ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব 2

লেখক: Jannatul Naima

অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব ২: গোপন ফাইল ও প্রথম সন্দেহ

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

__

শাহরিয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চব্বিশ তলায় প্রথম দিন পা রাখার পর থেকেই পরিবেশটা ইনশিরাহের জন্য এক অনবরত মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মতো মনে হচ্ছিল।

ধূসর ইতালিয়ান মার্বেলে বাঁধানো মেঝের ওপর পা রাখতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল এক যান্ত্রিক ও চরম পেশাদার কর্পোরেট জগৎ। চারপাশের ডাবল-গ্লেজড সাউন্ডপ্রুফ গ্লাসের আড়ালে নীল-কালো ব্র্যান্ডেড স্যুটে সজ্জিত এক্সিকিউটিভরা যার যার ডেস্কে ব্যস্ত।

টেলিফোনের রিং, আধুনিক মনিটরের মৃদু গুঞ্জন আর যান্ত্রিক কিবোর্ডের খটখট শব্দে গমগম করছে পুরো সিইও উইং। কিন্তু এই চকচকে কৃত্রিম পরিবেশের মাঝেও ইনশিরাহের মাথায় কেবল একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—ফারহান শাহরিয়ারের ব্যক্তিগত ফাইল সার্ভার আর তার এক্সিকিউটিভ ডেস্কে রাখা এনক্রিপ্টেড ইলেকট্রনিক নথিপত্র।

সকাল ঠিক আটটা পঞ্চান্ন মিনিটে ফারহানের কাঁচঘেরা প্রাইভেট অফিসের বাইরে নিজের সুসজ্জিত ডেস্কে এসে দাঁড়াল ইনশিরাহ।

ঠিক নয়টা বাজতে পাঁচ সেকেন্ড বাকি থাকতে প্যাসেজের শেষ প্রান্তে প্রাইভেট লিফটের ব্রোঞ্জ রঙের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ফারহান শাহরিয়ার। পরনে নেভি ব্লু থ্রি-পিস কাস্টম স্যুট, এক হাতে ডার্ক চকলেট শেডের ইতালিয়ান লেদারের ব্রিফকেস, অন্য হাতে আইফোন।

সে করিডোর দিয়ে হেঁটে আসার সাথে সাথেই যেন চারপাশের বাতাসে এক ধরনের থমথমে গাম্ভীর্য ছড়িয়ে পড়ল।

"গুড মর্নিং, স্যার," নিজের গলার স্বর সম্পূর্ণ নিস্পৃহ ও পেশাদার রেখে অভ্যর্থনা জানাল ইনশিরাহ।

ফারহান না থমকে একঝলক ওর দিকে তাকাল। তার বাঁ কব্জির বিলাসবহুল ঘড়ির দিকে সময়টা একবার পরখ করে নিয়ে সামান্য মাথা নেড়ে বলল,

"গুড মর্নিং, মিস তুবা। টাইমিং পারফেক্ট। আমার কফি ব্ল্যাক, নো সুগার। উইথিন ফাইভ মিনিটস।"

কথাটা বলেই ফারহান নিজের বিশাল কাঁচঘেরা ঘরে ঢুকে গেল।

ইনশিরাহ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ডেস্কে লেদার ব্যাগটা রাখল। চক্রান্তের এই মহাখেলায় প্রথম দিনেই কোনো ভুল করা যাবে না।

প্যান্ট্রি থেকে ধোঁয়া ওঠা তাজা ব্ল্যাক কফির মগ নিয়ে সে ফারহানের ঘরের দরজায় দুবার মৃদু টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

ফারহান তখন ল্যাপটপের অ্যালুমিনিয়াম স্ক্রিনে চোখ রেখে কার্সার ঘোরাচ্ছিল। টেবিলের ডান পাশে নির্দিষ্ট স্থানে কফির কাপটি আলতো করে রাখার সময় ইনশিরাহের তীক্ষ্ণ চোখ হঠাৎ আটকে গেল ফারহানের ল্যাপটপের ঠিক পাশে রাখা একটা ব্ল্যাক মেটালিক বায়োমেট্রিক এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভের ওপর।

এই সেই সিকিউর ড্রাইভ, যেটিতে ফারহানের ব্যক্তিগত ও কোম্পানির অত্যন্ত সংবেদনশীল ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ থাকে—গতকাল এইচআর ডিরেক্টরের মাধ্যমে কথার মাঝে কথাটা জানতে পেরেছিল সে।

"আপনার আজকের কাজের তালিকা," ইনশিরাহ নিজের ডিজিটাল ট্যাবের স্ক্রিনে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, "সকাল দশটায় ফিন্যান্স কমিটির সাথে বোর্ড মিটিং, দুপুর বারোটায় সিঙ্গাপুরের ইনভেস্টরদের সাথে জুম ভিডিও কনফারেন্স, আর বিকেল তিনটায় লিগ্যাল টিমের সাথে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ফাইল রি-চেক।"

ফারহান কফির মগে একটা ছোট চুমুক দিয়ে চোখ তুলে সরাসরি ওর দিকে তাকাল। "লিগ্যাল টিমের মিটিংয়ের ফাইলগুলো কি প্রপারলি রেডি?"

"সব গুছিয়ে প্রি-প্রিন্ট করে এবং ট্যাবে এনক্রিপ্ট করে রাখা আছে, স্যার," ইনশিরাহ ইতস্তত না করে স্পষ্ট উত্তর দিল।

"গুড," ফারহান আবার স্ক্রিনে মন দিল।

"আজ বিকেলে অডিট ফাইলগুলো রি-চেক করার সময় আপনি আমার সাথেই থাকবেন। তিন বছর আগের কিছু অমীমাংসিত ফিন্যান্সিয়াল কেসের পুরোনো পেপারওয়ার্ক আছে, যেগুলোআমাকে আজকেই পার্সোনালি রিভিউ করে ক্লোজ করতে হবে।"

'তিন বছর আগে'—এই শব্দ দুটো শোনামাত্র ইনশিরাহের বুকের ভেতর যেন তীব্র একটা তরঙ্গ আছড়ে পড়ল। হাতের ট্যাবে ধরে রাখা আঙুলগুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য জমে বরফ হয়ে গেল। তবে চোখের পলক না ফেলে অসামান্য আত্মনিয়ন্ত্রণে নিজেকে সামলে নিল সে।

তিন বছর আগের সেই অমীমাংসিত কেস মানেই তো ওর বাবা নাবিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে তৈরি করা সেই সাজানো মিথ্যা চক্রান্তের মূল ফাইল!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই শুরু হলো বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই সিক্রেট অডিট সেশন।

ফারহানের বিশালাকার ডেনিশ এক্সিকিউটিভ ডেস্কে ছড়ানো রয়েছে একের পর এক ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট আর ইন্টারনাল মেমো।

ইনশিরাহ ফারহানের টেবিলের ঠিক পাশে রাখা ভিজিটর চেয়ারে বসে ফাইলগুলোর সংক্ষিপ্ত সামারি নোট তৈরি করছিল। এত কাছ থেকে ফারহানের কর্মপদ্ধতি আর তার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করার সুযোগ ইনশিরাহ এই প্রথম পেল।

ফারহান মানুষ হিসেবে ভীষণ কঠোর, নির্দ্বিধায় আদেশ প্রদানকারী, কিন্তু অডিটের হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নিখুঁত ও নীতিবান। কোনো ফাইলের পাতায় সামান্যতম গরমিল বা এক টাকার অসঙ্গতি দেখলেই সে মেজাজ হারাচ্ছে না, বরং বরফশীতল শান্ত মাথায় তার পেছনের মূল উৎসটা খুঁজে বের করছে।

ইনশিরাহের মনের গভীর তলদেশে প্রথম একটা সূক্ষ্ম ও অস্বস্তিকর দ্বন্দ্ব জেগে উঠল—যে মানুষটা অন্যায়ের হিসাব এত সূক্ষ্মভাবে ধরে, সে কীভাবে তিন বছর আগে ওর বাবার মতো একজন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান মানুষকে ফাঁসাতে পারে? নাকি সত্যি ফারহান এর মূল নেপথ্যে ছিল না? কিন্তু বাবার বিরুদ্ধে তো সমস্ত আদেশে স্বাক্ষর ছিল এই ফারহান শাহরিয়ারেরই!

"মিস তুবা, আপনি কি অন্য কিছু ভাবছেন?"

ফারহানের গভীর, রাশভারী শান্ত কণ্ঠস্বরে ইনশিরাহের ভেতরের চিন্তাগুলো কাচের মতো চুরমার হয়ে গেল।

সে চমকে মুখ তুলে তাকাল। ফারহান তার হাত থেকে কলমটা নামিয়ে রেখে সরাসরি ইনশিরাহের চোখের দিকে চেয়ে আছে। ফারহানের চোখের সেই পরিচিত গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—যা যেন তুবা আমীনের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল ইনশিরাহকেও এক মুহূর্তে চিনে ফেলতে চায়।

"না... আই মিন, দুঃখিত স্যার," ইনশিরাহ নিজের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল, "আমি আসলে ফাইলগুলোর জটিলতা দেখছিলাম। তিন বছর আগের এই অডিট রিপোর্টে কিছু অস্বাভাবিক ফান্ড ট্রান্সফারের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে।"

ফারহান একটু পেছনের ডেনিশ লেদার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ওর সুগঠিত চিবুক আর কপালের খাঁজে এক ধরনের ক্লান্ত কিন্তু চরম চিন্তাশীল ভাব ফুটে উঠল।

"তিন বছর আগের ওই ঘটনাটা শাহরিয়ার গ্রুপের ইতিহাসে এক বিশাল কালো দাগ, মিস তুবা," ফারহান এক দৃষ্টিতে জানালার ওপাশের ধূসর মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল। "

আমাদের তৎকালীন চিফ একাউন্টেন্ট নাবিল চৌধুরী বিশাল অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে অন্য অ্যাকাউন্টে সরাতে শুরু করেছিলেন। কেসটা খুব দ্রুত বন্ধ করে দিতে হয়েছিল কারণ উনি পুলিশ কাস্টডিতে যাওয়ার আগেই হঠাৎ মারা যান।"

ইনশিরাহের হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেবিলের নিচে শক্ত হয়ে মুঠো হয়ে এলো। সুতীক্ষ্ণ নখগুলো গিয়ে সোজা বিঁধল হাতের তালুতে। নিজের জন্মদাতা বাবাকে লোকজনের মুখে 'চোর' আর 'অপরাধী' বলে আখ্যা দিতে শোনাটা সহ্য করা ওর জন্য প্রায় অসম্ভব এক শারীরিক যন্ত্রণায় পরিণত হচ্ছিল।

"আপনি কি বিশ্বাস করেন... উনি সত্যিই একাই এই অপরাধটা করেছিলেন?" ইনশিরাহ সমস্ত মানসিক জোর এক জায়গায় এনে, অত্যন্ত ধীর গলায় প্রশ্নটা করে ফেলল।

ফারহান কয়েক সেকেন্ড নিথর হয়ে ইনশিরাহের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে উঠল।

তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা ও গম্ভীর গলায় ফারহান উত্তর দিল, "আইনের চোখে শুধু শক্ত দলিল আর লিখিত প্রমাণ কথা বলে, মিস তুবা। তবে... ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, কর্পোরেট জগতের কিছু রহস্যের জট কখনোই সামনে আসে না। কিছু সত্যি ফাইল আর রিপোর্টের ধুলোর নিচে চিরকালের জন্য চাপা পড়ে থেকে যায়।"

ফারহানের মুখে এমন একটি উত্তর শুনে ইনশিরাহ বুকের ভেতর এক অজানা আলোড়ন অনুভব করল। ফারহান কি তবে অন্তরালে জানে যে এই ঘটনার পেছনে আসল অপরাধী অন্য কেউ ছিল?

সন্ধ্যা সাতটা বাজতেই পুরো চব্বিশ তলা ফ্লোরটা এক ভৌতিক নীরবতায় ডুবে গেল। অন্য কর্মীরা কাজ শেষ করে যার যার মতো চলে গেছে।

ফারহান জরুরি এক মিটিংয়ের জন্য নিচের ব্লেজার উইংয়ের লিগ্যাল টিমের কনফারেন্স রুমে গেছে। যাওয়ার আগে ইনশিরাহকে নির্দেশ দিয়ে গেছে ডেস্কে ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো যেন এনক্রিপ্টেড ওয়ালেটে লক করে গুছিয়ে রেখে সে বাড়ি যায়।

ইনশিরাহ খুব ভালো করেই জানে, এমন সুযোগ হয়তো আগামী কয়েক মাসেও আর কখনো আসবে না।

ধীর ও সতর্ক পায়ে সে ফারহানের ফাঁকা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঘরের ড্রপ-লাইটের হালকা আলোতে ফ্রস্টেড গ্লাসের মার্বেল টেবিলটা চকচক করছে।

ইনশিরাহের হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল, কিন্তু মাথার ভেতর বাবার সেই শেষ আকুতিটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—*"আমাকে ফাঁসানো হয়েছে, মা... শাহরিয়ার গ্রুপের ভেতরেই অপরাধী লুকিয়ে আছে।"*

সে নিঃশব্দে টেবিলের পাশে গিয়ে ডেস্কে রাখা নির্দিষ্ট ডেক্স ড্রয়ারের লক কোড প্রেস করল। ফারহান যখন পাসওয়ার্ড চাপছিল, ইনশিরাহ গোপনে তার আঙুলের মুভমেন্ট দেখে কোডটা মনে রেখেছিল। ড্রয়ারটা সামান্য শব্দ করে খুলে গেল।

তড়িঘড়ি করে তিন বছর আগের 'নাবিল চৌধুরী কেস'-এর মূল ফাইলটা হাতড়াতে শুরু করল সে। ঠিক তখনই ড্রয়ারের একদম শেষ প্রান্তে একটি মেটালিক সিক্রেট কম্পার্টমেন্টে কালো এনক্রিপ্টেড ডায়েরি আর একটা মেমোরি কার্ড দেখতে পেল সে, যার ওপর লাল কালিতে খোদাই করে লেখা—'কনফিডেনশিয়াল: এন. সি. ফাইল।'

ইনশিরাহ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। হ্যান্ডব্যাগ থেকে তার গোপন মিনি স্ক্যানিং ক্যামেরাটি বের করে ফাইলের পৃষ্ঠাগুলোর দ্রুত ছবি তুলতে লাগল। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের আওয়াজ যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে!

অফিসের বাইরের ভারী দরজায় অটোমেটিক ডিজিটাল এক্সেস কার্ডের বিওপ শব্দ হলো!

লক খোলার সেই পরিচিত মেটালিক আওয়াজ শুনে ইনশিরাহের হাতের রগগুলো নীল হয়ে গেল, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে বরফ হয়ে গেল।

ফারহান শাহরিয়ার ফিরে এসেছে!

ইনশিরাহ এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে স্ক্যানারটা ব্যাগে পুরে, ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিয়ে ফাইলগুলো দ্রুত টেবিলে সোজা করে রেখে কাঠের স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।

দরজার ভারী হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল ফারহান।

স্বচ্ছ ফ্রস্টেড গ্লাসের আবছা আলো-ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইনশিরাহ আর দরজার মুখে দাঁড়ানো সুউচ্চ ফারহানের চোখাচোখি হলো। ফারহানের চোখের তারায় সাথে সাথে এক বরফশীতল সন্দেহের ছায়া নেমে এলো। তার সুগঠিত মুখাবয়বে ফুটে উঠল চরম কঠোরতা।

"আপনি এখনো আমার রুমে কী করছেন, মিস তুবা?"

ফারহানের থমথমে ও নিম্নগামী গলার আওয়াজ পুরো নীরব ঘরে এক বিদগ্ধ ও বিপজ্জনক থ্রিল ছড়িয়ে দিল।

ইনশিরাহের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে কেঁপে উঠলেও সে মুখে কোনো ভয়ের ছাপ ফুটতে দিল না। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার ছদ্মবেশ, তার এতদিনের পরিকল্পনা আর বাবার নাম কলঙ্কমুক্ত করার লড়াই—সব কিছু কি তবে এই এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাবে?

সে গভীরভাবে একটা শ্বাস নিল। মাথাটা সামান্য উঁচু করে ফারহানের দিকে তাকাল। ওর ব্রেন তখন কাজ করছিল অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে। ফারহান এক পা এক পা করে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে চেপে রাখা এক অদ্ভুত মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছিল ঘরের ভেতরে।

"আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি, তুবা আমীন,"

ফারহান এখন ইনশিরাহের মাত্র দু-এক ফুট দূরত্বে এসে দাঁড়াল। তার গা থেকে আসা দামী উড অ্যান্ড আম্বার পারফিউমের তীব্র সুবাস ইনশিরাহের ইন্দ্রিয়গুলোকে আরও সচেতন করে তুলল।

ফারহানের চোখ দুটো সোজা আটকে ছিল ডেস্কে রাখা ফাইল আর ইনশিরাহের কাপা হাতে ধরে রাখা ট্যাবের ওপর।

"উত্তর দিন।

কোনো এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ নয় সিইওর অনুপস্থিতিতে তার প্রাইভেট ড্রয়ার আর সিক্রেট ফাইলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।" ফারহানের কণ্ঠস্বর এখন যতটা না রাগান্বিত, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক ও বিচারপ্রার্থী।

ইনশিরাহ তার চোখের দৃষ্টি স্থির রেখে অত্যন্ত নিচু কিন্তু পরিষ্কার গলায় বলল, "আমি আপনার ড্রয়ার চুরি করতে আসিনি, স্যার।"

"তাহলে কী করছিলেন এখানে?" ফারহান টেবিলের ওপর এক হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়াল, যাতে ইনশিরাহের প্রতিটি সূক্ষ্ম মুখের অভিব্যক্তি সে সরাসরি ধরতে পারে।

"আমি আপনার সেই তিন বছর আগের কেস ফাইলটাই আবার চেক করছিলাম," ইনশিরাহ বানিয়ে বানিয়ে একটি মোক্ষম চাল চালল। সে জানে, এই মুহূর্তে একদম সাধারণ অজুহাত দিলে ফারহান তাকে এক সেকেন্ডেও বিশ্বাস করবে না। তাকে এমন কিছু বলতে হবে যা ফারহানের নিজস্ব চিন্তার সাথেই মিলে যায়।

ফারহানের চোখ দুটো সামান্য সংকুচিত হলো। "অডিট ফাইল দেখা আপনার কাজ নয়। আপনি নিজের সীমা অতিক্রম করছেন।"

"হয়তো করছি, স্যার," ইনশিরাহ সাহস সঞ্চার করে বলল। "কিন্তু আজ দুপুরে আপনি নিজে আমাকে বলেছিলেন যে কিছু সত্য ফাইলের ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে। আমি শুধু দেখছিলাম, আপনি লিগ্যাল টিমের কাছে যাওয়ার আগে যে অডিট ফাইলগুলো আমাকে চেক করতে বলেছিলেন, তার মধ্যে ওই তৎকালীন চিফ একাউন্টেন্টের সাইন করা কোনো ডকুমেন্টে ম্যানুয়াল কোনো জালিয়াতি ছিল কি না। কারণ আপনার অডিট রিপোর্টের ১৪ নম্বর পেজে একটা সইয়ের স্টাইল বাকি পেজগুলোর সাথে মিলছিল না।"

ইনশিরাহের এই নিখুঁত তথ্য আর সাহসী জবাবে ফারহান এক মুহূর্তের জন্য যেন কিছুটা থমকে গেল। সে আশা করেনি যে তুবা নামের এই নতুন মেয়েটি এত দ্রুত আর এত গভীর দৃষ্টিতে কোম্পানির ফাইল পর্যবেক্ষণ করেছে।

ফারহান টেবিলে রাখা ফাইলটির দিকে তাকাল, তারপর আবার ইনশিরাহের চোখের দিকে। ঘরের ভেতর দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের ভারী নীরবতা নেমে এলো।

"আপনি বড্ড বেশি কৌতূহলী, মিস তুবা," ফারহান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল। "আর কর্পোরেট জগতে অতিরিক্ত কৌতূহল কিন্তু ক্যারিয়ারের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।"

"কৌতূহল না থাকলে সঠিক কাজটা নিখুঁতভাবে করা যায় না, স্যার," ইনশিরাহ বিনয়ের সাথে কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল।

ফারহান কয়েক মুহূর্ত ইনশিরাহের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর টেবিল থেকে ফাইলটা তুলে নিল। তারপর নিজের ড্রয়ারের দিকে না গিয়ে ফাইলটা বন্ধ করে ইনশিরাহের হাতে বাড়িয়ে দিল।

"আজকের মতো কাজ শেষ। আপনার ব্যাগ গুছিয়ে আপনি বাড়ি যেতে পারেন," ফারহান ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের ল্যাপটপের দিকে পা বাড়াল। "

তবে মনে রাখবেন... আমার সীমানার ভেতর দ্বিতীয়বার যেন আপনাকে কখনো কোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে না দেখতে পাই। এর পরের বার কিন্তু আমি কোনো ব্যাখ্যা শুনব না।"

ইনশিরাহ ফাইলটা নিয়ে মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বলল, "ধন্যবাদ, স্যার। শুভরাত্রি।"

সে ধীর পায়ে ফারহানের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। চব্বিশ তলার বিশাল করিডোর দিয়ে হেঁটে লিফটের দিকে যাওয়ার সময় ইনশিরাহের হাঁটু দুটো তখনও থকথক করে কাঁপছিল। পিঠের দিকটা ঘেমে ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে জানে, আজ সে একটুর জন্য বেঁচে গেছে। ফারহানের মতো অত্যন্ত চতুর আর তীক্ষ্ণ মানুষকে এভাবে সামাল দেওয়া কোনো সাধারণ খেলা নয়।

লিফটের ভেতরে ঢুকে সে আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে এখন এক অদ্ভুত বিজয়ের ঝিলিক, আর ব্যাগের ভেতরে রয়েছে বাবার রহস্যের সবচেয়ে বড় ক্লু—সেই এনক্রিপ্টেড ড্রাইভারের স্ক্যান করা ছবি!

ইনশিরাহ হাতের ড্রাইভ আর নিজের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে ফারহান শাহরিয়ারের মনের ভেতর সন্দেহের বীজ পুতে দিয়ে এসেছে। এবার শুরু হবে ছায়াবৃত্তের আসল সমীকরণ উন্মোচনের লড়াই!

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন