ফন্ট সাইজ:
থিম:
জান্নাতের ছায়া

পর্ব 5

লেখক: জান্নাতুল নাঈমা

জান্নাতের ছায়া

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ৫

_____

হেমন্তের কুয়াশাচ্ছন্ন দিনগুলো পেরিয়ে প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ল মৃদু শীত। সকালের মিষ্টি রোদেও এখন একটা হিমেল পরশ জড়িয়ে থাকে, যা চারপাশের চেনা পৃথিবীকে এক অন্যরকম মোহনীয় রূপ দেয়।

সাদিক ও ফাতেমার ছোট ফ্ল্যাটটির বারান্দার টবের গাছগুলোতে এখন কুয়াশার ফোঁটা জমে থাকে মুক্তোর দানার মতো। প্রতিদিনের মতো আজও শেষ প্রহরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দুজনে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করেছেন।

রাতের সেই নিস্তব্ধতায় রবের দরবারে করা দীর্ঘ মোনাজাত তাদের সারা দিনের জন্য এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি জুগিয়ে দেয়।

শীতের এই সকালে ফাতেমা রান্নাঘরে গরম আদা-চা আর সামান্য সুতি নাশতা প্রস্তুত করছিলেন। সাদিক পড়ার টেবিলে বসে কোরআনের তাফসির অধ্যয়ন করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করেই ফ্ল্যাটের দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। সকাল সকাল কে এল এমন ভাবনায় সাদিক একটু অবাক হলেন। সাধারণত এই সময়ে তাদের দরজায় কেউ কড়া নাড়ে না।

দরজা খুলে সাদিক তো অবাক! সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোনো বন্ধু তানভীর। তানভীরের পরনে একটি দামি ব্র্যান্ডের উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট, হাতে লেটেস্ট মডেলের আইফোন, আর চোখে নামী ব্র্যান্ডের রোদচশমা—যদিও বাইরে এখনো রোদের তেজ সেভাবে ছড়ায়নি।

তানভীরের চেহারায় সাফল্যের এক ধরনের চকচকে ভাব থাকলেও তার চোখের নিচে গভীর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

তানভীর সাদিককে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল এবং হাসিমুখে বলল, "কী রে সাদিক? কেমন আছিস ভাই? অনেক দিন পর তোর এই ছোট্ট ঠিকানায় এলাম। অফিসের কাজে এই এলাকার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম তোর সাথে একটু দেখা করে যাই।"

সাদিক অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে তানভীরকে ড্রয়িংরুমে বসাল। ফাতেমা দ্রুত রান্নাঘর থেকে এসে তানভীরের জন্য এক কাপ গরম চা ও নাশতা সামনে এগিয়ে দিলেন।

ফাতেমাকে দেখেই তানভীর একটু নড়েচড়ে বসল এবং সামান্য হেসে বলল, "ভাবী, আপনাদের এই ঘরটার ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। কী এক অদ্ভুত প্রশান্তি এখানে!"

➤তানভীরের জীবন সংগ্রাম ও বৈষয়িক শূন্যতা

চা খেতে খেতে তানভীরের সাথে নানা বিষয়ে কথা শুরু হলো। তানভীর কর্পোরেট দুনিয়ার একজন সফল উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করে, প্রচুর অর্থ উপার্জন করে, দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় এবং শহরের সবচেয়ে ভিআইপি এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে একা বসবাস করে। কিন্তু তার কথার ভেতরে এক ধরনের গভীর হতাশা ও অস্থিরতা লুকিয়ে ছিল।

তানভীর চায়ে চুমুক দিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "সাদিক, তোকে সত্যি বলছি—টাকা হয়তো আমি অনেক কামিয়েছি, গাড়ি-বাড়ি সবই হয়েছে; কিন্তু তানভীরের ভেতরের মানুষটা আজ বড় বেশি একা ও ক্লান্ত।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ইঁদুর দৌড়ে নামি, রাতে বাড়ি ফিরে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমার এই জীবনের কোনো অর্থ নেই। কদিন আগে আমার স্ত্রীর সাথেও ডিভোর্স হয়ে গেছে। টাকার পিছু ছুটতে গিয়ে নিজের পরিবারটাই টিকিয়ে রাখতে পারলাম না।"

ড্রয়িংরুমের কোণায় বসে তানভীরের এই আত্মকথন শুনছিলেন ফাতেমা। তাঁর মনে তানভীরের জন্য এক ধরনের করুণা ও সহমর্মিতা জন্মাল।

সাদিক অত্যন্ত শান্ত ও স্নেহের সুরে বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "তানভীর, তুই তো সবসময় একটু বেশি উচ্চাভিলাষী ছিলি। দুনিয়ার চাকচিক্য আর ব্যাংক ব্যালেন্সকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলার কারণে আজ তোর এই অবস্থা। তুই এমন এক জিনিসের পেছনে ছুটেছিস যা মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু অন্তরের আসল প্রশান্তি দিতে পারে না।"

" মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে কেবল নিজের ক্যারিয়ার আর অর্থের পেছনে অন্ধের মতো দৌড়ায়, তখন তার বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও ভেতরটা মরুভূমির মতো শুষ্ক হয়ে যায়।"

তানভীর কিছুটা অবাক হয়ে সাদিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন এমন একটা কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে কিছুটা বিদ্রূপের সুরে বলল, "তোরা তো ভাই সাধু মানুষ! তোদের এই ছোট ফ্ল্যাটে বসে চারপাশের দুনিয়াকে জ্ঞান দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকলে এই আধ্যাত্মিক ফিলোসফি পেটে ভাত জোগায় না, সাদিক।"

সাদিক মৃদু হেসে বললেন, "তানভীর, তুই ভুল ভাবছিস। আমাদের পকেটেও যে খুব বেশি টাকা থাকে তা নয়; কিন্তু আমাদের অন্তরে কোনো অস্থিরতা নেই। আমরা জানি আমরা কার সন্তুষ্টির জন্য বেঁচে আছি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন—'জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই কেবল অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়।' তুই তোর বিশাল ফ্ল্যাটে একা শুয়ে যে শান্তি পাস না, ফাতেমা আর আমি এই ছোট্ট ঘরে বসে একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি প্রশান্তি পাই। কারণ আমাদের ভালোবাসার ভিত্তি কেবল দুনিয়ার রূপ বা টাকার ওপর নয়, বরং তাকওয়া ও আখিরাতের সফলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।"

➤ফাতেমার প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও তানভীরের আত্মোপলব্ধি

ফাতেমা এবার অত্যন্ত মার্জিত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কণ্ঠে তানভীরকে লক্ষ্য করে বললেন, "তানভীর ভাই, দুনিয়ার এই জীবনটা তানভীর বা সাদিক কারোর জন্যই চিরস্থায়ী নয়। এটি একটি পরীক্ষার হল। পরীক্ষা শেষ হলে সবাইকে শূন্য হাতেই ফিরে যেতে হবে। তখন আপনার এই কোটি টাকার ফ্ল্যাট বা গাড়ি আপনার কোনো উপকারে আসবে না; সাথে থাকবে কেবল আপনার সৎকর্ম এবং আল্লাহর প্রতি আপনার বিশ্বাস। আল্লাহ আপনাকে রিযিক দিয়েছেন, কিন্তু আপনি যদি সেই রিযিক হালাল ও সৎ পথে ব্যবহার না করে কেবল অহংকার আর মোহের পেছনে ব্যয় করেন, তবে তো আখিরাতে চরম লজ্জিত হতে হবে।"

ফাতেমার কথাগুলো তানভীরের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার চোখ দুটো যেন পলকের জন্য ভিজে এল। সে বুঝতে পারল, সে বাহ্যিকভাবে যতই সফল হোক না কেন, ভেতরের দিক থেকে সে এক চরম দেউলিয়া মানুষ।

তানভীর আর বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। সে চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল এবং বিদায় নেওয়ার সময় সাদিকের হাত শক্ত করে ধরে বলল, "সাদিক, তোদের এই জীবনযাত্রা বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরের আলোটা অনেক শক্তিশালী। আজ তোর কথাগুলো শুনে আমার মনে হলো, আমি এতদিন ভুল রাস্তায় দৌড়েছি। দোয়া করিস ভাই, যেন আমিও আমার জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নিতে পারি।"

তানভীর চলে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটটি আবার আগের মতো শান্ত হয়ে গেল। দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামল। সাদিক ও ফাতেমা দুজনে মিলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুপুরের রোদ উপভোগ করছিলেন।

ফাতেমা সাদিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, "দেখলেন তো সাদিক, মানুষ দুনিয়ার সব পাওয়ার পরও ভেতরে কতটা ফাঁকা থাকে, যদি তার অন্তরে আল্লাহর ভয় বা ইমান না থাকে। আমাদের এই ছোট্ট সংসারটা অনেক ধনী মানুষের কাছে হয়তো খুব সাধারণ লাগবে, কিন্তু আল্লাহ আমাদের যে নেয়ামত দিয়েছেন, তা দুনিয়ার কোনো ধনকুবেরের নেই।"

সাদিক ফাতেমার হাতটি নিজের হাতের ভেতর শক্ত করে ধরে বললেন, "তুমি ঠিকই বলেছ, ফাতেমা। একজন মুমিন নারীর ছায়া না থাকলে মানুষের জীবন মরুভূমির চেয়েও কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের এই ভালোবাসাকে জান্নাত পর্যন্ত কবুল করুন।"

➤রাতের নিস্তব্ধতা ও জান্নাতের চিরন্তন কাফেলা

শীতের সন্ধ্যা নামতেই চারপাশ দ্রুত অন্ধকার হয়ে এল। রাতের খাবার শেষে সাদিক ও ফাতেমা আবার তাদের নিয়মিত বই নিয়ে বসার ঘরে বসলেন।

আজকের আলোচনার বিষয় ছিল জান্নাতের নেয়ামত ও সেখানে মুমিনদের চিরস্থায়ী শান্তি।

রাত গভীর হলো। ঘড়ির কাঁটা যখন আবার সেই পরিচিত শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল—ঠিক রাত তিনটে—দুজনের ঘুম ভেঙে গেল। কোনো জাগানোর অ্যালার্ম ছাড়াই তাদের অবচেতন মন রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত।

দুজনে অজু সেরে যখন জায়নামাজে দাঁড়ালেন, তখন শীতের সেই ঠান্ডা বাতাস আর রাতের নিস্তব্ধতা মিলে এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করল।

সাদিক যখন সেজদায় লুটিয়ে পড়ে ফিসফিস করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করছিলেন, তখন তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল জায়নামাজে।

তিনি দোয়া করছিলেন, "হে আমাদের রব, আমাদের তানভীরের মতো দুনিয়ার মোহে অন্ধ করে দিও না। আমাদের অন্তরকে আপনার হিদায়াতের ওপর অবিচল রাখুন এবং আমাদের এই পবিত্র ভালোবাসাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে চিরস্থায়ী করে দিন।"

ফাতেমাও পাশের জায়নামাজে সিজদা অবস্থায় রবের দরবারে হাত তুলে গভীর আকুতি নিয়ে আমীন বলছিলেন। তাঁদের এই গোপন ইবাদত, এই কান্নাকাটি এবং রবের প্রতি এই গভীর আত্মসমর্পণ প্রমাণ করছিল যে, দুনিয়ার শত ঝড়-ঝাপটা, মানুষের অহংকার কিংবা বৈষয়িক মোহের কোনো ঝড়ই তাদের এই পবিত্র বন্ধনকে একচুলও টলাতে পারবে না। তাদের এই সাদামাটা ছোট্ট বাসাটি যেন দুনিয়ার বুকে সত্যিই এক টুকরো জান্নাতের সুশীতল ছায়া হয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন