ফন্ট সাইজ:
থিম:
ডাক্তার সাহেব বউ

পর্ব 2

লেখক: Umme Habiba

# 🎀🖤 ডাক্তার সাহেব বউ 🖤🎀

## পর্ব — ০২

**লেখিকা — উম্মে হাবিবা**

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🌸 রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে দুই রহস্যময় সুন্দরীর আগমন 🌸

রাশিয়ার ব্যবসায়িক জগতে এমন দুটি নাম রয়েছে, যাদের পরিচয় শুনলে বড় বড় ব্যবসায়ীদেরও একবার ভেবে কথা বলতে হয়। অসীম সম্পদ, বিশাল সাম্রাজ্য আর রহস্যে ঘেরা জীবন—সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে আছে তাদের এক ভয়ংকর পরিচয়।

তারা শুধু রাশিয়ার বিখ্যাত বিজনেসম্যানই নয়, বরং গোপন জগতের ক্ষমতাধর দুই গ্যাংস্টার হিসেবেও পরিচিত।

তাদের নাম—**ছায়া কাদের ও ইয়ারা কাদের।**

ব্যবসার জগতে তারা যেমন সফল, তেমনি নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভীষণ দৃঢ়। তাদের সামনে কেউ সহজে মাথা তুলে কথা বলার সাহস পায় না। তবে তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে।

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে চলেছে এই দুই রহস্যময় নারী। তাদের আসার উদ্দেশ্য একটাই—বাংলাদেশের নামকরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন করা এবং নিজেদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করা।

কিন্তু কেউ জানে না, এই সফর শুধু ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাদের জীবনে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবে!

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🚘 কাদের গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রিতে রাজকীয় আগমন 🚘

ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি প্রবেশপথের সামনে সারি সারি বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে বিএমডব্লিউ, অন্যদিকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ, রোলস-রয়েসসহ আরও অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি। প্রতিটি গাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর।

কালো পোশাক পরা নিরাপত্তারক্ষীরা চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে এক ধরনের গম্ভীর ভাব। মনে হচ্ছে, আজকের দিনটি অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা।

ঠিক তখনই বিমানবন্দরের ভিআইপি দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল দুটি মেয়ে।

দুজনের পরনেই কালো রঙের শার্ট, সুন্দরভাবে ইন করা। পায়ে তিন ইঞ্চি উঁচু দামী ব্র্যান্ডের জুতা। তাদের পোশাকের মধ্যে যেমন আভিজাত্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের ছাপ।

দুজনের পোশাক প্রায় একই রকম। হাঁটার ভঙ্গি, মুখের গাম্ভীর্য আর আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিতেও আশ্চর্যজনক মিল।

তাদের চুল কোমর পর্যন্ত লম্বা, বাদামি রঙের। চোখের মণিও বাদামি—তবে একজনের চোখে রয়েছে নীলের মায়াবী আভা। তাদের গায়ের রং এতটাই কাছাকাছি যে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া দুই যমজ বোন!

প্রথম মেয়েটি হলো ছায়া কাদের। তার চোখের নীল আভা যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

আর দ্বিতীয় মেয়েটি ইয়ারা কাদের। তার বাদামি চোখে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।

তারা দুজন কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে নিজেদের জন্য অপেক্ষা করা বিএমডব্লিউ গাড়িতে উঠে বসল।

ড্রাইভার বিনয়ের সঙ্গে বলল,

— ম্যাম, সবকিছু প্রস্তুত। আমরা এখনই কাদের গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রির উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারি।

ছায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— Let's go.

ড্রাইভার আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ি চালু করল।

মুহূর্তের মধ্যেই একে একে সব গাড়ি বিমানবন্দর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। গাড়ির দীর্ঘ বহর ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলল কাদের গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রির দিকে।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🏢 বাংলাদেশের ২০০টি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক 🏢

কাদের গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রির বিশাল ভবনটি যেন আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ভবনের সামনে নিরাপত্তারক্ষীদের কড়া পাহারা। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল লবি, ঝকঝকে মার্বেলের মেঝে আর দেয়ালে সাজানো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

আজকের দিনটি প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, রাশিয়ার দুই বিখ্যাত ব্যবসায়ী বাংলাদেশে এসে একসঙ্গে প্রায় ২০০টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে চলেছেন।

বাংলাদেশের নামকরা ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোর প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই মিটিং রুমে উপস্থিত হয়েছেন।

সেখানে রয়েছে খান গ্রুপ, চৌধুরী গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, বসুন্ধরা গ্রুপ, বেক্সিমকোসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

বিশাল মিটিং রুমের মাঝখানে একটি লম্বা টেবিল। টেবিলের দুই পাশে সারি সারি চেয়ার। প্রত্যেকের সামনে পানির বোতল, নথিপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাজানো।

কিন্তু এত বড় আয়োজনের মধ্যেও সবার দৃষ্টি আটকে আছে একটি বিষয়ের ওপর—রাশিয়া থেকে আসা সেই দুই রহস্যময় নারীকে দেখার অপেক্ষা।

কিছুক্ষণ পর মিটিং রুমের দরজা খুলে গেল।

দরজার সামনে প্রথমে দেখা গেল কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীকে। তারপর ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল ছায়া ও ইয়ারা।

দুজনের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই মিটিং রুমের পরিবেশ যেন বদলে গেল।

কেউ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল।

একজন ব্যবসায়ী নিচু কণ্ঠে পাশের জনকে বললেন,

— এরাই কি সেই কাদের গ্রুপের মালিক? শুনেছি, রাশিয়ার বাজারে এদের প্রভাব অনেক!

অন্যজন জবাব দিলেন,

— শুধু প্রভাব নয়, এদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় সুযোগ।

ছায়া ও ইয়ারা কারও কথায় মনোযোগ না দিয়ে নিজেদের নির্ধারিত আসনের দিকে এগিয়ে গেল।

তারা বসার পর ছায়া চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।

তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— সবাইকে শুভ সকাল। আশা করি, আপনারা সবাই ভালো আছেন। তাহলে আমরা কি মিটিং শুরু করতে পারি?

তার কথার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই নিজেদের আসনে সোজা হয়ে বসল।

মিটিং শুরু হলো।

এক এক করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিজেদের ব্যবসার পরিচয়, বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়গুলো তুলে ধরতে লাগলেন।

ইয়ারা বেশির ভাগ সময় নীরবে বসে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। অন্যদিকে ছায়া প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল।

একজন ব্যবসায়ী প্রশ্ন করলেন,

— ম্যাম, আপনারা যদি একসঙ্গে এতগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন তো?

ছায়া মৃদু হাসল।

— মিস্টার, আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তখন সেটার দায়িত্বও নিই। আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করবেন, তাদের প্রত্যেকের ব্যবসায়িক স্বার্থ, উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর।

আরেকজন প্রতিনিধি বললেন,

— আপনাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলে আমাদের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা করছি।

ছায়া মাথা নাড়ল।

— সেটাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা চাই, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আপনাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।

এভাবেই একের পর এক আলোচনা চলতে লাগল।

কখনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে কথা হচ্ছে, আবার কখনো নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।

সময় গড়িয়ে গেল।

এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা—দেখতে দেখতে প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে গেল।

অবশেষে মিটিং শেষের দিকে এগিয়ে এলো।

ছায়া সামনে রাখা নথিগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল,

— আজকের জন্য আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আপনাদের প্রত্যেকের প্রস্তাব আমরা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করব। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আমাদের টিম আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সবাইকে ধন্যবাদ।

সবাই সম্মানের সঙ্গে মাথা নাড়ল।

ঠিক তখনই পেছনের দিক থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—

— **ইয়ারা!**

কণ্ঠটা শুনে ইয়ারা থেমে গেল।

সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।

তারপর যা দেখল, তাতে তার চোখেমুখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বহুদিনের পরিচিত একজন মানুষ!

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 💗 বহুদিন পর প্রিয় বান্ধবীর দেখা 💗

মেয়েটিকে দেখে ইয়ারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর অবাক হয়ে বলল,

— আফিজা! তুই এখানে?

মেয়েটি হেসে উত্তর দিল,

— হ্যাঁ, আমি এখানে। কেন, আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে গেলি নাকি?

ইয়ারা হালকা হেসে বলল,

— আরে না! তোকে এখানে দেখব, সেটা ভাবিনি।

মেয়েটির নাম আফিজা নোমান। বয়স ২২ বছর। উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। তার স্বামী অর্ণব নেওয়ার বাংলাদেশের একজন পরিচিত ব্যবসায়ী।

আফিজা এগিয়ে এসে ইয়ারা ও ছায়ার দিকে তাকাল।

তার চোখে আনন্দের ঝিলিক।

— আচ্ছা, তোদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে আমার এখনো অবাক লাগছে! তোরা দুজন ঠিক আগের মতোই আছিস।

ছায়া মৃদু হেসে বলল,

— কিছু মানুষ বদলায়, আর কিছু সম্পর্ক দূরে থেকেও একই রকম থেকে যায়।

আফিজা কথাটা শুনে হাসল।

তারপর ইয়ানা বলল,

— তোর সঙ্গে আমার পরে কথা হবে। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে।

আফিজা মাথা নেড়ে বলল,

— ঠিক আছে। কিন্তু আজ তোকে ছাড়া আমি বাড়ি ফিরছি না, বুঝলি?

ইয়ারা হেসে উত্তর দিল,

— আচ্ছা, আচ্ছা। এবার একটু ধৈর্য ধর।

এরপর ইয়ারা আশপাশে তাকিয়ে আরেকজনকে খুঁজতে লাগল।

তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে ডাকল,

— **জ্যোৎস্না! তোর সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।**

ইয়ারা নাম ধরে ডাকতেই মিটিং রুমে উপস্থিত কয়েকজন আবার তাদের দিকে তাকালেন।

মেয়েটি এগিয়ে এলো।

এই মেয়েটির পরিচয়ও বেশ বিশেষ।

সে খান পরিবারের ছোট মেয়ে, মাহাদিবা খান। পরিবারের সবাই তাকে আদর করে জ্যোৎস্না নামে ডাকে।

বয়স উনিশ বছর। উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। তার গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। তার স্বামীর নাম আবির সরকার।

জ্যোৎস্না সামনে এসে ইয়ারা ও ছায়ার দিকে তাকাল।

তারপর আনন্দে বলে উঠল,

— ইয়ারা আপু! ছায়া আপু! তোমরা সত্যিই বাংলাদেশে এসেছ?

ছায়া মৃদু হেসে বলল,

— হ্যাঁ, জ্যোৎস্না। আমরা এসেছি। কেমন আছিস?

জ্যোৎস্না হাসিমুখে বলল,

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। কিন্তু তোমরা এত বছর কোথায় ছিলে? আমাদের কথা একবারও মনে পড়েনি?

ইয়ারা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— সব কথা একদিনে বলা যাবে না। অনেক কিছুই হয়েছে। সময় হলে সব বলব।

জ্যোৎস্না অভিমানী কণ্ঠে বলল,

— তোমরা সব সময় এই একই কথা বলো! পরে বলব, পরে বলব! সেই পরে যে কবে আসবে, কে জানে!

তার কথা শুনে ছায়া হেসে ফেলল।

— আচ্ছা, এবার থেকে আর এমন হবে না। খুশি?

জ্যোৎস্না মাথা নাড়ল।

— হুম, দেখা যাবে!

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🥹 তিন বছরের জমে থাকা অভিমান 🥹

আফিজা এবার ইয়ারা সামনে এসে দাঁড়াল।

তার মুখে হাসি থাকলেও চোখেমুখে জমে থাকা অভিমানের ছাপ স্পষ্ট।

— আচ্ছা, এবার আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দে।

ইয়ারা ভ্রু উঁচু করে বলল,

— কী প্রশ্ন?

আফিজা কোমরে হাত রেখে বলল,

— তুই আমাকে ছাড়া এত দিন কীভাবে ছিলি?

ইয়ারা কিছু বলার আগেই আফিজা আবার বলে উঠল,

— আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও আমাকে একটা ফোন পর্যন্ত করিসনি! তিন বছর ধরে তোর কোনো খবর নেই। তুই জানিস, আমি তোকে কত খুঁজেছি?

ইয়ারা এবার চুপ করে গেল।

আফিজা বলতে থাকল,

— আমি কতবার খান বাড়িতে গিয়েছি, জানিস? সবাই বলেছে, তোর বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়ের পর নাকি তুই আর আমাদের সঙ্গে দেখা করিসনি। আমি ভেবেছিলাম, অন্তত একবার হলেও তুই আমাকে মনে করবি!

তার কণ্ঠে এবার অভিমানের সঙ্গে কষ্টও মিশে গেল।

— আমি তোকে কতবার খুঁজেছি, ইয়ারা! আর তুই একবারও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলি না?

ইয়ারা ধীরে ধীরে আফিজার হাত ধরল।

— আফিজা, আমি জানি, তুই আমার ওপর অনেক রাগ করে আছিস। তোর রাগ করার অধিকার আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, সবকিছু আমার ইচ্ছেমতো হয়নি। এমন কিছু পরিস্থিতি ছিল, যেগুলো তোকে বোঝানো আমার পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না।

আফিজা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— আচ্ছা, সব কথা এখন বলতে হবে না। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এত সহজে তোকে ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে আমি নই!

ইয়ারা হেসে বলল,

— জানি তো, মাই বেস্ট ফ্রেন্ড!

কথাটা শুনে আফিজার মুখেও হাসি ফুটে উঠল।

দীর্ঘ তিন বছরের দূরত্ব যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য মুছে গেল।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 💐 বড় আব্বু কি সব মেনে নিয়েছেন? 💐

কিছুক্ষণ পর জ্যোৎস্না ইয়ারা দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

— ইয়ারা আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

— বল।

— তোমার বিয়ের পর বড় আব্বু কি সব মেনে নিয়েছেন?

ইয়ারা একটু থেমে বলল,

— হ্যাঁ, জ্যোৎস্না। এখন সব ঠিক আছে।

জ্যোৎস্না স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

— যাক, তাহলে ভালোই হয়েছে। জানো আপু, তোমাদের বিয়ের পর থেকে তোমরা আর আমাদের কোনো খোঁজ নাওনি। বাড়িতে আব্বু, বড় আব্বু—সবাই তোমাদের কথা জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু আমরা যখন তোমাদের খুঁজতে যেতাম, তখন শুনতাম, তোমরা নাকি বাড়িতে এসে আবার চলে গেছ।

ছায়া শান্ত কণ্ঠে বলল,

— অতীতের সব কথা মনে করে মন খারাপ করিস না। আমরা এখন বাংলাদেশে এসেছি। এবার সবার সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে।

জ্যোৎস্না হেসে বলল,

— তাহলে কথা দাও, এবার আর হারিয়ে যাবে না!

ইয়ারা তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,

— কথা দিলাম।

জ্যোৎস্না হাসিমুখে তার হাত ধরল।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🎉 বিয়ের তৃতীয় বর্ষপূর্তির দাওয়াত 🎉

আফিজা হঠাৎ আনন্দিত কণ্ঠে বলে উঠল,

— আচ্ছা, এত কথা হলো, এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি!

ছায়া ও ইয়ারা দুজনেই তার দিকে তাকাল।

— আগামীকাল আমার আর অর্ণবের বিয়ের তিন বছর পূর্ণ হবে। আমরা একটা ছোট্ট পার্টির আয়োজন করেছি। তোদের দুজনকেই আসতে হবে।

ইয়ারা হাসিমুখে বলল,

— ওহ! তাহলে তো অনেক বড় অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে!

আফিজা চোখ বড় করে বলল,

— অবশ্যই! আর শোন, তুই না এলে কিন্তু আমি সত্যিই রাগ করব।

ইয়ারা হেসে বলল,

— আচ্ছা, বাবা! যাব।

আফিজা এবার ছায়ার দিকে তাকাল।

— ছায়া আপু, আপনিও আসবেন। আপনাকে ছাড়া কিন্তু পার্টি জমবে না।

ছায়া মৃদু হেসে বলল,

— ঠিক আছে, চেষ্টা করব।

আফিজা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

— না, না! চেষ্টা করলে হবে না। আসতেই হবে!

ইয়ারা মজা করে বলল,

— আচ্ছা, তুই বল, কী পরে আসতে হবে? শাড়ি?

আফিজা দুষ্টুমি করে বলল,

— হ্যাঁ, শাড়ি পরে আসবি!

ইয়ারা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

— আমি শাড়ি পরব কেন? শাড়ি কি তোর জন্য বাধ্যতামূলক পোশাক নাকি?

আফিজা হেসে বলল,

— আমার পার্টিতে আমার নিয়ম চলবে!

ইয়ারা মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর কথা মেনে নিলাম।

আফিজা খুশি হয়ে বলল,

— পার্টি শুরু হবে আগামীকাল রাত আটটায়। কিন্তু শোন, তুই যদি না আসিস, তাহলে আমি আর কোনো দিন তোর সঙ্গে কথা বলব না!

ইয়ারা হেসে তার হাত ধরে বলল,

— ঠিক আছে, ম্যাডাম। আমরা দুজনেই আসব। এবার খুশি?

— হ্যাঁ, এবার খুশি!

তিনজনের হাসিতে মুহূর্তেই পরিবেশটা আনন্দময় হয়ে উঠল।

কিন্তু তাদের এই হাসির আড়ালে যে কত পুরোনো স্মৃতি, কত না বলা কথা আর কত রহস্য লুকিয়ে আছে, তা কেউ জানে না।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 👑 নায়িকা ইয়ারা কাদেরের আসল পরিচয় 👑

পাঠক, এবার একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক আমাদের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর সঙ্গে।

**ইয়ারা কাদের**—এই গল্পের অন্যতম প্রধান নায়িকা। সে রাশিয়ার বিখ্যাত কাদের পরিবারের মেয়ে। ব্যবসায়িক জগতে তার পরিচিতি রয়েছে, আর তার ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় অতীত।

বাংলাদেশের খান পরিবারের মেজকর্তার একমাত্র মেয়ে মেহজাবিন খানও এই গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তার জীবন, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো গল্পের কাহিনিকে নতুন দিকে নিয়ে যাবে।

আর **ছায়া কাদের** হলো ইয়ারা কাদেরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। রাশিয়ার প্রভাবশালী কাদের পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং ইয়ারা সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গল্পে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ছায়া ও ইয়ারা অনলাইনে পরিচিত হয়েছিল। সেই পরিচয় থেকেই ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। একসময় তারা হয়ে ওঠে একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

দূরত্ব তাদের আলাদা করতে পারেনি। সময় তাদের সম্পর্কের পরীক্ষা নিয়েছে, কিন্তু বন্ধুত্বের টান আজও রয়ে গেছে।

আর সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই আজ বাংলাদেশের মাটিতে তাদের নতুন যাত্রা শুরু হলো।

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🌆 নতুন ঠিকানায় ছায়া ও ইয়ারা 🌆

মিটিং শেষ হওয়ার পর সবাই একে একে বিদায় নিতে শুরু করল।

কেউ ব্যবসায়িক আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আবার নতুন চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।

ছায়া ও ইয়ারা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে এলো।

বাইরে তাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল।

দুজন গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল,

— ম্যাম, আমরা কি সরাসরি বাসায় যাব?

ইয়ারা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— হ্যাঁ, বাসায় চলো।

গাড়ির বহর ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রির চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে কিছুক্ষণ পর তারা এসে পৌঁছাল একটি নতুন আবাসিক ভবনের সামনে।

এই মাসেই বাংলাদেশে তাদের জন্য নতুন একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। বাইরে থেকে ভবনটি দেখতে যেমন আধুনিক, ভেতরে তেমনি সাজানো হয়েছে তাদের পছন্দ অনুযায়ী।

গাড়ি থেকে নেমে ছায়া ভবনটির দিকে তাকাল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

— ইয়ারা, জায়গাটা কিন্তু বেশ সুন্দর!

ইয়ারা চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— হুম। আশা করি, এখানে আমাদের সময়টা ভালো কাটবে।

দুজন পাশাপাশি হেঁটে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করল।

লিফটে উঠে নির্দিষ্ট তলায় পৌঁছে তারা নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল।

দরজা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক রাজকীয় দৃশ্য।

বিশাল ড্রয়িংরুম, ঝকঝকে মেঝে, সুন্দর আসবাবপত্র, বড় বড় কাচের জানালা এবং আধুনিক আলোকসজ্জা—সবকিছুই যেন নিখুঁতভাবে সাজানো।

ড্রয়িংরুমের এক পাশে আরামদায়ক সোফা, অন্য পাশে সুন্দর ডাইনিং স্পেস। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায় শহরের ব্যস্ত রাস্তা আর দূরের উঁচু ভবনগুলো।

ছায়া ধীরে ধীরে ঘরটির চারপাশ ঘুরে দেখল।

তারপর সোফায় বসে বলল,

— অবশেষে একটু শান্তিতে বসা গেল!

ইয়ারা হেসে বলল,

— কেন? আজকের মিটিংয়ে এত ক্লান্ত হয়ে গেছিস?

ছায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— মিটিংয়ের জন্য নয়। এত মানুষের এত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বিরক্ত লাগছিল।

ইয়ারা হেসে উঠল।

— আরে, এটাই তো ব্যবসা! এতগুলো গ্রুপের সঙ্গে কাজ করতে গেলে একটু ধৈর্য ধরতেই হবে।

ছায়া মাথা নেড়ে বলল,

— জানি। কিন্তু এখন আমার একটাই ইচ্ছা—এক কাপ গরম কফি আর কিছুক্ষণ শান্তিতে বসে থাকা।

ইয়ারা উঠে দাঁড়াল।

— তাহলে তুই বস। আমি কফি বানিয়ে আনছি।

ছায়া অবাক হয়ে বলল,

— কী ব্যাপার! আজ তুই কফি বানাবি?

ইয়ারা ঘুরে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,

— কেন? আমি কি কফি বানাতে পারি না?

ছায়া হেসে বলল,

— পারিস তো! তবে তোর হাতের কফি খেয়ে বেঁচে ফিরতে পারব কি না, সেটা নিয়ে একটু সন্দেহ আছে!

ইয়ারা চোখ বড় করে বলল,

— এই মেয়ে! দাঁড়া, আজ তোকে এমন কফি খাওয়াব যে, সারাজীবন মনে রাখবি!

দুজনের হাসিতে পুরো ফ্ল্যাটটা মুখর হয়ে উঠল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।

শহরের আকাশে একে একে জ্বলে উঠছে আলো। নতুন শহর, নতুন ঠিকানা, পুরোনো বন্ধুত্ব আর সামনে অপেক্ষা করে থাকা অসংখ্য ঘটনা—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

কিন্তু তারা তখনো জানত না, আগামীকালের সেই বিয়ের বর্ষপূর্তির পার্টিতে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হবে, যা তাদের জীবনের গল্পকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে।

কাদের পরিবারের দুই রহস্যময় নারী বাংলাদেশে এসেছে।

তাদের অতীতের দরজা এখনো বন্ধ।

আর সেই দরজা খুললেই হয়তো সামনে আসবে এমন কিছু সত্য, যা বদলে দেবে অনেকগুলো মানুষের জীবন!

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

### 🖤 চলবে… 🖤

**পর্ব — ০২ সমাপ্ত।**

✍️ লেখিকা — উম্মে হাবিবা

🌸 *ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, অভিমান, রাজকীয় জীবন আর রহস্যে ঘেরা এক নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায় থাকুন।*

**পর্ব ০৩-এ দেখা হবে নতুন গল্প, নতুন রহস্য আর নতুন চমকের সঙ্গে।** 🎀🖤

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন