কিছু গল্পের সমাপ্তি সুন্দর
লেখিকা: জান্নাতুল ফেরদৌস
পর্ব – ০৬
অচেনা বার্তার আড়ালে
বার্ষিক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর কয়েকটা দিন বেশ স্বাভাবিকভাবেই কাটছিল মেহরিনের। অনুষ্ঠানের দিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের লেখা পড়ার অভিজ্ঞতাটা এখনো তার মনে বেশ স্পষ্ট। প্রথমে ভয় পেয়েছিল, কথা বলতে গিয়ে ভুল হয়ে যাবে কি না, সবাই কী ভাববে—এমন অনেক চিন্তা মাথায় এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে নিজের লেখাটা সুন্দরভাবে পড়ে শেষ করতে পেরেছিল।
শিক্ষিকাদের প্রশংসা আর সহপাঠীদের হাততালি তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, এত দিন নিজের ভেতরে যে ছোট্ট স্বপ্নটা লুকিয়ে রেখেছিল, সেটাকে যেন একটু হলেও বাইরে প্রকাশ করতে পেরেছে।
তবুও একটা বিষয় তার মন থেকে যাচ্ছিল না।
তার সেই হারিয়ে যাওয়া খাতাটা কে পড়েছিল? কে সেখানে ব্যক্তিগত লেখার পাশে এমন একটি বাক্য লিখে রেখেছিল—‘সবাইকে বিশ্বাস করা উচিত নয়’? কথাটা কি তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা হয়েছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল?
মেহরিন অনেকবার ভেবেছে বিষয়টা ভুলে যাবে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো চাইলেই মন থেকে সরিয়ে রাখা যায় না।
সেদিন সকালে মা তাকে কয়েকবার ডাকছিলেন।
— মেহরিন, আর কতক্ষণ লাগবে? নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
— এই তো মা, আসছি।
মেহরিন বইগুলো ব্যাগে গুছিয়ে টেবিলের কাছে গেল। মা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আজকাল দেখছি পড়াশোনার পাশাপাশি আরও অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকিস।
— সামনে একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হবে মা। ম্যাডাম বলেছেন, যারা আগ্রহী তারা অংশ নিতে পারবে।
মা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন,
— তুই অংশ নিবি?
— ভাবছি। তবে আগে কখনো বিতর্কে অংশ নিইনি। একটু ভয়ও লাগছে।
মা হাসলেন।
— নতুন কিছু করতে গেলে ভয় লাগতেই পারে। ভয় পেয়ে যদি শুরুই না করিস, তাহলে শিখবি কীভাবে?
মায়ের কথাটা মেহরিনের মনে রয়ে গেল। সে নাশতা শেষ করে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
মাদ্রাসায় পৌঁছানোর পর দেখল, সুমাইয়া কয়েকজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মেহরিনকে দেখে সে একবার তাকাল, কিন্তু আগের মতো এগিয়ে এসে কথা বলল না।
একসময় সুমাইয়ার সঙ্গে তার কত কথা হতো! ক্লাসের ফাঁকে গল্প, একসঙ্গে লাইব্রেরিতে যাওয়া, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হাসাহাসি—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে বদলে গেছে।
মেহরিন অবশ্য কাউকে জোর করে নিজের বন্ধু বানিয়ে রাখতে চায় না। তবুও পুরোনো অভ্যাসগুলো হঠাৎ বদলে গেলে একটু খারাপ তো লাগেই।
নিজের জায়গায় বসে বই বের করছিল, এমন সময় রাইসা এসে পাশে বসল।
— কী হয়েছে? আজও এত চুপচাপ?
মেহরিন হেসে বলল,
— আমি কি সবসময় চুপচাপ থাকি?
— না, তবে আজকাল তোমাকে একটু চিন্তিত মনে হয়।
— কিছু বিষয় নিয়ে ভাবছি।
রাইসা আর প্রশ্ন করল না। বরং নিজের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে বলল,
— দেখো, গতকাল লাইব্রেরি থেকে নিয়েছি। গল্পের বই। পড়লে তোমার ভালো লাগবে।
মেহরিন বইটার প্রচ্ছদ দেখল। বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। নতুন বই হাতে পেলেই তার মনে একটা অন্যরকম আনন্দ কাজ করত।
— শেষ হলে আমাকে দিও।
— অবশ্যই।
কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হলো। দ্বিতীয় ক্লাসে শিক্ষিকা সবাইকে জানালেন, আগামী মাসে আন্তঃশ্রেণি বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি শ্রেণি থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে।
শিক্ষিকা বোর্ডে বিষয়টি লিখে বললেন,
— বিতর্কের বিষয় হচ্ছে, ‘প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, নাকি কঠিন করেছে?’ তোমরা যারা অংশ নিতে চাও, তারা নিজেদের নাম দিতে পারো। তবে শুধু মুখস্থ করে বক্তব্য দিলেই হবে না। বিষয়টা বুঝে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে।
ক্লাসের কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ প্রকাশ করল। কেউ বলল, সে অংশ নেবে, কেউ আবার বন্ধুকে উৎসাহ দিতে লাগল।
একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ মেহরিনের নাম প্রস্তাব করল।
— ম্যাডাম, মেহরিনকে দিতে পারেন। অনুষ্ঠানে ও খুব সুন্দর করে বক্তব্য দিয়েছিল।
শিক্ষিকা মেহরিনের দিকে তাকালেন।
— তুমি কি অংশ নিতে চাও?
মেহরিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— জি ম্যাডাম, চেষ্টা করতে পারি।
— খুব ভালো। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিয়মিত প্রস্তুতি নিলে নিশ্চয়ই ভালো করবে।
কথাটা শুনে মেহরিনের মনে একটু সাহস তৈরি হলো।
ক্লাস শেষে রাইসা বলল,
— তুমি অংশ নিলে আমি খুব খুশি হব।
— কিন্তু বিতর্ক আর বক্তব্য তো এক জিনিস নয়। সেখানে বিপক্ষের কথার উত্তরও দিতে হয়।
— সেটা ঠিক। কিন্তু শিখতে হলে তো কোথাও থেকে শুরু করতে হবে।
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে। এবার ভালোভাবে চেষ্টা করব।
দুজন লাইব্রেরিতে গেল। মেহরিন বিতর্কের বিষয় নিয়ে কিছু বই খুঁজছিল। এমন সময় লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা আপা তাকে ডাকলেন।
— এই যে মেহরিন, তোমার খাতাটা তো সেদিন পাওয়া গিয়েছিল, তাই না?
মেহরিন একটু অবাক হয়ে বলল,
— জি আপা। ম্যাডাম লাইব্রেরি থেকে পেয়েছিলেন।
— হ্যাঁ, সেদিন বইয়ের তাক গোছানোর সময় একটা খাতা তাকের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি কার। পরে শিক্ষিকাকে জানিয়েছিলাম।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
— আপা, কেউ কি খাতাটা আপনার কাছে জমা দিয়েছিল?
— না তো। আমি নিজেই পেয়েছিলাম। তবে কে সেখানে রেখেছিল, সেটা জানি না।
মেহরিন আর কোনো প্রশ্ন করল না। তার মনে হচ্ছিল, রহস্যটা যেন আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে।
লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার পর রাইসা জিজ্ঞেস করল,
— কী বলল আপা?
— বলল, খাতাটা তাকের পাশে পেয়েছিল। কে রেখেছিল, জানে না।
— তাহলে এখনো কিছু পরিষ্কার হলো না।
— না। তবে আমি আর বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবতে চাই না।
রাইসা বলল,
— সেটাই ভালো। কারও ভুলের জন্য নিজের পড়াশোনা বা লেখালেখির আগ্রহ নষ্ট কোরো না।
কথাটা মেহরিনের ভালো লাগল। সে মনে মনে ঠিক করল, আবার নিয়মিত লিখবে। তবে এবার নিজের ব্যক্তিগত লেখাগুলো আরও যত্ন করে রাখবে।
পরের দিন থেকে বিতর্কের প্রস্তুতি শুরু হলো। মেহরিন বাড়িতে ফিরে বইপত্র নিয়ে বসে পড়ল। প্রযুক্তির ভালো দিক, খারাপ দিক, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব—সবকিছু নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে লাগল।
তার ছোট ভাই একসময় পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল।
— আপু, তুমি কী করছ?
— একটা প্রতিযোগিতার জন্য পড়ছি।
— তুমি কি পুরস্কার পাবে?
মেহরিন হেসে বলল,
— সেটা তো এখনই বলা যায় না।
— না পেলে?
— তাতেও সমস্যা নেই। চেষ্টা করলে কিছু না কিছু শেখা যায়।
ছোট ভাই কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তাহলে আমিও একদিন প্রতিযোগিতায় অংশ নেব।
— অবশ্যই। তবে আগে নিজের পড়াশোনা ঠিকমতো করো।
দুজনেই হেসে উঠল।
রাতে বাবা বাসায় ফিরে মেয়েকে বইয়ের সামনে বসে থাকতে দেখে জানতে চাইলেন,
— কী নিয়ে এত পড়াশোনা করছ?
মেহরিন বাবাকে বিতর্ক প্রতিযোগিতার কথা বলল। বাবা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
— ভালো কথা। নতুন কিছু শেখার সুযোগ পেলে চেষ্টা করা উচিত। তবে মনে রাখবে, পুরস্কার পাওয়াটাই সবকিছু নয়। নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করাটাও অনেক বড় বিষয়।
মেহরিন বলল,
— জি বাবা। আমি চেষ্টা করব।
বাবা আর কিছু না বলে নিজের কাজে চলে গেলেন। কিন্তু তার কথাগুলো মেহরিনের মনে থেকে গেল।
এদিকে মাদ্রাসায় সুমাইয়ার সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়ছিল। আগে বিরতির সময় দুজন একসঙ্গে বসত। এখন সুমাইয়া অন্যদের সঙ্গে সময় কাটায়। মেহরিন প্রথম কয়েক দিন বিষয়টা এড়িয়ে গেলেও একসময় সরাসরি কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
একদিন বিরতির সময় সে সুমাইয়ার কাছে গিয়ে বলল,
— সুমাইয়া, একটু কথা বলবি?
— বলো।
— আমাদের মধ্যে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?
সুমাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— না তো। এমন কিছু হয়নি।
— তাহলে আগের মতো কথা বলিস না কেন? আমি কি কোনো ভুল করেছি?
সুমাইয়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— সবকিছু নিয়ে এত প্রশ্ন করার কী আছে? মানুষের নিজেরও তো অনেক কাজ থাকে।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— অবশ্যই থাকে। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, আমার কোনো ভুল থাকলে যেন বুঝতে পারি।
সুমাইয়া আর কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের বন্ধুদের কাছে চলে গেল।
মেহরিন তার চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে এল।
সেদিন তার একটু কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারল, সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা দুজনের দিক থেকেই আসতে হয়। একজন বারবার এগিয়ে গেলে আর অন্যজন বারবার দূরে সরে গেলে সেই সম্পর্ক আগের মতো রাখা কঠিন।
পরদিন বিতর্ক প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই অনুষ্ঠিত হলো। মেহরিনের নামও তালিকায় ছিল। সে সকাল থেকেই কিছুটা চিন্তিত ছিল। নিজের প্রস্তুতি কয়েকবার দেখে নিয়েছিল, তবুও মনে হচ্ছিল কোথাও যেন কিছু বাদ পড়ে গেছে।
তার নাম ডাকা হলে সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে একবার পুরো কক্ষের দিকে তাকাল। পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে রাইসাকে দেখতে পেল। রাইসা তাকে সাহস দেওয়ার জন্য মৃদু হাসল।
মেহরিন বক্তব্য শুরু করল।
প্রথম দিকে কণ্ঠ একটু কেঁপে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েকটি বাক্য বলার পর সে স্বাভাবিক হয়ে গেল। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কীভাবে সহজ করেছে, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও শিক্ষাক্ষেত্রে এর ভূমিকা কী—এসব বিষয় তুলে ধরল। পাশাপাশি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, সময়ের অপচয় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকির কথাও বলল।
বক্তব্য শেষ হলে শিক্ষিকা তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। প্রথম প্রশ্নের উত্তর সে ভালোভাবেই দিল। দ্বিতীয় প্রশ্নের সময় কিছুটা থেমে গেল। উত্তরটা তার জানা ছিল, কিন্তু কীভাবে গুছিয়ে বলবে বুঝতে পারছিল না।
কয়েক মুহূর্ত ভেবে সে নিজের মতো করে উত্তর দিল।
শিক্ষিকা বললেন,
— ভালো চেষ্টা। তবে আরও অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আত্মবিশ্বাস ধরে রাখবে।
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল,
— জি ম্যাডাম।
বাইরে বের হওয়ার পর রাইসা এগিয়ে এল।
— কেমন হলো?
— মোটামুটি। একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আটকে গিয়েছিলাম।
— তাতে কী হয়েছে? প্রথমবারেই সব নিখুঁত হতে হবে এমন তো নয়।
মেহরিন হেসে বলল,
— তুমি সবসময় আমাকে সাহস দাও কেন?
রাইসা বলল,
— কারণ তুমি নিজের ভালো দিকগুলো নিজেই দেখতে পাও না।
কথাটা শুনে মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সত্যিই তো, সে অনেক সময় নিজের ভুলগুলো নিয়ে এত বেশি ভাবে যে নিজের চেষ্টাগুলোর কথা ভুলে যায়।
দূর থেকে খাদিজা তাদের কথোপকথন শুনছিল। সে কাছে এসে বলল,
— বাহ! এখন তো দেখছি মেহরিন সব জায়গাতেই নাম লেখাচ্ছে।
কথাটার মধ্যে প্রশংসার চেয়ে ব্যঙ্গই বেশি ছিল।
মেহরিন শান্তভাবে বলল,
— চেষ্টা করছি শুধু।
খাদিজা বলল,
— চেষ্টা করলেই তো আর সবাই পারে না।
রাইসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেহরিন তাকে থামিয়ে দিল।
— সবাই সবকিছু পারে না, এটা ঠিক। তবে চেষ্টা না করলে নিজের সামর্থ্যটাও বোঝা যায় না।
এই কথা বলে সে আর দাঁড়াল না। রাইসাও তার সঙ্গে চলে গেল।
বাড়ি ফিরে মেহরিন নতুন একটি খাতা বের করল। প্রথম পাতায় নিজের নাম লিখে তার নিচে লিখল—
‘আমার প্রতিদিনের কথা।’
সে ঠিক করল, এই খাতায় শুধু নিজের অনুভূতি, দিনের অভিজ্ঞতা আর শেখা বিষয়গুলো লিখবে। আগের খাতার ঘটনাটা তাকে সতর্ক করেছে, কিন্তু লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা কমাতে পারেনি।
সেদিন রাতে সে জানালার পাশে বসে অনেকক্ষণ লিখল। বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছিল। ছোট ভাই ঘুমিয়ে পড়েছে, মা ঘরের কাজ শেষ করছেন, বাবা নিজের পড়ার টেবিলে বসে আছেন।
মেহরিন লিখল, মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন পরিচিত মানুষগুলোও অচেনা মনে হয়। আবার এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের সঙ্গে অল্প দিনের পরিচয় হলেও তাদের আচরণ মনে দাগ কাটে।
সে বুঝতে পারছিল, জীবন শুধু ভালো ফলাফল কিংবা প্রশংসা পাওয়ার নাম নয়। কখনো ভুল বোঝাবুঝি সামলাতে হয়, কখনো নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি হতে হয়, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ হয়।
সবকিছুর মধ্যেও নিজেকে হারিয়ে না ফেলাটাই সবচেয়ে জরুরি।
লেখা শেষ করে সে খাতাটা বন্ধ করল। ঠিক তখনই তার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।
অপরিচিত একটি নম্বর থেকে লেখা—
‘তোমার খাতার ব্যাপারটা নিয়ে বেশি চিন্তা কোরো না। সবকিছু যেমন দেখায়, আসলে সবকিছু তেমন নয়।’
মেহরিন বার্তাটি পড়ে থমকে গেল।
নম্বরটি তার পরিচিত নয়। কিন্তু যে মানুষটি বার্তা পাঠিয়েছে, সে তার খাতার ব্যাপারে জানে। তাহলে কি সেই মানুষটি খাতাটি দেখেছিল? নাকি পুরো ঘটনাটার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত?
সে বারবার বার্তাটি পড়ল। উত্তর দেওয়ার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত কিছু লিখল না।
ফোনটা পাশে রেখে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মনে হলো, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর সে এত দিন খুঁজছিল, হয়তো সেগুলোর উত্তর খুব কাছেই কোথাও আছে। কিন্তু কে তাকে বলবে? আর কেনই বা কেউ এত দিন বিষয়টা লুকিয়ে রেখেছে?
সে নতুন খাতাটা আবার খুলল। শেষ পাতায় লিখল—
‘কিছু প্রশ্নের উত্তর সময় দেয়, কিছু উত্তর মানুষ দেয়। আর কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা নিজের সম্পর্কে এমন অনেক কিছু জানতে পারি, যা আগে কখনো বুঝতে পারিনি।’
লেখাটা শেষ করে মেহরিন কলম বন্ধ করল।
সে জানত না আগামী দিনগুলোতে কী ঘটবে। তবে এবার সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো অজানা ঘটনার কারণে নিজের স্বপ্ন থেকে পিছিয়ে যাবে না।
কারণ তার জীবনে এখনো অনেক কিছু শেখার বাকি, অনেক পথ পাড়ি দেওয়ার বাকি।
আর সেই অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তাটি?
সেটি আপাতত তার মনে আরও একটি প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল।
কিন্তু মেহরিন জানত না, এই একটি বার্তাই খুব শিগগির তাকে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করাবে, যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
চলবে…