অদৃশ্য আলোড়ন
পর্ব ৪: গাজীপুর সাইট ও বিষাক্ত বার্তা
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
___
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা প্রায় বারোটা বেজে গেল। হাইওয়ের বৃষ্টি থেমে গেলেও সেখানকার বাতাসে তখনও এক ধরনের সিক্ত, ভারি গন্ধ জড়িয়ে রয়েছে।
শাহরিয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের নতুন হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং প্রজেক্টের বিশালাকার চারদেওয়ালের সামনে ফারহানের কালো মার্সিডিজ গাড়িটি এসে থামল।
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই ইনশিরাহ খুব দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। একটু আগের সেই নিভৃত মুহূর্ত, ফারহানের হাতের ছোঁয়া আর সেই অপ্রস্তুত করে দেওয়া প্রশ্নগুলোর রেশ তখনও ওর মনের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে ওকে সম্পূর্ণ পেশাদার তুবায় রূপান্তর হতে হবে।
"আমরা এসে পড়েছি, মিস তুবা," ফারহান সিটবেল্ট আনলক করতে করতে বলল। তার কণ্ঠস্বরে আগের সেই ক্ষণিক দুর্বলতার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। আবার ফিরে এসেছে সেই বরফশীতল, কঠোর সিইওর মেজাজ।
"ইয়েস, স্যার। আইটি টিমের সাইট প্রোগ্রেস রিপোর্ট আর আর্কিটেকচারাল ব্লুপ্রিন্ট আমার ট্যাবে রেডি আছে," ইনশিরাহ তৎক্ষণাৎ নিজের ব্যাগ থেকে ট্যাবটি হাতে নিয়ে উত্তর দিল।
তারা গাড়ি থেকে নেমে সাইটের ভেতরে প্রবেশ করল। চারপাশে নির্মাণকাজের বিশাল যজ্ঞ চলছে। উঁচুতে ক্রেন ঝুলছে, শ্রমিকদের ব্যস্ততা এবং সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের কোলাহলে পুরো পরিবেশ মুখরিত। ইনশিরাহ ফারহানের ঠিক এক ধাপ পেছনে থেকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং ট্যাবে নোট করছিল।
প্রজেক্টের হেড ইঞ্জিনিয়ার ও লোকাল ডিরেক্টররা ফারহানকে ঘিরে ধরে বিভিন্ন নকশা ও বাজেট নিয়ে কথা বলছিলেন। ইনশিরাহ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল ফারহানকে। কাজের ক্ষেত্রে লোকটার মনোযোগ অবিশ্বাস্য রকমের তীক্ষ্ণ।
সামান্যতম খামখেয়ালি বা ভুল হিসাব সে বরদাস্ত করছে না। যেসব জায়গায় ঠিকাদাররা কাজের অগ্রগতি বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করছিল, ফারহান এক নজর দেখেই সেখানে সূক্ষ্ম ভুলগুলো ধরে ফেলছিল।
এমন একজন অতি-সচেতন ও নিখুঁত মানুষ ৩ বছর আগে নিজের চিফ একাউন্টেন্টের এত বড় জালিয়াতি চোখে দেখতে পায়নি—এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না ইনশিরাহের কাছে।
নিশ্চয়ই এই প্রজেক্টের পেছনে, বা শাহরিয়ার গ্রুপের বোর্ডে এমন কেউ আছে যাকে ফারহান অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল, অথবা কেউ খুব সুচতুরভাবে ফারহানকেও অন্ধকারে রেখেছিল।
"মিস তুবা, সেকশন বি-র পরিবেশ ছাড়পত্র সম্পর্কিত ফাইলটা আমাকে দিন," ফারহানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ইনশিরাহের চিন্তায় ছেদ ফেলল।
"ইয়েস স্যার, হার্ডকপিটা ফাইল ফোল্ডারে আছে," ইনশিরাহ হাতের ফাইল ফোল্ডারটি খুলে কাগজগুলো গুছিয়ে ফারহানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
কাগজ নেওয়ার সময় ফারহানের ব্যান্ড-এইড লাগানো ডান হাতের তালুটা ইনশিরাহের নজর কাড়ল। ফাইলটা নেওয়ার সময় দুজনের আঙুল আবার এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল।
ইনশিরাহ পলকে চোখ নিচু করে নিল, আর ফারহান কাগজটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে এক নজর ওর দিকে তাকিয়ে ফাইলটি চেক করতে লাগল।
বিকেল চারটের দিকে সাইট ভিজিট শেষ হলো। তবে সাইট অফিস থেকে বের হওয়ার সময় লোকাল ডিরেক্টরদের একজন, রশীদ শাহরিয়ার—যে সম্পর্কে ফারহানের আপন কাকা ও শাহরিয়ার গ্রুপের একজন প্রভাবশালী বোর্ড ডিরেক্টর—হঠাৎ সাইটে এসে উপস্থিত হলেন।
রশীদ শাহরিয়ারের চেহারার মধ্যে এক ধরনের চতুর ও তীক্ষ্ণ হিংস্রতা লুকিয়ে আছে, যা তিনি সবসময় এক কৃত্রিম হাসির আড়ালে ঢেকে রাখেন। লোকটাকে দেখেই ইনশিরাহের ভেতরের সবকটি সতর্কঘণ্টা একসাথে বেজে উঠল।
বাবার পুরোনো ফাইলগুলোর এক কোণে এই রশীদ শাহরিয়ারের সাইন করা কিছু অফ-শোর শ্যাডো অ্যাকাউন্টের উল্লেখ পেয়েছিল সে!
"আরে ফারহান! তুই নিজেই সাইটে চলে এসেছিস? আমাকে একটা ফোন করলেই তো পারতি," রশীদ শাহরিয়ার হেসে ফারহানের কাঁধে হাত রাখলেন।
ফারহান মৃদু হেসে কিন্তু এক ধরনের দূরত্বের সাথে জবাব দিল, "আঙ্কেল, সারপ্রাইজ ভিজিট না দিলে ভেতরের সঠিক চিত্রটা পাওয়া যায় না। তাছাড়া প্রজেক্টের লিগ্যাল ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল, যা আমি নিজে না দেখলে ক্লোজ হচ্ছিল না।"
রশীদ শাহরিয়ারের হাসির আড়ালে যেন এক মুহূর্তের জন্য বিরক্তির ছায়া ভেসে উঠল। ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে পড়ল ফারহানের পাশে দাঁড়ানো ইনশিরাহের ওপর। তিনি খুব সূক্ষ্ম ও অস্বস্তিকরভাবে ইনশিরাহকে উপর থেকে নিচে পর্যবেক্ষণ করলেন।
"তোমার এই নতুন পিএ-কে তো আগে দেখিনি। খুব কম বয়সি মনে হচ্ছে। কাজ ঠিকঠাক সামলাতে পারছে তো?" রশীদ শাহরিয়ারের প্রশ্নটা সাধারণ হলেও তার গলার টোন ইনশিরাহের মোটেও পছন্দ হলো না।
"মিস তুবা যথেষ্ট দক্ষ ও সতর্ক, আঙ্কেল," ফারহান এক বাক্যে কথাটি শেষ করে দিল। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের ঢাকায় ফিরতে হবে। আজ সন্ধ্যায় বোর্ড মিটিংয়ের কিছু প্রস্তুতি বাকি।"
রশীদ শাহরিয়ার হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালেন, কিন্তু ফারহান ও ইনশিরাহ যখন গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, ইনশিরাহ পেছনে তাকাতেই দেখল রশীদ শাহরিয়ার তখনও এক অদ্ভুত, সন্দেহজনক দৃষ্টি নিয়ে ওদের দিকে চেয়ে আছেন।
ঢাকায় ফেরার পথে বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল। হাইওয়েতে ট্রাফিকের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। গাড়ির ভেতরে এসি চললেও ইনশিরাহের ভেতরের অস্থিরতা আবার বাড়তে শুরু করল।
রশীদ শাহরিয়ারের সেই চাহনি ওর মনে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাবার কেস ফাইলের যে ডিজিটাল স্ক্যান কাল রাতে সে পেয়েছে, সেখানে কিছু এনক্রিপ্টেড পেমেন্ট স্লিপ ছিল। সেই স্লিপগুলোর কোডনেম ছিল 'R.S.'!
তাহলে কি R.S. মানেই রশীদ শাহরিয়ার? ফারহান কি তবে সত্যিটা জানে না, নাকি জেনেও নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য ওর বাবাকে বলির পাঠা বানিয়েছিল?
হঠাৎ ইনশিরাহের হ্যান্ডব্যাগের ভেতরে রাখা পার্সোনাল গোপন ফোনটিতে মেসেজের একটা নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। গাড়ি নীরব থাকায় হালকা শব্দটাও ফারহানের কান এড়াল না।
ফারহান সাইড মিরর দিয়ে ইনশিরাহের দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল, "জরুরি কোনো কল বা মেসেজ?"
"না স্যার, সাধারণ মার্কেটিং মেসেজ," ইনশিরাহ খুব স্বাভাবিক গলায় মিথ্যাটা বলল।
সে সাবধানে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করতেই ওর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মেসেজটি কোনো চেনা নম্বর থেকে আসেনি, এসেছে একটি এনক্রিপ্টেড অনলাইন ভিওআইপি নম্বর থেকে।
মেসেজে লেখা:
> *"তুবা আমীন ওরফে ইনশিরাহ চৌধুরী... আগুনে হাত দেওয়া বন্ধ করো। তুমি যে ফাইলে হাত দিয়েছ, তা তোমাকে আর তোমার মৃত বাবার নামকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে। শাহরিয়ার গ্রুপের চব্বিশ তলা থেকে দ্রুত সরে দাঁড়াও, নয়তো পরবর্তী পরিণতি তোমার কল্পনার বাইরে হবে।"*
>
ইনশিরাহের হাতের তালু ঘামতে শুরু করল। শরীরজুড়ে আছড়ে পড়ল এক মারাত্মক আতঙ্কের ঢেউ।
কে পাঠাল এই মেসেজ? কীভাবে জানল ওর আসল নাম? কোম্পানির ভেতরে কেউ কি তবে জেনে গেছে সে আসলে কে? নাকি কাল রাতে ফারহানের রুমে ড্রয়ার খোলার বিষয়টি কেউ সিকিউরিটি সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখে ফেলেছে?
ইনশিরাহের শ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কপালে জমতে থাকা সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো ফারহানের চোখ এড়াতে পারল না।
"কী হয়েছে, মিস তুবা?" ফারহান হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে রাস্তার এক পাশে ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে দিল। "ইউ লুক ফ্যাকাশে। এনিথিং রং?"
ইনশিরাহ এক সেকেন্ডের মধ্যে ফোনটা আবার ব্যাগে পুরে দিয়ে শক্ত হয়ে বসল। "ন-না স্যার... কিছু না। সামান্য মাথা ব্যথা করছে।"
ফারহান গাড়িটা রাস্তার এক পাশে পার্ক করল। সে গাড়ি স্টপ মোডে রেখে পুরো শরীর ঘুরিয়ে ইনশিরাহের দিকে তাকাল। ফারহানের সুগঠিত চেহারায় এখন চরম গম্ভীর ও পর্যবেক্ষকমূলক অভিব্যক্তি।
"আপনি মিথ্যা বলতে একদমই পারেন না, তুবা," ফারহান সোজা ইনশিরাহের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল। "সাইটে রশীদ আঙ্কেল আসার পর থেকেই আপনাকে আমি নার্ভাস দেখছি। আর এখন এই মেসেজটা আসার পর আপনার গায়ের রঙ একদম সাদা হয়ে গেছে।"
ইনশিরাহ ফারহানের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে মনে মনে শিউরে উঠল। লোকটার চোখ থেকে কিছুই এড়ানো সম্ভব নয়।
"আমি কোনো মিথ্যা বলছি না, স্যার," ইনশিরাহ নিজের গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বলল। "ব্যক্তিগত কিছু দুশ্চিন্তা ছিল, দ্যাটস ইট। কাজের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।"
"আই ডন্ট কেয়ার অ্যাবাউট পার্সোনাল ইস্যুস, আনলেস ইট এফেক্টস মাই ওয়ার্ক অর মাই অফিস," ফারহান সিটের সাথে হেলান দিয়ে ইনশিরাহের কপালে নেমে আসা কয়েকটা চুলগুলোর দিকে তাকাল। তার গলার টোন হঠাৎ কিছুটা নরম হয়ে এলো, "তবে আপনার যদি কোনো সাহায্য দরকার হয়... এনি কাইন্ড অফ প্রবলেম অর থ্রেট... ইউ ক্যান টেল মি।"
ফারহানের মুখে 'থ্রেট' বা হুমকির কথাটা শুনে ইনশিরাহ কেঁপে উঠল।
ইনশিরাহ এক দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে চেয়ে রইল। এই লোকটা কি এখন ওর সাথে কোনো এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে? একদিকে সে হুমকি পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে সুরক্ষার আশ্বাস দিচ্ছে!
সে কি জানে কে মেসেজটা পাঠিয়েছে? নাকি সে নিজেই এই নাটকের মূল কারিগর, যে ইনশিরাহকে পরখ করে দেখছে সে ভয় পেয়ে পিছু হটে কি না?
"আমার কোনো সাহায্য লাগবে না, স্যার," ইনশিরাহ ফারহানের চোখ থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল। "আমি নিজের নিরাপত্তা আর নিজের সিদ্ধান্ত একা সামলাতে অভ্যস্ত।"
ফারহান কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে ইনশিরাহের জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত, অস্পষ্ট কিন্তু গভীর এক হাসি।
"সেলফ-ডিপেন্ডেন্ট হওয়া ভালো, তুবা। কিন্তু কখনো কখনো অতি-আত্মবিশ্বাস মানুষকে এমন কোনো খাদে ফেলে দেয়, যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব," ফারহান আবার ফার্স্ট গিয়ারে গাড়ি স্টার্ট দিল। "আর শাহরিয়ার গ্রুপ কিন্তু সাধারণ কোনো জায়গা নয়। এখানে প্রতিটা পদক্ষেপে ছায়া শিকার করে।"
গাড়ি আবার বৃষ্টিভেজা রাস্তায় চলতে শুরু করল।
ইনশিরাহ বাইরের অন্ধকার হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ব্যাগের ভেতর রাখা ফোনটা তখন এক প্রাণঘাতী হুমকির বার্তা বহন করছে, আর পাশে বসে থাকা পুরুষটি ওর শত্রু নাকি রক্ষক—
সেই প্রশ্নের রহস্য কেবল আরও গভীর ও জটিল রূপ নিচ্ছে। তবে যাই ঘটুক না কেন, ইনশিরাহ পিছু হটবে না। শুরু যখন হয়েছে, এই অদৃশ্য আলোড়নের শেষ দেখে তবেই সে থামবে।
চলবে..