জান্নাতের ছায়া
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ১ নীরব ভোরের ইবাদত ও ভালোবাসার প্রথম সোপান
রাতের শেষ প্রহর। চারপাশ নিস্তব্ধ, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো পৃথিবী। কেবল দূর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা ফজর পূর্ববর্তী তাহাজ্জুদের শান্ত পরিবেশ কিংবা মৃদু বাতাসে গাছের পাতার মর্মর শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই!
এই নিঝুম রাতেও শহরের একটি ছোট, সাধারণ ফ্ল্যাটের আলো জ্বলছে মৃদুভাবে। সেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেই অনুভব করা যায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা দুনিয়ার কোনো কৃত্রিম আলো বা বিলাসবহুল আসবাবপত্র দিয়ে কেনা যায় না।
ঘরের এক কোণে জায়নামাজ বিছানো। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সাদিক। তাঁর পরনে একটি সাদা সুতির পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি।
তাহাজ্জুদের শেষ সেজদায় লুটিয়ে পড়ে আছেন তিনি। তাঁর চোখের কোণ গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ জলের ফোঁটা—সেটা দুনিয়াবি কোনো প্রাপ্তি বা প্রাপ্তির আশাহীনতার কান্না নয়, বরং মহান আল্লাহর ভীতি, তাঁর অসীম রহমতের শুকরিয়া এবং নিজের দুর্বলতাগুলোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আকুতি।
সেজদায় থাকা অবস্থায় তিনি মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলছেন, "হে আমার রব, আমাকে এবং আমার পরিবারকে এমন এক জীবনের অধিকারী করুন, যা আপনার সন্তুষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের ভালোবাসাকে জান্নাতের পথচলার সহায়ক বানিয়ে দিন।"
ঠিক একই সময়ে, বিছানার অন্যপাশে মৃদু নড়াচড়া হলো। ফাতেমা চোখ মেলে তাকালেন। তাঁর চোখে কোনো জড়তা ছিল না, ছিল এক স্নিগ্ধ আলো। তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। রুমের হালকা আলোয় দেখতে পেলেন সাদিক এখনো সেজদায় পড়ে আছেন।
এই দৃশ্য ফাতেমার হৃদয়ে এক অন্যরকম কম্পন সৃষ্টি করল। প্রতি রাতের এই দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন কোনো বিস্ময় নয়, তবুও প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখলে তাঁর বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় ভরে ওঠে।
একজন স্ত্রীর কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে যে, তাঁর স্বামী রাতের অন্ধকারে নিজের আরামের ঘুম হারাম করে আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন?
ফাতেমা আলতো পায়ে হেঁটে এলেন সাদিকের কাছে। তিনি কোনো শব্দ করলেন না, পাছে সাদিকের একাগ্রতায় ব্যাঘাত ঘটে। তিনি নীরব দাঁড়িয়ে রইলেন যতক্ষণ না সাদিক সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত শেষ করলেন।
মোনাজাত শেষ করে সাদিক পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলেন ফাতেমা দাঁড়িয়ে আছেন। ফাতেমার মুখে এক টুকরো স্নিগ্ধ হাসি। তিনি হাতে একটি পরিষ্কার তোয়ালে এবং জায়নামাজের পাশে এক গ্লাস হালকা গরম পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
সাদিক মুচকি হেসে বললেন, "এত সকালে উঠে পড়লে ফাতেমা? তোমার তো আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো উচিত ছিল, কাল সারাদিন তো অনেক ধকল গেছে।"
ফাতেমা মৃদু হেসে গ্লাসটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "যে ঘরের স্বামী রাতের শেষ প্রহরে রবের সাথে কথা বলার জন্য জেগে ওঠেন, সে ঘরের স্ত্রীর পক্ষে ঘুমানো কি মানায়, সাদিক?
"আপনার এই ইবাদতের একটুখানি সওয়াব কি আমার আমলনামায় যোগ হওয়ার সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারি?"
সাদিকের চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় চকচক করে উঠল। এটিই ছিল তাদের ভালোবাসার মূল ভিত্তি। তাদের সম্পর্কটি কেবল ভালো লাগা বা বাহ্যিক রূপের মোহের ওপর তৈরি হয়নি।
তাদের এই ভালোবাসার ভিত ছিল অত্যন্ত শক্ত—যার ভিত্তি ছিল তাকওয়া, পরকালের মুক্তি এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস।
☞অতীত পাতার স্মৃতি:
✪সাদিক ও ফাতেমার পথচলা
আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগের কথা। সাদিক যখন ফাতেমার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন চারপাশের অনেকেই অবাক হয়েছিল।
সাদিক তখন অত্যন্ত সাধারণ একজন মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ছোটখাটো একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। তাঁর পকেটে খুব বেশি টাকা ছিল না, ছিল না কোনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিংবা গাড়ি।
ফাতেমার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব আসার পর অনেকেই ফাতেমার বাবাকে বলেছিল, "আপনার মেয়ে তো এত ভালো ছাত্রী, শহরের একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তার জন্য তো বড় কোনো ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসায়ীর পাত্র দেখা উচিত।"
কিন্তু ফাতেমার বাবা ছিলেন একজন দূরদর্শী ও দ্বীনদার মানুষ। তিনি শুধু দুনিয়াবি চাকচিক্য দেখেননি, তিনি দেখেছিলেন সাদিকের ভেতরকার মানুষটিকে—তাঁর চরিত্র, তাঁর বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি।
ফাতেমার বাবা ফাতেমাকে ডেকে বলেছিলেন, "মা, দুনিয়ার ধন-সম্পদ একদিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, সে কখনো তোমার ওপর জুলুম করবে না। সে তোমাকে সম্মান করবে, আগলে রাখবে।"
ফাতেমাও সেদিন নিজের বাবার সাথে একমত হয়েছিলেন। তিনি নিজের মনে বলেছিলেন, "আমি এমন কাউকে চাই না যে শুধু আমাকে দুনিয়ার সুখ দেবে, আমি এমন একজন জীবনসঙ্গী চাই যে আমার হাত ধরে জান্নাতের পথ মসৃণ করে দেবে।"
বিয়ের প্রথম দিন সাদিক ফাতেমার হাতে হাত রেখে একটি পবিত্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সাদিক বলেছিলেন, "ফাতেমা, আমি তোমাকে রাজরানী করে রাখতে পারব না, হয়তো রোজ সোনার গহনা দিতে পারব না। কিন্তু আমি তোমায় আল্লাহর দ্বীনের ওপর চলতে সাহায্য করব। আমরা দুজনে মিলে এমন এক সংসার গড়ব, যেখান থেকে প্রতিদিন আল্লাহর জিকির আর কুরআনের সুবাস বের হবে।"
আর সেই প্রতিশ্রুতি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তাদের ছোট্ট সংসারটি যেন দুনিয়ার বুকে এক টুকরো জান্নাতের বাগান।
☞বর্তমান সকালের স্নিগ্ধতা:
✪ফজরের আযান ও নতুন দিনের সূচনা
পানি পান শেষ করে সাদিক ফাতেমার দিকে তাকালেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই দূর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এল ফজর এর সুমধুর আযান—"আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম" (নিদ্রা অপেক্ষা সালাত উত্তম)।
আযানের ধ্বনি শোনার সাথে সাথে দুজনের চেহারায় এক অভাবনীয় আলো খেলে গেল।
সাদিক দ্রুত ওযু করার জন্য বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। আর ফাতেমা ঘরের জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে দিলেন। বাইরে তখনো রাতের গাঢ় অন্ধকার কাটেনি, তবে পূর্ব আকাশে ভোরের প্রথম আলোর রেখা উঁকি দিচ্ছে।
বাতাস বইছে খুব ধীরেসুস্থে, যা মনকে সতেজ করে তোলে।
ওযু শেষ করে সাদিক যখন ঘরে ফিরলেন, তখন ফাতেমা ঘরের এক কোণে নিজের জায়নামাজটি সুন্দর করে বিছিয়ে রেখেছেন।
সাদিক মুচকি হেসে বললেন, "তাহলে আজকেও ঘরেই নামাজ সেরে নিই, কী বলো?"
ফাতেমা মাথা নেড়ে সায় দিলেন। দুজনে মিলে জামাতে ফজর সালাত আদায় করলেন। সাদিক ইমামতি করলেন, আর ফাতেমা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ইক্তাদা করলেন।
নামায শেষে যখন তারা দুজনে হাত তুলে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করলেন, সাদিক উচ্চস্বরে আমীন বললেন ফাতেমার প্রতিটি দোয়ার সাথে।
ফাতেমা দোয়া করছিলেন, "হে আল্লাহ, আমাদের এই ভালোবাসাকে দুনিয়াতেও টিকিয়ে রাখুন এবং আখিরাতে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে আমাদের একসাথে একত্র করুন।"
নামায শেষ হওয়ার পর ফাতেমা জায়নামাজ গুছিয়ে রাখছিলেন। এমন সময় সাদিক বসার ঘরে গিয়ে ছোট্ট একটি ডায়েরি খুললেন। এটি তাদের উভয়ের একটি সুন্দর অভ্যাস ছিল। প্রতিদিন ফজরের পর তারা অন্তত একটি কুরআনের আয়াত বা হাদিস নিয়ে সামান্য আলোচনা করতেন।
সাদিক ডায়েরি থেকে একটি পাতা উল্টে ফাতেমাকে ডাকলেন, "ফাতেমা, এদিকে এসো। গতকাল রাতে সুরা আল-ফুরকানের একটি আয়াতের ওপর ভাবছিলাম। আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—'যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য ইমাম বানিয়ে দিন।' এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ কত গভীর, বলো তো?"
ফাতেমা এসে সাদিকের পাশে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে চিন্তার গভীরতা ও খুশির ঝিলিক। তিনি বললেন, "এর মানে হলো, প্রকৃত শান্তি কোনো টাকা-পয়সা বা বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়। চোখের শীতলতা তখনই আসে, যখন জীবনসঙ্গী এবং সন্তানরা আল্লাহর অনুগত হয়। আপনার পাশে বসে যখন আমি তাহাজ্জুদ পড়ি বা কুরআন তিলাওয়াত শুনি, তখন আমার হৃদয়ে যে শান্তি কাজ করে, সেটাই আসলে এই আয়াতের বাস্তব রূপ।"
সাদিকের বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় ভরে উঠল। তিনি ফাতেমার মাথার ওপর ভালোবাসার একটা হালকা হাত বুলিয়ে দিলেন। কোনো রকম উচ্চবাচ্য বা কৃত্রিম রোমান্স ছাড়াই তাদের এই পবিত্র কথোপকথন যেন এক স্বর্গীয় সুবাস ছড়াচ্ছিল পুরো ঘরে।
বাইরের পৃথিবীর কোলাহল ও আদর্শের লড়াই
সকাল তখন পুরোপুরি হয়ে গেছে। সূর্যের আলোয় চারপাশের প্রকৃতি জেগে উঠেছে।
সাদিককে এবার বাইরে বের হতে হবে কাজের উদ্দেশ্যে। ফাতেমা দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে সকালের হালকা নাস্তা প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। সাদিকের জন্য আটার রুটি আর ডিম ভাজি। সাদিক সাদাসিধে খাবার পছন্দ করেন, আর ফাতেমাও পরম যত্নে সেগুলো রান্না করেন।
নাস্তা করার সময় সাদিক একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। ফাতেমা সেটা খেয়াল করলেন। তিনি কাপে চা ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করলেন, "কী ব্যাপার সাদিক? অফিসে যাওয়ার আগে আপনাকে একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা?"
সাদিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "না, বড় কোনো সমস্যা নয়। তবে আজকালকার দুনিয়াটা যেভাবে বদলে যাচ্ছে, চারপাশে ফিতনা যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ে একটু ভাবি।
মানুষ আজ দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে গেছে। হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে কীভাবে বিত্তশালী হওয়া যায়, সেটাই সবার লক্ষ্য। এমন একটা সমাজে আমাদের দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা অনেক বড় পরীক্ষার বিষয়।"
ফাতেমা চা কাপ এগিয়ে দিয়ে সান্ত্বনার সুরে বললেন, "আপনি কেন এত চিন্তা করছেন, সাদিক? যার সাথে আল্লাহ আছেন, তার আবার ভয়ের কী? আমরা তো জানি এই দুনিয়া আমাদের আসল ঠিকানা নয়। এটি একটি পরীক্ষার হল মাত্র। আমাদের আসল বাড়ি তো জান্নাত। সেখানে পৌঁছানোর পথটাই তো কঠিন হবে। নবীজি (সা.) ও সাহাবিরা তো আমাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি কষ্ট সহ্য করেছেন।"
ফাতেমার এই কথাগুলো সবসময় সাদিকের মনে জাদুকরী কাজ করত। একজন আদর্শ জীবনসঙ্গীর কাজই হলো স্বামীর ক্লান্তিতে শক্তি জোগানো, বিপদে ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেওয়া।
সাদিক ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তাঁর সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই মিলিয়ে গেল।
তিনি চা শেষ করে নিজের চশমাটা পরে নিলেন এবং কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে দরজার দিকে এলেন। যাওয়ার সময় জুতো পরতে পরতে ফাতেমা তাঁর হাতে দুপুরের টিফিন বক্সটি তুলে দিলেন।
দরজা খোলার আগ মুহূর্তে ফাতেমা নরম অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, "সাবধানে যাবেন। আর মনে রাখবেন, অফিসে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের সততা বজায় রাখবেন। রিযিক কম বা বেশি যাই হোক না কেন, তা যেন হালাল উপায়ে আসে। আমরা দুনিয়ায় একটু কষ্ট করি, তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু আখিরাতে যেন আল্লাহর সামনে লজ্জিত হতে না হয়।"
সাদিক মাথা নেড়ে বললেন, "ইনশাআল্লাহ, ফাতেমা। তোমার এই কথাগুলো সারাদিন আমার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হবে।"
দরজা খুলে সাদিক যখন বাইরে পা রাখলেন, তখন ভোরের চিলতে রোদ এসে পড়ল তাঁর মুখে। পেছনে ফাতেমা দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়, চোখে বিদায়ের মায়াবী স্নিগ্ধতা আর মুখে আল্লাহর কাছে তাঁর স্বামীর নিরাপত্তার জন্য ছোট্ট একটি দোয়া।
বাইরের এই বিশাল ও কোলাহলপূর্ণ দুনিয়ায় নামার আগে সাদিকের বুকটা এক অজানা শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠল। কারণ তিনি জানেন, ঘরের ভেতর তাঁর জন্য একজন মানুষ অপেক্ষা করছেন, যিনি তাঁকে দুনিয়ার মোহে ভাসিয়ে দেন না, বরং হাত ধরে জান্নাতের দিকে টেনে নেন।
চলবে.....