জান্নাতের ছায়া
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৮
শীতের তীব্রতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। পৌষ মাসের এই কনকনে ঠান্ডায় চারপাশ ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। সকালের নরম রোদও যেন কুয়াশার দেয়াল ভেদ করে ঠিকমতো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না।এমন এক হিমশীতল সকালে সাদিক ও ফাতেমার ছোট ফ্ল্যাটটির ভেতরটা বেশ উষ্ণ ও আরামদায়ক।
যথারীতি শেষ প্রহরে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করেছেন তাঁরা। রাতের ওই নিস্তব্ধতায় রবের দরবারে করা দীর্ঘ মোনাজাত ও চোখের পানি তাদের সারা দিনের জন্য এক অদ্ভুত আত্মিক শক্তি জুগিয়ে দিয়েছে।
আজ সাদিকের কর্মক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে একটি বড় আন্তর্জাতিক বইমেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সাদিককে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই মেলায় দেশের নামী-দামি প্রকাশকরা অংশ নিচ্ছেন। সাদিকের ওপর পুরো ইভেন্টটি সততা ও শৃঙ্খলার সাথে পরিচালনা করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
সকালবেলা ফাতেমা নাশতা প্রস্তুত করার সময় খেয়াল করলেন সাদিক একটু চিন্তিত মুখে টেবিলে বসে আছেন। ফাতেমা গরম আদা-চা ও সুন্নতি নাশতা সামনে এগিয়ে দিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, "আজ বড় মেলা শুরু হচ্ছে বলে কি আপনার মনে একটু বাড়তি চাপ কাজ করছে, সাদিক? আপনাকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে।"
সাদিক মৃদু হেসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "চাপ একটু আছে বটে, ফাতেমা। আজকের মেলায় দেশের অনেক বড় বড় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট প্রকাশকরা আসবেন। প্রকাশনা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মেলায় ভালো স্টল বরাদ্দ পেতে বা কিছু বিশেষ সুযোগ সুবিধা হাসিল করতে অনেকেই গোপনে অনৈতিক বা আন্ডারহ্যান্ড ডিল করার চেষ্টা করতে পারে। আমাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো দুর্নীতির বা অসদুপায়ের কালো ছায়া আমাদের ওপর না পড়ে।"
ফাতেমার মুখটা এই কথা শুনে আরও দৃঢ় ও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাদিকের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত ও আস্থার সাথে বললেন, "এতে চিন্তার কী আছে, সাদিক? আল্লাহ তো আপনাকে সততা ও আমানত রক্ষা করার জন্যই এই দায়িত্বে বসিয়েছেন। দুনিয়ার মানুষ হয়তো সাময়িক লাভের জন্য নীতি বিসর্জন দেয়, কিন্তু আপনার পরিচয় তো একজন মুমিন হিসেবে। আপনি আপনার জায়গাতে অটল থাকুন, বাকি সব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন। হালাল রুজির বরকত আমাদের সবসময় রক্ষা করবে।"
➤বইমেলার কোলাহল ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
সাদিক যখন মেলা প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালেন, তখন চারদিকে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। হরেক রকমের স্টল, মাইকের আওয়াজ, হাজারো মানুষের ভিড় আর নতুন বইয়ের ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। সাদিক অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করছিলেন। কোনো স্বজনপ্রীতি বা ঘুষের তোয়াক্কা না করে তিনি নিয়ম অনুযায়ী স্টল বরাদ্দ দিচ্ছিলেন।
দুপুরের দিকে একটি প্রভাবশালী প্রকাশনা সংস্থার মালিক সরাসরি সাদিকের কাছে এসে হাজির হলেন। লোকটি বেশ প্রভাবশালী এবং কর্পোরেট দুনিয়ায় তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
তিনি একটু একান্তে সাদিককে ডেকে নিয়ে পকেট থেকে একটি খাম বের করে টেবিলে রাখলেন এবং নিচু গলায় বললেন, "দেখুন সাদিক ভাই, আমরা মূল প্যাভিলিয়নে একটু বড় জায়গা চাচ্ছি। নিয়মের কাগজপত্রে একটু এদিক-সেদিক করে আমাদের এই স্টলটি বরাদ্দ দিয়ে দিন। এই খামে আপনার জন্য সামান্য সম্মানী রাখা আছে। বিষয়টি আপনাদের ম্যানেজারের কাছেও গোপন থাকবে।"
খামের ভেতর থেকে উঁকি দিতে থাকা টাকার নোটগুলোর দিকে সাদিক একবার তাকিয়ে মুহূর্তের জন্যও দ্বিধায় পড়েননি। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল ফাতেমার সেই সকালের কথাগুলো এবং তাঁর নিজের ইমানের আমানতদারি।
সাদিক বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত শান্ত, দৃঢ় ও মার্জিত কণ্ঠে সেই খামটি লোকটির দিকে ঠেলে দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, "মাফ করবেন ভাই, এই অনৈতিক কাজের সাথে আমি যুক্ত হতে পারব না। নিয়ম অনুযায়ী যা পাওয়ার যোগ্য, কেবল সেভাবেই স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে। এর বাইরে কোনো অসদুপায় বা উপঢৌকন গ্রহণ করা আমার নীতি ও বিশ্বাসের পরিপন্থী।"
লোকটি প্রথমে কিছুটা অবাক হলেন এবং পরে রাগে গজগজ করতে করতে হুমকি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন যে, সে এই বিষয়টি ম্যানেজারের কাছে নীতিনৈতিকতার কথা বলে নালিশ করবে।
কিন্তু সাদিক একটুও ভয় পেলেন না। তাঁর বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল। তিনি জানতেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোনো শক্তি এই পৃথিবীতে নেই।
➤সন্ধ্যার ঘরে ফেরা ও বিজয়ের প্রশান্তি
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামল। মেলার কোলাহল কিছুটা কমে আসার পর সাদিক যখন সমস্ত কাজ গুছিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে এলেন, তখন ফাতেমা দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন।
সাদিকের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ভেতরে এক পরম বিজয়ের দ্যুতি জ্বলজ্বল করছিল।
জুতো খুলে হাত-মুখ ধুয়ে বসার ঘরে আসতেই ফাতেমা এক কাপ গরম চা ও হালকা নাশতা এগিয়ে দিয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে বললেন, "আজ মেলার অবস্থা কেমন হলো, সাদিক? ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে কি কোনো ঝামেলা হয়েছিল?"
সাদিক চায়ে একটা চুমুক দিয়ে আজকের সারদিনের পুরো ঘটনাটি ফাতেমার কাছে খুটিয়ে বললেন—কীভাবে তাঁকে ঘুষের লোভ দেখানো হয়েছিল এবং তিনি কীভাবে তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন।
সব শুনে ফাতেমার চোখের কোণ দুটো আনন্দে ও গর্বে চকচক করে উঠল। তিনি আলতোভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ! আপনি আজ শুধু একটি স্টল বরাদ্দের দুর্নীতি রোধ করেননি, আপনি আপনার ইমানকে জান্নাতের যোগ্য করে তুলেছেন। দুনিয়ার মানুষ হয়তো সাময়িক ওই প্রভাবশালীর ভয়ে কুঁকড়ে থাকত, কিন্তু আপনি রবের ভয়ে যে অটলতা দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই সাদিকের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল প্রকাশনা সংস্থার প্রধান নির্বাহীর (CEO) নম্বর।
সাদিক ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে সিইও সাহেব অত্যন্ত প্রশংসার সুরে বললেন, "সাদিক, আমি আপনার সততা ও কর্মদক্ষতার কথা শুনেছি। ওই প্রভাবশালী লোকটি আমাদের কাছে আপনার নামে নালিশ করতে এসেছিল যে আপনি নাকি তার অন্যায় আবদার শোনেননি। কিন্তু আমাদের কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এমন সততা ও নীতিবান কর্মকর্তা পাওয়া বর্তমান সময়ে ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা আপনাকে কোম্পানির প্রকাশনা বিভাগের ব্যবস্থাপক পদে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি!"
খবরটি শোনার পর সাদিক ও ফাতেমা দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। সততার পুরস্কার যে এত দ্রুত এবং এত সুন্দরভাবে আসতে পারে, তা তারা আবার হাতেনাতে টের পেলেন। ফোন রেখে সাদিক যখন ফাতেমার দিকে তাকালেন, দুজনের চোখেই তখন কৃতজ্ঞতার জল গড়িয়ে পড়েছে।
➤রাতের নিস্তব্ধতা ও জান্নাতের অনন্ত কাফেলা
রাত গভীর হলো। শীতের সেই কনকনে ঠান্ডার মাঝেও তাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটি যেন ভালোবাসার ও রহমতের আভায় উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। রাতের খাবার শেষে তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন।
ঘড়ির কাঁটা যখন আবার সেই পরিচিত শেষ প্রহরে এসে পৌঁছাল—ঠিক রাত তিনটে—দুজনের ঘুম ভেঙে গেল। কোনো অ্যালার্মের প্রয়োজন হয়নি; নিয়মিত ইবাদতের অভ্যস্ততা তাদের অবচেতন মনকে ঠিক সময়ে জাগিয়ে তুলেছিল।
দুজনে নীরবে অজু সেরে যখন তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়ালেন, তখন রাতের সেই সুগভীর নিস্তব্ধতা এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করল।
সাদিক যখন সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ফিসফিস করে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছিলেন, তখন তাঁর দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল কৃতজ্ঞতার উষ্ণ অশ্রু। তিনি দোয়া করছিলেন, "হে আমাদের রব, আপনি আমাদের সুসময়েও অহংকার থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই পবিত্র ভালোবাসাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে চিরস্থায়ী করে দিন।"
ফাতেমাও পাশের জায়নামাজে সিজদা অবস্থায় রবের দরবারে হাত তুলে গভীর আকুতি নিয়ে আমীন বলছিলেন।
তাঁদের এই গোপন ইবাদত, এই কান্নাকাটি এবং রবের প্রতি এই গভীর আত্মসমর্পণ প্রমাণ করছিল যে, দুনিয়ার শত প্রলোভন, কর্পোরেট লোভ কিংবা মানুষের ষড়যন্ত্র—কোনো কিছুই তাদের এই পবিত্র বন্ধনকে একচুলও টলাতে পারবে না।
তাদের এই সাদামাটা ছোট্ট বাসাটি যেন দুনিয়ার বুকে সত্যিই এক টুকরো জান্নাতের সুশীতল ছায়া হয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল।
চলবে...