ফন্ট সাইজ:
থিম:
জান্নাতের ছায়া

পর্ব 3

লেখক: জান্নাতুল নাঈমা

জান্নাতের ছায়া

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ৩

_____

শহরের আকাশে তখন শরৎকালের মেঘহীন নীলিমা। দুপুরের সোনালী রোদ ভেদ করে মিষ্টি বাতাসে চারপাশ এক স্নিগ্ধ আমেজে ভরে উঠেছে।

সাদিক ও ফাতেমার ছোট্ট ফ্ল্যাটটির বারান্দায় রাখা কয়েকটি টবের গাছগুলো দুপুরের বাতাসে মৃদু দুলছে।

গাছগুলোর সবুজ পাতা আর ফাতেমার পরম যত্নে ফোটানো ছোট্ট জবা ফুলটি যেন পুরো ঘরটায় এক জীবন্ত সজীবতা এনে দিয়েছে। এই বাসায় দামী কোনো আসবাবপত্র নেই, নেই এসির কৃত্রিম হাওয়া কিংবা কোনো আধুনিক বিলাসবহুল সাজসজ্জা; কিন্তু এখানে যা আছে, তা হলো প্রশান্তি—যা কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স বা ধন-সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না।

আজ শুক্রবার। ছুটির দিন হওয়ায় সাদিকের অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই। শুক্রবার মানেই তাদের কাছে এক বিশেষ দিন—যেদিন তারা আল্লাহর ইবাদতে একটু বেশি সময় দেন, সুরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করেন এবং নিজেদের পরকালের পাথেয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই ঘরে এক অন্যরকম স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজ করছিল। ফাতেমা রান্নাঘরে সুন্নতি নাশতা প্রস্তুত করছিলেন—হালকা গরম বার্লি, খেজুর আর রুটি।

সাদিক গোসল সেরে পরিষ্কার সুতির পাঞ্জাবি পরে জায়নামাজে বসে তসবিহ পাঠ করছিলেন। জুম্মার দিন উপলক্ষে চারপাশের বায়ুমণ্ডলেও যেন একটা পবিত্র সুবাস ছড়ানো ছিল।

নাশতা করার সময় সাদিক একটু গম্ভীর মুখে কিছু একটা ভাবছিলেন। ফাতেমা তা খেয়াল করে প্লেটটি সাদিকের সামনে এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "আজ জুম্মার দিনে আপনার চেহারায় আবার কিসের এত গভীর চিন্তা, সাদিক? সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তো কাজের চাপে গম্ভীর থাকেন, ছুটির দিনেও যদি এমন মনমরা হয়ে থাকেন, তবে তো মুশকিল!"

সাদিক মৃদু হেসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "না ফাতেমা, মনমরা ঠিক নই। আসলে কাল রাতে আমাদের ড্রয়িংরুমের কোণায় রাখা সেই পুরোনো সাদাকাহর (দানের) বাক্সের কথা ভাবছিলাম। আমাদের নিজেদের মাস শেষের খরচ মেলাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে গত কয়েক মাস ধরে বকশো বা অতিরিক্ত কোনো দানবাক্সে কিছু জমা করা হয়ে ওঠেনি।"

"অথচ আমরা জানি, মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়ানো আর আল্লাহর রাস্তায় দান করা কত বড় নেক আমল।"

ফাতেমার মুখটা এই কথা শুনে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাদিকের ঠিক বিপরীতে বসে অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আপনার এই চিন্তাটাই তো আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে, সাদিক। দান করার জন্য পাহাড়সম ধন-সম্পদ লাগে না; নিয়ত পরিষ্কার থাকলে এক টুকরো খেজুর বা সামান্য কিছু অর্থও আল্লাহর কাছে অনেক ভারী হয়ে ধরা দেয়। আমাদের পকেটে আজ হয়তো খুব বেশি টাকা নেই, কিন্তু আমাদের ঘরে যা আছে, তা থেকে তো আমরা কিছু অংশ আল্লাহর রাস্তায় দিতেই পারি।"

কথাটা শেষ করেই ফাতেমা দ্রুত ঘরের ভেতরে গেলেন এবং তাঁর ছোট কাঠের ক্যাশ বাক্স থেকে কিছু খুচরা ও নোট এনে সাদিকের হাতে রাখলেন। এগুলো ছিল তাদের গত কয়েক সপ্তাহের জমানো টাকা থেকে বাঁচানো কিছু অংশ, যা তারা একান্ত প্রয়োজনেও হাত দিতেন না, কেবল অভাবী মানুষের সাহায্যে খরচ করার জন্য জমাতেন।

➤পাশের বাড়ির রহিমা খালার গল্প

☞নীরব সেবা ও ভালোবাসার বিস্তার

টাকাগুলো হাতে পেয়ে সাদিকের মনটা হালকা হয়ে গেল। তিনি ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "জানো ফাতেমা, আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে যে বয়স্কা রহিমা খালা থাকেন, তাঁর ছোট ছেলেটি গত কয়েক দিন ধরে জ্বর-সর্দি ও কাশিতে ভুগছে। খালা বয়স্ক মানুষ, ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। ওষুধ কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকাও হয়তো তাঁর কাছে নেই। আমরা কি এই টাকা থেকে কিছু অংশ আজ জুম্মার নামাযের পর খালার হাতে পৌঁছে দিতে পারি?"

ফাতেমার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন, "অবশ্যই! এটা তো আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নবীজি (সা.) তো আমাদের শিখিয়েছেন, সেই ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় আর তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে। চলুন, নামাযের পর আমরা দুজনে মিলে খালার খোঁজখবর নেব।"

জুম্মার আযান দেওয়ার সাথে সাথে সাদিক পবিত্র হয়ে সুগন্ধি মেখে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। চারপাশের রাস্তাঘাট তখন জুম্মার নামাযে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের পদচারণায় মুখরিত।

মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা খুতবার আওয়াজ বাতাসে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছিল। সাদিক মসজিদে গিয়ে সামনের (সফ)-এ বসে মন দিয়ে জুম্মার বয়ান শুনতে লাগলেন। আজকের খুতবার মূল বিষয়বস্তু ছিল—"পরকালের প্রস্তুতি ও হালাল উপায়ে জীবনযাপন"।

ইমাম সাহেবের প্রতিটি কথা যেন সাদিকের অন্তরের গভীরে গিয়ে আঘাত করছিল। তিনি মনে মনে আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া আদায় করলেন যে, আল্লাহ তাঁকে এমন একজন জীবনসঙ্গী দান করেছেন যিনি তাঁকে সবসময় এই পথের ওপর অবিচল থাকতে সাহায্য করেন।

এদিকে বাসায় ফাতেমা জুম্মার নামাযের এই সময়টিতে ঘর পরিষ্কার করলেন, কোরআন তিলাওয়াত করলেন এবং রহিমা খালার জন্য একটু গরম স্যুপ ও কিছু ফল প্রস্তুত করে রাখলেন।

সাদিক যখন নামায শেষ করে বাসায় ফিরলেন, তখন তাঁদের দুজনের মুখেই ছিল এক অদ্ভুত আত্মিক তৃপ্তির হাসি।

খাবার খাওয়ার পর সাদিক ও ফাতেমা দুজনে মিলে পাশের ফ্ল্যাটে গেলেন। রহিমা খালা তাঁদের দেখে প্রথমে একটু সংকুচিত হয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু ফাতেমা অত্যন্ত মায়াবী স্নেহে খালার হাত দুটো ধরে তাঁর কপালে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বর আছে কি না।

সাদিক অত্যন্ত বিনয়ের সাথে খালার হাতে ওষুধ ও কিছু আর্থিক সহায়তা তুলে দিলেন এবং বললেন, "খালা, নিজের ছোট ভাইয়ের মতো ভাববেন। কোনো সমস্যা হলে আমাদের ডাকতে দ্বিধা করবেন না।"

বুড়ি রহিমা খালা চোখের পানি মুছতে মুছতে দোয়া করলেন, "বাবা, তোদের আল্লাহ জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। এই যুগে এমন পরোপকারী ও দ্বীনদার মানুষ কোথায় পাওয়া যায়!"

➤বিকেলের বারান্দা ও জান্নাতের সুউচ্চ মাকামের ফিকির

দুপুরের খাবার ও ছোট্ট এই মানবিক কাজের পর বিকেল গড়িয়ে যখন সোনালী রোদ বারান্দার গ্রিল ভেদ করে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল, তখন সাদিক ও ফাতেমা বারান্দার ছোট টুলের ওপর বসে চা খাচ্ছিলেন।

চারপাশের পরিবেশটা তখন চরম শান্ত ও স্নিগ্ধ। দূরের কোনো মসজিদ থেকে আসরের আযানের মধুর ধ্বনি ভেসে আসছিল।

চায়ে চুমুক দিয়ে সাদিক ফাতেমার দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বললেন, "ফাতেমা, আজ রহিমা খালার মুখে যে দোয়াটা শুনলাম, আমার মনে হলো দুনিয়ার সমস্ত সোনাদানা পেলেও এত বড় শান্তি পেতাম না। মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে সাহায্য করে, তখন নিজের ভেতর এক অদ্ভুত স্বর্গীয় শান্তি অনুভূত হয়।"

ফাতেমা বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকালেন, যেখানে বিকেলের মেঘগুলো সোনা ও কমলা রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, "সাদিক, আমাদের এই জীবনটা তো খুবই সংক্ষিপ্ত। আজ আছি, কাল হয়তো মাটি বা কবরের নিচে চলে যাব। কিন্তু আমরা পেছনে যে আমলগুলো রেখে যাব, সেটাই আমাদের আসল পুঁজি। জান্নাত তো এমনি এমনি পাওয়া যাবে না; তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে—ধৈর্য দিয়ে, সততা দিয়ে, আর মানুষের উপকারের মাধ্যমে।"

সাদিক ফাতেমার কথার সাথে পুরোপুরি একমত হয়ে মাথা নাড়লেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ফাতেমা শুধু তাঁর স্ত্রী নন, তিনি হলেন তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযাত্রী।

রাত নামল। সপ্তাহের ছুটির এই দিনটি তাদের জীবনের অন্যান্য সাধারণ দিনের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠল। রাতের গভীরতায় যখন আবার তাহাজ্জুদের সময় হলো, সাদিক ও ফাতেমা যথারীতি রবের দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন।

তাঁদের একটাই ফরিয়াদ—"হে আমাদের রব, আমাদের এই ছোট সংসারটিকে আপনার রহমতে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের শেষ পরিণতি যেন জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় হয়।"

বাইরের ঠান্ডা বাতাসে তখন শুধু শান্তির পরশ, আর ভেতরে ভালোবাসার এক পবিত্র জান্নাতি আবহ।

চলবে...

আপনাদের গল্পটি ভালো লাগলে প্লিজ লাইক করে দিবেন🌸

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন