কিছু গল্পের সমাপ্তি সুন্দর
লেখিকা: মারজান আক্তার মির্হা
পর্ব – ০৫
বিশ্বাসের মূল্য
কিছু কিছু দিন মানুষের জীবনে এমনভাবে আসে, যেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত পরবর্তীতে মনে পড়ে। সেদিন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়, কিন্তু দিনের শেষে এমন কিছু ঘটে যায়, যা মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দেয়।
মেহরিনের জীবনেও তেমন একটি দিন আসতে চলেছিল।
প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বেশ ভালোভাবেই চলছিল। সবাই নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। কেউ মঞ্চ সাজানোর পরিকল্পনা করছে, কেউ আবৃত্তির অনুশীলন করছে, আবার কেউ অতিথিদের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে।
মেহরিনও তার লেখাটি কয়েকবার পড়ে দেখছিল। শিক্ষিকা তাকে অনুষ্ঠানে নিজের লেখা পড়ে শোনানোর সুযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সে আনন্দিত হলেও ভেতরে ভেতরে একটু ভয় পাচ্ছিল।
এত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতা তার কখনো হয়নি।
সেদিন সকালে রাইসা এসে বলল,
—কী অবস্থা? প্রস্তুতি কেমন?
মেহরিন বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে বলল,
—মোটামুটি। তবে সবার সামনে গিয়ে যদি সব ভুলে যাই?
রাইসা হেসে বলল,
—তাহলে আবার শুরু করবি। এত চিন্তা করার কী আছে?
—তোর কাছে সবকিছুই সহজ মনে হয়।
—কারণ আমি জানি, তুই পারবি।
রাইসার কথায় মেহরিন একটু সাহস পেল।
কিছুক্ষণ পর সুমাইয়াও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। আগের কয়েক দিনের দূরত্ব যেন কিছুটা কমে এসেছে। সে মেহরিনের লেখাটি দেখতে চাইল।
লেখা পড়ে সুমাইয়া বলল,
—সত্যি বলতে, তোর লেখার হাত বেশ ভালো। আগে জানতাম না।
মেহরিন হেসে বলল,
—এমন কিছু না। নিজের ভালো লাগা থেকেই লিখি।
সুমাইয়া বলল,
—অনুষ্ঠানের দিন ভালো করে পড়বি। আমরা তো থাকবই।
কথাটা শুনে মেহরিনের ভালো লাগল।
সে ভেবেছিল, হয়তো তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বটা আর থাকবে না।
কিন্তু মানুষের মনের ভেতর কী চলছে, তা বাইরে থেকে বোঝা সত্যিই কঠিন।
পরদিন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল।
মেহরিন তার লেখার খাতাটি নিয়ে প্রতিষ্ঠানে এসেছিল। শিক্ষিকাকে দেখানোর পর খাতাটি ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। বিরতির সময় রাইসার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাইরে চলে যায়।
ক্লাসে ফিরে এসে ব্যাগ খুলতেই তার চোখ আটকে গেল।
খাতাটি নেই!
প্রথমে সে ভাবল, হয়তো অন্য বইয়ের মধ্যে রেখেছে। ব্যাগের প্রতিটি জিনিস বের করে দেখল। বেঞ্চের আশপাশেও খুঁজল। কিন্তু কোথাও পেল না।
সে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল।
রাইসা এসে জিজ্ঞেস করল,
—কী খুঁজছিস?
—আমার লেখার খাতাটা পাচ্ছি না।
—কোথায় রেখেছিলি?
—ব্যাগেই ছিল। একটু আগে দেখেছি।
রাইসা বলল,
—ভালো করে দেখ। হয়তো অন্য কোথাও রেখেছিস।
দুজন মিলে অনেকক্ষণ খুঁজল। তবুও পাওয়া গেল না।
মেহরিনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ খাতাটিতে শুধু অনুষ্ঠানের লেখাই ছিল না, আরও কিছু ব্যক্তিগত লেখা ছিল। অনেক দিন ধরে সে সেখানে নিজের মনের কথা লিখে রেখেছিল।
সে বিষয়টি শিক্ষিকাকে জানাল।
শিক্ষিকা বললেন,
—চিন্তা করো না। ভালোভাবে খোঁজ করো। হয়তো কেউ ভুল করে নিয়ে গেছে।
মেহরিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
কিন্তু পরদিনও খাতাটি পাওয়া গেল না।
এদিকে ক্লাসে একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কয়েকজন বলছে, মেহরিন নাকি নিজেই খাতাটি কোথাও রেখে ভুলে গেছে। আবার কেউ কেউ বলছে, তার ব্যক্তিগত লেখাগুলো অন্য কেউ পড়ে ফেলেছে।
মেহরিন এসব শুনে অস্বস্তি বোধ করছিল।
সে কাউকে সন্দেহ করতে চাইছিল না। কিন্তু খাতাটি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাকে ভেতর থেকে চিন্তিত করে তুলেছিল।
একদিন টিফিনের সময় খাদিজা তার কাছে এসে বলল,
—তোমার খাতাটা কি এখনো পাওনি?
মেহরিন বলল,
—না।
খাদিজা একটু মুচকি হেসে বলল,
—আচ্ছা! তোমার ওই খাতায় কী এমন ছিল যে এত চিন্তা করছ?
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।
—আমার ব্যক্তিগত কিছু লেখা ছিল। তাই খুঁজছি।
খাদিজা বলল,
—ওহ! ব্যক্তিগত লেখা!
কথাটা বলে সে চলে গেল।
মেহরিনের মনে হলো, খাদিজার কথার মধ্যে যেন অন্য কোনো ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে বসে ছিল। মা কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে? আজ তোকে এমন লাগছে কেন?
মেহরিন সব খুলে বলল।
মা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন,
—কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে কষ্ট হয়, বিশেষ করে সেটার সঙ্গে যদি মনের সম্পর্ক থাকে। তবে অন্যের ওপর সন্দেহ করার আগে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মেহরিন বলল,
—আমি কাউকে সন্দেহ করতে চাই না মা। কিন্তু খাতাটায় আমার অনেক ব্যক্তিগত কথা ছিল।
মা তার পাশে বসে বললেন,
—তাহলে এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো একটু সাবধানে রাখবি। আর মনে রাখবি, নিজের মনের সব কথা সবার সামনে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই।
মায়ের কথাগুলো মেহরিনের মনে রয়ে গেল।
পরদিন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সে রাইসাকে বিষয়টি আবার বলল। রাইসা তাকে আশ্বস্ত করল।
—দেখ, খাতাটা পাওয়া যাবে। এত চিন্তা করিস না।
কিন্তু মেহরিনের মন মানছিল না।
ঠিক সেই সময় সুমাইয়া এসে বলল,
—মেহরিন, তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।
—কী হয়েছে?
—একটু বাইরে আয়।
দুজন ক্লাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।
সুমাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তোর খাতাটা নিয়ে একটা কথা শুনেছি।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
—কী শুনেছিস?
—খাদিজার কাছে নাকি তোর খাতার মতো একটা খাতা দেখা গেছে।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—তুই নিশ্চিত?
—না, নিশ্চিত নই। তবে আমার এক বান্ধবী দেখেছে বলে জানিয়েছে।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তুই কি মনে করিস, খাদিজা আমার খাতাটা নিয়েছে?
সুমাইয়া বলল,
—আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। তবে বিষয়টা জানা দরকার।
মেহরিন ঠিক করল, সে সরাসরি খাদিজার সঙ্গে কথা বলবে।
ক্লাস শেষে সে খাদিজার কাছে গিয়ে বলল,
—তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
খাদিজা বলল,
—বলো।
—আমার একটা খাতা হারিয়েছে। কেউ বলেছে, তোমার কাছে নাকি আমার খাতার মতো একটা খাতা দেখেছে। তুমি কি কিছু জানো?
খাদিজা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি কেন তোমার খাতা নেব?
মেহরিন শান্তভাবে বলল,
—আমি শুধু জানতে চেয়েছি। তোমাকে দোষ দিচ্ছি না।
খাদিজা বিরক্ত হয়ে বলল,
—তোমার জিনিস হারালে আমার কাছে কেন আসছ? নিজের জিনিস নিজে সামলাতে পারো না?
মেহরিন আর কথা বাড়াল না।
সে বুঝতে পারল, এভাবে কিছু জানা যাবে না।
এরপর কয়েক দিন কেটে গেল।
অনুষ্ঠানের দিনও ঘনিয়ে এল। মেহরিন নতুন করে নিজের লেখাটি তৈরি করল। আগের খাতার লেখা মনে করে আবার লিখতে বেশ কষ্ট হয়েছিল। তবুও সে হাল ছাড়েনি।
অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলে রাইসা তাকে ফোন করল।
—মেহরিন, একটা খবর আছে।
—কী খবর?
—তোর খাতাটা পাওয়া গেছে।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—সত্যি? কোথায়?
—প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে পাওয়া গেছে। একজন শিক্ষিকা খাতাটা পেয়েছেন।
মেহরিন যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
পরদিন সকালে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষিকার কাছ থেকে খাতাটি নিয়ে এল।
খাতা হাতে পেয়ে তার খুব ভালো লাগছিল। সে দ্রুত কয়েকটি পাতা উল্টে দেখল। সব লেখা ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করছিল।
কিন্তু শেষের দিকের একটি পাতায় চোখ পড়তেই সে থমকে গেল।
সেখানে তার ব্যক্তিগত একটি লেখা ছিল। পাতাটির পাশে পেন্সিল দিয়ে ছোট্ট একটা মন্তব্য লেখা।
মন্তব্যটি ছিল—
'সবাইকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।'
মেহরিন কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কে লিখেছে, সে জানত না।
তবে এবার সে একটা সিদ্ধান্ত নিল। কারও আচরণে কষ্ট পেলেও নিজের মনকে তিক্ত হতে দেবে না।
অনুষ্ঠানের দিন সে নিজের লেখা সুন্দরভাবে পড়ে শোনাল। প্রথমে একটু ভয় লাগলেও কিছুক্ষণ পর সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। উপস্থিত শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীরা তার লেখার প্রশংসা করল।
রাইসা আর সুমাইয়া দুজনেই তাকে অভিনন্দন জানাল।
সেদিন মেহরিনের মনে হচ্ছিল, এতদিনের চেষ্টা সার্থক হয়েছে।
বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে সব বলল। বাবা বললেন,
—দেখেছ, চেষ্টা করলে মানুষ অনেক কিছুই পারে।
মেহরিন হাসল।
রাতে ডায়েরি খুলে সে নতুন করে কিছু কথা লিখল।
'আজ একটা বিষয় বুঝলাম। বিশ্বাস করা সুন্দর, কিন্তু বিশ্বাসের পাশাপাশি নিজের বিবেচনাবোধ থাকাও জরুরি। কারও প্রতি অকারণে খারাপ ধারণা রাখা উচিত নয়। তবে নিজের অনুভূতি আর ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও যত্ন করে রাখতে হয়।
সব মানুষকে আপন ভাবতে নেই, আবার সবাইকে অবিশ্বাস করেও বাঁচা যায় না।
আমি চাই, জীবনে এমন মানুষ থাকুক, যাদের সামনে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হবে না। যাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যাবে। আর যদি এমন মানুষ না-ও পাই, তবুও নিজের প্রতি বিশ্বাস যেন কখনো হারিয়ে না ফেলি।'
লেখা শেষ করে ডায়েরি বন্ধ করল।
জানালার বাইরে তখন রাতের আকাশে মেঘ জমেছে।
মেহরিন জানত না, খাতাটি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটির পেছনে আসলে কী ছিল। সে কাউকে দোষীও করল না। তবে তার মনে একটা প্রশ্ন থেকে গেল—কিছু মানুষ কেন অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এত আগ্রহী হয়?
হয়তো এর উত্তর সে কোনো একদিন পাবে।
আর সেদিন হয়তো কিছু সম্পর্কের আসল রূপও তার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কিন্তু আপাতত সে নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে চায়।
কারণ সে বুঝতে শুরু করেছে, জীবনে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে কীভাবে সামলাবে, সেই সিদ্ধান্তটা নিজের হাতে রাখা যায়।
চলবে...