ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিছু গল্প সমাপ্তই সুন্দর

পর্ব 1

লেখক: মরজান আক্তার মির্হা

কিছু গল্পের সমাপ্তি সুন্দর
লেখিকা: মারজান আক্তার মির্হা
পর্ব – ০১
অচেনা দিনের গল্প
জীবনে কিছু সময় আসে, যখন মানুষ বুঝতেই পারে না যে সে আসলে কী হারাচ্ছে আর কী পেতে চলেছে। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, পরিচিত মানুষ আর ছোট ছোট ঘটনার ভিড়ে আমরা অনেক সময় খেয়ালই করি না, আমাদের চারপাশে কত কিছু বদলে যাচ্ছে। অথচ কয়েক বছর পর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনে হয়, ইশ! সময়টা যদি আরেকবার ফিরে পাওয়া যেত!
আমার নাম মেহরিন। বয়স ষোলো। খুব সাধারণ একটা মেয়ে আমি। খুব বেশি বন্ধু নেই, আবার একেবারে একাও নই। নিজের মতো থাকতে ভালো লাগে। অন্যের জীবনে কী হচ্ছে, কে কী করছে—এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর অভ্যাস আমার নেই। তবে একটা সমস্যা আছে, আমি খুব সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলি। কেউ একটু ভালোভাবে কথা বললেই মনে হয়, মানুষটা হয়তো সত্যিই ভালো।
আমার পরিবারে আমরা চারজন। বাবা, মা, ছোট ভাই আর আমি। বাবা একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সংসার খুব স্বচ্ছল না হলেও আমাদের প্রয়োজনগুলো বাবা যথাসাধ্য পূরণ করার চেষ্টা করেন। মা সংসারের সবকিছু সামলান। আর আমার ছোট ভাইটা সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে বাড়ি মাথায় তুলে রাখে।
আমাদের ছোট্ট সংসারটায় খুব বেশি আয়োজন নেই, কিন্তু একটা জিনিস আছে—একসঙ্গে থাকার আনন্দ।
তবে আমার একটা স্বপ্ন আছে। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। এমন কিছু করতে চাই, যাতে একদিন বাবা-মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতে পারি। বাবাকে আর সংসারের চিন্তায় এতটা ব্যস্ত থাকতে হবে না। মা নিজের জন্যও একটু সময় বের করতে পারবেন।
এই স্বপ্নগুলোই আমাকে প্রতিদিন নতুন করে চেষ্টা করতে শেখায়।
সেদিন ছিল রবিবার। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। বৃষ্টির দিন আমার খুব পছন্দ। চারপাশের কোলাহল একটু কমে যায়, বাতাসে কেমন একটা শান্ত অনুভূতি থাকে।
মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
—মেহরিন, আর কতক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবি? নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
আমি বললাম,
—আসছি মা!
নাশতা শেষ করে পড়ার টেবিলে বসলাম। সামনে পরীক্ষা, তাই পড়াশোনার চাপও একটু বেশি। কিন্তু সেদিন পড়ায় মন বসছিল না। বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটা মেসেজ এল। আমার বান্ধবী নীলা লিখেছে, আজ বিকেলে একটু দেখা করতে পারবে কি না।
নীলার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় দুই বছরের। মেয়েটা খুব চঞ্চল। এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না। অথচ আমার ঠিক উল্টো। আমি যেখানে চুপচাপ বসে থাকতে পছন্দ করি, নীলা সেখানে সারাক্ষণ কথা বলতে ভালোবাসে।
বিকেলে বৃষ্টি থামার পর আমরা দেখা করতে বের হলাম।
নীলা আমাকে দেখেই বলল,
—তোর একটা সমস্যা আছে জানিস?
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—আবার কী করলাম?
—তুই সবকিছু এত সিরিয়াসলি নিস কেন? জীবনটা একটু উপভোগ কর!
আমি হেসে বললাম,
—সবাই কি আর তোর মতো হতে পারে?
—হতে হবে না। তবে মাঝে মাঝে নিজের জন্যও বাঁচতে হয়।
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। নীলার কথাগুলো মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে মনে দাগ কাটে।
আমরা রাস্তার পাশের একটা ছোট দোকানে বসে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, পরিবার—কত বিষয় নিয়েই না কথা হলো।
ফেরার সময় নীলা হঠাৎ বলল,
—মেহরিন, একটা কথা বলব?
—বল।
—সব মানুষকে নিজের মতো ভাবিস না। সবাই তোর সরলতার মূল্য বুঝবে না।
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম।
—তুইও না! আজকাল শুধু উপদেশ দিস।
নীলা আর কিছু বলল না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
সেদিন বাড়ি ফিরে কথাটা আর মনে রাখিনি। কিন্তু কে জানত, একদিন এই কথাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি হয়ে থাকবে!
এরপর কয়েকটা দিন বেশ স্বাভাবিকভাবেই কেটে গেল।
হঠাৎ একদিন আমাদের বাসায় একটা খবর এল। বাবার চাকরির জায়গায় পরিবর্তন হয়েছে। তাঁকে অন্য এলাকায় বদলি করা হয়েছে। প্রথমে বিষয়টা শুনে খুব একটা চিন্তা করিনি। ভেবেছিলাম, হয়তো যাতায়াতের একটু অসুবিধা হবে। কিন্তু পরে বুঝলাম, শুধু বাবার কর্মস্থলই নয়, আমাদের পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসতে চলেছে।
মা বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। নতুন জায়গায় বাসা খুঁজতে হবে, ছোট ভাইয়ের স্কুলের ব্যবস্থা করতে হবে, আমার পড়াশোনারও নতুন ব্যবস্থা করতে হবে।
বাবা অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করলেন।
—চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন জায়গা মানেই নতুন একটা সুযোগ।
বাবার মুখে কথাটা শুনে সাহস পেলাম। কিন্তু নিজের ভেতরে একটা অজানা ভয় কাজ করছিল।
এতদিনের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া কি সত্যিই সহজ?
যে রাস্তায় প্রতিদিন হাঁটতাম, যে দোকান থেকে মাঝেমধ্যে খাবার কিনতাম, যে জায়গায় বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটত—সবকিছু কি এত সহজে ছেড়ে দেওয়া যায়?
কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন বাসা ঠিক হলো।
যেদিন আমরা বাসা ছাড়লাম, সেদিন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন পরিচিত কোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই ঘরটা শুধু থাকার জায়গা ছিল না, এখানে আমার জীবনের অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত জমা হয়ে আছে।
মা তাড়া দিলেন,
—মেহরিন, আর কতক্ষণ? গাড়ি এসে গেছে।
আমি শেষবারের মতো ঘরটার দিকে তাকালাম। তারপর ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
নতুন বাসায় এসে প্রথম কয়েকটা দিন একটু অস্বস্তিতে কাটল। সবকিছু গুছিয়ে নিতে সময় লাগছিল। নতুন প্রতিবেশী, নতুন রাস্তা, নতুন পরিবেশ—কিছুই পরিচিত নয়।
তবে সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল পড়াশোনা নিয়ে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাবা কয়েক জায়গায় খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। অবশেষে একটা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেল। মা বললেন, জায়গাটা নাকি বেশ ভালো।
ভর্তির দিন সকালে আমি খুব একটা কথা বলছিলাম না।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে? মন খারাপ?
—না মা।
—নতুন জায়গায় যাচ্ছিস, একটু ভয় লাগতেই পারে। ভয় পেলে চলবে না। সবাই তো একদিন নতুন ছিল।
মায়ের কথায় একটু সাহস পেলাম।
সেদিন প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখছিলাম। অনেক শিক্ষার্থী আসছে-যাচ্ছে। কেউ দল বেঁধে কথা বলছে, কেউ আবার নিজের মতো হাঁটছে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এখানেও কি ভালো কিছু মানুষ পাব? এমন কেউ কি থাকবে, যার সঙ্গে নির্দ্বিধায় মনের কথা বলা যাবে?
কিছুক্ষণ পর একজন শিক্ষিকা এসে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখার পর ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলো।
সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেল।
বাড়ি ফেরার পথে মা জিজ্ঞেস করলেন,
—কেমন লাগল জায়গাটা?
আমি বললাম,
—দেখি মা, সময় গেলে বুঝতে পারব।
মা হেসে বললেন,
—হ্যাঁ, সময়ই সব বুঝিয়ে দেয়।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে অনেকক্ষণ ভাবছিলাম। জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে আরেকটা অধ্যায় শুরু হচ্ছে। আগের জায়গার মানুষগুলো হয়তো ধীরে ধীরে দূরের স্মৃতি হয়ে যাবে। নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হবে। নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম—নিজের স্বপ্নগুলো কখনো ছেড়ে দেব না।
আমি জানতাম না, নতুন এই জায়গায় আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে। কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে, কারও সঙ্গে মতের অমিল হবে, আবার এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, যা আমাকে নিজের সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
তবে সেদিন এসব কিছুই আমার জানা ছিল না।
আমি শুধু জানতাম, পরদিন সকালে আমাকে নতুন একটা জায়গায় যেতে হবে। নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। আর নিজের মতো করে আবার সবকিছু শুরু করতে হবে।
রাত বাড়তে লাগল। জানালার বাইরে হালকা বাতাস বইছিল। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ডায়েরিটা খুলে দিনের শেষ কথাগুলো লিখে রাখলাম—
'জীবনে কখনো কখনো সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়। হয়তো শুরুটা কঠিন, হয়তো কিছু পুরোনো স্মৃতি পেছনে ফেলে আসতে হয়। তবুও সামনে এগিয়ে যেতে হয়। কারণ আমরা জানি না, আগামীকাল আমাদের জন্য কত সুন্দর কিছু অপেক্ষা করছে।'
ডায়েরি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
আমি তখনো জানতাম না, এই নতুন পরিবেশই একদিন আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দেবে, যা কোনো বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না।
এটা ছিল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম দিন। আর সেই অধ্যায়ের গল্প তখনো শুরুই হয়নি।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন