🎀🖤 ডাক্তার সাহেব বউ 🖤🎀
পর্ব — ০১
লেখিকা — উম্মে হাবিবা
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🌸 খান বাড়ির রাজকীয় বিয়ে 🌸
ঢাকার অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে খান পরিবার একটি সুপরিচিত নাম। বিশাল রাজকীয় বাড়ি, অঢেল সম্পদ, ক্ষমতা আর আভিজাত্যে পরিপূর্ণ এই পরিবারটির সুনাম বহু বছর ধরে ছড়িয়ে রয়েছে।
খান বাড়ির তিন কর্তা—নিহার খান, নিহাদ খান ও নিরান খান। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক যেমন দৃঢ়, তেমনি তাঁদের কথার মূল্যও অপরিসীম। এই পরিবারের সিদ্ধান্ত একবার নেওয়া হলে তা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।
নিহার খানের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী নুরজাহান খান। তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে—বড় ছেলে শুভ খান, মেজো ছেলে সাজ্জাদ খান, মেয়ে মেহেরিমা খান এবং ছোট ছেলে আইজান খান।
নিহাদ খানের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী রুজি খান। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে—বড় ছেলে শহীদ খান, একমাত্র মেয়ে মেহজাবিন খান এবং ছোট ছেলে ইয়াশ খান।
অন্যদিকে, নিরান খানের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী রোমা খান। তাঁদের তিন সন্তান—মেয়ে মাহাদিবা খান জোসনা, বড় ছেলে সাফওয়ান খান এবং ছোট ছেলে ইরফান খান।
সব মিলিয়ে খান বাড়ি যেন এক বিশাল রাজ্য। কিন্তু এই রাজ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু গোপন অধ্যায়, যেগুলোর কথা পরিবারের অনেক সদস্যও জানেন না।
আজ থেকে ষোলো বছর আগে এই বাড়িতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার প্রভাব আবারও ফিরে আসতে চলেছে।
আর সেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মেয়ে—মেহজাবিন খান।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
💍 যে বিয়েতে কনের কোনো সম্মতি ছিল না
খান বাড়িতে আজ উৎসবের আমেজ।
বাড়ির প্রতিটি কোণে সাজসজ্জার ধুম পড়েছে। ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে বিশাল অন্দরমহল। কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে প্রবেশদ্বার, কোথাও অতিথিদের আপ্যায়নের প্রস্তুতি চলছে। চারদিকে গানবাজনা, হাসি-আনন্দ আর ব্যস্ততা।
আজ খান পরিবারের বড় মেয়ের বিয়ে।
বরপক্ষের লোকজন ইতিমধ্যে এসে পড়েছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য সবাই প্রস্তুত। কিন্তু বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিই যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল!
কনের ঘরে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে কেউ নেই। আলমারি খোলা, বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কিছু পোশাক। ফোনটিও বন্ধ।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল, হয়তো কোথাও আছে। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই পরিষ্কার হয়ে গেল ভয়ংকর সত্যটা।
বড় মেয়ে পালিয়ে গেছে!
খবরটা শুনে খান বাড়ির সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
নুরজাহান খান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— কীভাবে সম্ভব? এত বড় সাহস হলো মেয়েটার!
নিহার খানের মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— বিয়ে হবে। আজকের দিনেই হবে। খান পরিবারের কথা একবার দেওয়া হয়েছে, সেই কথা ফিরিয়ে নেওয়ার মানুষ আমি নই।
একজন আত্মীয় ভয়ে ভয়ে বললেন,
— কিন্তু ভাইজান, এখন কী করবেন? বরপক্ষ তো চলে এসেছে!
নিহার খান ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন কঠোর সিদ্ধান্তের ছাপ।
— বাড়িতে আরেকটা মেয়ে আছে না? মেজো মেয়েকে ডেকে আনো। বিয়ে তার সঙ্গেই হবে।
কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
কারণ যে মেয়েটির কথা বলা হচ্ছে, সে মাত্র আজই হোস্টেল থেকে বাড়িতে ফিরেছে। সে জানেও না, তার জীবনের জন্য কী ভয়ংকর সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।
মেয়েটির নাম—মেহজাবিন খান।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🖤 মেহজাবিন খান
সতেরো বছরের এক কিশোরী।
সামনেই তার অনার্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে সে বাড়িতে ফিরেছিল। অথচ বাড়িতে পা রাখার পরই শুনতে পেল, তার বড় বোন নিজের বিয়ে থেকে পালিয়ে গেছে।
মেহজাবিন প্রথমে ভেবেছিল, পরিবারের সবাই হয়তো তাকে নিয়ে বসে আলোচনা করবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন তাকে ডেকে পাঠানো হলো, তখনও সে বুঝতে পারেনি তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
ঘরে ঢুকতেই বাবার গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
— মেহজাবিন, তোর বোন পালিয়ে গেছে।
মেহজাবিন অবাক হয়ে বলল,
— কী বলছ, বাবা? আপু পালিয়ে গেছে মানে?
— যা বলছি, তা-ই সত্যি।
— কিন্তু কেন? আর এখন কী হবে?
নিহার খান কোনো ভূমিকা না করেই বললেন,
— তোর বোনের জায়গায় আজ তোর বিয়ে হবে।
কথাটা শুনে মেহজাবিনের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— কী বললে, বাবা? আমার বিয়ে?
— হ্যাঁ। বরপক্ষকে কথা দেওয়া হয়েছে। খান পরিবারের সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব এখন তোর।
মেহজাবিন কয়েক মুহূর্ত বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— বাবা, আমি তো বিয়ে করতে চাই না! আমি এখনো পড়াশোনা করব। আমার তো নিজের একটা ভবিষ্যৎ আছে!
কিন্তু তার কথাগুলো যেন কারও কানেই পৌঁছাল না।
মা-বাবা, চাচা-চাচি—সবাই মিলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বোঝানোর আড়ালে ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত, যার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগটুকুও মেহজাবিন পেল না।
তার চোখে পানি জমে উঠল।
যে বাড়িতে সে এত বছর বড় হয়েছে, যে মানুষগুলোকে নিজের পৃথিবী মনে করেছে, আজ সেই মানুষগুলোই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার জীবন বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সে মনে মনে শুধু একটি কথাই বলল—
“আমার স্বপ্নগুলো কি এতটাই তুচ্ছ ছিল? আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকুও কি আমার নেই?”
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
👑 চৌধুরী পরিবারের পরিচয়
ঢাকার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী তারেক চৌধুরী। ব্যবসায়িক জগতে তাঁর নাম ও পরিচিতি যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর স্ত্রী রুহি চৌধুরী। তাঁদের দুই সন্তান—বড় ছেলে এরিদ চৌধুরী এবং ছোট মেয়ে মায়া চৌধুরী।
চৌধুরী পরিবারও আভিজাত্য ও প্রতিপত্তিতে কোনো অংশে কম নয়।
আর সেই পরিবারের বড় ছেলে—এরিদ চৌধুরী।
ছয় ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার সুদর্শন এক যুবক। গায়ের রং উজ্জ্বল, ব্যক্তিত্বে গাম্ভীর্য, আর হাসলে গালে ফুটে ওঠে ছোট্ট একটি টোল। কিন্তু তার সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি আলোচিত তার মেধা ও কর্মজীবন।
এরিদ একজন দক্ষ হার্ট সার্জন। চিকিৎসাবিদ্যায় নিজের অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি বাবার ব্যবসাও সামলায়। কাজের ব্যাপারে সে ভীষণ কঠোর, সিদ্ধান্তে দৃঢ় এবং নিজের জীবন নিয়ে যথেষ্ট স্বাধীনচেতা।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তে তার নিজের কোনো মতামতই রাখা হয়নি।
সেই সিদ্ধান্ত—তার বিয়ে।
বাবার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রাজি হয়েছে এরিদ। অথচ এই বিয়েতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
তার কাছে বিয়ে মানে দায়িত্ব, আর দায়িত্বের বাইরে কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দেওয়ার কথা সে কখনো ভাবেনি।
সে জানেও না, আজ যে মেয়েটিকে বিয়ে করতে যাচ্ছে, সেই মেয়েটি তার জীবনে একদিন এমন এক রহস্য হয়ে দাঁড়াবে, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাকে নিজের অতীত সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে হবে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🥀 বিদায়ের আগে শেষ কথা
অবশেষে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।
লালচে আভায় সাজানো বিয়ের পোশাকে মেহজাবিনকে অপূর্ব লাগছিল। তার উজ্জ্বল মুখ, দুই গালে হাসলে ফুটে ওঠা টোল আর কোমল চেহারার আড়ালে জমে ছিল অসংখ্য না-বলা কষ্ট।
চারপাশে সবাই আনন্দ করছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নতুন দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
কিন্তু মেহজাবিনের কাছে সবকিছুই যেন অর্থহীন।
তার চোখের কোণে জমে থাকা পানি সে বারবার আড়াল করার চেষ্টা করছিল। সে জানত, এই বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার জীবনে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।
গাড়িতে ওঠার আগে সে একবার পেছনে ফিরে তাকাল।
তারপর মা-বাবা ও চাচাদের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— একটা কথা মনে রেখো, তোমরা। আজ তোমাদের সম্মানের জন্য আমি নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিলাম। কিন্তু এই দিনটা আমি কোনো দিন ভুলব না।
কেউ কিছু বলার আগেই সে আবার বলল,
— আমি আর কখনো এই বাড়িতে ফিরে আসব না।
কথাটা বলে মেহজাবিন গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
খান বাড়ির বিশাল ফটক পেরিয়ে গাড়ি যখন দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল, মেহজাবিন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়লেও সে আর তা মুছল না।
তার মনে তখন একটাই সিদ্ধান্ত—
এই বিয়ে তার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হবে না। নিজের ভবিষ্যৎ সে নিজেই গড়বে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🏰 চৌধুরী বাড়িতে নতুন বউ
চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছানোর পর মেহজাবিন বুঝতে পারল, এই বাড়ির আভিজাত্য খান বাড়ির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
বিশাল লোহার ফটক, চারপাশে সাজানো সবুজ বাগান, রঙিন ফুলের সারি আর প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়ি—সব মিলিয়ে এক রাজকীয় পরিবেশ।
কিন্তু বাড়িতে প্রবেশ করেই সে এমন একটি খবর পেল, যা শুনে তার সব ভাবনা যেন থমকে গেল।
তার নতুন স্বামী এরিদ চৌধুরী কানাডায় চলে যাচ্ছে!
বিয়ের পর একবারও স্বামীর মুখ দেখার সুযোগ হয়নি তার। বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা পরিবারের লোকজনের উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয়েছে। আর এখন সেই স্বামীই তাকে রেখে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
মেহজাবিন মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“বাহ! বিয়ে করেই বউকে রেখে বিদেশে চলে যাওয়া! বেশ তো, ডাক্তার সাহেব! আপনার যখন আমাকে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই, তখন আমারই বা কেন থাকবে?”
তারপর নিজের মনেই আরেকটি সিদ্ধান্ত নিল।
“তিন দিন পর আমিও রাশিয়া চলে যাব। পড়াশোনা করব, নিজের জীবন গড়ব। এই বিয়ে আমার স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারবে না।”
এরপর চৌধুরী বাড়ির আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা নতুন বউকে দেখতে এলেন। সবাই মেহজাবিনের সৌন্দর্য, ভদ্রতা আর মিষ্টি ব্যবহারের প্রশংসা করছিলেন।
কেউ বললেন,
— মাশাআল্লাহ! কী সুন্দর মেয়ে!
আরেকজন বললেন,
— চৌধুরী বাড়ির বউ তো একেবারে পরীর মতো!
মেহজাবিন সবার কথা শুনে শুধু মৃদু হাসল।
কিন্তু তার মনে যে কত বড় সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেছে, তা কেউ বুঝতে পারল না।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
🌙 শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে এক অদ্ভুত ঘোষণা
সন্ধ্যার দিকে মেহজাবিন তার শ্বশুর তারেক চৌধুরী ও শাশুড়ি রুহি চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়াল।
— আঙ্কেল, আন্টি, আপনাদের সঙ্গে আমার একটা কথা ছিল।
রুহি স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
— বলো মা, কী হয়েছে?
মেহজাবিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— আমি তিন দিন পর রাশিয়া চলে যাব। সেখানে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
তারেক চৌধুরী অবাক হয়ে তাকালেন।
— রাশিয়া? তুমি সেখানে পড়াশোনা করবে?
— জি, আঙ্কেল। অনেক আগে থেকেই আমার পরিকল্পনা ছিল। আমি চাই, নিজের পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।
রুহি চৌধুরী একটু চিন্তিত হয়ে বললেন,
— কিন্তু মা, বিয়ের মাত্র তিন দিন পরই তুমি বিদেশে চলে যাবে? এরিদ তো কানাডায়। তোমরা একে অপরকে ঠিকমতো চিনতেও পারলে না!
মেহজাবিনের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
— আন্টি, আমাদের বিয়েটা তো আমাদের ইচ্ছায় হয়নি। আর আমি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আপনারা আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি ভালো থাকব।
তারেক চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মেয়েটির কথার মধ্যে অভিমান ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল আত্মসম্মান আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ়তা।
তিনি আর জোর করলেন না।
শুধু বললেন,
— ঠিক আছে, মা। তবে নিজের যত্ন নেবে। এই বাড়িটাকেও নিজের বাড়ি মনে করবে।
মেহজাবিন মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আপনাদের এই কথাটা আমি মনে রাখব, আঙ্কেল।
কিন্তু সে একটি কথা গোপন রাখল।
রাশিয়ায় শুধু তার পড়াশোনার ব্যবস্থা নেই। সেখানে অপেক্ষা করছে তার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে খান ও চৌধুরী পরিবারের কেউই জানে না।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
✈️ তিন দিন পর—নতুন গন্তব্য রাশিয়া
দেখতে দেখতে তিন দিন কেটে গেল।
মেহজাবিন নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পড়াশোনার নথি—সবকিছু প্রস্তুত।
চৌধুরী বাড়ির কেউই তাকে বাধা দিল না। তারেক ও রুহি তাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে চাইলেও মেহজাবিন বিনয়ের সঙ্গে জানাল, সব ব্যবস্থা সে নিজেই করে নিয়েছে।
বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সে শেষবারের মতো বাংলাদেশের আকাশের দিকে তাকাল।
এই দেশেই তার জন্ম। এই দেশেই তার শৈশব, তার পরিবার, তার অসংখ্য স্মৃতি। অথচ এই দেশ ছেড়েই তাকে নতুন করে নিজের জীবন শুরু করতে হচ্ছে।
মোবাইলের পর্দায় একটি বার্তা ভেসে উঠল।
“Princess, we are waiting for you.”
বার্তাটি পড়ে মেহজাবিনের মুখে অন্য রকম এক হাসি ফুটে উঠল।
যে হাসি গত কয়েক দিনে কেউ দেখেনি।
সে দ্রুত উত্তর দিল—
“I’m coming home.”
তারপর বোর্ডিংয়ের ঘোষণা শোনামাত্র সে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান আকাশে উড়ে গেল। ধীরে ধীরে নিচে হারিয়ে গেল বাংলাদেশ, আর মেহজাবিন পাড়ি জমাল রাশিয়ার উদ্দেশে।
কিন্তু সে কি সত্যিই শুধু পড়াশোনা করতে যাচ্ছে?
নাকি রাশিয়ার মাটিতে অপেক্ষা করছে তার এমন এক পরিচয়, যা জানাজানি হলে খান পরিবারের বহু বছরের অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে?
সেই উত্তর আপাতত অজানা।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
👑 রাশিয়ার প্রাসাদ—যেখানে অপেক্ষা করছে অন্য এক পৃথিবী
রাশিয়ায় পৌঁছে মেহজাবিন যখন বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এল, তখন রাতের আকাশে বরফশীতল বাতাস বইছে।
বিমানবন্দরের বাইরে সারি সারি কালো বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িগুলোর পাশে কালো পোশাক পরা কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
মেহজাবিনকে দেখতে পেয়েই তাঁদের একজন এগিয়ে এলেন।
— Welcome back, Princess.
মেহজাবিন মাথা নাড়ল।
— Thank you. Is everything ready?
— Yes, Princess. Everyone is waiting for you.
মেয়েটি গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ির বহর শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এমন এক বিশাল প্রাসাদের সামনে এসে থামল, যার উচ্চতা ও আভিজাত্য দেখে যে কেউ বিস্মিত হয়ে যাবে।
প্রাসাদের বিশাল ফটক খুলে গেল। দুপাশে সারিবদ্ধ নিরাপত্তাকর্মীরা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মেহজাবিন গাড়ি থেকে নামতেই একজন বয়স্ক নারী দ্রুত এগিয়ে এলেন।
— আমার রাজকন্যা!
মেহজাবিন তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— Mum, I missed you.
নারীটি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— আমরাও তোমাকে খুব মিস করেছি, আমার মেয়ে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে এক গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল—
— আমার রাজকন্যা অবশেষে বাড়ি ফিরেছে!
মেহজাবিন মুখ তুলে তাকাল।
সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির চোখে ছিল গভীর স্নেহ, অথচ তাঁর উপস্থিতিতে পুরো প্রাসাদ যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল।
মেহজাবিন এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।
— Dad!
লোকটি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বললেন,
— Welcome home, Princess.
সেই মুহূর্তে মেহজাবিনের মুখে ফুটে উঠল এমন এক প্রশান্তির হাসি, যা বাংলাদেশে কেউ দেখেনি।
কারণ এখানে সে কারও অবহেলিত মেয়ে নয়।
এখানে সে রাজকন্যা।
আর তার বাবা-মা এমন পরিচয়ের অধিকারী, যা জানাজানি হলে পুরো পৃথিবী অবাক হয়ে যাবে।
কিন্তু তাঁদের পরিচয় কী?
কেনই বা মেহজাবিন বাংলাদেশে নিজের পরিচয় গোপন করে সাধারণ একটি মেয়ের মতো জীবন কাটিয়েছে?
আর কেন তার বাবা-মা তাকে এত দিন দূরে রেখেছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অতীতের গভীরে।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
⏳ তিন বছর পর...
সময়ের স্রোতে কেটে গেল তিনটি বছর।
বাংলাদেশে চৌধুরী পরিবারের জীবন আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
এরিদ চৌধুরী কানাডা থেকে ফিরে বাবার ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি নিজের চিকিৎসকজীবনেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একজন দক্ষ হার্ট সার্জন হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
কাজের ব্যস্ততা, হাসপাতাল আর ব্যবসা—সব মিলিয়ে তার দিনগুলো কাটছে নিয়মের মধ্যে।
কিন্তু একটা বিষয় সে কখনো কাউকে বুঝতে দেয়নি।
তার বিয়ে।
যে মেয়েটিকে বিয়ে করেছিল, সেই মেয়েটি তিন বছর ধরে তার কাছ থেকে দূরে। তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মতো কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এমনকি মেহজাবিনের বর্তমান জীবন সম্পর্কে সে কতটুকু জানে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে খান বাড়িতেও সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
তারা জানে, বড় মেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরিবারের সিদ্ধান্তে মেহজাবিনের বিয়ে হয়েছিল এরিদ চৌধুরীর সঙ্গে। বিয়ের মাত্র তিন দিন পর সে রাশিয়ায় চলে গিয়েছিল পড়াশোনা করতে।
কিন্তু রাশিয়ায় গিয়ে সে কী করেছে, কার সঙ্গে থেকেছে, তার জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব বিষয়ে তাদের ধারণা নেই।
তারা জানে না, যে মেয়েটিকে তারা নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে দিয়েছিল, সেই মেয়েটিই এখন এমন এক জগতে বাস করছে, যেখানে পৌঁছানো তাদের কল্পনারও বাইরে।
আরও একটি বিষয় তারা জানে না—
মেহজাবিন খান আর আগের সেই সতেরো বছরের অভিমানী মেয়েটি নেই।
তিন বছরে তার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তার চিন্তাভাবনা, ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসে এসেছে নতুন দৃঢ়তা। সে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছে এবং এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে রয়েছে, যাঁদের পরিচয় এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে রহস্য।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যটি এখনো অমীমাংসিত।
এরিদ চৌধুরী জানে না, তার স্ত্রী আসলে কে।
খান পরিবার জানে না, তাদের মেয়ের অন্য একটি পরিবার রয়েছে।
আর চৌধুরী পরিবারও জানে না, তাদের বাড়ির বউয়ের জীবনে এমন এক অধ্যায় আছে, যা একদিন তাদের সবার সামনে উন্মোচিত হবে।
হয়তো খুব শিগগিরই।
সেদিন হয়তো এরিদ চৌধুরীকে নিজের স্ত্রীকে নতুন করে চিনতে হবে।
আর মেহজাবিন?
সে কি তিন বছর পর নিজের স্বামীর সামনে ফিরে আসবে?
নাকি তার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে এমন এক খেলা, যেখানে ভালোবাসা, অভিমান, ক্ষমতা আর গোপন পরিচয়ের মুখোমুখি দাঁড়াবে সবাই?
চলবে...
🖤🌹