অচেনা মায়া
নানুর কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
—সে আবার ফিরে এসেছে?
আমি আতঙ্কিত চোখে নানুর দিকে তাকালাম।
কিন্তু নানু কোনো উত্তর দিলেন না।
জানালার বাইরের ছায়াটা ধীরে ধীরে নড়ছিল।
আমি ভয়ে নানুর হাত শক্ত করে ধরে বললাম—
—নানু, ও কে?
নানু খুব নিচু গলায় বললেন—
—আমি জানি না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
—কী! তুমি জানো না?
নানু আমার দিকে তাকালেন।
তাঁর চোখে আমি স্পষ্ট ভয় দেখতে পেলাম।
—কিন্তু আমি জানি, ও আমাদের জন্য ভালো কোনো খবর নিয়ে আসেনি।
ঠিক তখনই আবার আমার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ঈশানের নাম।
আমি দ্রুত ফোনটা ধরলাম।
—ঈশান!
ওপাশ থেকে তার কণ্ঠ ভেসে এল—
—তুমি ঠিক আছ?
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—তুমি কীভাবে জানলে?
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—জানালার কাছে যেও না।
আমি ভয়ে জানালার দিকে তাকালাম।
ছায়াটা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।
—ঈশান, ও কে?
এবার ঈশানের কণ্ঠটা একটু কঠিন হয়ে গেল।
—আমি এখনই আসছি।
—না! তুমি কোথায়?
—বাড়ির কাছেই।
কথাটা বলেই ফোনটা কেটে গেল।
আমি নানুর দিকে তাকালাম।
—ঈশান আসছে।
নানুর মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—না... ওকে এখানে আসতে দেওয়া যাবে না।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কেন?
নানু কিছু বলার আগেই—
বাইরে হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলো।
জানালাটা জোরে শব্দ করে খুলে গেল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
নানু দ্রুত জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ করার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা আর সেখানে নেই।
আমি আতঙ্কিত হয়ে চারপাশে তাকালাম।
—নানু... ও কোথায় গেল?
কোনো উত্তর নেই।
হঠাৎ ঘরের দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
ঠক!
ঠক!
ঠক!
আমরা দুজনেই স্থির হয়ে গেলাম।
নানু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
—কেউ দরজা খুলবি না।
আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম।
আবার শব্দ হলো।
ঠক!
ঠক!
ঠক!
ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এল।
ঈশান—
“দরজা খুলবে না।”
আমার হাত কেঁপে উঠল।
আমি দ্রুত লিখলাম—
“তুমি কোথায়?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
“তোমার খুব কাছেই।”
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
দরজার বাইরে আবার শব্দ হলো।
কিন্তু এবার—
কেউ যেন খুব আস্তে আমার নাম ধরে ডাকল।
—মেহেনাজ...
আমি ভয়ে পিছিয়ে গেলাম।
নানু আমার সামনে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই হঠাৎ ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
আর দরজার বাইরে থেকে পরিচিত একটি কণ্ঠ শোনা গেল—
—মেহেনাজ, ভয় পেয়ো না।
ঈশান!
আমি দৌড়ে দরজার কাছে যেতে চাইলাম।
কিন্তু নানু আমাকে থামিয়ে দিলেন।
—দাঁড়া!
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কেন?
নানু কাঁপা গলায় বললেন—
—আগে নিশ্চিত হতে হবে... বাইরে সত্যিই ঈশান আছে কি না।
কথাটা শুনে আমার শরীর শিউরে উঠল।
কারণ—
একই সময়ে আমার ফোনে ঈশানের আরেকটা মেসেজ এল।
“মেহেনাজ, আমি এখনো বাড়ির বাইরে আসিনি।”
আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে গেল।
তাহলে—
দরজার বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে...
সে কে?
দরজার বাইরে আবার সেই কণ্ঠটা শোনা গেল—
—মেহেনাজ, দরজা খোলো।
আমি ভয়ে নানুর দিকে তাকালাম।
নানু এবার আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন—
—একদম দরজার কাছে যাবি না।
আমি ফিসফিস করে বললাম—
—কিন্তু বাইরে যদি সত্যিই ঈশান হয়?
নানু কোনো উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল।
ঈশানের কল।
আমি দ্রুত ফোনটা ধরলাম।
—ঈশান!
ওপাশ থেকে তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল—
—দরজা খোলোনি তো?
—না। কিন্তু বাইরে তোমার মতো একজন দাঁড়িয়ে আছে!
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ঈশান খুব কঠিন গলায় বলল—
—আমি বলছি, যা-ই শোনো না কেন, দরজা খুলবে না।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
—ও কে?
ঈশান বলল—
—আমি এখনই আসছি।
ফোনটা কেটে গেল।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল।
শব্দটা ঈশানের মতো হলেও—
কেমন যেন অচেনা।
নানু ফিসফিস করে বললেন—
—ও আমাদের পরীক্ষা করছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
—কে?
নানু এবার বললেন—
—যে ঈশানের মতো হতে পারে, কিন্তু ঈশান নয়।
ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে একটুখানি ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আমি কেঁপে উঠলাম।
বাতিটা একবার নিভে আবার জ্বলে উঠল।
আর দরজার বাইরে থেকে সেই কণ্ঠটা এবার বলল—
—তুমি কি সত্যিই আমাকে চিনতে পারছ না, মেহেনাজ?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কিছুক্ষণ পর—
সবকিছু হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।
দরজার বাইরে আর কোনো শব্দ নেই।
আমি নানুর দিকে তাকালাম।
—চলে গেছে?
নানু ধীরে বললেন—
—না।
আমার বুক ধক করে উঠল।
—তাহলে?
নানু জানালার দিকে তাকালেন।
আমি ধীরে ধীরে সেদিকে তাকালাম।
জানালার বাইরে—
সেই ছায়াটা দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এবার—
তার পাশে আরও একজন।
আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
দ্বিতীয়জন ধীরে ধীরে আলোতে এগিয়ে এল।
এবার আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম—
সে সত্যিই ঈশান।
ঈশান জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ছায়াটা—
ধীরে ধীরে হাসছে।
ঠিক তখনই ঈশান ফোন করল।
আমি ফোনটা ধরতেই সে বলল—
—মেহেনাজ, জানালা থেকে সরে যাও!
আমি দ্রুত পিছিয়ে এলাম।
পরের মুহূর্তেই জানালার কাঁচে জোরে একটা শব্দ হলো।
নানু চিৎকার করে উঠলেন।
আর ঈশানের কণ্ঠ ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল—
—ও তোমাকে খুঁজছে!
আমি কাঁপা গলায় বললাম—
—কেন? আমি ওর কী করেছি?
ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—কারণ তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার খবর এখন শুধু একজন জানে না।
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—তাহলে কারা জানে?
ঈশান খুব নিচু গলায় বলল—
—যাদের সম্পর্কে তুমি এখনো কিছুই জানো না।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে—
সে একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
—আবার দেখা হবে, মেহেনাজ...
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সেদিন প্রথমবার সত্যিই বুঝতে পারলাম—
ঈশানের জীবনে আসার পর আমার জীবন আর আগের মতো নেই।
আর এই রহস্যের—
শুধু শুরু হয়েছে।
চলবে... !!