কিছু গল্পের সমাপ্তি সুন্দর
লেখিকা: জান্নাতুল ফেরদৌস
পর্ব – ০৮
পুরোনো তাকের আড়ালে
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই মেহরিনের মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। রাতে অপরিচিত নম্বর থেকে পাওয়া শেষ বার্তাটি বারবার মনে পড়ছিল তার।
‘সবকিছু জানতে চাইলে আগামীকাল লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের তাকের কাছে একবার খোঁজ করো।’
কথাটা খুব সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা মেহরিনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার হারিয়ে যাওয়া খাতার সঙ্গে লাইব্রেরির পুরোনো তাকের সম্পর্ক কী? সেখানে এমন কী আছে, যা জানার জন্য তাকে যেতে বলা হয়েছে?
সকালে নাশতার টেবিলে বসেও সে অন্যমনস্ক ছিল। মা কয়েকবার কথা বলার পরও যখন কোনো উত্তর পেলেন না, তখন জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে তোর? আজ এত চুপচাপ কেন?
মেহরিন একটু চমকে উঠে বলল,
— কিছু না মা। আজ মাদ্রাসায় একটু কাজ আছে, তাই ভাবছি।
— কী কাজ?
— লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিতে হবে।
মা আর কিছু বললেন না। শুধু মনে করিয়ে দিলেন যেন সময়মতো ফিরে আসে।
মাদ্রাসায় পৌঁছে মেহরিন প্রথমেই রাইসাকে খুঁজল। রাইসা তখন ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিল। মেহরিনকে দেখে সে এগিয়ে এল।
— কী ব্যাপার? আজ তোমাকে একটু চিন্তিত লাগছে।
মেহরিন চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— তোমাকে একটা কথা বলব। তবে আগে বলো, আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে?
— অবশ্যই। কিন্তু কী হয়েছে?
মেহরিন আগের রাতের বার্তাগুলোর কথা খুলে বলল। রাইসা মনোযোগ দিয়ে সব শুনল। তারপর বলল,
— তুমি কি নিশ্চিত, ওই নম্বরের মানুষটি সত্যি কিছু জানে?
— নিশ্চিত নই। কিন্তু বারবার আমার খাতার কথা বলছে। এবার লাইব্রেরির পুরোনো তাকের কাছে যেতে বলেছে।
রাইসা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— তাহলে আমরা লাইব্রেরিতে গিয়ে আপাকে জিজ্ঞেস করতে পারি। তবে কোনো অচেনা মানুষের কথায় একা কোথাও যেও না।
মেহরিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
প্রথম দুই ক্লাস শেষ হওয়ার পর তারা লাইব্রেরিতে গেল। লাইব্রেরিতে তখন খুব বেশি শিক্ষার্থী ছিল না। কয়েকজন পড়ার টেবিলে বসে বই পড়ছিল। দায়িত্বে থাকা আপা নিজের জায়গায় বসে কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন।
মেহরিন এগিয়ে গিয়ে বলল,
— আপা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— হ্যাঁ, বলো।
— পুরোনো বইয়ের তাকটা কি একটু দেখতে পারি?
আপা তাকিয়ে বললেন,
— কেন? কোনো বই খুঁজছ?
— জি আপা। একটা বইয়ের নাম জানি না, তবে তাকটা একটু দেখতে চাই।
আপা অনুমতি দিলেন।
মেহরিন ও রাইসা ধীরে ধীরে লাইব্রেরির পেছনের দিকে গেল। সেখানে পুরোনো কিছু বই সাজানো ছিল। কয়েকটি বইয়ের মলাট বিবর্ণ হয়ে গেছে, কিছু বইয়ের পাতা হলুদ হয়ে এসেছে। তাকের এক পাশে পুরোনো পত্রিকা ও হাতে লেখা কয়েকটি খাতা রাখা ছিল।
মেহরিন প্রতিটি জায়গা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।
হঠাৎ রাইসা নিচু হয়ে বলল,
— মেহরিন, এদিকে দেখো।
তাকের এক কোণে কয়েকটি পুরোনো খাতার নিচে একটা ছোট কাগজের টুকরো দেখা যাচ্ছিল। মেহরিন কাগজটি তুলে নিল।
সেখানে হাতে লেখা ছিল—
‘কিছু কথা নিজের কাছে রাখাই ভালো। সব সত্য সবার সামনে বলা যায় না।’
মেহরিন লেখাটি পড়ে চুপ করে গেল।
লেখার ধরনটা তার কাছে পরিচিত মনে হলো। কিন্তু কোথায় দেখেছে, সেটা মনে করতে পারল না।
রাইসা বলল,
— এটা কি তোমার সেই খাতার লেখার মতো?
মেহরিন কাগজটা আরেকবার দেখল।
— ঠিক বলতে পারছি না। তবে লেখাটা দেখে মনে হচ্ছে, কেউ ইচ্ছা করেই এখানে রেখে গেছে।
তারা আপার কাছে গিয়ে কাগজটি দেখাল।
আপা কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,
— এটা এখানে কীভাবে এল, আমি জানি না। পুরোনো খাতার সঙ্গে হয়তো ছিল। তোমরা এটা পেয়েছ কোথায়?
— ওই তাকের এক কোণে ছিল।
আপা কিছুক্ষণ কাগজটি দেখে বললেন,
— তোমরা চাইলে এটা আমার কাছে রেখে যেতে পারো। তবে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় হলে অনুমান করে কিছু বলা ঠিক হবে না।
মেহরিন কাগজটি আপার কাছে রেখে দিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো অজানা গল্পের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা খুঁজে পেয়েছে, কিন্তু পুরো গল্পটা এখনো অজানা।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রাইসা বলল,
— তোমার কী মনে হচ্ছে?
— মনে হচ্ছে, কেউ কিছু লুকাচ্ছে। কিন্তু কেন লুকাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি না।
— তোমার কি মনে হয়, এই কাগজটা তোমার খাতার সঙ্গে সম্পর্কিত?
— হতে পারে। তবে প্রমাণ ছাড়া কিছু বলতে চাই না।
সেদিনের মতো তারা আর বিষয়টি নিয়ে কথা বলল না।
ক্লাসে ফিরে মেহরিন নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চিন্তা বারবার সেই কাগজের দিকে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই শিক্ষিকা ক্লাসে এসে জানালেন, বিতর্ক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। সবাইকে নিজের প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
মেহরিনের নাম তালিকায় ছিল। সে এবার সত্যিই আনন্দ পেল। এত দিনের অনুশীলন বৃথা যায়নি।
শিক্ষিকা বললেন,
— তোমাদের মধ্যে যারা নির্বাচিত হয়েছ, তাদের প্রত্যেকের ওপর এখন একটা দায়িত্ব আছে। ভালো ফলাফল করার পাশাপাশি নিজেদের আচরণেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
মেহরিন মনে মনে ঠিক করল, এবার সে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
ক্লাস শেষে সুমাইয়া তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— মেহরিন, একটু কথা ছিল।
— বল।
— তুমি কি আজকাল লাইব্রেরিতে অনেক সময় কাটাও?
প্রশ্নটা শুনে মেহরিন একটু অবাক হলো।
— হ্যাঁ, বই খুঁজি। কেন?
— এমনিই জানতে চাইলাম।
মেহরিন কিছুক্ষণ সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
— তোর কি কিছু বলার আছে?
সুমাইয়া যেন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
— না, তেমন কিছু না।
তারপর সে চলে গেল।
মেহরিনের মনে হলো, সুমাইয়া যেন কোনো কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলতে পারেনি।
বাড়ি ফিরে মেহরিন প্রথমে পড়াশোনা শেষ করল। তারপর মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করল। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পও করল। কিন্তু দিনের ঘটনাগুলো তার মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
রাতে ফোন হাতে নিয়ে সে দেখল, অপরিচিত নম্বর থেকে নতুন কোনো বার্তা আসেনি।
সে নিজেই একটি বার্তা লিখল,
‘আজ লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা কাগজ পেয়েছি। আপনি কি জানেন, সেটি কে রেখেছে?’
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো উত্তর এল না।
মেহরিন ফোনটা পাশে রেখে পড়তে বসে গেল।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর ফোনে শব্দ হলো।
একটি নতুন বার্তা।
‘কাগজটি পেয়েছ জেনে ভালো লাগল। কিন্তু এখনো সময় হয়নি। তুমি শুধু নিজের কাজ করে যাও।’
মেহরিন বিরক্ত হয়ে গেল।
সে লিখল,
‘আপনি যদি সত্যিই আমাকে সাহায্য করতে চান, তাহলে নিজের পরিচয় দিন। এভাবে রহস্য করে কথা বলার কোনো মানে হয় না।’
বার্তাটি পাঠিয়ে সে আর অপেক্ষা করল না।
পরদিন মাদ্রাসায় গিয়ে সে প্রথমেই রাইসাকে ঘটনাটি জানাল।
রাইসা বলল,
— আমার মনে হয়, এবার বিষয়টা শিক্ষিকাকে জানানো উচিত।
— কিন্তু আমি তো জানি না, আসলে কী ঘটছে।
— সেই কারণেই তো জানানো উচিত। অচেনা কেউ তোমাকে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছে। এটা একা সামলানোর প্রয়োজন নেই।
মেহরিন বুঝতে পারল, রাইসা ঠিকই বলছে।
তারা দুজন শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করল। মেহরিন সবকিছু খুলে বলল—হারিয়ে যাওয়া খাতা, লাইব্রেরির কাগজ, অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তা—কিছুই বাদ দিল না।
শিক্ষিকা মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন।
— তুমি ভালো করেছ আমাকে জানিয়েছ। এখন থেকে কোনো অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এলে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দেবে না। বার্তাগুলো সংরক্ষণ করে রাখবে। প্রয়োজন হলে তোমার অভিভাবকের সঙ্গেও কথা বলব।
মেহরিন বলল,
— জি ম্যাডাম।
শিক্ষিকা আরও বললেন,
— আর একটা কথা মনে রাখবে, কারও আচরণ দেখে তাকে অপরাধী ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। সত্য জানার জন্য ধৈর্য দরকার।
মেহরিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেদিন বিকেলে মেহরিন বাড়ি ফেরার আগে লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা আপার কাছ থেকে জানতে পারল, তিনি পুরোনো কাগজটি শিক্ষিকার কাছে জমা দিয়েছেন। তবে কাগজটি কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি।
মেহরিন আর কিছু জানতে চাইল না।
বাড়ি ফিরে সে নিজের পড়ার টেবিলে বসে বিতর্কের বক্তব্য অনুশীলন করছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল, আগের খাতার কয়েকটি পাতায় সে নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি কিছু ছোট গল্পও লিখেছিল। সেগুলোর মধ্যে একটি গল্প ছিল একজন মেয়েকে নিয়ে, যে সবসময় অন্যদের সমস্যা সমাধান করতে চাইত, কিন্তু নিজের জীবনের সমস্যাগুলো কাউকে বলতে পারত না।
মেহরিন ভাবল, গল্পটি আবার লিখবে।
সে নতুন খাতা খুলে লেখা শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই এসে বলল,
— আপু, তুমি আবার গল্প লিখছ?
— হ্যাঁ।
— তোমার গল্পে কি আমি থাকব?
মেহরিন হেসে বলল,
— তুমি থাকলে তো গল্পটা আরও মজার হবে।
ছোট ভাই খুশি হয়ে চলে গেল।
রাতে বাবা বাসায় ফিরে মেহরিনকে পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
— আজ মাদ্রাসায় দিন কেমন গেল?
মেহরিন এবার কিছু না লুকিয়ে অচেনা নম্বরের ব্যাপারটি আবার বলল। বাবা মন দিয়ে শুনলেন।
— তুমি শিক্ষিকাকে জানিয়েছ?
— জি বাবা।
— ভালো করেছ। তবে কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে যাবে না, আর তার কথায় কোথাও একা যাবে না। কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাবে।
— ঠিক আছে বাবা।
বাবা বললেন,
— জীবনে অনেক মানুষ পাওয়া যাবে। সবাইকে সন্দেহ করাও ঠিক নয়, আবার সবাইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও ঠিক নয়। মানুষকে চিনতে সময় লাগে।
মেহরিন বাবার কথাগুলো মনে মনে ভাবল।
রাত গভীর হলে সে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনে আবার বার্তা এল।
এবার বার্তাটি আগের চেয়ে ছোট।
‘তুমি যাকে খুঁজছ, সে তোমার খুব কাছেই আছে।’
মেহরিন বার্তাটি পড়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
তারপর আরেকটি বার্তা এল—
‘কিন্তু তাকে খুঁজতে গিয়ে ভুল মানুষকে কষ্ট দিও না।’
মেহরিনের মাথায় একের পর এক নাম ঘুরতে লাগল। সুমাইয়া? রাইসা? খাদিজা? নাকি অন্য কেউ?
সে এবার কোনো উত্তর দিল না।
ফোনটা টেবিলে রেখে নিজের খাতার দিকে তাকাল। এত দিন সে ভাবত, তার হারিয়ে যাওয়া খাতার রহস্য হয়তো খুব সাধারণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এর পেছনে এমন কিছু আছে, যা সে এখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
পরদিন কী হবে, সে জানে না।
তবে একটা সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে—কাউকে অকারণে সন্দেহ করবে না, আবার নিজের অস্বস্তিকেও অবহেলা করবে না।
কারণ সত্য জানার আগ্রহ যতই থাকুক, সত্যের পথে এগোতে হলে ধৈর্য আর বুদ্ধি দুটোই প্রয়োজন।
সেদিন ঘুমানোর আগে সে নিজের খাতায় লিখল—
‘কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে পরিচিত হয়ে, কিন্তু তাদের সম্পর্কে সবকিছু জানতে অনেক সময় লেগে যায়। আবার কখনো কাছের মানুষদের মাঝেও এমন কিছু গল্প লুকিয়ে থাকে, যার শুরু আমরা জানি না, শেষও জানি না।’
মেহরিন কলম বন্ধ করল।
তার অজান্তেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ের দরজা খুলে যাচ্ছিল। আর সেই দরজার ওপারে অপেক্ষা করছিল এমন এক সত্য, যা শুধু তার খাতার রহস্যই নয়, কয়েকজন মানুষের সম্পর্কও বদলে দিতে পারে।
চলবে…