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—
—কারণ কিছু নাম অকারণে উচ্চারণ করাও ঠিক নয়।
আমি আরও বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।
—নানু, তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ।
নানু আমার হাত ধরে বললেন—
—আমি তোকে ভয় পাইয়ে দিতে চাই না। আমি শুধু তোকে রক্ষা করতে চাই।
—কিন্তু ঈশান কি আমাকে ক্ষতি করবে?
নানু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
—ঈশান হয়তো করবে না।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—হয়তো?
নানু বললেন—
—কিন্তু ওর পৃথিবীর সবাই একরকম নয়।
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ঈশানের কথাটা মনে পড়ল—
“কেউ আমাদের দেখছে।”
আমি নানুকে জিজ্ঞেস করলাম—
—তুমি কি জানো, কে আমাদের দেখছে?
নানুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি কিছু বলার আগেই—
হঠাৎ ঘরের সব আলো নিভে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
আমি ভয়ে নানুর হাত শক্ত করে ধরলাম।
—নানু!
ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীরে...
ধীরে...
ধীরে...
আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছিল।
নানু ফিসফিস করে বললেন—
—মেহেনাজ, আমার পেছনে দাঁড়া।
আমি নানুর পেছনে দাঁড়ালাম।
হঠাৎ জানালার বাইরে একটা ছায়া দেখা গেল।
আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
আমার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে একটাই নাম—
ঈশান।
কাঁপা হাতে আমি ফোনটা ধরলাম।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে ঈশানের কণ্ঠ ভেসে এল—
—তোমার ঘর থেকে বের হবে না।
আমি ভয়ে বললাম—
—কেন? বাইরে কে?
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম, মেহেনাজ...
আমরা একা নই।
ফোনটা হঠাৎ কেটে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল।
আমি আতঙ্কে নানুর দিকে তাকালাম।
আর নানু খুব নিচু গলায় বললেন—
—ঈশান... সে আবার ফিরে এসেছে।
চলবে... !!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন