কিছু গল্প অসমাপ্তই সুন্দর
একটি অসমাপ্ত প্রেম ও জীবনের গল্প
লেখিকা: মারজান আক্তার মির্হা
---
পর্ব ২:
সেদিন রাতেও নীরা ডায়েরি খুলে বসেছিল। জানালার বাইরে তখন নীরব রাত। আকাশে অল্প কিছু তারা দেখা যাচ্ছে। চারপাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, অথচ নীরার চোখে ঘুম নেই।
ডায়েরির সাদা পাতায় কলম ছোঁয়াতেই তার মনে হলো, ইদানীং দিনগুলো কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। আগে দিনের শেষে ডায়েরিতে লেখার মতো তেমন কিছুই থাকত না। অথচ এখন প্রতিদিনই ছোট ছোট কিছু ঘটনা জমে থাকে। কখনো কারও বলা দু-একটি কথা, কখনো অকারণ হাসি, আবার কখনো এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর সে নিজেও জানে না।
হঠাৎ ফোনের পর্দায় আলো জ্বলে উঠল।
রাফি: ঘুমিয়ে পড়েছেন?
নীরা মেসেজটি দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উত্তর দিল—
নীরা: না, ডায়েরি লিখছিলাম।
রাফি: প্রতিদিন লেখেন?
নীরা: চেষ্টা করি। সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না। তাই ডায়েরিকে বলি।
রাফি: ভালো অভ্যাস। তবে নিজের মনের কথাগুলো আল্লাহর কাছেও বলবেন। তিনি তো সব শোনেন।
নীরা মেসেজটি পড়ে মৃদু হাসল। কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যে একধরনের আন্তরিকতা ছিল।
নীরা: আপনি কি সব সময় এমন সুন্দর করে কথা বলেন?
রাফি: না। সব সময় সুন্দর করে কথা বলতে পারি না। তবে চেষ্টা করি কাউকে কষ্ট না দিতে।
নীরা: সবাই যদি এমন চেষ্টা করত, তাহলে হয়তো অনেক সম্পর্ক ভেঙে যেত না।
রাফি: সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু কথা নয়, সম্মান আর বিশ্বাসও দরকার।
নীরা আর কিছু লিখল না। ফোনটা পাশে রেখে ডায়েরির পাতায় চোখ রাখল। অজান্তেই তার মনে হলো, মানুষটাকে সে খুব বেশি দিন ধরে চেনে না। অথচ তার কিছু কথা মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে মনে থেকে যায়।
পরদিন সকালটা শুরু হলো মায়ের ডাকে।
— নীরা! আর কত ঘুমাবি? মাদ্রাসায় যাবি না?
নীরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। বিছানা গুছিয়ে, নাশতা করে বইগুলো ব্যাগে ঢোকাতে লাগল। তাড়াহুড়োর মধ্যে ফোনটা একবার হাতে নিতেই দেখল, রাফির কোনো নতুন মেসেজ নেই।
কেন যেন একটু অদ্ভুত লাগল তার। তারপর নিজেকেই বোঝাল, সবাই তো আর সারাক্ষণ ফোন হাতে বসে থাকে না।
মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশের গাছগুলো বাতাসে দুলছিল। নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, জীবনে কিছু মানুষ আসে খুব সাধারণভাবে। তাদের আগমনের সময় বোঝা যায় না, একদিন তারা স্মৃতির অংশ হয়ে উঠবে।
ক্লাসে বসে শিক্ষক যখন পড়া বোঝাচ্ছিলেন, নীরা মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে তার মনে পড়ছিল রাতের কথাগুলো। নিজেকে কয়েকবার বুঝিয়েছে, পড়াশোনার সময় পড়াশোনাতেই মন দিতে হবে।
ক্লাসের ফাঁকে বান্ধবী মেহের তার পাশে এসে বসল।
— কী হয়েছে তোর? আজ এত চুপচাপ কেন?
— কিছু হয়নি।
— কিছু হয়নি বললেই তো আর বিশ্বাস করতে হবে না!
নীরা হেসে বলল,
— সব সময় কি আর কথা বলতে ইচ্ছা করে?
মেহের তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তা ঠিক। তবে তোর মুখে আজ অন্যরকম একটা ভাব।
নীরা বিষয়টা এড়িয়ে গেল। সে জানত, সব অনুভূতি সবাইকে বোঝানো যায় না। কিছু কথা নিজের কাছেই থাকুক।
বিকেলে বাড়ি ফিরে নীরা নামাজ পড়ে পড়ার টেবিলে বসল। সামনে বই খোলা, কিন্তু মনটা বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। ফোনে কোনো নোটিফিকেশন নেই। সে নিজে থেকে মেসেজ দেবে কি না, ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত ফোনটা সরিয়ে রাখল।
নিজেকে মনে করিয়ে দিল, পড়াশোনাও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তাকে পরিশ্রম করতেই হবে। কোনো কিছুই যেন তার দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
রাতের দিকে ফোনে মেসেজ এল।
রাফি: আজ দিনটা কেমন গেল?
নীরা: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনার?
রাফি: ভালোই। তবে আজ একটু ব্যস্ত ছিলাম।
নীরা: বুঝেছি। ব্যস্ত থাকলে সমস্যা নেই। সবারই তো কাজ থাকে।
রাফি: আজ আপনার মাদ্রাসায় পড়াশোনা কেমন হলো?
নীরা: ভালো। তবে কিছু পড়া বাকি আছে।
রাফি: তাহলে আগে পড়াশোনা শেষ করুন। পরে কথা হবে।
নীরা অবাক হলো। সে ভেবেছিল রাফি হয়তো আরও কথা বলবে। কিন্তু রাফি নিজেই তাকে পড়তে বলছে।
নীরা: আপনি কি সব সময় অন্যদের পড়াশোনার কথা মনে করিয়ে দেন?
রাফি: নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে কারও সঙ্গে কথা বলার কোনো মানে নেই। আগে নিজের লক্ষ্য পূরণ করা দরকার।
কথাটা নীরার ভালো লাগল।
নীরা: কথাটা মনে রাখব।
এরপর কয়েক দিন তাদের কথাবার্তা নিয়মিত চলতে লাগল। কখনো সকালে ছোট্ট একটা শুভেচ্ছা, কখনো রাতে দিনের গল্প। কখনো পড়াশোনা নিয়ে কথা, কখনো পরিবারের কথা। আবার কখনো এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো, যা দুজনের চিন্তাভাবনাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসত।
একদিন রাফি নিজের স্বপ্নের কথা বলছিল।
রাফি: জানেন, আমার খুব ইচ্ছা একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াব। পরিবারের জন্য কিছু করতে চাই।
নীরা: এটা তো খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন।
রাফি: শুধু স্বপ্ন দেখলে তো হবে না। চেষ্টা করতে হবে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত কিছু পারব তো?
নীরা: চেষ্টা করলে আল্লাহ নিশ্চয়ই উত্তম কিছু দেবেন। তবে ধৈর্য ধরতে হবে।
রাফি: আপনার নিজের স্বপ্ন কী?
নীরা কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—
নীরা: আমি চাই একদিন নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। নিজের পরিশ্রমে কিছু একটা করতে চাই, যেন কেউ বলতে পারে—নীরা নিজের চেষ্টায় কিছু করেছে।
রাফি: ইনশাআল্লাহ, পারবেন। শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবেন।
নীরা: দোয়া করবেন।
রাফি: অবশ্যই।
কথাগুলো খুব ছোট ছিল। কিন্তু নীরার কাছে সেদিন সেগুলো অনেক বড় মনে হয়েছিল।
একদিন বিকেলে আকাশ মেঘলা ছিল। বৃষ্টি নামার অপেক্ষায় চারপাশ কেমন থমথমে হয়ে আছে। নীরা জানালার পাশে বসে ছিল। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে সে ফোন হাতে নিল।
নীরা: আপনার বৃষ্টি ভালো লাগে?
রাফি: অনেক। বৃষ্টির মধ্যে একটা শান্তি আছে।
নীরা: আমারও ভালো লাগে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকতে।
রাফি: তখন নিশ্চয়ই অনেক কিছু ভাবেন?
নীরা: হ্যাঁ। কখনো পুরোনো কথা, কখনো ভবিষ্যৎ, আবার কখনো এমন কিছু বিষয়, যার কোনো উত্তর নেই।
রাফি: সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।
নীরা: কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনো পাওয়াও যায় না।
রাফি: তবু জীবন থেমে থাকে না।
নীরা কথাটা পড়ে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাচ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল। তার মনে হলো, জীবনের অনেক অনুভূতিও বৃষ্টির ফোঁটার মতো—কিছুক্ষণ থাকে, তারপর কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
তবে সব দিন এক রকম ছিল না।
কয়েক দিন পর হঠাৎ রাফির সঙ্গে কথা কমে গেল। আগের মতো মেসেজ আসত না। নীরা প্রথমে ভাবল, হয়তো ব্যস্ত। কিন্তু একদিন, দুইদিন পেরিয়ে গেলেও কোনো খবর নেই।
সে ফোন হাতে নিয়ে বারবার পুরোনো কথাগুলো পড়ল। নিজেকে প্রশ্ন করল, সে কি কোনো ভুল কথা বলেছে? নাকি মানুষটা আর কথা বলতে চায় না?
শেষ পর্যন্ত নিজেকে থামাল। কারও নীরবতার পেছনে কারণ না জেনে নিজের মনকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়।
তৃতীয় দিনের রাতে রাফির মেসেজ এল।
রাফি: কেমন আছেন?
নীরা মেসেজটি দেখল। অনেকক্ষণ পর উত্তর দিল—
নীরা: আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?
রাফি: ভালো। কয়েক দিন একটু সমস্যায় ছিলাম। তাই কথা বলতে পারিনি। কিছু মনে করেছেন?
নীরা কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—
নীরা: না। তবে হঠাৎ যোগাযোগ কমে গেলে একটু চিন্তা হয়।
রাফি: দুঃখিত। আর এমন হলে জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।
নীরা: সমস্যা নেই। তবে একটা কথা বলি?
রাফি: বলুন।
নীরা: কারও সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস হয়ে গেলে তার নীরবতাও চোখে পড়ে।
রাফি কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না। নীরা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিট পর মেসেজ এল।
রাফি: তাহলে চেষ্টা করব, আমার নীরবতা যেন আপনাকে অকারণে চিন্তায় না ফেলে।
নীরা আর কিছু বলল না। শুধু বুঝল, যেকোনো পরিচয়ে বিশ্বাসের পাশাপাশি বোঝাপড়াও জরুরি। আর সেই বোঝাপড়া তৈরি হতে সময় লাগে।
এরপর থেকে তাদের কথায় আরও স্বাভাবিকতা ফিরে এল। তবে নীরা নিজের মনে একটা সীমারেখা ঠিক করে নিল। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগা মানেই নিজের সবটুকু অনুভূতি তার হাতে তুলে দেওয়া নয়। নিজের আত্মসম্মান, পরিবার, পড়াশোনা আর বিশ্বাস—সবকিছুরই আলাদা গুরুত্ব আছে।
এক রাতে রাফি জিজ্ঞেস করল—
রাফি: আপনি কি সহজে কাউকে বিশ্বাস করেন?
নীরা: না। বিশ্বাস করতে আমার সময় লাগে।
রাফি: কেন?
নীরা: কারণ বিশ্বাস ভাঙলে মানুষ শুধু একজনকে হারায় না, নিজের ভেতরের সরলতাটাও হারিয়ে ফেলে।
রাফি: কথাটা খুব গভীর।
নীরা: জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়।
রাফি: তাহলে আমাকে কীভাবে দেখেন?
প্রশ্নটা পড়ে নীরা থমকে গেল। উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ ভাবল।
নীরা: একজন পরিচিত মানুষ হিসেবে। যাকে এখনো জানার বাকি আছে।
রাফি উত্তর দিল—
রাফি: ঠিক আছে। সময় নিয়ে চিনবেন। আমি তাড়াহুড়ো করতে চাই না।
নীরা ফোনটা পাশে রেখে দিল। তার মনে হলো, এই উত্তরটাই হয়তো তার শোনা দরকার ছিল।
সেদিন রাতে ডায়েরি খুলে নীরা লিখল—
“কিছু মানুষকে আমরা খুব অল্প সময়েই চিনতে শুরু করি। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা না হলেও তাদের বলা কিছু কথা মনে থেকে যায়। তবে কাউকে আপন ভাবার আগে সময়কে তার কাজ করতে দিতে হয়। কারণ সুন্দর কথা বললেই কেউ আপন হয়ে যায় না; আপন হতে হলে প্রয়োজন সততা, সম্মান আর বিশ্বাস।
আমি জানি না, রাফি আমার জীবনের গল্পে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। হয়তো একদিন সে আমার খুব পরিচিত একজন হয়ে থাকবে, আবার হয়তো সময়ের সঙ্গে আমাদের কথাগুলোও হারিয়ে যাবে। আমি কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে চাই না। শুধু চাই, জীবনের প্রতিটি পরিচয় আমাকে ভালো কিছু শেখাক।”
ডায়েরির শেষ পাতায় আরও একটি লাইন লিখে সে কলম বন্ধ করল—
“কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নয়, বরং আমাদের কিছু সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিতে। তবে সেই মুহূর্তগুলোকে সুন্দর রাখতে হলে নিজের মূল্যবোধ ভুলে যাওয়া যায় না।”
রাত আরও গভীর হলো। জানালার বাইরে বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছিল। নীরা ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
সে জানত না, সামনের দিনগুলোতে তাদের কথার মাঝে কত নতুন গল্প জমবে। কত হাসি, কত অভিমান, কত ভুল বোঝাবুঝি অপেক্ষা করছে।
সে শুধু জানত, অচেনা একজন মানুষ ধীরে ধীরে তার প্রতিদিনের গল্পের ছোট্ট একটি অংশ হয়ে উঠছে।
কিন্তু গল্পের শুরুটা যতই সুন্দর হোক, শেষটা কেমন হবে—তা কেউ আগে থেকে জানে না।
চলবে…