-স্যার, আই লাভ ইউ।
কলেজের মাঠে ইংরেজি লেকচারার বর্ষণ চৌধুরীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসল মেঘ।
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষণের চোখ লাল হয়ে উঠলো। তার ভেতরে যেনো কেউ আগুন ছুঁড়ে দিয়েছে। মেঘ ভয়ে এক ঢোক গিলে অপ্রস্তুত হাসি ঝরালো।
-আ… আ… আসলে ডে… ডেয়ার ছিলো বর্ষণ ভাই।
বর্ষণ গম্ভীর গলায় ধমক দিলো,
-এটা কি ট্রুথ-ডেয়ার খেলার জায়গা?
মেঘ গা বাঁচিয়ে তড়িঘড়ি বললো,
- না, একদম না। ওই শুভ্রা দিয়েছে… শু-শুভ্র… হেহেহে…
বলে হেসেই উলটো দিকে দৌড় দিলো সে। বর্ষণ কপাল কুঁচকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা অফিস কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগলো।
____________________________________
চৌধুরী বাড়ি যেনো রূপকথার মতো সমৃদ্ধ ছিলো একসময়। ফয়জুর চৌধুরী, ফয়সাল চৌধুরী, দুই ভাই আর একমাত্র বোন রুমিনা। তাদের হাসি-আনন্দে ভরে থাকতো চারপাশ। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সেই বাড়ি পরিণত হলো দ্বন্দ্বের অগ্নিকুণ্ডে। সম্পত্তি নিয়ে টানাপোড়েন এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে একে অপরের মুখ দেখাও দায় হয়ে গেলো। কাঁটায় কাঁটায় শত্রুতা, যার শেষপর্যন্ত রূপ নিলো চৌধুরী বাড়ির মাঝ বরাবর প্রাচীর তুলে দেওয়ায়। তাতেও শান্তি মিললো না।ফয়সালের অভিযোগ, বড় ভাই ফয়জুর চৌধুরী সিংহভাগ সম্পত্তি দখল করে নিয়েছেন, অথচ ছোট ছেলে হিসেবে বেশি পাওয়ার অধিকার তারই।
একসময় রাগের মাথায় ছুরি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ফয়সাল, প্রাণে বাঁচলেও সেই আঘাতের দাগ ফয়জুর চৌধুরীর বুকে যেমন থেকে গেলো, তেমনি তাদের সম্পর্কেও চিরস্থায়ী বিভাজন হয়ে গেলো।
ফয়জুর চৌধুরীর দুই সন্তান, ববিতা ও বর্ষণ।
ও ফয়সালের একমাত্র মেয়ে মেঘ।
রুমিনা তার তিন কন্যা নৌরিন, নোহা, নাওমিকে নিয়ে থাকেন স্বামীগৃহে। তবে এই দূরত্ব সবসময় ছিলো না।
একসময় দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিলো গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ।
মাহতাব চৌধুরী ও সায়রা খাতুন তাঁদের দুই ছেলের মিলনোৎসব দেখে মুগ্ধ হতেন। মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন, এই বন্ধনকে আরও অটুট করতে মেঘ ও বর্ষণের বিয়ে দেওয়া হবে। তখন বর্ষণের বয়স সতেরো, আর মেঘের মাত্র ছয়। বয়সের ব্যবধান ছিলো এগারো বছর, কিন্তু কারও মনে আপত্তি জাগেনি। কথা হয়েছিলো, মেঘ প্রাপ্তবয়স্ক হলেই দুজনের বিয়ে হবে। কিন্তু মাহতাব চৌধুরী ও সায়রা খাতুনের মৃত্যুতে সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। ভাইয়ের সম্পর্ক মুহূর্তেই পরিণত হলো শত্রুতায়, আর মেঘ-বর্ষণের ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনাও হারিয়ে গেলো সেই দ্বন্দ্বের ভিড়ে।
তবু ববিতা দৃঢ়ভাবে বলেছিল,
-বাবা-চাচা যাই করুক, আমরা ভাইবোনেরা নিজেদের সম্পর্ক ঠিক রাখবো।
সেই অঙ্গীকারেই লুকিয়ে-চুরিয়ে যোগাযোগ রাখছে মেঘ, ববিতা আর বর্ষণ। ববিতার সঙ্গে রোজই মেঘের কথা হয়, কিন্তু বর্ষণের সঙ্গে তেমন হয় না। কারণ বর্ষণ সবসময় গম্ভীর, কথার ফাঁকে ফাঁকেই পড়াশোনার প্রসঙ্গ টেনে আনে, যা মেঘের কাছে ভীষণ বিরক্তিকর লাগে। সায়রা খাতুন ডিগ্রি কলেজ ফয়সাল চৌধুরীর মায়ের নামে। মাহতাব চৌধুরী জীবদ্দশায় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নামকরণ করেছিলেন কলেজটির। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর সেই কলেজও হয়ে উঠলো দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বের ময়দান।
বর্ষণ যখন মাস্টার্স শেষ করলো, বড় ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে ফয়জুর চৌধুরী ছেলেকে কলেজের ইংরেজি বিভাগের লেকচারার হিসেবে বসালেন। এতে ফয়সালের ক্ষোভ দ্বিগুণ হলো। বড় ভাই কি পুরো কলেজ নিজের কব্জায় নেবে? তিনি মনস্থির করলেন, নিজের অংশ নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। মেঘের এসএসসি শেষ হতেই মেয়েকে ভর্তি করালেন সেই কলেজে। ভেবেই নিলেন, একদিন মেয়েকে কলেজের অধ্যাপকের আসনে বসাবেন, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করেও।
তবে মেঘকে বারবার সাবধান করলেন ফয়সাল চৌধুরী,
-বর্ষণের আশেপাশেও যেও না। ফয়জুর তার ছেলেকে তোমার পেছনে লেলিয়ে দিয়ে আমার সম্পত্তির ভাগ হাতিয়ে নিতে চাইবে, তাই সাবধানে থেকো সবসময়।
তবে মেঘ বেশিদিন বাবার কঠোর নির্দেশ মানতে পারলো না। ছোটবেলা থেকেই বর্ষণের প্রতি এক অদৃশ্য টান, একরকম ভালো লাগা তার হৃদয়ে গেঁথে ছিলো। এখন এত কাছাকাছি থেকেও কীভাবে চুপচাপ দূরে থাকবে? তাই অহেতুক অজুহাত খুঁজে কথা বলতো বর্ষণের সাথে। কখনো সামান্য প্রশ্ন, কখনো পড়াশোনার প্রসঙ্গ, যেনো নিছক হালকা আলাপ।
ববিতাও প্রায়ই কলেজে আসত। মেঘের সাথে দেখা করত, খোঁজখবর নিত। কখনো টিফিনে খাবার এনে দিত, যেনো ছোট বোনের প্রতি মমতা দেখিয়ে লুকিয়ে রাখছে পরিবারের সম্পর্কের ভাঙন।
এমন সময় শুভ্রার ডাক মেঘের ধ্যান ভাঙলো।
-কি’রে মেঘ, সেই তখন থেকে এখানে বসে আছিস কেন?
মেঘ হঠাৎ চমকে উঠে সামলে নিলো নিজেকে। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
-আজ তো খুব বাঁচা বেঁচে গেছি। হঠাৎ করেই বর্ষণ ভাইকে 'ভালোবাসি' কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।
শুভ্রার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
-তারপর? তারপর কী হলো?
মেঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
-ডেয়ার বলে চালিয়ে দিয়েছি।
শুভ্রা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে তার পিঠে চাপড় দিলো।
-ধুর, আমি তো ভাবলাম সবকিছু ফাঁস হয়ে গেলো।
মেঘ ঠোঁট কাঁমড়ে নিজের আবেগ আড়াল করার চেষ্টা করলো।
- বাবা-চাচার এই দ্বন্দ্বে হয়তো বর্ষণ ভাইকে পাওয়া হবে না আমার। তবু আমি তাকে ভালোবাসি। জানিস শুভ্রা, না পাওয়া জিনিসগুলোর ভেতরেই যেনো সবচেয়ে বেশি টান, সবচেয়ে বেশি মায়া জন্মায়।
শুভ্রা মেঘের কাঁধে হাত রেখে নরমস্বরে বললো,
-উল্টাপাল্টা ভেবে কষ্ট বাড়াস না। তুই আর স্যার যদি একে অপরকে সত্যিই ভালোবাসিস, তবে বাবা-চাচাদের কোনো শক্তিই পারবে না তোদের আলাদা করতে।
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
-কিন্তু শুভ্রা, বর্ষণ ভাই কি আমায় চায়?
শুভ্রা কাঁধ ঝাঁকালো।
-সেটাই তো জানি না। তবে তোর চোখের মতোই ওর চোখেও একদিন উত্তর খুঁজে পাবি।
দূর থেকে তাহিয়া ডাক দিলো,
- ওই মেঘ, শুভ্রা! তোরা ক্লাস করবি না? সেই কখন থেকে খুঁজছি। মাঠের মধ্যে কি করছিস?
শুভ্রা একটু ঢঙ করে উত্তর দিলো,
- বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলা মনে হয় শেষ হলো, তাই এখন আমাদের খোঁজ নিতে এসেছে।
কথাটা তাহিয়ার কানে যেতেই সে খানিক রাগ দেখিয়ে বললো,
- তুই সব সময় এরকম বলিস, যেনো আমি শুধু বয়ফ্রেন্ড নিয়েই পড়ে থাকি।
মেঘ মৃদু হেসে পরিস্থিতি সামলে নিলো।
-আচ্ছা থাক, বাদ দে। চল, ক্লাসে যাই।
তিনজন মিলে ধীরে ধীরে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ালো, কিন্তু মেঘের মনে তখনও অজস্র প্রশ্নের ভিড়, বর্ষণ ভাইয়ের চোখে কি সত্যিই তার জন্য কোনো অনুভূতি লুকিয়ে আছে? নাকি সবটাই তার একতরফা কল্পনা?
অনামিকা জ্যোতি রুবাদের ফিসফাস কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ করেই পুরো ক্লাসরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
দরজার দিকেই যেনো এক ঝলক আলো ঢুকলো, বর্ষণ স্যারের প্রবেশ। মেঘের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেলো। শুভ্রা তার পাশেই কনুই দিয়ে আলতো খোঁচা মেরে বললো,
-এই যে, স্বপ্ন না দেখে সোজা হয়ে বস।
মেঘ ইতিমধ্যেই বর্ষণের প্রতি এক অদৃশ্য টান অনুভব করছে। বর্ষণের প্রতিটি পদক্ষেপ যেনো মেঘের কানে ধ্বনি তোলে।
উচ্চতায় প্রায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি, জিমে ঘাম ঝরানো শরীরের প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে পুরুষালি কঠোরতা। সাদা শার্টের নিখুঁত ভাঁজ, কালো প্যান্টের দৃঢ়তা, কোমরে ভারী বেল্ট, হাতে কালো চামড়ার ঘড়ি সব মিলিয়ে যেনো শৃঙ্খলা ও ক্ষমতার প্রতীক।
মুখে খোঁচা দাঁড়ি তাকে দিয়েছে গম্ভীর পরিণত রূপ, আর ঠোঁটের হালকা গোলাপি আভা সেই কঠোরতাকে আড়ালে রেখে দিয়েছে সূক্ষ্ম কোমলতায়। তার চোখের মণি বাদামি, যেনো একদিকে অজানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, আবার অন্যদিকে অদ্ভুত টান তৈরি করে। এই দৃষ্টির সামনে কেউ দাঁড়ালে মনে হয় সে শুধু তাকায় না, ভেতরটা ভেদ করে পড়ে ফেলে। খাড়া খাড়া চুলে অগোছালো এক স্বাভাবিকতা, অথচ তার হাঁটার ভঙ্গি, দৃষ্টি, কথা বলার ভঙ্গিমা সবকিছুতেই স্পষ্ট এক রাজকীয়তা। কানে ঝুলছে ছোট্ট ব্লুটুথ, আধুনিকতার ছোঁয়া দিলেও সেই গম্ভীরতা কোনোভাবেই ভাঙতে পারে না।
বর্ষণ হাতে বই নিয়ে একে একে সবার দিকে তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ থেমে গেল মেঘের সামনে।
-মেঘ... মেঘ... মেঘ...
মেঘের দৃষ্টি ততক্ষণে যেনো কাচের মতো স্থির হয়ে গেছে বর্ষণের মুখে। কানে শব্দ ঢুকলেও তার মগজে পৌঁছালো না। শুভ্রা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করলো,
-ওরে গাধা, সামনে স্যার দাঁড়িয়ে আছেন!
মেঘ যেনো হুঁশ ফিরে পেয়ে তোতলাতে লাগলো,
-জ... জ্বি স্যার, আমি পারি। বাসায় শিখে এসেছি।
ভ্রু কুঁচকে বর্ষণ প্রশ্ন করলেন,
-কি পারো?
-ওই যে... যেটা আপনি বললেন। মেঘ অসহায় গলায় বলল।
বর্ষণ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-আমি কি বলেছি?
মেঘ চোখের ইশারায় শুভ্রাকে জিজ্ঞেস করলো, শুভ্রা না সূচক মাথা নাড়ালো। অবশেষে মেঘও মাথা নাড়িয়ে দিলো, সে জানেই না স্যার কি বলেছিলেন।
বর্ষণ এবার স্পষ্ট গলায় বলল,
-কি বলবে মুখে বলো মেঘ।
মেঘ শুধু স্থির চোখে বর্ষণের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, বুকের ভেতর যেনো কাঁপন তুলছে এক অজানা ভয় আর ভালোবাসা মেশানো অনুভূতি। বর্ষণের কণ্ঠ এবার খানিক কঠোর হলো,
-বসো তুমি। নেক্সট পড়ায় মনোযোগ না দিলে, সবার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবো।
ক্লাসরুমে চাপা হাসির শব্দ উঠলো। মেঘ চুপচাপ বসে গেলো।
বাড়ি ফিরেই মেঘ ব্যাগটা ছুড়ে ফেললো খাটের উপর।বুকের ভেতর গুমরে উঠছে অজস্র না বলা কথা। প্রতিটা শব্দ যেন তাকে ভেতর থেকে ক্ষত-বিক্ষত করছে। কেনো আব্বু, বড় আব্বুর সাথে সব ঠিক করে নিচ্ছেন না? কেনো ভেঙে দিচ্ছেন না দুই পরিবারের মাঝ বরাবর উঠানো এই অদৃশ্য নির্মম দেয়াল? একই ছাদের নিচে থেকেও রক্তের সম্পর্কগুলো আজ কত অচেনা, কত দূরের মনে হয়! কিন্তু এসব কে বোঝাবে আব্বুকে?
এমন সময় রাজিয়া আহমেদ ভাত বেড়ে মেয়ের রুমে এলেন। মেয়ের হাঁটার ভঙ্গি আর গুমোট মুখ দেখে সহজেই টের পেলেন, আজ কোনো না কোনো কারণেই সে বিরক্ত। মেঘ এলোমেলোভাবে ফ্লোরে বসে আছে, ঠিক যেনো অস্থির মনের প্রতিচ্ছবি। ভাতের প্লেট নামিয়ে রাজিয়া আহমেদ মেয়ের পাশে বসলেন, স্নেহমাখা হাতে মাথায় আলতো স্পর্শ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-কি হইছে মেঘ?
কথাগুলো যেনো গলায় আটকে গেলো মেঘের। বলতে চাইলেও ভয় ভেতর থেকে চেপে ধরলো। এসব বললে মা হয়তো ট্রান্সফার করিয়ে দেবেন অন্য কলেজে। আর তখন? তখন হয়তো বর্ষণ ভাইকে চোখের দেখা তো দূরের কথা, বর্ষণ ভাইয়ের মুখে নিজের নামটুকুও শোনার সুযোগ থাকবে না!
তবু একদিন সাহস সঞ্চয় করে রাজিয়া আহমেদকে বলেছিলো,
-বড় আব্বুর সাথে সব মিটমাট করে নিচ্ছো না কেনো?
প্রত্যুত্তরে রাজিয়া আহমেদ কঠিন গলায় বলে দিয়েছিলেন,
-এটা আজ বলেছো, বলেছো। আর কখনো এমন কথা মুখে যেনো না শুনি।
রাজিয়া আহমেদ জানতে চাইলেন,
-কলেজে কিছু হইছে?
মেঘ মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলো।
- তাহলে যাও, ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি ভাত খাইয়ে দিচ্ছি।
মেঘ কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে এলো। রাজিয়া আহমেদ নিজের হাতে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিলেন মেয়েকে। খাওয়ানোর পর মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললেন,
-এবার একটু ঘুমিয়ে নে মা, সন্ধ্যায় আবার পড়তে বসতে হবে।
মেঘ খুব ছোট করে উত্তর দিলো,
- হুম…
দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন রাজিয়া আহমেদ।মেঘ ফোনটা অন করতেই টুংটাং করে একের পর এক নোটিফিকেশন ভেসে উঠলো।
হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে দেখে, বর্ষণ একের পর এক পড়ার নোটস পাঠিয়েছে। মেঘ বিরক্ত মুখে ফোনটা একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বললো,
-এই মানুষটা কি পড়ালেখা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না?
ফোন আবারও অফ করে লম্বা একটা ঘুম দিলো সে।
ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ ববিতা আপার সাথে আড্ডা দিলো, খোঁজখবর নিলো উনার স্বামীর, খোঁজ নিলো ছোট্ট তিতলিটার।
এমন সময় রাজিয়া আহমেদ এক গ্লাস গরম দুধ আর সেদ্ধ ডিম হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। মা’কে দেখেই মেঘ তড়িঘড়ি ফোন লুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মেঘের চোখে কিছুটা ধরা পড়ার ভয়।
রাজিয়া আহমেদ দুধের গ্লাস টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বললেন,
-এখন ফ্রেশ লাগছে?
-হুম।
-কলেজ কেমন লাগছে?
-ভালোই।
যাক ভালো লাগলেই ভালো। মন দিয়ে পড়ো আমি আসি।
মেঘ মাথা নাড়ালো।
_______________________
এদিকে রাতের আঁধারে শুভ্রার রুম নিস্তব্ধ। টেবিলের কোণে বসে সে ঘুড়ি বানাচ্ছে। দু’বছর আগে মা চলে গেছেন, অথচ এই দুই বছরে এক রাতও যায়নি, যে রাতে সে মাকে চিঠি লেখেনি। সে ভালো করেই জানে, চিঠিগুলো কোনোদিন মায়ের কাছে পৌঁছাবে না, তবুও প্রতিরাতে লিখে যায়, মনের শান্তির জন্য। ঘুড়িতে বেঁধে আকাশে ভাসিয়ে দেয়। তারপর সুতো কেটে দেয় মুক্তির মতো। ঘুড়ি হারিয়ে যায় আকাশে সাথে শুভ্রার ভেতর জমে থাকা অশ্রু কিছুটা মুছে যায়। আজও নতুন ঘুড়ি বানানো শেষ করে কলম তুলে নিলো।
প্রিয় মা,
তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে আমার কপাল থেকে ‘ভালোবাসা’ শব্দটাই যেন মুছে গেছে। বাবার স্নেহ আছে, অভাব নেই টাকার কিংবা খাওয়ার কিন্তু তাঁর ভালোবাসা শুধু দায়িত্বের গণ্ডিতে আটকে আছে। তিনি কখনো আমার পাশে বসে গল্প শোনাননি, কখনো আমার সাথে একবেলা খাবার খাননি। তোমাকে হারানোর পর আমি একেবারে একা হয়ে গেছি, মা।কলেজে যতক্ষণ থাকি, হাসি-আড্ডায় সময় চলে যায়। কিন্তু রাত নামলেই শূন্যতা বুকের ওপর নেমে আসে।জানো মা, বাংলা ডিপার্টমেন্টে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের এক ছেলে গত ছ’মাস ধরে আমার পিছু পিছু ঘোরে।তার মুখে একটাই কথা, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, শুভ্রা।” আজকাল তার সেই উচ্ছ্বাস আমাকেও কেমন টানে।
এতটুকু লিখে চিঠিটা ভাঁজ করলো শুভ্রা। চিঠিটা ঘুড়ির গায়ে বেঁধে ছাদে উঠে গেলো। ল্যাম্পপোস্টের আলো ছাদে এসে ছড়িয়ে পড়ছে। শুভ্রা একা একা ঘুড়ি উড়ালো কিছুক্ষণ, তারপর কাঁপা হাতে সুতো কেঁটে দিলো। আকাশের ঘন অন্ধকারে ঘুড়ি মিলিয়ে গেলো, শুভ্রার মুখে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠলো।
হঠাৎ বাইরে থেকে চেঁচামেচি শোনা গেলো,
চোর! চোর! ধরো ওকে, মারো…
বোধহয় কোনো ছেলেকে ধরে বেদম মারছে। শুভ্রা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ক্ষণেক তাকিয়ে রইলো। ফিসফিস করে বললো,
‘দুনিয়ায় এত কাজ থাকতে মানুষ চুরি করে কেনো!’
মেঘ কলেজের জন্য বের হতে যাচ্ছিলো তখন পেছন থেকে ডেকে উঠলেন ফয়সাল চৌধুরী,
-মেঘ।
-জ্বি, আব্বু।
-কতবার বলেছি, পায়ে হেটে যেও না। তুমি আমাদের একমাত্র মেয়ে, চাইলে গাড়ি নিয়েও যেতে পারো।
-আব্বু, কুড়ি মিনিটের রাস্তা মাত্র, বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই সময় চলে যায়।
-ঠিক আছে, সাবধানে যাও।
মেঘ মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো।
গেট ম্যানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বর্ষণ ভাই কি বেরিয়ে গেছে?
-না।
না শব্দটি যেনো মেঘের অন্তরে এক অদ্ভুত উত্তেজনার ঢেউ ফেললো। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো সে। পুরো বাড়ি ভাগ হলেও রাস্তা একটাই, এটাই একমাত্র পথ যেটা দিয়ে দুই পরিবারের লোক যাতায়াত করে। আর মেঘ রোজ এই রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে বর্ষণের জন্য অপেক্ষা করে। যখনই বর্ষণ বাইক নিয়ে বের হবে, সে ভাবে আজ হয়তো এবার পেছনে বসিয়ে কলেজ পর্যন্ত নিয়ে যাবে, কিন্তু প্রতিবারই তার আশা মিথ্যে প্রমাণিত হয়। তবু মেঘ থেমে থাকে না; এই অপেক্ষা যেনো তার রোজকার অভ্যাস, মনস্তাত্ত্বিক অঙ্গীকারের মতো হয়ে গেছে।
চলবে,,,,,,
মেঘের বর্ষণ
আরেব্বা চৌধুরী
পর্ব ০১
পর্ব 1
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান