ফন্ট সাইজ:
থিম:
জান্নাতের ছায়া

পর্ব 4

লেখক: জান্নাতুল নাঈমা

জান্নাতের ছায়া
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৪ কৃতজ্ঞতার আলো ও রিযিকের বরকত
_____

শরতের নীল আকাশ পেরিয়ে ধীরে ধীরে হেমন্তের হালকা আমেজ নামতে শুরু করেছে চারপাশের প্রকৃতিতে।

সকালের বাতাসে এখন রোদের উষ্ণতার সাথে হালকা মিষ্টি শীতের ছোঁয়া অনুভূত হয়।

সাদিক ও ফাতেমার ছোট ফ্ল্যাটটির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকালে দেখা যায় রাস্তার ধারের মেহগনি গাছের পাতাগুলো কেমন যেন হলদে রঙ ধারণ করেছে।

ঋতু পরিবর্তনের এই খেলায় প্রকৃতির রূপ বদলালেও সাদিক ও ফাতেমার জীবনের মূল সুরটি ছিল অপরিবর্তিত—আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পারস্পরিক ভালোবাসার এক পবিত্র মেলবন্ধন।

গত কয়েকদিনের সেই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও বেতনের অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে যাওয়ার সময় এসেছে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে অফিস থেকে ফেরার সময় সাদিকের হাতে যখন খামের ভেতর তাঁর বহু প্রতীক্ষিত বেতন তুলে দেওয়া হলো, তখন তাঁর মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।

যদিও এই টাকাটা কোনো বিশাল অংকের ছিল না, তবুও বিগত কয়েক দিনের পরীক্ষার পর এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট রহমতের প্রকাশ।

বাসার দরজায় এসে যখন সাদিক কলিং বেল বাজালেন, ফাতেমা চিরকালের মতো আজও হাসিমুখে দরজা খুলে দিলেন। সাদিকের চোখে-মুখে ক্লান্তির চেয়ে এবার এক স্বস্তির দীপ্তি দেখতে পেয়ে ফাতেমা কৌতূহলী হয়ে বললেন, "আজ আপনার চেহারায় অন্যরকম উজ্জ্বলতা দেখছি, সাদিক!
অফিসের কি কোনো ভালো খবর আছে?"

জুতো খুলে হাত-মুখ ধুতে ধুতে সাদিক ড্রয়িংরুমে এসে বসল এবং খামটি ফাতেমার হাতে বাড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল, "আলহামদুলিল্লাহ, ফাতেমা। আমাদের এই মাসের বেতনটা আজ হাতে পেয়েছি। সাথে গত কয়েক দিনের বকেয়া কিছু কাজের পারিশ্রমিকও যোগ হয়েছে। আল্লাহর শুকরিয়া, আমাদের অভাবের দিনগুলো আপাতত কেটে গেছে।"

ফাতেমা খামটি হাতে নিয়ে এক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল।"

এরপর অত্যন্ত শান্ত ও কৃতজ্ঞ সুরে সাদিককে বললেন, "আমি তো আগেই বলেছিলাম, যে আল্লাহ আমাদের বিপদে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছেন, তিনিই আবার উপযুক্ত সময়ে আমাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন। রিযিকের মালিক তো মানুষ নয়, স্বয়ং রাব্বুল আলামিন।"

➤বরকতের হিসাব ও দানের পবিত্র আনন্দ

সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময় তারা দুজনে মিলে হিসাব-নিকাশ করতে বসলেন। বর্তমান যুগে মানুষ যখন হাতে কিছু টাকা পায়, তখন সে সবার আগে চিন্তা করে কীভাবে তা দিয়ে নিজের বিলাসিতা বাড়ানো যায়—কেমন দামি পোশাক কেনা যায়, কিংবা কোন রেস্তোরাঁয় গিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ খাবার খাওয়া যায়। কিন্তু সাদিক ও ফাতেমার ভাবনাটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

সাদিক ডায়েরির পাতা খুলে ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বলো ফাতেমা, এই টাকা থেকে আমাদের প্রথমে কোন কাজটা করা উচিত? ঘরভাড়া আর বাজারের বাকি বকেয়া তো মেটাতেই হবে, সাথে আগের সেই সাদাকাহর (দানের) বাক্সেও কিছু অংশ জমা করতে হবে। গত সপ্তাহে রহিমা খালাকে সাহায্য করার পর বাক্সটা তো প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল।"

ফাতেমার চোখ দুটো এই কথা শুনে আনন্দে চকচক করে উঠল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বললেন, "ঠিক বলেছেন! আমাদের এই রিযিকে কেবল আমাদের অধিকার নেই, সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষেরও অধিকার রয়েছে।"

"নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, সাদাকাহ কখনো সম্পদ কমায় না, বরং তা রিযিকে বরকত বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এই সীমিত আয়ের একটা অংশ যদি আমরা নিয়মিত আল্লাহর রাস্তায় দান করি, তবে আমাদের সংসারে কখনো অশান্তি আসবে না।"

সেদিনই তারা অত্যন্ত সুচারুভাবে পুরো টাকার একটি সুন্দর বণ্টন করলেন—প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে, ভবিষ্যতের সঞ্চয় রেখে, এবং একটি নির্দিষ্ট অংশ গরিব ও দুস্থদের সাহায্যের জন্য আলাদা করে রাখলেন।

এই হিসেব করার সময় তাদের মনে কোনো কৃপণতা বা আফসোস ছিল না; বরং এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি কাজ করছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সম্পদের আসল সৌন্দর্য তার পরিমাণে নয়, বরং তার বরকতের ভেতরে লুকিয়ে আছে।

➤সমাজের অন্ধ দৌড় ও মুমিনের প্রকৃত দৃষ্টি
পরদিন ছুটির দিনে সাদিক ও ফাতেমা একটু হাঁটাহাটি করার জন্য স্থানীয় একটি পার্কের দিকে গেলেন। শরতের বিকেলের সোনালী আলোয় পার্কের সবুজ ঘাসের ওপর ছোট ছোট শিশুরা খেলছিল, আর নানা বয়সের মানুষ নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছিল।

পার্কের একটি কাঠের বেঞ্চে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে সাদিক একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ফাতেমা, চারপাশে তাকালে মনে হয় মানুষ যেন এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কার গাড়ি কত বড়, কার বাড়ি কত দামি, কিংবা কে কত বেশি ধন-সম্পদের মালিক—এটাই যেন সবার একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অন্ধ দৌড়ের মাঝে মানুষ কি কখনো প্রকৃত শান্তির দেখা পায়?"

ফাতেমা একটু মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "যারা কেবল দুনিয়াকে সবকিছুর শেষ বলে ধরে নেয়, তারা সারাজীবন এই ইঁদুর দৌড়েই ছুটে বেড়ায়। তাদের মন কখনো তৃপ্ত হয় না। গাড়ি বা বাড়ি থাকার পরও তাদের বুকজুড়ে থাকে হারানোর আতঙ্ক। কিন্তু একজন মুমিন তো জানে যে, সে এই দুনিয়ায় একজন মুসাফির মাত্র। তার আসল ঠিকানা তো জান্নাত। যার অন্তরে আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় থাকে, সে কুঁড়েঘরে থেকেও রাজার মতো শান্তিতে ঘুমাতে পারে।"

ফাতেমার এই প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাগুলো সাদিককে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল কেন তিনি ফাতেমাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
পার্থিব মোহের এই যুগে এমন একজন জীবনসঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, যিনি কেবল দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজেন না, বরং হাত ধরে জান্নাতের পথে টেনে নিয়ে যান।

➤ রাতের নিস্তব্ধতা ও রবের সাথে একান্ত আলাপ
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হলো। শহরের কোলাহল শান্ত হয়ে চারপাশ আবার নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে গেল। রাতের খাবার শেষে সাদিক ও ফাতেমা যখন নিজেদের ঘরে ফিরে এলেন, তখন বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে।

প্রতিদিনের অভ্যাসের মতো আজও রাতের শেষ প্রহরে ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক তিনটার ঘর ছুঁল, দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। কোনো অ্যালার্মের প্রয়োজন হয়নি; নিয়মিত ইবাদতের অভ্যস্ততা তাদের অবচেতন মনকেও জাগিয়ে তুলেছিল।

দুজনে নীরবে অজু সেরে যখন জায়নামাজে দাঁড়ালেন, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক আবহের সৃষ্টি করেছিল।

সাদিক যখন তাহাজ্জুদের সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, তখন তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কৃতজ্ঞতার উষ্ণ অশ্রু। তিনি মনে মনে ফিসফিস করে বলছিলেন, "হে আমার রব, আপনি আমাদের কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দিয়েছেন, আবার সুসময়ে আমাদের অহংকার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমাদের এই ছোট্ট সংসারকে আপনার ভালোবাসায় চিরস্থায়ী করে দিন।"
ফাতেমাও পাশের জায়নামাজে সিজদা অবস্থায় রবের দরবারে হাত তুলে গভীর আকুতি নিয়ে দোয়া করছিলেন, "হে আল্লাহ, আমাদের এই দুনিয়াবি ভালোবাসাকে কিয়ামতের মাঠে এবং জান্নাতের সুউচ্চ মাকামেও অটুট রাখুন।"

বাইরের সেই হিমেল অন্ধকারের বুক চিরে তখন কেবল মুমিনের রবের সাথে যোগাযোগের এক অলৌকিক প্রশান্ত সুবাস প্রবাহিত হচ্ছিল। দুনিয়ার শত সংকট, বৈষয়িক টানাপোড়েন বা মোহের ঝড় তাদের এই পবিত্র বন্ধনকে একচুলও টলাতে পারেনি।

তাদের এই ছোট্ট বাসাটি প্রমাণ করছিল—টাকা-পয়সা দিয়ে সুখ বা জান্নাত কেনা যায় না, আসল সুখ তো লুকিয়ে থাকে তাকওয়া, হালাল রিযিক এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাসের ভেতরে।

তাহাজ্জুদের সেই স্নিগ্ধ ও পবিত্র মুহূর্তগুলো শেষ হতে না হতেই পূর্ব আকাশে ভোরের প্রথম আলোর রেখা উঁকি দিতে শুরু করল। রাতের গাঢ় অন্ধকার কাটিয়ে চারপাশ ফর্সা হয়ে এল। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা ফজরের আযানের মধুর ধ্বনিতে চারপাশের ঘুমন্ত প্রকৃতি যেন এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে জেগে উঠল।
সাদিক ও ফাতেমা জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে একে অপরের দিকে তাকালেন। তাঁদের চেহারায় কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল রাতের ইবাদত থেকে প্রাপ্ত এক অদ্ভুত স্বর্গীয় নূর।

সাদিক মৃদু হেসে ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "জানো ফাতেমা, জীবনের এই পথচলায় তোমার মতো একজন জীবনসঙ্গী না পেলে হয়তো আমি কখনো বুঝতে পারতাম না যে প্রকৃত সুখ আসলে কিসে নিহিত। মানুষ তো সোনা-রুপা আর ক্ষমতার পেছনে ছুটে বেড়ায়, কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তির ঠিকানা তো কেবল আল্লাহর জিকির আর তাঁর সন্তুষ্টির ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"

ফাতেমা মিষ্টি হেসে উত্তর দিলেন, "আমরা তো কেবল একে অপরের সহযাত্রী, সাদিক। আমাদের আসল লক্ষ্য তো একটাই—যেভাবে আজ আমরা একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ে রবের দরবারে হাত তুলছি, একদিন পরকালের সেই অনন্ত জীবনেও যেন জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় একসাথে বসতে পারি। দুনিয়ার এই কদিনের জীবন তো চোখের পলকে ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের এই তাকওয়ার বন্ধন যেন জান্নাত পর্যন্ত চিরস্থায়ী হয়।"

সূর্য তখন পুরোপুরি উঠে গেছে। বারান্দার গাছগুলোর ওপর রোদের আলো পড়ে এক সোনালী আভা ছড়াচ্ছে। ফাতেমা প্রতিদিনের মতো আজও রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাধারণ অথচ পবিত্র নাশতা প্রস্তুত করতে। সাদিক বসে গেলেন তাঁর প্রিয় বইগুলোর মাঝে, যেখানে কুরআন ও হাদিসের আলোয় তাঁর মন আলোকিত হয়।

তাদের এই সাদামাটা সংসারটি কোনো রূপকথার রাজপ্রাসাদ না হলেও, এটি ছিল এমন এক নিরাপদ আশ্রয়—যেখানে দুনিয়ার লোভ-লালসা বা মোহের কোনো স্থান ছিল না। এখানে কেবল ছিল ভালোবাসার উষ্ণতা, হালাল রিযিকের বরকত এবং জান্নাতের সুউচ্চ মাকামে পৌঁছানোর এক অদম্য কাফেলা।
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন